Published : 25 Aug 2025, 09:35 AM
আশির ও নব্বইয়ের দশকে নগর-বন্দর ছাড়িয়ে গ্রামগঞ্জে তারিখ ইব্রাহিম নামের তুখোড় এক লেখকের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। ‘যায়যায়দিন’ নামক অধূনাবিলুপ্ত সাপ্তাহিকের মাধ্যমে তার লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় নব্বইয়ের দশকে। তারও পরে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এসে জানলাম ওই তারিখ ইব্রাহিমই হলেন বিভুরঞ্জন সরকার, আমাদের বিভুদা। ততদিনে তিনি সামরিক আর বেসামরিক গণতান্ত্রিক জামানার শাসনকাল পার করা ত্রিকালদর্শী স্থির দৃঢ় সাহসী আর প্রজ্ঞাবান সাংবাদিক হিসেবে পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হওয়ার সুবাদে হলের মূল ভবনের তিনতলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ব্লকের ৩৭৩ নম্বর কক্ষে প্রায় এক বছর ছিলাম। একই ব্লকে কাছাকাছি কক্ষে থাকতেন আমাদের কয়েক বছর আগের শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের ছাত্র এবং ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আমিনুল ইসলাম সজল এবং ইংরেজি বিভাগের মাহমুদুল আমিন অপু।
ছুটির দিনগুলোতে মাঝে মধ্যে তাদের মধ্যে আড্ডা জমে উঠত। আমিও শ্রোতা হিসেবে ওই আড্ডার অংশ হতাম। সেই আলাপে প্রায়ই দুজন সরকারের নাম উচ্চারিত হতো—একজন বিভুরঞ্জন সরকার এবং আরেকজন চিররঞ্জন সরকার। চিররঞ্জন সরকার তখনও তরুণ, টগবগে এবং মাঝেমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, বিশেষ করে মধুর ক্যান্টিনে আড্ডায় মগ্ন অবস্থায় দেখেছি। তখনও আমি জানতাম না যে এই দুই সরকার একই পরিবারের, একই সরকার এবং সহোদর।
হলের আড্ডার আবহ থেকে আঁচ পেয়েছিলাম যে এই দুই সরকার তুমুল তুখোড় কলামনিস্ট। এরপর তাদের লেখালেখির প্রতি দূর থেকে আমার মনোযোগ কিছুটা বাড়ে। তাদের লেখা আমার সামনে এলে আগ্রহ নিয়ে পড়তাম।
লেখালেখির জগতে একজন পাঠক ও ছাত্র হিসেবে আমি একটি সত্য মানি—অসৎ লোকের জন্য লেখালেখি নয়। গত দুই দশকে ঢাকার সংবাদমাধ্যম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ আমার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সৎ ও সাহসী কণ্ঠস্বর প্রায় বিলুপ্তির পথে।
এই বিলুপ্তির কালে বিভুরঞ্জন সরকার এবং আমি প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিয়মিত লিখে আসছিলাম। ওই সুবাদে মতামত বিভাগের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক তন্ময় ইমরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলাপ হতো। এমন এক সময়ের কথা বলছি, যখন পেশাদার দায়বদ্ধ লেখকরা পদধারী, পুরস্কারজীবী, পদলোভী ও সুযোগসন্ধানী মানুষদের কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে যাচ্ছিলেন। এই সুযোগসন্ধানী কলমজীবীদের লেখার শুরুটা পড়লেই শেষটা বলে দেওয়া যায়, তাই পুরো লেখা পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন প্রথমোক্ত দলের একজন দায়বদ্ধ লেখক। তার দায়বদ্ধতা ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম এবং মাতৃভূমির মঙ্গলচিন্তার প্রতি, যার স্বীকারোক্তি তিনি তার ‘খোলা চিঠি’তে করে গেছেন।
ততদিনে আমি জেনে গিয়েছিলাম যে চিররঞ্জন সরকার বিভুরঞ্জন সরকারের ছোট ভাই। এই জানার সুযোগটাও ছিল সম্মোহনী। সামাজিক মাধ্যমে কয়েকজন মানুষের প্রকাশভঙ্গি, রুচি ও ভিন্ন এক ভুবনের সন্ধান পেয়েছিলাম। তাদের মধ্যে কবি সৈয়দ তারিক, অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য, প্রকাশক ও কবি রবীন আহসান এবং সাংবাদিক চিররঞ্জন সরকার অন্যতম। চিররঞ্জন সরকারের নানা সময়ের বিবিধ উপলক্ষের গল্প ও ছবির প্রকাশ থেকে জেনেছিলাম যে তিনি বিভুরঞ্জন সরকারের ছোট ভাই। চিরদার গল্প থেকেই জেনেছিলাম বিভুদার পরিবারের ঈর্ষণীয় শান্তির এক ভুবনের কথা। সামাজিক মাধ্যমে চিরদার গল্পের অনেকটাই ছিল বিভুদার পরিবার ও তার সহধর্মিণী, আমাদের বউদির বাহারি রান্নার প্রশংসায় ভরা।
