Published : 29 Aug 2020, 02:10 PM
বিল গেটস কোভিড মহামহারীর সমাধান দেখছেন একটি কার্যকর প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মধ্যে। আমার বন্ধু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জাওয়াদুল হক মনে করেন এই মহামহারী সহসা যাবে না, সংক্রমণ-মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে একটা সহনীয় অবস্থায় স্থিতি পাবে।
আমাদের অজানা অনেক কিছুই
চীনের উহান শহরে শুরু হয়ে আশ্চর্য দ্রুততায় সারা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া এক অদৃশ্য ভাইরাসের চরিত্রের অনেক কিছুই এখনও আমাদের অজানা। বিটা করোনাভাইরাসের অন্তর্ভুক্ত ৩০ হাজার নিউক্লিউটাইডের আরএনএ সার্স কোভ-২ ভাইরাসটি ২০০৩ সালে এশীয় দেশে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স কোভ-১ (SARS COV) ভাইরাসের জিনের সাথে ৭৯% অভিন্নতা রয়েছে। ভাইরাসটির শারীরিক কাঠামোর ক্রাউন সদৃশ্য স্পাইক (s) প্রোটিন বিজ্ঞানী ও শিল্পীর রঙে প্রতিদিনই আরো নান্দনিক হচ্ছে। সার্স কোভ-২ ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন মানব কোষের (Cell) ACE2 রিসেপ্টর আঁকড়ে ধরে সেলের ভিতরে প্রবেশ করে। ACE2 রিসেপ্টর শ্বাসতন্ত্র (ইপিথিলিয়াল কোষ) ও অন্যান্য কিছু অঙ্গে অধিক মাত্রায় থাকে। স্পাইক প্রোটিনের দুটি অংশ- S1 অংশে থাকা Receptor Binding Domain (RBD) রিসেপ্টরের সাথে আবদ্ধ হয় এবং S2 অংশ কোষের মেমব্রেনের সাথে একীভূত হতে কাজ করছে।
কোভিড-১৯ দেশ-সীমানা, ধনী-দরিদ্র বাছবিচার না করলেও বয়স, জেন্ডার ও শরীরে পূর্বতন রোগের উপস্থিতি ভেদে উপসর্গবিহীন, মৃদু উপসর্গ (সর্দি-কাশির ন্যায়) থেকে তীব্র ও গুরুতর অবস্থার মধ্য দিয়ে মৃত্যুর মতো তারতম্য ঘটাচ্ছে। আমাদের জানা অসম্পূর্ণ থাকলেও এই তারতম্য মূলত শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার (immune system) সক্ষমতা ও প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। শরীরে ভাইরাস বা জার্ম প্রবেশ করার সাথে সাথেই অনির্দিষ্টভাবে কিছু সেল ও প্রোটিন মলিকিউল দিয়ে সহজাতভাবে প্রতিরোধ (innate immune system) গড়ে তোলে। এর পরপরই আমাদের অ্যাডাপটিভ ইমিউন সিস্টেম জাগ্রত হয়। এই সিস্টেমের লড়াকু সৈনিক- লিম্ফোসাইট। বি-লিম্ফোসাইট অ্যান্টিবডি তৈরি করে ভাইরাসকে নিউট্রালাইজ করে। টি-লিম্ফোসাইট ভাইরাস সংক্রমিত সেলকে ধ্বংস করে।
কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ব্যক্তি কি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ইমিউনিটি গড়ে তুলতে সক্ষম? সেই ইমিউনিটির প্রকৃতিই বা কী রকম? কোভিড-১৯ রোগ থেকে আরোগ্যপ্রাপ্ত বেশিরভাগ (৯০%) ব্যক্তির দেহে উপসর্গ আসার ১৪-২৫ দিনের মধ্যে আন্টিবডি তৈরি হয়। উপসর্গবিহীন বা মৃদু উপসর্গবাহী রোগীদের ক্ষেত্রে খুব কম মাত্রায় আন্টিবডি তৈরি হয়। আরো বেশি উদ্বেগের বিষয়, বেশিরভাগ আরোগ্যপ্রাপ্ত রোগীর রক্ত থেকে দুই-তিন বা কখনো এক মাসের মধ্যে এই আন্টিবডি লুপ্ত বা প্রায় লুপ্ত হয়ে যায়। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার সমার্থক হিসাবে পর্যাপ্ত আন্টিবডি উৎপন্ন হওয়া বিবেচিত হয়ে থাকে। তাই ডাব্লিউএইচও কোভিড আরোগ্যপ্রাপ্তদের ইমিউনিটি পাসপোর্ট দিতে পারেনি। গত ৮ মাস পর্যন্ত কোনো রি-ইনফেকশন দাবি সমর্থিত না হলেও অতি সম্প্রতি একটি রি-ইনফেকশনের কেস সমীকরণ আরো জটিল করে তুলবে।
কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন কতদূর
