Published : 19 Aug 2025, 12:17 AM
ইউক্রেইনে রুশ আগ্রাসন বন্ধে চুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় অনুষ্ঠিত ডনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের সভা কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া শেষ হয়েছে—এটি এখন সবারই জানা। এবার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে ওয়াশিংটনে, যেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিয়েছেন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
এবারের বৈঠকে জেলেনস্কি একা নন; তার সঙ্গে আছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকার প্রধানও। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, জেলেনস্কির কূটনৈতিক অবস্থান আগের তুলনায় শক্তিশালী এবং তিনি এককভাবে নন, বরং আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে আলোচনায় প্রবেশ করছেন।
গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির পূর্ববর্তী বৈঠক বাগবিতণ্ডা ও হতাশার মধ্যে শেষ হয়েছিল। বহু আশা নিয়ে হোয়াইট হাউসে গিয়েও জেলেনস্কিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাব্য কুশীলব হিসেবে অভিহিত হতে হয়েছিল তখন।
পুতিনের সঙ্গে আলাস্কায় বৈঠক করার পেছনে ট্রাম্পের নির্বাচন স্পষ্ট—এটি সাবেক রুশ এলাকা, যা আমেরিকা ১৮৬৭ সালে মাত্র ৭২ লাখ ডলারে রাশিয়ার কাছ থেকে কিনেছিল। ট্রাম্পের এই কূটনৈতিক বৈঠকের জন্য এই স্থান পছন্দ করাটাকে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ট্রাম্পের ভাষায় ওই সভায় ‘অনেক অগ্রগতি’ হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের আলোচনাকে অশ্বডিম্ব প্রসবকারী সভা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়, যেখানে বড় বড় দাবি থাকলেও বাস্তব ফলাফল শূন্যের কাছাকাছি। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি সম্পন্ন হয় না। তিনি আরও বলেন, তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেছেন ও একমত হয়েছেন। কিন্তু আসল কাজ কিছুই হয়নি সেটি সবার জানা। অথচ ওই সভার আগেও তিনি হুমকি দিয়েছেন যে, যুদ্ধ বন্ধ না হলে রাশিয়ার ওপর আরও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হবে।
প্রকৃতপক্ষে, আলাস্কার ওই বৈঠকে পুরো লাভবান হয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেইন আক্রমণের পর তিনি অনেকটা একঘরে হয়ে পড়েছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চোখে যুদ্ধাপরাধী হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছেন। অথচ ওই বৈঠকের আগে ট্রাম্পের কাছ থেকে পেলেন লাল-গালিচা সংবর্ধনা, যা কেবল তার কূটনৈতিক বৈধতাকেই বাড়িয়ে দিল না, বরং তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনল।
পুতিন অত্যন্ত কৌশলে ট্রাম্পের অহমিকায় তেল মেখেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প যদি গত মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকতেন তবে রুশ-ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরু হতোই না। এটি নিছক প্রশংসা নয়, বরং ট্রাম্পের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর রাজনৈতিক চাল, যাতে তিনি ভবিষ্যতের জন্য পুতিনের প্রতি আরও নমনীয় থাকেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্প বলে বেড়ান যে আগের নির্বাচনে প্রকৃত জয় তারই ছিল, ডেমোক্র্যাটরা কারচুপি করে তাকে হারিয়েছে। এমন বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে তোলে এবং বাইরের শক্তিগুলোর—যেমন রাশিয়ার—পক্ষে আমেরিকার বিভক্ত রাজনীতিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা সহজ হয়ে ওঠে।
আলাস্কায় বৈঠকের পর ট্রাম্পের পূর্ববর্তী নির্বাচনি পরাজয় প্রসঙ্গেও ইঙ্গিত দিলেন পুতিন। যেন তিনি ট্রাম্পের সেই দীর্ঘদিনের ক্ষতকে নতুন করে উসকে দিয়ে তার অনুকূলে ব্যবহার করতে চাইছেন। শুধু তাই নয়, পুতিন আবারও বললেন, ট্রাম্পের মতো অসাধারণ ব্যক্তির একটি নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত। এই ধরনের মন্তব্য নিছক সৌজন্য নয়; বরং এটি মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি, যেখানে প্রশংসার আড়ালে প্রতিপক্ষকে হাতের মুঠোয় আনা যায়।
ট্রাম্পের চরিত্রগত দুর্বলতাই হলো অহংকার ও প্রশংসালিপ্সা। পুতিন সেই দুর্বলতাকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। নোবেল পুরস্কারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি শুধু ট্রাম্পকে খুশিই করেননি, বরং তাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ অবস্থানে নিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এমনকি পুতিন মস্কোয় পরবর্তী সম্মেলনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ট্রাম্পকে। এটি শুধু কূটনৈতিক আমন্ত্রণ নয়; বরং রাশিয়ার জন্য পশ্চিমা অবরোধ ভাঙার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে নিজের পক্ষে কৌশলে ব্যবহার করার একটা চেষ্টা।
