Published : 04 Jan 2026, 10:07 AM
‘ছেড়ে দিলে কী আর করার?’
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে কোনো অন্যায়-অপরাধ ছাড়াই বাদ পড়ার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানের এই ছোট বাক্যটিই সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তিনি এর বেশি কোনো মন্তব্য করেননি।
এই বাক্যে নেই কোনো অভিযোগ, নেই কোনো প্রতিবাদ, এমনকি নেই কোনো ব্যাখ্যাও। আছে এক ধরনের নীরব উপলব্ধি। যে উপলব্ধি বলে, ক্ষমতা যাদের হাতে, সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত তাদেরই হাতে। একজন খেলোয়াড় হিসেবে তিনি এর বেশি আর কীই বা করতে পারেন?
কিন্তু এই বাক্যটি শুধুই একজন ক্রিকেটারের হতাশা নয়। বৃহৎ পরিসরে, এটি ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক রাজনৈতিক উৎসাহে বাড়তে থাকা পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণা আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতার যে নেক্সাস তার আরেকটি নির্মম বহিঃপ্রকাশ। যার সামনে মুস্তাফিজের মতো একেক দিনে ও একেক ঘটনা প্রসঙ্গে, একেক ব্যক্তির কিংবা প্রতিষ্ঠানের আর কিছুই করার থাকে না।
মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) স্পষ্ট করেছে যে, তারা ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিসিসিআইয়ের নির্দেশ অনুসরণ করেছে। অথচ বিসিসিআই কিংবা কেকেআর, কেউই এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা হাজির করতে পারেনি। মাঠের পারফরম্যান্স, ফিটনেস, দলীয় কৌশল বা শৃঙ্খলাভঙ্গ, এর কোনোটিই এখানে আলোচনায় আসেনি। ফলে এই সিদ্ধান্তকে ক্রিকেটীয় বলার সুযোগ নেই, কেউ তা বলছেও না।
ফলে এটি সুস্পষ্ট হচ্ছে, যে ক্ষমতার বলে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা ক্রিকেটের বল নয়। এই বলের উৎস পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণার রাজনীতির মাঠ। ভারতীয় উপমহাদেশে যেখানে জাতিগত পরিচয় ও ধর্মীয় বিভাজন এখন রাজনীতির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার, সেখানে মুস্তাফিজকেও বাদ দেওয়া হয়েছে একই সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে তৈরি মবের চাপে।
এটি এমন এক চাপ, যা সরাসরি কোনো আদেশ দেয় না, কিন্তু তার উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানগুলো উপেক্ষাও করতে পারে না। রাজনৈতিক ভাষ্য, সংখ্যাগরিষ্ঠের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা এবং জনপরিসরের হুমকি একসঙ্গে মিলে এই চাপ তৈরি করে। মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ঘটনা এর বাইরের কিছু না বরং মবের ক্ষমতার সামনে প্রতিষ্ঠানের নতিস্বীকারের আরেকটি ক্লাসিক উদাহরণ।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, মুস্তাফিজকে এখানে কখনোই একজন ব্যক্তি কিংবা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তাকে দেখা হয়েছে একটি বৃহত্তর পরিচয়ের প্রতিনিধি হিসেবে। যেখানে তিনি কেবল একজন বাংলাদেশি, একজন মুসলিম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়দের চোখে একজন ‘আদার’ বা অন্যপক্ষের মানুষ। তার কোনো বক্তব্য, আচরণ বা অপরাধ এখানে মুখ্য হয়ে সামনে আসেনি। কেবল তার এই অন্যপক্ষীয় পরিচয়টিই এখানে মবের মাথায় সবচেয়ে বড় অন্যায় হিসেবে চাড়া দিয়ে উঠেছে।
ভারতীয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার Identity and Violence: The Illusion of Destiny বইয়ে বলছেন, মানুষকে যখন একটিমাত্র পরিচয়ের ভেতরে আটকে ফেলা হয়, তখন সেই পরিচয়ই ঘৃণা ও সহিংসতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আইপিএলে মুস্তাফিজের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক পরিচয় তিনি একজন পেশাদার ক্রিকেটার, তিনি আরও অনেক ক্রিকেটারের সহকর্মী। যিনি অনেক বছর ধরে বিভিন্ন দলে খেলেছেন, সাফল্য অর্জন করেছেন এবং মাঠে নিজের কাজ দিয়েই আইপিএল নিলামে জায়গা করে নিয়েছেন। কিন্তু পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি তার এই বহুমুখী প্রাসঙ্গিক পরিচয়কে মুছে দিয়ে সামনে এনেছে কেবল বাংলাদেশি পরিচয়টিকে। তার সঙ্গে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তার ধর্মীয় পরিচয়কে যুক্ত করেছে। ফলে মবের কাছে তা বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতিবিদদের সৃষ্ট সাম্প্রতিক বাস্তবতায় ঘৃণার হাতিয়ার হয়েছে।
যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট পরিচয়কে হুমকি হিসেবে অনুভব করে, তখন ব্যক্তিগত দায়ের ধারণা সেখানে অর্থহীন হয়ে পড়ে। শাস্তি দেওয়া হয় প্রতীকে। মুস্তাফিজ এখানে ঠিক সেই প্রতীক। পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার সহজ লক্ষ্যবস্তু। তাকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে আসলে শাসন করা হয়েছে তার বাংলাদেশি মুসলিম পরিচয়টিকে।
এই ধরনের পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণার রাজনীতি উপমহাদেশের ক্রিকেটে নতুন নয়। ২০০৯ সালের পর থেকে আইপিএলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতি, ভারত–পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সিরিজের দীর্ঘ স্থবিরতা, কিংবা শ্রীলঙ্কা সফরে পাকিস্তান দলের ওপর হামলার পর তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকির বয়ান। এর সবই দেখায়, ক্রিকেট এই উপমহাদেশে বহু আগেই কেবল খেলাধুলা নয়, বরং রাজনৈতিক আবেগ ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির মঞ্চে পরিণত হয়েছে। যেখানে ক্রিকেট হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় সংঘাতের বিকল্প ক্ষেত্র।
এই প্রেক্ষাপটে মুস্তাফিজের ঘটনা আরও সূক্ষ্ম। এখানে ভারত-পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘাত বা শ্রীলঙ্কা দলের সঙ্গে ঘটা ঘটনার মতো সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি নেই। আছে পরিচয়ভিত্তিক মবের চাপ, আর সেই চাপকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর প্রবণতা।
এই মবের শক্তিই যে এখানে বাস্তব ক্ষমতায় রূপ নিয়েছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় ভারতীয় শাসক দলের একাধিক নেতার বক্তব্যে। বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোম প্রকাশ্যে বলেছেন, মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো ‘শত কোটি হিন্দুর জয়’ এবং বিসিসিআই ‘দেশের মানুষের আবেগকে সম্মান জানিয়ে’ সঠিক কাজ করেছে। একইভাবে বিজেপির আরেক নেতা কৌস্তভ বাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটার কলকাতায় আইপিএল খেলতে এলে তা হতে দেওয়া হবে না’। এসব বক্তব্যে ‘জনতার আবেগ’ ও ‘দেশের অনুভূতি’র নামে যে চাপ তৈরি করা হয়েছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
এখানে যুক্তি বা ক্রিকেটীয় বিবেচনা নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে নির্মিত আবেগই হয়ে উঠেছে নীতি নির্ধারণের মানদণ্ড। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে, বিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে চাপ বাড়ছিল।
কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রতিষ্ঠান কেন এসব চাপ প্রতিরোধ করে না? এর উত্তর প্রতিরোধে নয়, বরং ক্ষমতার গদি আর আত্মরক্ষায়। উপমহাদেশের চলমান মবের ক্ষমতার রাজনীতিতে আমরা নিয়মিতই দেখছি, প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁকছে। কখনো নিরাপত্তার যুক্তিতে, কখনো স্থিতিশীলতা রক্ষার নামে, আবার কখনো জনমতের চাপ দেখিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত, দুই দেশেই নানা অন্যায্য দাবিকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। কখনো প্রতিষ্ঠান রক্ষার অজুহাতে তা করা হচ্ছে, আবার রাজনীতিবিদেরা তা করছেন তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে।
মুস্তাফিজকে কেকেআর থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাটিও এই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। এটি এমন এক প্রতীকী শাসন, যেখানে পরিচয়ভিত্তিক মবের শক্তিতে বলীয়ান রাজনীতি একটি আন্তর্জাতিক খেলাকে ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশের ওপর বার্তা পাঠিয়েছে। এই বার্তাটি সরাসরি কূটনৈতিক ঘোষণার মতো নয়, আবার নিছক খেলাধুলার সিদ্ধান্তও নয়।
এই ঘটনার পর বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের ঘোষণা বা ভারতে আইসিসি ইভেন্টে অংশ না নেওয়ার আহ্বান বা সম্ভাবনা ঘিরে যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তাতেও স্পষ্ট যে, পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণা ও তার প্রতিক্রিয়া কতটা তীব্র হয়ে উঠতে পারে। একদিকে মবের ঘৃণা, অন্যদিকে তার বিপরীতে জন্ম নেওয়া প্রতিঘৃণা, দুটি একই মুদ্রার দুই পিঠ। দুটিই যুক্তির বদলে আবেগে চালিত।
মুস্তাফিজের সেই ছোট বাক্য ‘ছেড়ে দিলে কী আর করার?’, উপমহাদেশে পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণার রাজনীতির সামনে একজন খেলোয়াড়ের তো বটেই যে কোনো ব্যক্তিসত্তার অসহায় বাস্তবতাটিকে সামনে এনেছে। যেখানে ব্যক্তির কাজ নয়, জাতি আর ধর্মীয় পরিচয়ই শেষ কথা।