Published : 21 Jun 2020, 09:12 PM
মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় জর্জ ফ্লয়েড নামের একজন কৃষ্ণাঙ্গকে পুলিশ পিছমোড়া করে বেঁধে তার গলায় চেপে বসে। প্রকাশ্য দিনের আলোয় প্রতক্ষ্যদর্শীদের ক্যামেরার মাধ্যমে সারা দুনিয়ার মানুষ দেখে এই ভয়াবহ দৃশ্যটি। আর এরপরেই গোটা আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের আগুন। মিনিয়াপোলিসের আগুনের আঁচ গিয়ে পৌঁছায় ওয়াশিংটন ডিসি-র হোয়াইট হাউজ প্রাঙ্গণে। ঘটনার ছয়দিন পরে এক সোমবার বিকেলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে দেখা যায় প্রচুর অফিসার বেষ্টিত হয়ে হোয়াইট হাউজ থেকে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে সেইন্ট জন এপিস্কোপাল চার্চের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তার সামনে অসংখ্য ক্যামেরা।
তারপর রিপোর্টারদের ক্যামেরা তার আরো একটু কাছে যেতেই দেখা গেল ট্রাম্পের হাতে একটি খয়েরি মলাটের বই। তিনি অস্বস্তিকর ভঙ্গিমায় বইটি দুইহাতে ধরে কিছুক্ষণ ঝাঁকালেন, তারপর একহাতে তুলে ধরলেন, ছবিতে পোজ দেওয়ার উদ্দেশে। তখন একজন রিপোর্টার জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার হাতে ওটা কি বাইবেল?" তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে চোখটা একটু বন্ধ করে ঠোঁট টিপে খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, 'এটা বাইবেল।' এরপর নিজের হাতের বাইবেলটি তুলে ধরেই স্বগতোক্তির মত করে বললেন, 'আমেরিকা একটা মহান দেশ।'
যখন আমেরিকার যুবসমাজ তাদের দেশের নানান প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁড়ে বসা বর্ণবাদিতার অবসান চেয়ে প্রায় ৬০ বছর পরে আবার ফুঁসে উঠেছে ঠিক তখন তাদেরকে দমানোর জন্য মিলিটারির শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প চার্চের সামনে গিয়ে ছবি তোলার জন্য হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। গোটা দৃশ্যটাই ধর্মীয় প্রতীকের অপব্যবহারের একটা নগ্ন দৃষ্টান্ত হয়ে ইতিহাসের পাতায় জমা হয়ে রইলো। এপিসকোপাল চার্চের সাবেক এবং বর্তমান মিনিস্টাররাও ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ডে হতবুদ্ধি এবং ক্ষিপ্ত হয়েছেন যা তাদের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট। বিশপ ম্যারিয়ান বাড্ডে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদককে বলেন, "আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের একটি চার্চকে পেছনে রেখে বাইবেল হাতে যে দৃশ্যটি মঞ্চস্ত করলেন সেটি জেসাসের শিক্ষার পরিপন্থী। বাইবেল জুডিও-খ্রিস্টান ঐতিহ্যের একটি অত্যন্ত পবিত্র গ্রন্থ, এটি কোন ছবি তোলার কাজে ব্যবহার করার জিনিস না। তিনি চার্চে প্রার্থনা করতে আসেননি, এসেছেন ছবি তুলতে"। জেসুইট প্রিস্ট এবং লেখক জেমস মারটিন বলেন, "বাইবেল কোন প্রপ নয়, চার্চ কোন ফটোসেশনের জায়গা নয়, ধর্ম রাজনীতির অস্ত্র নয় এবং গড কোন খেলাধুলার বিষয় নয়"।
তবে এই চার্চনেতাদের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রে আরো প্রচুর ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ মানুষ রয়েছেন যারা মনে করেন ট্রাম্প স্বয়ং ঈশ্বর প্রেরিত নেতা যিনি আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলবেন। তাদের প্রায় অনেকেই মূলত আমেরিকাকে একটি খ্রিস্ট-রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। এই বিশাল সংখ্যক লোককে ট্রাম্প বলেন "সাইল্যান্ট মেজরিটি"। ২ জুন, মঙ্গলবার তিনি ক্যাপিটাল লেটারে "সাইলেন্ট মেজরিটি" শব্দবন্ধটি লিখে টুইট করেন। বোঝা যায়না এই টুইটের মাধ্যমে তিনি সবাইকে ঠিক কী বার্তা দিতে চান? তিনি বলতে চান কি না যে, যতই তোমরা শহরে শহরে আগুন জ্বালাও আমার পাশে চুপচাপ পাহাড়ের মত নিরবে দাঁড়িয়ে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন। কিংবা এই টুইটের মাধ্যমে তিনি তার নীরব সমর্থকদেরকে সরব হবার আহ্বান জানান কি না তাও বোঝা যায়না।
মনে পড়লো, ট্রাম্প সমর্থক সহপাঠী জ্যাকবের কথা। আমাদের বন্ধুদের আড্ডায় ছেলেটা প্রায়ই জোর গলায় বলতে থাকে যে, ট্রাম্প আমেরিকার মেসিয়াহ। আমেরিকাকে সে উদ্ধার করতে এসেছে। উদ্ধারকাজ অনেকটুকু করেও ফেলেছে, শুধু দুষ্ট লিবারেলরা নানানভাবে তার কাজে বাঁধা দিচ্ছে। হ্যাঁ, ট্রাম্পকে নিয়ে মিডিয়া হ নানান জায়গায় অনেক হাসিঠাট্টা দেখা গেলেও প্রচুর ধার্মিক আমেরিকানের কাছে তিনি হচ্ছেন একজন সেভিয়র, মেসিয়াহ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ইয়াশা মউংক ডনাল্ড ট্রাম্পকে একজন "অথোরিটারিয়ান পপুলিস্ট" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থাৎ ট্রাম্প তার স্বৈরাচারী আচরণ এবং কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেবার জন্য স্স্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটেন। আর সেজন্যেই তিনি বাইবেল হাতে নিয়ে কোনরকম ভূমিকা না করে বলে উঠেন, "আমেরিকা একটি মহান দেশ"। ঠিক কোথায় মহান, কেন মহান এবং এই কথাটি বলার জন্য কেন বাইবেল হাতে নিতে হয়- তা আর আমরা বুঝতে পারি না।
২০১৫ সালের নির্বাচনী প্রচারণায়ও ট্রাম্প বারবার সবাইকে জানিয়েছেন বাইবেল তার প্রিয় বই। তিনি আরও বলেন, "আর কোন বই- ই বাইবেলের মতো ভালো নয়"। এরপর ব্লুমবার্গ এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে তাকে বাইবেলে তার সবচেয়ে পছন্দের অধ্যায়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়। উত্তরে ট্রাম্প বলেন, "আমি খুব বেশি গভীর আলোচনায় যেতে চাইনা। কারণ এটা আমার খুবই ব্যক্তিগত। বাইবেল আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটা নিয়ে আমি বিশেষ কোন আলোচনায় যেতে চাইনা"। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্টের মধ্যে কোনটাকে বেশি পছন্দ করেন। আবারো তিনি খুব বেশি কথা না বাড়িয়ে বলেন, "সম্ভবত দুটোই একই রকম পছন্দ করি। আমি মনে করি এটা অবিশ্বাস্য একটা বই"।
পৃথিবীর নানান দেশে পপুলিস্ট স্বৈরাচারী নেতারা ঠিক এই রূপেই যুগে যুগে নানাভাবে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান। ক্ষমতা ধরে রাখার নাট্যমঞ্চে তাদের হাতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রপস হলো নিজ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের নানান প্রতীক। তারা আরেকটি যে কাজ করে থাকেন তা হলো, তাদের নিজের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাথায় খুব কায়দা করে ঢুকিয়ে দিতে থাকেন যে তাদের নিজের দেশ, ঐতিহ্য এবং ধর্ম এইসব কিছু খুব বিপদের মধ্যে আছে। তাদেরকে ক্ষমতায় না রাখা গেলে জাত-ধর্ম সব যাবে। খুব কৌশলে সংখ্যালঘুদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো হয়ে থাকে। এরপরে বাকি কাজ খুব সহজ হয়ে যায়। শক্তিশালীরা যখন নিজেকে বিপদগ্রস্ত মনে করতে থাকে তখন সত্যিই বিপর্যয় নেমে আসে, সেই বিপদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শক্তিহীনেরা। সব মিলিয়ে নিরব সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থকদের সমর্থনে এসব পপুলিস্ট নেতারা ক্ষমতায় থাকে এবং টিকে থাকার জন্য জাতিকে আরো নানাভাবে টুকরো টুকরো করতে থাকে। মূলত নিজ নিজ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌন সমর্থন নিয়েই তারা এসব কাজ করে থাকে। ফলে আমরা দেখি চূড়ান্ত ভাঙনের মাঝেও তাদের মুখে কখনো বিষাদের রেখা দেখা যায়না। বরং তাদের দম্ভের মাত্রা দিনদিন বাড়তে বাড়তে আকাশ স্পর্শ করে।
ঠিক এমন কাণ্ড আমরা অতি সম্প্রতি পাশের দেশ ভারতেও দেখেছি। ২ জুন প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটিতে লেখক ক্যাথারিন স্টুয়ার্ট বলেন ট্রাম্পের চার্চের ছবি দেখে প্রথমেই তার মনে পড়েছে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিকটর অরগ্যান এবং তুরস্কের এরদোগানের কথা। তিনি বলেন, "ট্রাম্প এমন কি তার বাইবেলটি খুলে একটা ছত্রও পড়ে শোনান নি। বাইবেলকে তিনি পুরোপুরি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের প্রতি তার পক্ষপাতিত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন"।
সোশ্যিওলজি অফ রিলিজিয়ন জার্নালে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত "মেইক আমেরিকা খ্রিস্টান অ্যাগেইন: খ্রিস্টান ন্যাশনালিজম এন্ড ভোটিং ফর ডোনাল্ড ট্রাম্প ইন দ্য টু থাউজ্যান্ড সিক্সটিন প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশন" নামক এক গবেষণা পত্রে বলা হয়, "সেক্সিজম, সংখ্যালঘু বিদ্বেষ, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বিদ্বেষ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি কারণের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদ। গবেষণাপত্রটির গবেষকরা (অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেড, স্যামুয়েল প্যারি, জোসেফ বেকার ) ট্রাম্পের প্রতি খ্রিস্টান ন্যাশনালিস্টদের সমর্থনের বিষয়টিতে বিস্ময় প্রকাশ করেন এই কারণে যে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নানান সময় যেসব অভিযোগ এসেছে সেগুলোর কোনটিই তাকে একজন ভালো খ্রিস্টান হিসেবে প্রমাণ করেনা।
নিজে ভালো খ্রিস্টান না হলেও দেখা যায় গোটা নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প খুবই কৌশলের সাথে তার জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করেছেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারির ১৮ তারিখে লিবার্টি ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, "আমরা খ্রিস্টধর্মকে রক্ষা করতে যাচ্ছি। এবং আপনারা যদি সারা দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখেন, সিরিয়ায় দেখেন, খ্রিস্টানদের সবখানে হত্যা করা হচ্ছে। আরো নানান দেশে খ্রিস্টধর্ম বিপদের মুখে আছে। আমি নিজে একজন প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান হিসেবে খুবই গর্ব বোধ করি। আমাদেরকে আমাদের ধর্ম রক্ষা করতে হবে। কারণ খুবই বাজে বাজে ঘটনা ঘটছে চারদিকে। আমরা সঙ্ঘবদ্ধ নই। আর অন্যান্য ধর্মের লোকেরা আমাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হচ্ছে। আমাদেরকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে"।
চিরাচরিত খেলা। সংখ্যাগুরুকে নানাভাবে উত্তেজিত করে তোলা, তাদেরকে জানানো যে তাদের আশেপাশে নানান রকম বিপদ ওঁত পেতে আছে। এরপর নিজেকে সেই বিপদের একমাত্র রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করা। এই ধর্মের কার্ড নানাভাবে সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মের নেতারা ব্যবহার করে আসছেন। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন জনগণকে। তাদের এই খেলায় সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌন অনুমোদন আছে বলেই এর এত জয়জয়কার। এখন গোটা আমেরিকাজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী মিছিলগুলোতে প্রতিবাদকারীদের একটা অন্যতম প্রিয় স্লোগান হলো, 'হোয়াইট সাইলেন্স ইজ হোয়াইট ভায়োলেন্স" (অর্থাৎ সাদাদের নীরবতাই সাদাদের নিষ্ঠুরতা)। ঠিক তাই। যে কোন দেশে জাতি –ধর্ম-বর্ণ- লিঙ্গভিত্তিক যেসব কাঠামোগত বৈষম্য, অত্যাচার নির্যাতন চলে সেসব সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদন নিয়েই চলে। আর তাই এইসব বৈষম্যমূলক নির্যাতনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের নিরবতাই তাদের নিষ্ঠুরতা।