আলাস্কায় বৈঠকের পর ট্রাম্প তার প্রিয় ফক্স টিভিতে গিয়ে রাশিয়া ও পুতিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। তিনি বললেন, রাশিয়া একটি বিরাট শক্তি, তাদের শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করলেন, আমেরিকা পৃথিবীর এক নম্বর শক্তি হলে রাশিয়া তার ঠিক পরেই দুই নম্বরে। এই বক্তব্য কেবল মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রচলিত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, বরং রাশিয়ার জন্যও এক ধরনের কূটনৈতিক অর্জন।
আরও উদ্বেগজনক হলো, ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে আহ্বান করেছেন রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী ইউক্রেইনের কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধ থামাতে। অর্থাৎ, এক প্রকার তিনি রাশিয়ার আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার মতো অবস্থান নিলেন। এমন আহ্বান কেবল ইউক্রেইনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর আঘাত নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়ের ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
জেলেনস্কির দৃষ্টিতে তাই যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারটি এখন আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ, যে যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ইউক্রেইনের প্রধান সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখান থেকেই যখন রাশিয়ার শর্ত মেনে নেওয়ার বার্তা আসে, তখন কূটনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা পুরোপুরি পাল্টে যায়। এতে বোঝা যায়, বৈশ্বিক শক্তির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রায়ই যুদ্ধের গতিপথকে আরও দীর্ঘায়িত করে।
লক্ষণীয় যে, রাশিয়া–ইউক্রেইন যুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনায় ইউক্রেইনের কোনো প্রতিনিধিত্বই ছিল না। দেশটির ভাগ্য নির্ধারণে বসেছিলেন বৃহৎ শক্তিধর দুই দেশের কর্তৃত্বপরায়ণ দুই নেতা—ট্রাম্প ও পুতিন। এটি কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাহ্য করা। এমন ঘটনা শুধু ইউক্রেইনের অবস্থানকেই দুর্বল করেনি, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ছোট দেশগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির নগ্ন রূপও প্রকাশ করেছে।
ট্রাম্পের পুতিনপ্রেম তার প্রথম মেয়াদেই পৃথিবীজুড়ে আলোচিত হয়েছিল। ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছিলেন, সেই আশ্চর্য বিজয়ে হিলারির বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে জেতাতে পুতিনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। আজকের প্রেক্ষাপটে সেই অভিযোগ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
স্বভাবতই, ট্রাম্প–পুতিন সম্মেলন ইউক্রেইনের অসহায়ত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। এটি প্রমাণ করে, বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিতে ছোট রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নিজেদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হতে পারে না; তারা কেবল বড় শক্তিগুলোর হিসাব–নিকাশের দাবায় একেকটি ঘুঁটি মাত্র।
ট্রাম্প ও পুতিন মুখে ইউক্রেইনে যুদ্ধবিরতির কথা বললেও বাস্তবে তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল। ইরান প্রসঙ্গে নিজের নীতিগত অবস্থান গুবলেট পাকিয়ে ফেলা ট্রাম্প আবারও একটি বিশ্বমঞ্চ খুঁজছিলেন, যেখানে ফটোশুট আর বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে নিজেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে আনা যায়। এটি তার পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল—শক্তি প্রদর্শন ও মিডিয়া স্পটলাইটে থেকে নিজেকে অপরিহার্য করে তোলা।
ট্রাম্প বরাবরই স্বৈরাচারী, একনায়কতান্ত্রিক ও যুদ্ধবাজ নেতাদের প্রতি এক ধরনের ব্যক্তিগত টান অনুভব করেন। বিগত মেয়াদে তিনি উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করে বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন, যদিও প্রকৃত লাভ হয়েছিল কিমেরই। এবারও একই দৃশ্য পুনরাবৃত্ত হলো—পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার চেয়ে বেশি লাভবান হলেন পুতিন।
যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়েও পুতিন আবার দ্বিতীয় বিশ্বনেতার শিরোপা জিতে নিয়েছেন, আর ট্রাম্প তাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। এখন চিত্রটা যেন আরও প্রতীকী হয়ে উঠেছে: ট্রাম্পের ডানে নেতানিয়াহু, বামে পুতিন, আর মাঝখানে ট্রাম্প নিজে মধ্যমণি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—তিনি কি সত্যিই মধ্যমণি, নাকি এই দুই আগ্রাসী নেতার হাতে খেলতে থাকা এক ‘ট্রাম্প কার্ড’ মাত্র?
আসলে রুশ–ইউক্রেইন যুদ্ধটা ইউক্রেইনকে কেন্দ্র করে যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি আমেরিকা ও রাশিয়ার দীর্ঘ ঐতিহাসিক শত্রুতার চলমানতা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর রাশিয়া যখন পুঁজিবাদী পথে হাঁটতে শুরু করল, তখনও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে প্রকৃত অর্থে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। বরং ভিন্ন আঙ্গিকে ঠান্ডা যুদ্ধের আবহ অব্যাহত থেকেছে।
ন্যাটোকে শক্তিশালী করা ও ক্রমাগত বিস্তৃত করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শুধু এই বৈরিতাকে জিইয়ে রাখেনি, বরং তা আরও বাড়িয়েছে। ন্যাটোর বিস্তারকে রাশিয়ার সীমানা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার যে প্রচেষ্টা চলছে, সেটিতেই তো পুতিনের প্রধান আপত্তি।
অনেক পর্যবেক্ষক যুক্তিসঙ্গতভাবেই মনে করেন, এ সমস্যার গোড়ায় রয়েছে মার্কিন উসকানি। পুতিন নিজেও পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, সমস্যাটা আসলে ‘ইউক্রেইনকে ঘিরে পরিস্থিতি’—ইউক্রেইন নিজে থেকে নয়। অর্থাৎ, ইউক্রেইন এখানে মূল খেলোয়াড় নয়, বরং দুই মহাশক্তির দ্বন্দ্বে আটকে পড়া এক যুদ্ধক্ষেত্র। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ইউক্রেইনের বিপর্যয় আসলে বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্মম পরিণতি, যেখানে মানবিক মূল্য ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন জে. মিয়ারশাইমারের বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি ২০১৪ সালে ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ সাময়িকীর সেপ্টেম্বর–অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত বহুল আলোচিত ‘হোয়াই দ্যা ইউক্রেইন ক্রাইসিস ইজ দ্যা ওয়েস্ট’স ফল্ট: দ্যা লিবারেল ডিলিউশন দ্যাট প্রোভোকড পুটিন’ প্রবন্ধের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেই লিখেছিলেন—“এই সংকটের বৃহদংশের দায় যুক্তরাষ্ট্রের ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের। সমস্যার গোড়ায় হচ্ছে ন্যাটো সম্প্রসারণ। এ হচ্ছে ইউক্রেইনকে রাশিযার নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে পশ্চিমের অধীনস্থ করবার বৃহৎ কৌশলের মূল উপাদান। একই সময়ে পূর্বদিকে ইইউ-র সম্প্রসারণ ও ইউক্রেনে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকতা যা ২০০৪-এ ‘কমলা বিপ্লবে’ পরিণতি পায়, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।”
মিয়ারশাইমারের এই মন্তব্য শুধু একাডেমিক পর্যবেক্ষণ নয়; বরং এটি পশ্চিমা কৌশলের অন্তর্নিহিত দায়কে স্পষ্ট করে তুলে ধরে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেইনের সঙ্কট মূলত পশ্চিমা জোটের অতিরিক্ত চাপ ও সম্প্রসারণবাদী মানসিকতার ফল, যা পুতিনকে প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করেছে। অর্থাৎ, পুতিন এককভাবে দায়ী হলেও পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকাকেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
এরপর মিয়ারশাইমার আরও উল্লেখ করেন ২০১৩ সালের ‘ময়দান আন্দোলন’-এর প্রসঙ্গ, যা পশ্চিমা অর্থায়ন ও ইন্ধনে সংগঠিত হয়ে রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং তিনি পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। এই ঘটনাই পুতিনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়, যার ফলস্বরূপ তিনি ইউক্রেইনে আগ্রাসন চালিয়ে ক্রাইমিয়া দখল করেন।
শুধু মিয়ারশাইমারই নন, খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাকসও একই বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তার মতে, এই যুদ্ধ মূলত ন্যাটো সম্প্রসারণকে ঘিরেই সৃষ্টি হয়েছে—যা যুক্তরাষ্ট্রের বিগত তিরিশ বছরের কৌশলগত সাধনার ফল। তিনি দ্য ওয়ার ইন ইউক্রেইন ওয়াজ প্রভোকড— অ্যান্ড হোয়াই দ্যাট ম্যাটারস টু এচিভ পিস শীর্ষক প্রবন্ধে (২৩ মে ২০২৩, কমন ড্রিমস) লিখেছেন, “রাশিয়ার আক্রমণের এক মাস পরেই অর্থাৎ ২০২২-এর মার্চে যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইউক্রেইন ও রাশিয়া একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছিলো যার মুল কথা ছিলো যে, যুদ্ধনীতিতে ইউক্রেইন নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে। কিন্তু জেলেনস্কিকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধা দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তারা অস্ত্র দিয়ে জয়ের লক্ষ্যে জেলেনস্কিকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উসকানি দেয় ও মাঠে নামায়।”