আধুনিক ভ্যাকসিন (প্রতিষেধক টিকা) আবিষ্কারের ইতিহাস দু'শত বছরের অধিক পথ অতিক্রম করে এলেও নতুন ভ্যাকসিন তৈরির পথটি সহজ ও মসৃণ নয়, সময় সাপেক্ষ। শতাব্দীর ভয়াবহ মহামারীতে বিপন্ন মানুষ একটি ভ্যাকসিনের জন্য মরিয়া। গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয়, বায়োটেক কোম্পানী, ফিলানথ্রোপিস্ট, সরকার নিরন্তর ও সর্বাত্মক কাজ করে চলেছেন, বিলিয়ন, বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন দ্রুততম সময়ে একটা নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করতে।
এই মুহূর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ১৭০'র অধিক সার্স-কোভ-২ ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের ট্রায়াল চলছে, এরমধ্যে ৭টি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের পরীক্ষা হয়েছে যা আন্টিবডি তৈরিতে সক্ষম হয়েছে (ফেজ-১), অন্য ১২টি এই পর্যায় অতিক্রম করে আরো বড় পরিসরে ফেজ-২ তে পৌঁছেছে, ৭টি আছে ফেজ-৩ এ। দু'টি ভ্যাকসিন সীমিত ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে (রাশিয়ার ভ্যাকসিন Sputunik V ও চীনা ভ্যাকসিন CanSino's Ad5-nCoV)। ঐতিহাসিকভাবে ভ্যাকসিন তৈরি হয় মৃতপ্রায় (লাইভ অ্যাটিনিউটেড), নিষ্ক্রিয়কৃত (ইনএকটিভেটেড) জীবাণু বা অংশ বিশেষ (Subunit protein যেমন- টক্সোইড, রিকম্বিন্যান্ট) ব্যবহার করে।
কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরিতে জেনেটিক প্ল্যাটফর্ম প্রধান ভূমিকা নিয়েছে- এডিনোভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন (adenoviral vector vaccines), ডিএনএ ভ্যাকসিন (DNA vaccines) ও এম-আরএনএ ভ্যাকসিন (mRNA vaccines)। লক্ষ্য একই, বাইরে থেকে তৈরি করা অ্যান্টিজেনের বদলে শরীরের ভিতরে উৎপাদিত হওয়া (Spike protein) অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি তৈরি করা। প্রায় প্রত্যেকটা ভ্যাকসিন স্পাইক প্রোটিন এবং এসিই-২ রিসেপ্টরের মধ্যে আবদ্ধ হওয়াকে বাধা দেওয়ার লক্ষ্য ধরে তৈরি হচ্ছে।
প্রকাশিত তথ্য বলছে এই ভ্যাকসিনসমূহ নিরাপদ এবং তা অ্যান্টিবডি ও টি সেল- উভয় প্রকার ইমিউনিটি তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই ইমিউনিটি কতদিন স্থায়ী হবে তা অজানা। সার্স-কোভ-২, মার্স ও অনান্য প্রাকৃতিক করোনাভাইরাস প্রতিরোধী ইমিউনিটির মাত্র কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত বিভিন্ন রকম স্থায়ীত্ব পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়াও অ্যান্টিবডি ও টি সেলের কোন মাত্রা কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে তা এখনও নিশ্চিত নয়।
CanSino, University of Oxford/AstraZeneca এবং Johnson & Johnson এডিনোভাইরাল ভেক্টর ব্যবহার করে কোভিড ভ্যাকসিন তৈরিতে এখন অগ্রগামী অবস্থানে। রাশিয়ার Gamaleya Institute এর Sputunik V এই দলের। এডিনোভাইরাস ভেক্টর নির্ভর ভ্যাকসিন তৈরির সীমিত ইতিহাস খুব সুখকর নয়। ২০০৭ সালে এডিনোভাইরাস (ad5) ভেক্টর নির্ভর এইচ আই ভি ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বন্ধ করে দিতে হয়। প্রাকৃতিক হওয়াতে এডিনোভাইরাসের বিরুদ্ধে অনেকের শরীরে অ্যান্টিবডি থাকতে পারে যা ভ্যাকসিনকে অকার্যকর করতে পারে। দুইটি দেশের এডিনোভাইরাস ভেক্টর নির্ভর ভ্যাকসিনের লাইসেন্স পাওয়া এক ব্যাপার আর লাইসেন্স পরবর্তী সাফল্য আরেক বিষয়। এর আগে পর্যন্ত মানুষের জন্য একমাত্র অনুমোদনপ্রাপ্ত এডিনোভাইরাস ভেক্টর নির্ভর ভ্যাকসিনটি চীনের CanSino-র তৈরি, ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবহারের জন্য (যা ফেজ-২ ট্রায়াল পর্যন্ত যেতে পেরেছিল)। ডিএনএ ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বৈজ্ঞানিক ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি। এক্ষেত্রে তালিকার শীর্ষ কোম্পানী ইনোভিও (INOVIO), যারা এর আগে মার্স (MERS) ভাইরাসের বিরুদ্ধে ডিএনএ ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করেছিল। এম-আরএনএ (mRNA) ভ্যাকসিন তৈরির কৌশল নতুন। এখন পর্যন্ত একটি mRNA পদ্ধতির ভ্যাকসিন অনুমোদন প্রাপ্ত যা রেবিস ভাইরাস প্রতিরোধী। অগ্রগামী মর্ডানা কোম্পানির প্রকাশিত ডাটা অপ্রতুল। Pfizer and BioNTech কোম্পানীর mRNA ভ্যাকসিনের ফেজ-২/৩ ট্রায়াল শুরু হয়েছে। CureVac, Imperial College London, Osaka University (AnGes and Takara Bio) ইত্যাদি জেনেটিক ভ্যাকসিন (DNA, RNA) তৈরির দৌড়ে আছে। DNA, RNA ভিত্তিক ভ্যাকসিন সফল হলে স্বল্প সময়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডোজ উৎপাদন সম্ভব হবে।
একাধিক কোম্পানি প্রচলিত পদ্ধতির ভ্যাকসিন প্রস্তুতে এগিয়ে আছে। নিষ্ক্রিয়কৃত জীবাণু ভ্যাকসিনে চীনের Sinovac, Sinopharm কোম্পানী শীর্ষে। বাংলাদেশে আইসিডিডিআরবি চীনের সিনোভ্যাকের (Sinovac) ভ্যাকসিনের ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন দিয়েছে। ভারত বায়োটেকের নিষ্ক্রিয়কৃত জীবাণু ভ্যাকসিনের একটি ট্রায়াল দেখা যায় তালিকাভুক্ত। নোভাভাক্স প্রোটিন সাবইউনিট ভ্যাকসিন তৈরির ফেজ-১/২ ট্রায়ালের তথ্য প্রকাশ করেছে। কোম্পানিটি ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্য কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপারেডনেস (CEPI) থেকে মোট ৩৮৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে।
প্যানডেমিকের অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে, মানুষের জীবন রক্ষা করতে প্রচলিত মানদণ্ডের সাথে আপোস করে ইতিহাসে প্রথম সর্ব্বোচ্চ দ্রুততায় কোনো ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার ও পরীক্ষার ঘটনা অগ্রসর হচ্ছে। রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি বৈজ্ঞানিক তথ্য ছাড়া, ফেজ-৩ ট্রায়ালে যাওয়ার আগেই অনুমোদন পেয়েছে। সময়ের আগে চলতে গিয়ে ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা, সামগ্রিক কার্যকারিতা, ডোজ ইত্যাদি অনিরূপিত থেকে যাবে। ভ্যাকসিনটি দীর্ঘমেয়াদী ইমিউনিটি না দিলে এবং প্রত্যাশিত কার্যকারিতা না দেখালে ভ্যাকসিনেশনে আগ্রহী করে তোলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার তারতম্য হয়। তাই গণ ভ্যাকসিনেশনের আগে দেশে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল প্রয়োজন।
করোনাভাইরাসকে রুখে দেবার লড়াইয়ে প্রথম ভ্যাকসিনটি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য নাও পেতে পারে। সংক্রমণের গতি কমিয়ে আনা, রোগের তীব্রতা হ্রাস, হাসপাতালে ভর্তি কমানো, মৃত্যু প্রতিহত করলেও সেটা এগিয়ে যাওয়া হবে। তা হতে পারে ২০২১ সালের শুরু থেকে। দ্বিতীয় ভ্যাকসিনটি ভাল করবে। তৃতীয় অথবা চতুর্থ ভ্যাকসিনটি আশা করা যায় কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার এবং অনেক বেশি কার্যকর হবে।
গুরুতর ও সংকটাপূর্ণ রোগী
