Published : 28 Aug 2025, 12:27 AM
ইতালি সরকার ঘোষণা করেছে, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশটিতে ৫ লাখ লোক নেওয়া হবে। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ ও ইতালিতে এক অদৃশ্য ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে কোটি ডলারের। এর শিকার প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির ঢাকা সফর স্থগিত হওয়ায় এ সংক্রান্ত কূটনৈতিক সমাধান আরও কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল।
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়াটাই যেন পাপ—এটা আমার কথা নয়, ইতালি যেতে চাওয়া এক বাংলাদেশির। লাল চোখ, ঘামে ভেজা শরীর, চামড়া হাড়ে লেগে যাওয়া—সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তায় ভরপুর এক জীবন। তার প্রয়োজন কেবলই একটা পালানোর জায়গা, যেখানে রাতে গভীর ঘুমের আশ্রয় পাওয়া যায়। কিন্তু সেই নিরাপদ আশ্রয় তো নেই। দিন-রাত পাওনাদারের তাড়া, কিস্তির টাকা চাই। যে টাকা দিয়ে তিনি ইতালি যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন, এখন সেটাই ফেরত চাওয়া হচ্ছে।
ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার যে ভুক্তভোগীর কথা বলছিলাম, তার নাম-ধাম, পরিচয়, বয়স বলতে গেলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের নাম বলতে হবে। এই চিত্র কোনো একক ব্যক্তির নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের একটি সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিফলন। শ্রম অভিবাসন আমাদের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ, অথচ প্রবাসে যাওয়ার প্রক্রিয়াটাই এখন দালালচক্র ও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি।
আমরা যখন কোটি কোটি ডলারের রেমিটেন্সের গর্ব করি, তখন ভুলে যাই এই টাকার পেছনে কত মানুষের শ্রম-ঘাম জড়িয়ে আছে। আবার এই টাকা রোজগার করতে যাওয়ার জন্য প্রতারিত কত পরিবার ঋণের বোঝায় ডুবে গেছে। রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে দায়িত্ব নিত, তাহলে প্রবাসে শ্রম বিক্রি করতে যাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে এভাবে ঠকতে হতো না। বরং বিদেশি সরকারের সঙ্গে স্বচ্ছ চুক্তি, ন্যায্য ব্যয় নির্ধারণ ও দালালবিরোধী কার্যকর পদক্ষেপ নিলে আরও বেশি রেমিটেন্স আয় করা যেত।
ভোগান্তির শিকার এই মানুষগুলোর সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হয় আন্দোলনের মাঠে—কখনো ইতালি দূতাবাসের সামনে, কখনো ভিএফএসের সামনে। পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়, তারা আবার অন্য রাস্তায় বা পার্কে চলে যায়। এভাবে বছর ঘুরে যায়, কিন্তু সমাধান মেলে না।
আসলেই প্রশ্ন হলো—সমস্যা কোথায়? সমস্যা আছে প্রথমত আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের গাফিলতিতে। ইতালির মতো দেশে শ্রমবাজার খুলেছে, অথচ বাংলাদেশি কর্মীরা সংগঠিত, নিরাপদ ও বৈধ পথে যেতে পারছে না। কেন? কারণ ভিসা ও কোটার বণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং নীতি-নির্ধারণী স্তরে অদৃশ্য সমঝোতা।
এখানে কূটনৈতিক অদক্ষতাও বড় ভূমিকা রাখছে। প্রধানমন্ত্রী মেলোনির সফর স্থগিত হওয়া কেবল প্রটোকলের ব্যর্থতা নয়, বরং আমাদের কূটনীতির দুর্বলতার প্রতিফলন। যারা প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো টাকায় বাজেট চালায়, তারাই আবার তাদের অধিকার রক্ষায় উদাসীন।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—রাষ্ট্র কি কেবল রেমিটেন্স চাইবে, নাকি সেই রেমিটেন্স আনতে চাওয়া মানুষগুলোর স্বপ্নের মূল্যও দেবে? তারা যেন প্রতারিত না হয় সেটি নিশ্চিত করবে।
সমস্যাগুলো কয়েক ভাগে বিভক্ত।
এক) কিছু লোক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন, কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ভিসার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পাননি। যারা ২০২৪ সালের অক্টোবরের আগে পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন, তারা এই তালিকায়।
