Published : 06 Nov 2025, 02:56 AM
নিউ ইয়র্কে জোহরান মামদানির বিপুল বিজয় শুধু একটি শহরের মেয়র নির্বাচনের ফল নয়—এটি একটি আদর্শের বিজয়-প্রতীক। জোহরান মামদানি নামের এক তরুণ মুসলমান, অভিবাসীর সন্তান এবং তৃণমূল রাজনীতির প্রতিনিধি প্রমাণ করে দিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এখনও মানুষ জিততে পারে, অর্থ বা বংশ নয়। তার এই জয় শুধুমাত্র অ্যান্ড্রু কুওমোর পরাজয় নয়, এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধও নয়; বরং এটি আমেরিকার শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া প্রগতিশীল চেতনার অভ্যুদয় ঘটিয়েছে, যা ছড়িয়ে পড়বে বহুদূর।
অথচ এক বছর আগে, যখন জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ঘোষণা করেছিলেন, সবাই বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘কে এই মামদানি?’ ৪ নভেম্বর, নিউ ইয়র্কবাসী ভোট দিয়ে তাকে বিজয়ী করেছেন এবং উৎসবে খুশিতে নাচছেন। একজন মুসলমান, ভারতীয় বংশোদ্ভূত উগান্ডাবাসীর সন্তান, যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ শহর নিউ ইয়র্কের মেয়র। তার মা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভারতীয় চলচ্চিত্রকার মীরা নায়ার ও বাবা ভারতীয়-উগান্ডান অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি। ডালাসে বেড়ে ওঠা ও দুবাইয়ে শিক্ষালাভ করা চিত্রশিল্পী রামা দুয়াজি হলেন মামদানির স্ত্রী। মাত্র চার বছর আগে নিউ ইয়র্কে এসেছেন সিরীয়-মার্কিন এ শিল্পী। তারা এবছরই বিয়ে করেছেন।

নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক নতুন রাজনৈতিক ভোরের সূচনা করেছে। এই জয় নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। ঐতিহাসিক জয়ের পর উল্লসিত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে মামদানি বললেন, “এতদিন, নিউ ইয়র্কের ধনী ও উচ্চবিত্তের কাছে আমরা শুনে এসেছি, নিউ ইয়র্কের শ্রমজীবী মানুষের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। তবুও, গত ১২ মাস ধরে, আপনারা সাহস দেখিয়েছেন আরও বৃহত্তর কিছু অর্জনের জন্য। আজ রাতে, সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে, আমরা তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছি।”
তুমুল হর্ষধ্বনিতে, মামদানি তার পরাজিত প্রতিপক্ষ অ্যান্ড্রু কুওমোকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমার বন্ধুরা, আমরা একটি রাজনৈতিক রাজবংশকে উৎখাত করেছি।” মামদানির জন্য এই পথ সহজ ছিল না, এবং এটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়।
প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রতীক মামদানি
যুক্তরাষ্ট্রে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে শুরু করেন তার প্রগতিশীল আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিল একটি তৃণমূল রাজনৈতিক ও সামাজিক চেষ্টা, যা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং সামাজিক অবিচার মোকাবেলায় সক্রিয়ভাবে সোচ্চার ছিল।

আগেও এই ধরনের প্রচেষ্টা হয়েছিল সিনেটর হুবার্ট হুমপ্রি এবং সিনেটর ওয়াল্টার মন্ডলের নেতৃত্বে। কিন্তু সেগুলো ছিল স্বল্পস্থায়ী। তাই ধারণা করা হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে যাওয়ার পর বার্নি স্যান্ডার্সের আন্দোলনও মিইয়ে যাবে। সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, তখন লাখ লাখ তরুণ কর্মী বার্নি স্যান্ডার্সের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে কাজ করেছিলেন, এবং তারাই এই আন্দোলন জিইয়ে রাখলেন।
পরে তাদের মধ্যে অনেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিজেরাই যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের সদস্য হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইলহাম ওমর, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাশিও-কোর্টেজ, জেসুস গার্সিয়া, প্রমীলা জয়পাল, রাশিদা তলাইবসহ প্রায় শখানেক কংগ্রেস সদস্য। তারা কংগ্রেসে একটি ‘প্রগতিশীল ককাস’ প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন প্রগতিশীল কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করছেন।