কোভিড-১৯ প্রতিরোধক ভ্যাকসিনের দেখা মেলেনি। শতাংশের হিসাবে কম হলেও বিরাট সংখ্যক সংক্রমিত রোগী দ্রুত গুরুতর ও সংকটাপূর্ণ অবস্থার দিকে ধাবিত হয়। ভাইরাসের বিরুদ্ধে ইমিউন সিস্টেমের মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ায় শরীরের ইনফ্লামেটরি সিস্টেম সাইটোকাইনের ঝড় তোলে যা মানব শরীরের সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য সিস্টেমেও (যেমন কোগুলেশন) মারাত্মক বিপর্যয় ঘটায় । শ্বাসতন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গ ক্রমান্বয়ে অকার্যকর করে দেয়। কোনো কার্যকর অ্যান্টি ভাইরাল ঔষধ আবিষ্কার হয়নি। অক্সিজেনসহ সাপোর্টিভ চিকিৎসা বহু রোগীর জীবন রক্ষা করছে। যতক্ষণ না ভ্যাকসিন বা কার্যকর অ্যান্টি ভাইরাল পাওয়া যাচ্ছে, আমাদেরকে স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে তাকিয়ে থেকে জীবন মৃত্যুর লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
আমরা কোথায়
একটি ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য এমনভাবে সারা বিশ্বের মানুষ কোনোদিনই উন্মুখ ছিল না। একটি ভ্যাকসিন দিতে পারে আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার টিকিট। যখন দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন, "ভ্যাকসিন আসার আগেই বাংলাদেশ থেকে কোভিড-১৯ চলে যাবে" তা শুধু হাস্যকর নয় নির্মম তামাশা হয়ে দাঁড়ায়। প্যানডেমিকের গভীর সংকটকালে নেতৃত্বের যোগ্যতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের (ভুল-ত্রুটি, অপরাধ গণ্য করে) কাছ থেকে ঐক্য ও সংহতি ধরে সর্ব্বোচ্চ কাজটি বের করে এনে এই দুঃসময় মোকাবিলা প্রথম করণীয় হলেও আমরা তাদেরকে বলি দিয়েছি। সেখানে দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে অপরিহার্য হয়!
আমি যদি সমস্যা চিহ্নিত করতে না পারি, প্রয়োজন কী তা অনুধাবন করতে না পারি তা হলে আমার করণীয় কীভাবে নির্ধারণ করব? ভদ্রলোক এক উদ্ভট দাবি করেছেন- সরকার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার ফলেই দেশের কোভিড হাসপাতালে এখন ৬০ ভাগ শয্যা খালি পড়ে আছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সময় মানুষ হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা পায়নি, দেখেছে হাসপাতালগুলোর ব্যাপক অব্যবস্থাপনা। ভেন্টিলেটর, আইসিইউ, অক্সিজেন সাপ্লাই পাওয়ার নিশ্চয়তা নাই। হাসপাতাল আশা-ভরসার জায়গা না হয়ে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিজেন্ট, জেকেজি, মাস্ক জালিয়াতির ঘটনা মানুষকে আস্থাহীন করে দিয়েছে।
চীনের বিশেষজ্ঞ দল ঢাকা সফরে বলেছিলেন "বাংলাদেশে কাজ হচ্ছে অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো। এখানে সমস্যা হল- করোনাভাইরাস কোথায় আছে সেটাই বলা দুষ্কর। বলা যায় জানা যাচ্ছে না। এভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করা সত্যি দুষ্কর"। যদিও তারা এ কথা বলেছেন কি না তা নিয়ে মিডিয়ায় বিতর্ক আছে। চীনের বিশেষজ্ঞ দলের পর্যবেক্ষণ "এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচতেনতার খুবই অভাব"। এটা দেখে চীনা চিকিৎসকদের বিশেষজ্ঞ দল ভীষণ হতাশ।
কাঙ্ক্ষিত ভ্যাকসিনের দেখা মিললেও তা পৃথিবীর ৭৮০ কোটি মানুষের জন্য উৎপাদন এক বিশাল সময় সাপেক্ষ দূরূহ যজ্ঞ। আমরা কীভাবে ভ্যাকসিন পাব, কোথায় আমাদের উদ্যোগ? সব দেশই আগে ভ্যাকসিন পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। যাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষমতা বেশি তারাই হয়তো আগেভাগে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন পেতে সক্ষম হবে। ভারতের সেরাম ইনিস্টিটিউট অক্সফোর্ড/এস্ট্রোজেনেকার ভ্যাকসিনে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। কোল্ড চেইন, ফ্রিজ, অগ্রাধিকার ঠিক করা ইত্যাদি লজিস্টিকসের ব্যবস্থা করে কোটি কোটি মানুষকে দ্রুততম সময়ে টিকা দেয়ার প্রস্তুতি কোথায়? এমনি এমনি সব হয়ে যাবে!