অর্থাৎ, শান্তির একটি সম্ভাবনা হাতছাড়া হলো মূলত পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের কারণে। এতে কেবল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়নি, বরং ইউক্রেইনের মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্র হয়েছে।
পুতিনের দাবির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন ট্রাম্প হাত গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করা সম্পূর্ণভাবে জেলেনস্কির ওপর নির্ভর করছে। তার ভাষায়, জেলেনস্কি চাইলে এখনই যুদ্ধ থামাতে পারেন।
এমনকি ট্রাম্প সরাসরি ইউক্রেইনকে ক্রাইমিয়া ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, ইউক্রেইনের উচিত ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার প্রচেষ্টা থেকেও সরে আসা। অর্থাৎ, ট্রাম্প কার্যত ইউক্রেইনকে তার সার্বভৌম ভূখণ্ডের দাবি ত্যাগ করতে বলছেন এবং রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে চাপ দিচ্ছেন।
এই অবস্থান কেবল ইউক্রেইনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিরুদ্ধে যায় না, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ ঘোষণার মৌলিক নীতিকেও উপেক্ষা করে। ট্রাম্পের এই বার্তায় স্পষ্ট যে, তার কূটনৈতিক হিসাব ইউক্রেইনের ভবিষ্যতের চেয়ে বরং পুতিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক মসৃণ রাখার দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে।মিয়ারশাইমারের এক দশকেরও বেশি আগের ওই প্রবন্ধটির শেষ অনুচ্ছেদটি এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক: “যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপিয়ান মিত্রদেরকে এখন যে কোনো একটা সিদ্ধান্ত বেছে নিতে হবে। তারা বর্তমান নীতি অব্যাহত রাখতে পারে যা রাশিয়ার সঙ্গে শত্রুতা আরও বাড়াবে এবং ইউক্রেইনকে ধ্বংস করবে—যে পরিস্থিতিতে সকলেই হারবে। অথবা তারা পথ বদলাবে এবং একটি সমৃদ্ধ ও নিরপেক্ষ ইউক্রেইন বিনির্মাণে কাজ করবে যা রাশিয়াকে হুমকি দিবে না এবং ফলে পশ্চিমের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এরকম পদক্ষেপে সব পক্ষই জিতবে।”
আজকের বাস্তবতায় এই সতর্কবার্তা যেন আরও বেশি ওজনদার হয়ে উঠেছে। কারণ, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই ইউক্রেইনের ধ্বংসযজ্ঞ বাড়ছে, পশ্চিমা অর্থনীতি চাপে পড়ছে এবং রাশিয়া বিকল্প জোট গড়ে তুলছে। মিয়ারশাইমারের কথায় তাই স্পষ্ট—পশ্চিম যদি নিজের নীতি পুনর্বিবেচনা না করে, তবে এই সংঘাত কেবল ইউক্রেইন নয়, গোটা বিশ্বের স্থিতিশীলতাকেই বিপন্ন করে তুলবে।
২০২৫ সালে ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে এমন কোনো কূটনৈতিক প্রভাব তৈরি হবে কিনা, তা সময়ই বলবে। তার দৃষ্টিকোণ হয়তো জেলেনস্কির সঙ্গে আজকের বৈঠকে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তবে ট্রাম্পের পথে সবচেয়ে বড় বাধা তার দেশের শক্তিশালী সামরিক ও মিলিটারি–ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স, যা প্রথাগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধ করে।
ট্রাম্পের সামনে এখনও নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভের মুলা ঝুলছে। ব্যক্তিগত খ্যাতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত ট্রাম্প কি করছেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আলাস্কা বৈঠকের পর ওয়াশিংটন বৈঠক প্রমাণ করল, ইউক্রেইনের ভাগ্য বড় শক্তির দ্বন্দ্বে আটকা পড়ে আছে। জেলেনস্কি এবার আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে বসেছেন, যা তার কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে ছোট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কতটা গুরুত্বের তা-ও দেখার বিষয়।