ইতিহাসের অংশীদার, রাষ্ট্রের প্রান্তিক গারো পাহাড় ও হাজং জনপদের কান্না
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো, হাজং, কোচদের দিন কাটছে আতঙ্ক নিয়ে। অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তা কি এই আদিবাসী জনপদকে বাদ দিয়ে আদৌ সম্ভব?
বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠনের মূল দর্শন ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ—বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো, কোচ, বর্মন, হাজং, ডালু, বানাই ও হদি জনগোষ্ঠী—এখনও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে পূর্ণ নাগরিক অধিকার, সাংবিধানিক মর্যাদা ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য মতে, দেশে ৫৪টিরও অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ লাখ মানুষ রয়েছে; যদিও রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখানো হয়। সংখ্যাগত এই অস্বীকৃতি মূলত বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বঞ্চনার প্রতিফলন। আদিবাসীরা এই ভূখণ্ডের ভূমিপুত্র, যাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের ইতিহাসে গারো, হাজং, কোচ, বর্মন, বানাই, ডালু ও হদি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি কেবল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রগঠন, কৃষি অর্থনীতি, প্রতিরোধ সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রখ্যাত গবেষক কেদারনাথ মজুমদারের ‘ময়মনসিংহের ইতিহাস’ গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, মুঘল আগমনের পূর্বে পূর্ব ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কোচ, হাজং ও গারোদের বিভিন্ন ক্ষুদ্র রাজ্য ও শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। সুসঙ্গ পাহাড়ি অঞ্চল, জঙ্গলবাড়ী, মদনপুর, বোকাইনগর কিংবা গড়দলিপা—এসব অঞ্চলে গারো, কোচ ও হাজং শাসকদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ছিল বাস্তব ইতিহাস। গারো, কোচ ও হাজংরা এ অঞ্চলের রাষ্ট্র-সমাজ বিনির্মাণের প্রাচীন অংশীদার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, টংক আন্দোলন, কৃষক বিদ্রোহ, এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধেও এই জনগোষ্ঠীগুলোর গৌরবোজ্জ্বল অবদান রয়েছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহেই প্রায় ১৫০০ স্বীকৃত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কিন্তু ইতিহাসের অংশীদার, রাষ্ট্রের প্রান্তিক গারো পাহাড় ও হাজং জনপদের কান্না শুনবার মতো যেন কেউ নেই।স্বাধীনতার পর এই জনগোষ্ঠীগুলো তাদের ইতিহাসসম্মত মর্যাদা তো পায়নি, বরং ভূমি হারানো, সাংবিধানিক অস্বীকৃতি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বহীনতা এবং উন্নয়নের নামে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। ব্রিটিশ আমলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের শ্রীবর্দী, নালিতাবাড়ী, হালুয়াঘাট, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা অঞ্চল ‘Partially Excluded Areas’ বা ‘আংশিক বহির্ভূত এলাকা’ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। সহজ কথায়, যে সমস্ত অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি ছিল এবং যাদের নিজস্ব প্রথাগত আইন, সংস্কৃতি ও ভূমি ব্যবস্থা ছিল—সেসব অঞ্চলকে সাধারণ প্রশাসনিক নিয়মের বাইরে রেখে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছিল। বৃহত্তর ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো (যেমন: শ্রীবরদী, নালিতাবাড়ী, হালুয়াঘাট, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা) এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই স্বীকৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিশেষ সামাজিক ও প্রথাগত ভূমির মালিকানার বাস্তবতাকে স্বীকার করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান আমলে সেই বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা হয় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রেও সমতলের আদিবাসীরা ভূমি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সুরক্ষার ন্যূনতম কাঠামো থেকেও বঞ্চিত হয়।
আজ সমতলের আদিবাসীরা ভূমি দখল, জাল দলিল, সংরক্ষিত বনভূমি, জাতীয় উদ্যান, পর্যটন শিল্প, রাবার শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণসহ নানান উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ক্রমাগত ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। ১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের সীমিত সুরক্ষা বাস্তবে কার্যকর হয়নি; কারণ রাষ্ট্র তাদের প্রথাগত সামষ্টিক ভূমি মালিকানাকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভূমি শুধু সম্পত্তি নয়, এটি আদিবাসী জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক অস্তিত্ব, স্বশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ভিত্তি।
রাষ্ট্রের আরেকটি বড় সংকট হলো ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সাংবিধানিক অস্বীকৃতি। সরকারের সঙ্গে আদিবাসীদের দীর্ঘ আলোচনার পরও ২০১১ সালে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ শব্দগুলো সন্নিবেশিত করে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ভাষাগত কৌশল ও শাব্দিক খেলায় রাষ্ট্র মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো—বিশেষত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ঘোষণাপত্র-২০০৭, যা আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষার কাঠামো, তা অস্বীকার করেছে। যদিও আদিবাসী জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ‘ইন্ডিজেনাস পিপলস’ বা ‘আদিবাসী’ পরিচয়কেই গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক মনে করে; কারণ এটি শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়, এটি ভূমি, স্বশাসন, ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পাহাড় ও সমতল থেকে দু’জন আদিবাসী নারীকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করেছে। এটা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এছাড়াও আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস নতুনভাবে শুরু করার ব্যাপারে জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল যে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন, কিংবা বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো, কোচ ও হাজং জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার বিষয়টি জাতীয়ভাবে তুলে ধরে যে প্রগতিশীল অবস্থান নিয়েছেন, নিশ্চয়ই সেগুলো প্রশংসনীয়। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে এ ধরনের স্বীকৃতি দীর্ঘদিনের অবহেলিত বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে এই সব প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের কেবল উপকারভোগী হিসেবে নয়, বরং নীতিনির্ধারণের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। সমতলের আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের আইনগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে এবং একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তাদের যৌক্তিক সংরক্ষিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সংবিধানে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৬৯ অনুসমর্থন কিংবা মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, আদিবাসী নারী ও শিশুর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রথাগত শাসনব্যবস্থার স্বীকৃতি জরুরি। আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে আদিবাসীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলোচনা তথা ‘স্বাধীন, পূর্ব-অবহিত ও সম্মতি’ (এফপিআইসি) গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়।
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ কোনো অনুগ্রহ নয়, তারা সাংবিধানিক ন্যায়বিচার, ঐতিহাসিক স্বীকৃতি, ন্যায় ও সমঅধিকারের দাবিদার। রেইনবো নেশনের যে স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী ও তার দল বিএনপি দেখছে, সেই রেইনবো নেশন কিংবা উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আদিবাসীরাও অংশীদার হতে চায়। কিন্তু সেই সুযোগ রাষ্ট্রকেই করে দিতে হবে।
একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের ভূমি, পরিচয়, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষিত করতে হবে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন গারো পাহাড়, হাজং জনপদ, কোচ গ্রাম কিংবা ডালু, হদি ও বানাই সম্প্রদায়ের মানুষও সমান নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বলতে পারবে—এই বাংলাদেশ বাঙালি, আদিবাসী, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের ও সকল নাগরিকের। অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের উন্নয়নে নয়, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়ভিত্তিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই আগামীর অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।