আশার জায়গা, Gavi, আর্ন্তজাতিক ভ্যাকসিন জোট, COVAX AMC সুবিধার অধীনে ধনী দেশের সাথে একই সময়ে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশকে সুরক্ষা দিতে যে ৯২টা দেশের তালিকা করেছে সেখানে বাংলাদেশের নাম আছে। Gavi, CEPI ও WHO যৌথভাবে COVAX-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই জোট ২০২১ সালের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে ২০% জনগোষ্ঠীর জন্য কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন সরবরাহের বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। জনগোষ্ঠীর ৫০-৬০% ভ্যাক্সিনেটেড করতে পারলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যায়। ইতোমধ্যে দেশে অনেকের করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের আরো ২০-৩০% ভ্যাকসিন ক্রয়ের পরিকল্পনা করতে হবে।
টানা ৩ মাস টেস্টের বিপরীতে ২০-২৫% পজিটিভ হয়ে চলছে। মৃত্যু ঊর্ধ্বমুখী। আমরা জানি না আরো ভয়াল সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে না প্রাকৃতিকভাবে ছাড়া পেয়ে যাব। সরকার হাল ছেড়ে দিয়েছে। পরীক্ষা সংকুচিত করছে। ব্রিফিং বন্ধ করেছে। ভুল তথ্য দিচ্ছে। সরকারের কোনো পরিকল্পনা নাই। দিক-নির্দেশনাবিহীন জনগণ নিজেকে নিয়তির হাতে ছে়ড়ে দিয়ে নির্ভয়। গরীবের আবার মরা, ও তো শুয়ে থাকা।
আমাদের করণীয়- ভ্যাকসিন আসা না আসার সংশয়ের দিনগুলো কীভাবে পাড়ি দেব
একটি গরীব, ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মহামারীতে ভাইরাস সংক্রমণের সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে আমাদের আরো শক্ত হাতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সঠিক কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। করোনাভাইরাসের প্রাদূর্ভাবের সময় যে কথা সত্যি ছিল, এখনও তা সত্য- তথ্য জানতে হবে, জানাতে হবে। অন্ধের মত পথ চললে আমরা পৌঁছাতে পারব না।
সরকারকে একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী টেস্ট ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একটি সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী টেস্ট সংযোগ করতে হবে। র্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের পরে সীমিত সংখ্যক নেগেটিভ ব্যক্তিদের নমুনা আরটি-পিসিআরের জন্য প্রেরণ করা হবে। আমাদের অবকাঠামো বিপুল সংখ্যক আর ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ, টেকনিক্যালি জটিল আরটি-পিসিআর যথাযথভাবে করতে সক্ষম নয়। টেস্টের রিপোর্ট দ্রুত পাওয়া না গেলে সেই কোভিড পরীক্ষা সম্পূর্ণ অপচয়। যারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে তাদের চিহ্নিত করতে এটাকে তিন স্তরের র্যাপিড অ্যান্টিবডি টেস্ট অন্তর্ভুক্ত রেখে করা যেতে পারে। প্যানডেমিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে প্রতিদিন ব্যাপক হারে (৩০০০০-৯০০০০ হাজার বা তারও বেশি) টেস্ট করতে হবে। এই সময়ে প্রতিদিন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ১ মিলিয়ন টেস্ট হচ্ছে। এটা কোনো সাধারণ, সহজ, সুলভ বিষয় নয়। বিপুল রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, বিশাল প্রশাসনিক উদ্যোগ ও ব্যাপক অর্থ সংস্থান প্রয়োজন (এই অর্থ অবশ্যই প্রলম্বিত প্যানডেমিকের আর্থিক ক্ষতি ও ভয়াবহ বিপর্যয়ের চেয়ে কম)। অ্যান্টিজেন টেস্টের মৌখিক ঘোষণা গতকাল এলেও কাগজপত্রে এখনও নির্দেশ যায়নি। নিজস্ব টেস্ট কিট উদ্ভাবনে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