দুই) পাসপোর্টের ফটোকপি জমা দিয়ে ভিসার জন্য অপেক্ষা করছেন অনেকে। চাইলে অন্য দেশে মূল পাসপোর্ট দিয়ে আবেদন করতে পারেন, কিন্তু পুঁজি ও ঋণের সব টাকা তো ইতালির ভিসার পেছনে খরচ হয়ে গেছে।
তিন) ইতালিতে বসবাসকারী ব্যক্তির পরিবার ইতালি যেতে চায়। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের অগাস্টের পর এই ক্যাটাগরির ভিসা আবেদন তিনগুণ বেড়েছে। তাই ভিসা দিতে দেরি হচ্ছে, এমনটাই বলছে ইতালি দূতাবাস।
এই সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারের দুটি মন্ত্রণালয়—প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইতালি দূতাবাসের সামনে নিয়মিত ধরনা দিচ্ছেন এই মানুষগুলো। স্বপ্ন তাদের ইতালি যাবেন।
গত দুই-তিন বছরে এই ভোগান্তি সবার সামনে এলেও, ২০২২ সালের আগে এমনটা শোনা যায়নি। কিন্তু এর আগে থেকেই ইতালিতে বহু বাংলাদেশি বসবাস করছেন। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে প্রথম বাংলাদেশিরা ইতালিতে প্রবেশ করেন। শুরুতে শিক্ষার্থী, পর্যটক ও ভিজিট ভিসায় গেলেও ধীরে ধীরে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে কৃষি ও নির্মাণ খাতে শ্রমিক সংকটের কারণে বাংলাদেশিদের চাহিদা বাড়তে থাকে।
২০০০ সালের পর ইতালি বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসনের একটি বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বৈধভাবে ইতালিতে বসবাস করছেন এবং তারা দেশটির অর্থনীতি ও বাংলাদেশের রেমিটেন্সে বড় অবদান রাখছেন।
সমস্যার শুরু হয় ২০১২-১৩ সালের দিকে, যখন ভিসা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দালালচক্রের প্রভাব বাড়তে থাকে। এরপর থেকে আবেদনকারীরা নিয়মিত জটিলতায় পড়তে থাকেন। ২০১৯ সালে ইতালি সরকার ‘ডেক্রেতো ফ্লুস্সি’ (‘Decreto Flussi’) নামে শ্রমবাজারে কোটাভিত্তিক নিয়োগ নীতি চালু করে। এর ফলে নির্দিষ্ট সংখ্যক বিদেশি শ্রমিকই কাজের ভিসা পান।
২০২২ সালের পর বাংলাদেশি আবেদনকারীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়, কিন্তু কোটা সীমিত থাকায় বিপুল সংখ্যক আবেদন ঝুলে যায়। সংকট মোকাবেলায় ২০২৪ সালের অগাস্টে ইতালি নতুন আইন কার্যকর করে, যার আওতায় প্রায় ৪০ হাজার ভিসা আবেদন আটকে দেওয়া হয়। যারা ২০২৪ সালের অক্টোবরের আগে আবেদন করেছেন, তারা এই তালিকায় পড়েন।
২০২৪ সালের অক্টোবরের পর যারা আবেদন করেন, তাদের পাসপোর্টের ফটোকপি রেখে বলা হয়, কাগজ যাচাই-বাছাই করে সঠিক হলে ভিসা দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়াও কিছুটা ধীর। তবে ২০২৫ সালে যারা আবেদন করছেন, তাদের সিদ্ধান্ত পেতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।
অগাস্টের শুরুতে, যখন ইতালির প্রধানমন্ত্রী ঢাকা আসবেন বলে খবর ছড়ায়, ভুক্তভোগীরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ইতালি দূতাবাসে ভিসার জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ইতালি দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবরের আগে ইস্যু করা সব ওয়ার্ক পারমিট স্থগিত করা হয়েছে। তবুও তারা ইতিমধ্যে প্রায় ৪০ হাজার মূলতবি আবেদনের মধ্যে ৮ হাজারের বেশি নিষ্পত্তি করেছে। আরও প্রায় ২০ হাজার সম্ভাব্য আবেদনকারীর ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণের যাচাই-বাছাই শিগগিরই শুরু হবে।
আবেদনকারীরা এতেও খুশি নন, কারণ ২০২৪ সালের আগের আবেদনকারীরা তাদের পাসপোর্ট ফেরত পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিং ও প্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠান ভিএফএস ও ইতালি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, “পাসপোর্ট ফেরতের জন্য আবেদন করলেও, আবেদনকারীর ইতালি ভিসার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে, বাতিল হবে না।” এ ক্ষেত্রে নুলাস্তার মেয়াদও স্থগিত থাকবে।
দূতাবাস ও ভিএফএসের নানা পদক্ষেপের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—ভিসা দেওয়া হবে কি হবে না, এই সমস্যা এতদিন কেন ঝুলে আছে? দেশটির সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক তো বেশ ভালো। সমাধান কি কূটনৈতিকভাবে হতে পারে না?
