Published : 26 May 2026, 08:21 AM
কোরবানির ঈদের পরদিন সকালে যদি কোনো চামড়াপট্টিতে যান, দৃশ্যটা খুব একটা বদলানো দেখবেন না। রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা কাঁচা চামড়া, গরমে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, সর্বোপরি লোকসানের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত ছোট ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর একই ছবি। এত সম্ভাবনাময় একটি খাত বছরের পর বছর এমন অবস্থায় কেন পড়ে আছে?
গত কোরবানির ঈদের সময় রংপুরের একটি চামড়াপট্টিতে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি প্রায় এক লাখ বিশ হাজার টাকা দামের একটি গরু কোরবানি দিয়েছিলেন। চার ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর সেই গরুর চামড়ার দাম পেলেন মাত্র চারশ টাকা। পাশে দাঁড়ানো আরেকজন বলছিলেন, ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে পাঁচ টাকারও ক্রেতা পাননি। শেষ পর্যন্ত ফেলে রেখে যেতে হয়েছে।
অথচ এই চামড়া থেকেই কয়েক মাস পর বাজারে চার, পাঁচ কিংবা দশ হাজার টাকার জুতা বিক্রি হয়। উৎপাদনের শুরুতে যার মূল্য প্রায় নেই, প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর সেই পণ্যই হয়ে ওঠে মূল্যবান। চামড়ার সমস্যা আসলে চামড়ায় নয়, সমস্যা হচ্ছে আমরা এর বাজারটা ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারিনি।।
অনেকে মনে করেন, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় চামড়ার দাম পড়ে গেছে। বাস্তবতা একটু ভিন্ন। রংপুরের ব্যবসায়ী ও ঢাকার কয়েকজন আড়তদারের সঙ্গে কথা বলে যা বোঝা যায়, বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা খুবই সীমিত। হাতে গোনা কয়েকজন বড় আড়তদার দাম নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা স্বাধীনভাবে দর ঠিক করতে পারেন না।
লোকসান এখন চামড়া ব্যবসায়ীদের নিত্যসঙ্গী। গড়ে ছয়শ টাকায় কেনা চামড়া পাঁচশ টাকায় বিক্রি করতেও বাধ্য হন অনেকে। সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় ক্ষতি জেনেও বেশি দামে কেনা চামড়া কম দামে ছাড়তে বাধ্য হয় তারা।
বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২২ থেকে ২৫ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হয়। এর প্রায় ৬০ শতাংশ আসে কোরবানির ঈদের মাত্র কয়েক দিনে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই কাঁচামালের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দেশের বাজারে উৎপাদক পর্যায়ে এর মূল্য সেই সম্ভাবনার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দুই দশক আগে একটি কোরবানির গরুর চামড়া দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার উদাহরণ ছিল। এখন অনেক এলাকায় সেই দাম নেমে এসেছে কয়েকশ টাকায়। সরকার প্রতিবছর দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই মূল্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর হয় না। মাঠপর্যায়ে তদারকির ঘাটতি রয়ে যায়। দাম কমে যাওয়াটা চোখে পড়ে, কিন্তু এর পেছনে আরও বড় কিছু সমস্যা আছে, যেগুলো পুরো ব্যবসা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত।
২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর করা হয়েছিল পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি এখনো আন্তর্জাতিক মানে পুরোপুরি কার্যকর নয়। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এতে শুধু পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে না, ব্যবসায়ও বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের বড় ক্রেতারা এখন পরিবেশ ও কমপ্লায়েন্সকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (LWG) সনদ না থাকলে নাইকি, অ্যাডিডাস কিংবা অন্যান্য বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশি চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখায় না।
ফলে বাংলাদেশ বাধ্য হচ্ছে তুলনামূলক কম দামে কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিক্রি করতে। অন্যদিকে চীনসহ কয়েকটি দেশ সেই চামড়া নিজেদের কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে বহুগুণ বেশি দামে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করছে। সবচেয়ে বেশি লাভটা আমরা পাচ্ছি না, সেটা অন্য দেশ নিয়ে যাচ্ছে।