টেস্টের রেজাল্ট শুধুই তথ্য। তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অসুস্থ মানুষকে সুস্থ মানুষ থেকে আলাদা রাখতে হবে। চিহ্নিত অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ থেকে সংক্রমণ ছড়ানো রোধে পন্থা নির্ধারণ করতে হবে। সামাজিক দূরত্বের কঠোরতা শিথিল বা লাঘবের সিদ্ধান্ত নিতে হবে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে।
মাস্ক পরা বা না পরা আপনার ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান চরিত্র বোঝায় না। শাস্তির ভয়ে নয় জনগণ যেন তার নিরাপত্তার জন্য মাস্ক ব্যবহার করে। সে যেন বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির জায়গা থেকে সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান করে তা যেন নিশ্চিত করতে পারি। মাস্ক পরিধানে বাধা বা সামর্থের ঘাটতি থাকলে তা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। ভ্যাকসিনের সন্ধান জানার পরও অনেকদিন মাস্ক পরিধান করে যেতে হতে পারে।
এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাবস্থা। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের নেতৃত্বে পুনর্বিন্যাস কর়়তে হবে। বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপরে, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে এবং স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ততার মাধ্যমে জনগণের সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। জনগণের সচেতনতা ও ব্যাপক সম্পৃক্ততা ছাড়া এ লড়াইয়ে জয়ী হওয়া সম্ভব হবে না। কোভি়ড-১৯ মোকাবিলায় স্থানীয় ভিত্তিক, কমিউনিটি ভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। তাদের কর্তৃত্ব ও আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে।
বছরের পর বছর দূরদৃষ্টি ও বাজেট বরাদ্দের অভাবে, ব্যবস্থাপনার সংকটে রুগ্ন, ভঙ্গুর, বিশৃংখল স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজন বিশাল বিনিয়োগ ও দক্ষতার সাথে তা বাস্তবায়ন। বিনিয়োগ হতে হবে চিকিৎসা সামগ্রীর বাধাহীন, নিয়মিত সরবরাহে, নতুন টেকনোলজি সংযোজনে, জনশক্তি তৈরিতে। ২০২০-২১ সালের করোনাকালের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের অগ্রাধিকার বলা হলেও বরাদ্দে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
আমরা স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি। এখনও দুনম্বরি, জালিয়াতি, প্রতারণা ইত্যাদি কালিমায় পৃথিবীর এয়ারপোর্টে, এয়ারপোর্টে লাল-সবুজের পাসপোর্ট হাতে বিব্রত হতে হচ্ছে প্রতিদিন। যে ইতালি থেকে আমার দেশে করোনা ছড়াল, তারাই আমাদের বিমানকে ভাইরাসবাহী বোমা বলে উপহাস করছে, প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। আমরা তো চোখ বন্ধ করে মনে করতে পারি এখানে মৃত্যু হার কম, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আছে। নীরবে সংক্রমণের বিস্তৃতি আমাদেরকে সংক্রমণ-মৃত্যুর প্রলম্বিত চক্রের মধ্যে ফেলবে। আমাদের কপালে আরো একটি কালিমার তিলক যুক্ত হয়ে পৃথিবীর বন্দরে বন্দরে মাথা নীচু করে প্রবেশ করতে হবে। অথবা প্রবেশ রূদ্ধ হবে।
আমাদের উন্নয়নের স্বপ্ন, মাথা তুলে দাঁড়ানোর স্বপ্ন পূরণ করোনাভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে জয়ের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে।
শুরুতে আমরা মহামারী শেষ কোথায় জিজ্ঞাসা করেছি। আমাদের প্রত্যাশার জায়গায় রাশ টেনে ধরতে হবে। আমরা মহামারী শেষের কথা বলেছি, কোভিড-১৯ রোগের শেষ নয়।