এই বছর, এই আন্দোলনে দুর্দান্ত এক মাত্রা যোগ করেছেন জোহরান মামদানি। শুধু মামদানি নন, আরও কয়েকজন তরুণ প্রার্থী যারা মামদানির মতো নিজেদের ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন, যেমন মিনিয়াপোলিসের ওমর ফাতেহও এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
সাধারণের পক্ষ নিয়ে অসাধারণ মামদানি
নিউ ইয়র্কে ট্রাম্পের নীতিগুলো কঠিন সংকট তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—অভিবাসন বিরোধী অভিযান বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অর্থনৈতিক উদ্বেগ। মামদানি এইসব বিষয় নিয়ে সরাসরি ও খোলাখুলিভাবে কথা বলেছেন। নিউ ইয়র্কবাসীর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সহজীকরণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সাধারণের পক্ষ নিয়ে অসাধারণে পরিণত হয়েছেন তরুণ নেতা জোহরান মামদানি।
তার প্রধান কর্মসূচি হলো নিউ ইয়র্ক শহরে বাড়ি ভাড়ার উর্ধগতি রোধ করা এবং বাড়ি ভাড়াকে স্থিতিশীল করার ব্যবস্থা প্রণয়ন। আরও আছে শহরের নাগরিকদের জন্য বিনা ভাড়ায় পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি। জোহরান মামদানি বড়লোক, মধ্যবিত্ত ও গরিব নির্বিশেষে নিউ ইয়র্কের সমস্ত পরিবারের জন্য বিনামূল্যে শিশুযত্নের ব্যবস্থা প্রণয়নেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এটি বাস্তবায়ন করতে তাকে সরকারি ও বেসরকারি পরিষেবা প্রদানকারীদের অস্থির ও জটিল ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে, নতুন ডে কেয়ার স্পেস তৈরি করতে হবে, নতুন শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে এবং শহরের প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ডলারের বাজেট পুনর্নির্মাণের জন্য একটি জটিল লজিস্টিক ও আর্থিক গোলকধাঁধা অতিক্রম করতে হবে।
তার এই কর্মসূচিগুলো কার্যকর করা খুব সহজ হবে না। আর্থিক দায়ভার ছাড়াও রয়েছে বিরাট কাঠামোগত প্রতিকূলতা। তবু এটাও সত্য যে, মামদানির গতিশীল নেতৃত্ব ও দৃঢ় সদিচ্ছা তাকে সফল হতে বিপুলভাবে সাহায্য করবে।
ট্রাম্পকে ভলিউম বাড়াতে বললেন মামদানি
ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর, ডেমোক্র্যাটিক নেতাদের দুর্বলতা আরও প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে। যখন ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ছিল তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। ট্রাম্পের খামখেয়ালি নীতিমালা এবং একের পর এক প্রেসিডেন্টিয়াল আদেশের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ ডেমোক্র্যাটদের জন্য সংকট তৈরি করছিল, কারণ তারা তখন কংগ্রেসে সংখ্যাগতভাবে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিল না। এই পরিস্থিতিতে দলের প্রগতিশীল ও তরুণ নেতৃত্ব পুরোনো মরচে ধরা নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে সামনে এগিয়ে এসেছে।
মামদানির জয়, ডেমোক্র্যাটদের জন্য নতুন সময়ের সূচনা করবে বলে আশা করা যায়। ট্রাম্পকে মামদানি সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন—অর্থনৈতিক দুর্ভোগ, আগ্রাসী অভিবাসন নীতিমালা এবং দেশের বড় বড় শহরে আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। নির্বাচনি বিজয় বক্তৃতায় মামদানি পুনরায় এইসব অভিযোগ ব্যক্ত করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আমি জানি আপনি আমার বক্তৃতা শুনছেন—ভলিউম বাড়িয়ে শুনুন।”
মামদানির জয়, আন্তর্জাতিক প্রভাব
ইউরোপের রাজনীতিতে বর্তমানে ডানপন্থীদের জয়জয়কার। আগামী বছর বিভিন্ন দেশে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মামদানির উত্থান ও জয় ইউরোপের বামপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলো এককালে সমাজতান্ত্রিক ওয়েলফেয়ার স্টেটের বড় সমর্থক ছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে এবং ভাগ্যহীনদের দুর্ভোগ বেড়েছে। বামপন্থী দলগুলো মামদানির মতো সহজ ও জনবান্ধব নীতিমালা পুনরায় তুলে ধরে আবার সফল হতে পারে।