ইতালি সরকারের একটি দ্ব্যর্থহীন নীতি হলো—অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো, তবে ন্যায্য ও প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তির জন্য ভিসার পথ খোলা রাখা। ২০২৩-২০২৫ মেয়াদের জন্য প্রায় ৪৫০,০০০ কাজের ভিসা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ২০২৬-২০২৮ সালের জন্য এই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৫০০,০০০ করা হয়েছে, যার প্রথম ধাপে ২০২৬ সালে ১৬৪,৮৫০টি ভিসা ইস্যু করা হবে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘অপরাধী চক্র’ বা নিরাপত্তাহীন গোষ্ঠীগুলো ইতালির ভিসা ব্যবস্থায় প্রবেশ করে বাংলাদেশিসহ অভিবাসীদের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করছে। অর্থাৎ, ভিসা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। টাকার লেনদেন সবাই জানত, কিন্তু মেলোনির মুখে এই কথা আসায় বাংলাদেশিরা বিপাকে পড়েন। ভিসা যাচাই-বাছাই আরও কঠোর হয়, ফলে প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশি নাগরিকরা বৈধ ও অবৈধ উভয়ভাবেই ইতালিতে প্রবেশ করেছেন। এই বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বেশিরভাগ বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন।
প্রশ্ন হলো, বৈধ পথে যাওয়ার সুযোগ ভেঙে গেলে মানুষ অবৈধ পথে যাওয়ার চেষ্টা করে। ইতালির ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে দেশটিতে আসা অভিবাসীর সংখ্যা ৩৫,৭৯২। এদের মধ্যে বাংলাদেশিরা শীর্ষে, ১০,৯৮৯ জন। এরপর রয়েছেন ইরিত্রিয়া ও মিশরের নাগরিকরা।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। দীর্ঘদিন ধরে কথা হতো এমন এক ভিসা আবেদনকারীর ফোন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন পর আবার যোগাযোগ করলে বললেন, তিনি ইতালিতে আছেন। কীভাবে? তার পাসপোর্ট তো দূতাবাসে। তিনি বলেন, থানায় পাসপোর্ট হারানোর জিডি করে নতুন পাসপোর্ট তৈরি করেছেন। তারপর লিবিয়া হয়ে নৌপথে ইতালি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বৈধ পথে যাওয়ার খরচের তুলনায় অবৈধ পথে অর্ধেক খরচ হয়েছে। আমার মনে হচ্ছিল, যাত্রাপথে যদি তিনি মারা যেতেন বা কোনো মাফিয়ার হাতে আটক হতেন, তবে জীবন বিপন্ন হতে পারত।
ফেনীর ওই ছেলের গল্প শুনে এখন আরও অনেকে উৎসাহিত হচ্ছেন। তারা সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তাসনিম সিদ্দিক বলেছিলেন, “বৈধ পথে না হলে অবৈধভাবে কর্মী যাবেই বিদেশ। কারণ, তার লক্ষ্য বিদেশ যাত্রা বা অভিবাসন। একদিকে বিদেশের স্বপ্ন আর অন্যদিকে দেশে কাজের অভাব দুটোই তাকে তাড়িত করে।”
বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা কূটনীতির অগ্রাধিকারের কত নম্বরে আছে, তা নিয়ে ভুক্তভোগীদের মনে সন্দেহ রয়েছে।