এই অবস্থার সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, দেশে বিপুল পরিমাণ চামড়া উৎপাদিত হওয়ার পরও অনেক ফুটওয়্যার কোম্পানিকে বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে। কারণ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সব চামড়া আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারে না। অর্থাৎ কাঁচামাল আমাদের, কিন্তু মানসম্পন্ন পণ্য তৈরির সুবিধা পুরোপুরি আমাদের নয়। এ শুধু চামড়া শিল্পের সমস্যা নয়, পরিকল্পনা আর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ফল সমাধান অবশ্য আছে, কিন্তু সেটি কেবল কোরবানির কয়েক দিনের বাজার তদারকিতে সীমাবদ্ধ নয়।
কোরবানির অর্থনীতি নিয়েও আমাদের আলোচনা খুব সীমিত। বাংলাদেশে প্রতিবছর এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়। এর সঙ্গে জড়িত কৃষক, পশু ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত, মৌসুমী শ্রমিক, মাদ্রাসা ও এতিমখানা। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে শুধু চামড়া থেকেই হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হতে পারত।
কিন্তু বাস্তবে লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যবর্তী স্তরে। একটি চামড়া সংগ্রহকারী থেকে শুরু করে স্থানীয় ব্যবসায়ী, আড়তদার, ট্যানারি এবং রপ্তানিকারকের হাত ঘুরে বাজারে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ শৃঙ্খলে সবচেয়ে কম লাভ পান উৎপাদক ও সাধারণ বিক্রেতারা।
এর সামাজিক প্রভাবও কম নয়। এক সময় কওমী মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর বার্ষিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসত কোরবানির চামড়া থেকে। অনেক প্রতিষ্ঠানের লিল্লাহ বোর্ডিং পরিচালনার খরচও মেটানো হতো এই আয়ে। কিন্তু চামড়ার দাম ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় সেই আয়ের উৎস প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফলে সংকটের চাপ পড়ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের ওপর।
সমাধান সম্ভব, তবে শুধু ঈদের কয়েক দিন বাজারে নজরদারি বাড়ালেই হবে না। সমস্যার শিকড় যেখানে, সংস্কারও সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশগত অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত না হলে বাংলাদেশের জন্য বড় ব্র্যান্ডগুলোর বাজারে প্রবেশ কঠিনই থেকে যাবে। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ এবং বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কাঁচামালের অভাব আমাদের প্রধান সমস্যা নয়; বড় সমস্যা হলো সেই সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা। যে চামড়া দেশের অর্থনীতির জন্য সম্পদ হতে পারত, সেটাই অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বোঝায় পরিণত হচ্ছে। বিশ্ব চামড়াজাত পণ্যের বাজার কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের। সেখানে বাংলাদেশের অংশ এখনো খুবই সীমিত। অথচ কাঁচামালের বড় অংশ আমাদের নিজেদের। তৈরি পোশাক খাতের মতো বিদেশ থেকে অধিকাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয় না। এই সুবিধা বিশ্বের খুব কম দেশের আছে।
ঈদুল আজহা আবারও দরজায় কড়া নাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, এবারও হয়তো পুরোনো দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হবে। চামড়াপট্টিতে আবারও কম দামে চামড়া বিক্রি হবে, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনবেন, আর এতিমখানাগুলো প্রত্যাশার চেয়ে কম আয় পাবে।
কিন্তু এই চিত্র অনিবার্য নয়। প্রশ্ন কেবল একটি—আমরা কি সত্যিই এই খাতকে গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত? কারণ সমস্যাগুলো অজানা নয়। করণীয়ও বহুবার চিহ্নিত হয়েছে। এখন দরকার কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া, তা বাস্তবে প্রয়োগ করা এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা। নয়তো আগামী ঈদেও একই অভিযোগ শুনতে হবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা এই খাতের পুরো সুবিধা নিতে পারলাম না।