শুধু ইউরোপ কেন, বাংলাদেশের বামপন্থীরাও নিজেদের মধ্যে আদর্শের কাড়াকাড়ি বন্ধ করে কিছু বাস্তব ও জনদরদী নীতিমালা নিয়ে জনগণের সামনে আসতে পারে। মামদানির জয় বিভিন্ন দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।
মামদানির এজেন্ডা হলো নিউ ইয়র্কের শ্রমজীবী মানুষকে সাহায্য করার জন্য একদম স্থানীয়ভাবে গড়া কর্মসূচি। আমাদের দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিবিদেরা যদি সফল হতে চান, তাহলে মামদানির নির্বাচনি পাতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন—স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত জন-কল্যাণ কর্মসূচি তৈরি করে।
ইসরায়েলের অশনি সংকত মামদানি
মামদানির জয়ে, ডনাল্ড ট্রাম্পের পর সবচেয়ে অসুখি ব্যক্তি হতে পারেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মামদানি সরাসরি তার ইসরায়েলবিরোধী নীতিমালা উন্মোচন করেছেন। নিউ ইয়র্কের অনেক প্রগতিবাদী ইহুদি এখন মামদানির সঙ্গে একমত যে ইসরায়েলের মানবতাবিরোধী আগ্রাসনে আর সমর্থন দেওয়া যায় না।

মামদানি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, নেতানিয়াহুর পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জায়গা দখল করে সেটেলমেন্ট বানানোর জন্য নিউ ইয়র্ক থেকে কোনো আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে না। তিনি তার ইসরায়েলের মানবতাবিরোধী নীতিমালা যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশের বেশি মানুষ ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতিমালার বিরোধিতা করে। মামদানি বলেছেন, নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্ক শহরে এলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।
তবে মামদানিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। নিউ ইয়র্ক শহরের প্রভাবশালী ইহুদি সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়েই তাকে প্রশাসন চালাতে হবে, কারণ শহরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে তাদের সমর্থন অপরিহার্য। মামদানি যে সব বড় পরিষেবা-মূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চান, সেগুলোর জন্য ইহুদি সম্প্রদায়ের আর্থিক সাহায্য ও অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় নীতি ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জটিলতা ও বিভিন্ন শক্তির সমন্বয়ে মামদানিকে দক্ষতা দেখাতে হবে।
মুসলমানদের আশার বাতি মামদানি
মামদানি নিউ ইয়র্ক এবং সমগ্র পশ্চিমা দেশের মুসলমানদের জন্য একটি আশার বার্তা নিয়ে এসেছেন। বিগত কয়েক বছরে ইসলামফোবিয়া ও মুসলিমফোবিয়ার প্রকোপ পশ্চিমা দেশগুলোতে যেভাবে গেঁড়ে বসেছে, তা যথেষ্ট শ্বাসরুদ্ধকর। আশা করা যায়, মামদানির নির্বাচন এইসব দেশের নেতাদেরকে মুসলমানদের সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে প্রণোদিত করবে।
৪ নভেম্বরের নিউ ইয়র্ক সিটি নির্বাচন মামদানির সঙ্গে আরও কয়েকজন মুসলিম রাজনীতিককে সামনে নিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে আছেন মিনিয়াপোলিসের মেয়র পদপ্রার্থী ওমর ফাতেহ, যাকে বলা হয় মিনিয়াপোলিসের মামদানি। তিনিও একজন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট, সোমালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন। মিনিয়াপোলিসের নির্বাচন জটিল র্যাঙ্কড চয়েস পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং গণনা এখনও চলছে। ফাতেহের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে নির্বাচিত হওয়ার।
এছাড়া, ভার্জিনিয়া স্টেটসের লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন গাজালা ফেরদৌস হাশমি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম এই মহিলা এখন ভার্জিনিয়ার দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক