Published : 05 May 2020, 10:09 PM
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী বিপর্যস্ত। অর্থনীতির চাকা থেমে আছে। সব ধরনের উৎপাদন ও বিপণন থেমে গেছে। প্রতিদিন শিল্পে কোটি কোটি টাকা ক্ষতির পাশাপাশি দেশের কৃষি খাতও হুমকির মুখে। এছাড়াও আশঙ্কা করা হচ্ছে চলতি বছরে রেমিটেন্স প্রবাহ ২২ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। এখন বোরো ধান কাটার মৌসুম। বোরো ধান কাটা, মাড়াই, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় করোনাভাইরাসের ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষকের সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর জন্য এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বাংলাদেশের ভূমির অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ মিটার থেকে ৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হলেও দেশের সব ভূমি সব ধরনের ফসল ফলানো উপযুক্ত নয়। মোট জমির মাত্র ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ কৃষি কাজে ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৮৫ দশমিক ৭৭ লাখ হেক্টর জমির ৭১ শতাংশে বোরো ধান চাষ করা হয়। মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশ মালিক নিজেই চাষ করেন। প্রায় ৭৫ শতাংশ জনসংখ্যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। তবে উন্নত দেশে এ নির্ভরতার হার ২০-২৫ শতাংশ।
অনেক দেশেই কৃষিতে বিজ্ঞানের ছোঁয়া লাগলেও বাংলাদেশের কৃষি এখনও অনেকটা প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। যে বছর প্রকৃতি সুপ্রসন্ন থাকে সে বছর কৃষির প্রবৃদ্ধি ভালো হয়। বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান মোট জিডিপি প্রায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ধানের একক বৃহত্তম উৎপাদন অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনক নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে অন্যান্য ফসলের উৎপাদনের বৃদ্ধির ক্ষেত্রের জমির আনুপাতিক হারে ধান নিবিড় উৎপাদনের পাশাপাশি অন্য শস্যেও নিবিড় উৎপাদন বাড়ালে বেশি লাভজনক হবে।
স্বাধীনতার পর শাসনভার গ্রহণ করেই জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বহুমাত্রিক ও টেকসই কৃষি প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী কর্মসূচি নিয়েছিলেন। তার অদম্য ইচ্ছা ছিল যে কোনো উপায়ে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা। ১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এক বিশেষ ভাষণে কৃষি বিপ্লবের কথা বলেছিলেন।
ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, "গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে এবং গ্রামই হবে উন্নয়নের মূল কেন্দ্র"।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীও কৃষির উপর গুরুত্বারোপ করেছেন যার জন্য বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দিকে হাঁটছে। এদেশে কৃষি উন্নয়নের জন্য ৯০ দশকে শস্যবহুমুখীকরণ, ১৯৯৭ সালে বীজ নীতি, খাদ্যনীতি ২০০৬, জাতীয় কৃষি ২০১৮, সেচনীতি ২০১৮, পানি উন্নয়ন বোর্ড নীতি ২০১৮, জাতীয় পরিবেশ নীতি ২০১৮ এবং কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট সপ্তম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়ছে। কিন্ত প্রকৃতপক্ষে কৃষকদের অজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক শস্য লাভজনক উৎপাদনের উপর প্রায়োগিক গবেষণা না থাকাই এখন পযর্ন্ত এর আশানুরূপ সুফল পাওয়া যায় নি। তবে দেশে বোরো ধানের উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব জেলায় বোরো ধানের চাষ হয় যা সম্পূর্ণ সেচ নির্ভর। বোরো ধানের বাম্পার ফলনের কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে চতুর্থ।
আর এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) বোরো ধানের ২৭টি জাত উদ্ভাবন করে। স্বাধীনতার পর কৃষি জমি বাড়েনি বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দিনদিন তা হ্রাস পাচ্ছে। বিবিএস জরিপ ২০১৮ অনুযায়ী দেশের মোট শ্রম শক্তির ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত। কিন্ত অধিকাংশ কৃষক ভূমিহীন ও দরিদ্র। কৃষিকাজের উপকরণ ও সরঞ্জাম ক্রয় করার জন্য তাদেরকে ঋণ নিতে হয় । তাদেরকে ধান কাটার পর পরই কম দামে ধান বিক্রি করে এ ঋণ পরিশোধ করতে হয়। এতে ধানের সঠিক মূল্য থেকেও বঞ্চিত হয় প্রান্তিক কৃষকেরা এবং জমি চাষ করার জন্য পরের বছর আবারও ঋণ নিতে হয়। ফলে বছরের পর বছর ঋণের চক্রে আবদ্ধ থাকার কারণে দারিদ্রের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারে না।
একদিকে বোরো ধান উৎপাদনে খরচ বেশি, অন্যদিকে ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা কারণে বেশিরভাগ কৃষক বোরো ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়াতে উৎপাদনের দুই দিকে ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে। প্রথমত, ঋণের সুদ; দ্বিতীয়ত, ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া। বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা মূলত জীবন নির্বাহী এবং ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে কম বিবেচনা করা হয়। অঞ্চলভেদে বোরো ধানের উৎপাদন উপকরণ ব্যবহারের খরচ সামান্য কমবেশি হয়ে থাকে। যেমন- কৃত্রিম সেচ নির্ভর (গভীর নলকুপ ব্যবহার) অঞ্চলে খরচ বেশি এবং প্রাকৃতিক সেচ নির্ভর (হাওড় অঞ্চল) অঞ্চলে খরচ সামান্য কম। এ বছর শেরপুর জেলার কয়েকজন প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উদাহরণ হিসেবে এক একর জমির উৎপাদন খরচ তুলে ধরা হলো-
সেচ নির্ভর (গভীর নলকূপ ব্যবহার) ১. বীজতলা তৈরি ও বীজ বপন- ২৫০০ টাকা (শ্রমিক প্রয়োজন ৩ জন ৫০০ টাকা করে ও বীজ ১০০০ টাকা); ২. জমি তৈরি ও প্রস্তত- ৪০০০ টাকা (শ্রমিক প্রয়োজন ৪ জন ৫০০ টাকা করে পাওয়ার টিলার ২০০০ টাকা); ৩. চারা রোপন- ৭৫০০ টাকা (শ্রমিক প্রয়োজন ১৫ জন ৫০০ টাকা করে; ৪. ধানের আগাছা দমন,পোকামাকড় দমন ও রোগবালাই, সার প্রয়োগ- ৪০০০ টাকা (শ্রমিক প্রয়োজন ৩জন ৫০০ টাকা করে ও সার ২৫০০ টাকা); ৫. পানি ব্যবস্খাপনা-৪০০০ টাকা ( শ্রমিক প্রয়োজন ২ জন ৫০০ টাকা করে ও সেচ ভাড়া ২০০০ টাকা); ৬. ফসল কর্তন ও মাড়াই- ৮৭০০ টাকা (শ্রমিক প্রয়োজন ১২ জন ৬০০ টাকা করে ও মাড়াই ১৫০০ টাকা); মোট খরচ- ৩০৭০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ ৭৬৮ টাকা এবং প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ১৯ দশমিক ১৯ টাকা। গ্রামের বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে এবং প্রতি কেজি ধানের দাম সাড়ে ১৭ থেকে ১৮ টাকা ৭৫ পয়সায়। যেহেতু বেশির ভাগ কৃষক ধান বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়, তাই সরকারের উচিত করোনাভাইরাসের সময়ে গ্রামের বাজারে ধানের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা। এ বছর বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ৪ লাখ মেট্রিক টন গত বছরের তুলনায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন বেশি অর্থাৎ ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে আশা করা যাচ্ছে, চলতি মৌসুমে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবে। সরকার এ বছর প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে মাত্র ৮ লাখ মেট্রিক টন অর্থাৎ ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ ধান সংগ্রহ করবে; ৩৬ টাকা দরে ১০ লাখ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল ; ৩৫ টাকা দরে ১.৫ লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল কিনবে (সূত্র- খাদ্য মন্ত্রণালয়)।
অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকার কিনবে মোট ধানের ২২ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনায়। সরাসরি লটারি মাধ্যমে সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে নিবন্ধনকৃত সীমিত সংখ্যক কৃষক লাভবান হবে। তাছাড়া ধান বিক্রি নিয়ে রাজনৈতিক দলাদলি ও প্রভাব বিস্তারকারী কৃষকের আর্বিভাবের সম্ভাবনাও আছে। ফলে অবশিষ্ট ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও অনিবন্ধনকৃত কৃষকের কোনো স্বার্থ রক্ষা হবে না। করোনাভাইরাসের সময়ে সরকারের কৃষি প্রনোদনার প্যাকেজ হতে ধান ও সবজি চাষীরা বঞ্চিত। ফলে একদিকে ক্ষুদ্র চাষীদের মধ্যে ছদ্মবেশী বেকারত্ব আরো বাড়বে অন্যদিকে শহরমুখীর সংখ্যাও বাড়বে। গবেষণায় দেখা যায় যে, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কৃষক সময়মতো কৃষি পণ্য বিক্রি করতে পারে না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে বিক্রেতা হিসেবে ঠকে আবার ক্রেতা হিসেবে ঠকে। ব্যাপকভাবে কৃষি উপাদনের ও উপকরণের উপর ভুর্তকি প্রদান এবং কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে ও দরিদ্র কৃষকদের বাচাঁতে বোরো ধানের ন্যায্য দাম অতীব জরুরী। সরকার আরো সুচিন্তিত পদক্ষেপ হাতে নিলে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ কমানো যেতে পারে।
বোরো ধান উৎপাদনকারী (কৃষক) ক্ষতির সম্মুূখীন হলে আমন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও হ্রাস পেতে পারে এবং একই সাথে খাদ্য নিরাপত্তার উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমমত, এ বছর সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে লটারি মাধ্যমে ধান কমপক্ষে ১৫ লাখ মেট্রিক টন এবং চাল সংগ্রহ কমপক্ষে ২৫ লাখ মেট্রিক টন করা যেতে পারে; (উল্লেখ্য গুদাম- এর ধারণ ক্ষমতানুযায়ী); দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডের কর্মসূচি (ভর্তুকি, ঋণ, উপকরণ সহায়তা অর্থাৎ বীজ, কীটনাশক, যন্ত্রপাতি, হারভেস্টার, জ্বালানি তেল ইত্যাদি) বৃদ্ধি করা; তৃতীয়ত, নতুন আইন ও নির্দেশমালা প্রণয়নের মাধ্যমে মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস করতে হবে; চতুর্থত, কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য ঠিক রেখে কৃষি বিপণন নীতি প্রণয়ন করতে হবে; ( প্রয়োজনে রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানি হ্রাস এর সাথে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; পঞ্চমত, কৃষিতে আইসিটির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে এবং স্থানীয় বাজারে ধানের নামের পাশে দামের তালিকা প্রকাশ ও দাম বেধেঁ দেয়া; ষষ্ঠত, ই-কৃষি পণ্য চালু করতে হবে; (বিশেষ করে কৃষকেরা মিল মালিক ও চাতাল মালিকদের কাছে সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারে এবং খুব সহজে অন্যান্য পণ্য ক্রয় ও বিক্রয় করতে পারে); সপ্তমত,পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন করা ইত্যাদি। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে কৃষি বীমা চালু করা, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, কৃষি পণ্যে উৎপাদনে উৎসাহ ভাতা ও সার্টিফিকেট প্রদান করা। ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত, নিরাপদ ও পুষ্টি যুক্ত খাদ্যে স¦য়ংসম্পূর্ন অর্জন এবং মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়তে গ্রামকে ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি কৃষিকে গুরুত্ব দিতে হবে।