চিরদার গল্পের সুবাদে মাঝে মাঝে বিভুদার মেয়ের মধ্যে আমার মেয়ে অতসীর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠত। বিভুদার একটি লেখায় জেনেছিলাম, তিনি কখনো বিদেশ ভ্রমণ করেননি, এমনকি তার পাসপোর্টও করা হয়নি। পরে তার ‘খোলা চিঠি’ থেকে জানা গেল, তিনি শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করেছিলেন। ওই গল্পেও তিনি একজন সৎ লেখক ও সাংবাদিকের জীবনের বাস্তবতার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। হাতখরচের টাকায় স্যুট-কোট ও জুতা কিনে তিনি ধারদেনার মুখে পড়েছিলেন। এটাই নির্মোহ মানুষের সত্যের আকাশ। এই আকাশের শেষ নক্ষত্রের একজন তিনি, বিভুরঞ্জন সরকার।
লেখালেখি আদতে একটি নির্মোহ প্রত্যয়। এই জগতে প্রত্যয়ী কণ্ঠস্বর প্রায় বিলুপ্ত। বিভুদা ছিলেন এমন বিলুপ্ত কণ্ঠস্বরের একজন। দেশের কোনো প্রথিতযশা মানুষের প্রয়াণে তাদের সামগ্রিক জীবনের অবদান নিয়ে লেখা পত্রিকায় এখন বিরল। সেই বিরল জায়গায় কলম ধরার জন্য বিভু দা’র বা তার আগের প্রজন্মের হাতেগোনা কয়েকজনের নাম মনে পড়ে—আতাউস সামাদ, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, এবিএম মূসা ও সৈয়দ আবুল মকসুদ। এই ধারার শেষতম নাম বিভুরঞ্জন সরকার।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে পত্রিকাগুলো অসংখ্য লেখা ছেপেছে। হাজার হাজার পাতার সংকলন ও সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমার মনে দুই-একটি লেখা স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। বিভুদা একটি ছোট কলেবরের লেখায় স্বাধীনতার পরের দেশ, প্রশাসন ও পরিবারের বাস্তবতা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুর জীবনের একটি চিত্র এঁকেছিলেন। তিনি যোগসূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন অধ্যাপক আবুল ফজলের ‘শেখ মুজিব: তাঁকে যেমন দেখেছি’ শিরোনামের বইটি।
তিনি গবেষণা, সম্পাদনা ও জীবনীভিত্তিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন অগণিত। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত কিংবদন্তি কৃষক নেতা হাতেম আলী খানকে নিয়ে একটি বই এমনই একটি অনন্য কাজ। তিনি সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিরন্তর লিখেছেন। তার লেখায় সৈয়দ আবুল মকসুদের সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পাই। আমার দৃষ্টিতে তারা দুজনেই দেশের ‘চারণ কলামনিস্ট’।
লেখালেখির ছাত্র হিসেবে শিখেছি, উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট উভয় লেখা থেকেই শেখার সুযোগ আছে। খারাপ লেখা পড়ে ধারণা নিতে হয়, এমন লেখা লেখা যাবে না। আর ভালো লেখা থেকে প্রতিজ্ঞা করার সুযোগ আছে, এর চেয়েও ভালো লিখতে হবে। বিভুদার লেখার অপেক্ষায় থাকতাম। তার লেখা থেকে শেখার ও চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সুযোগ হিসেবে তার লেখার মুখোমুখি হতাম। এই কথা একদিন তার সঙ্গে দেখা করে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে সুযোগ আর হলো না।
বিভুদার লেখালেখি আমার মনে একটি ভাবনা জাগাত—তিনি কি লেখালেখি বা সাংবাদিকতাকে নিছক কাজ মনে করতেন, নাকি অন্য কিছু? তার রাজনীতি ছিল স্বাধীনতার পক্ষে প্রগতিশীল বাংলাদেশ, যা তিনি ‘খোলা চিঠি’তে খোলাসা করেছেন। তিনি সারাজীবন কথা, কাজ ও লেখালেখির মাধ্যমে এটি প্রকাশ করেছেন। তার লেখায় সমালোচনায় পরিমিতিবোধের ছাপ থাকত। প্রয়োজনীয় সূত্র ও বিচক্ষণ পর্যবেক্ষণের নজির তিনি রাখতেন। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপক পঠনের মাধ্যমে তিনি লেখালেখির অভিযাত্রায় ছিলেন। তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি মাতৃভূমির পতন-উত্থানের উপাখ্যান দেখেছেন। মাঝে মাঝে মনে হয়, লেখালেখি বুঝি তার ধর্ম ছিল।
মনের কোণে একটি ক্ষীণ ইচ্ছা জাগত—বিভু দা’র সংগ্রহে থাকা বইগুলো একবার দেখে আসি। গত দুই দশকে সংবাদপত্রগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক ও রুচিগত গরিবী হাল প্রায় দেউলিয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই দেউলিয়াত্বের কালেও বিভুদা ছিলেন বিশেষ উপলক্ষে লেখার জন্য ঈর্ষণীয় বিচক্ষণ একজন মানুষ। আমার এই মূল্যায়ন কেউ মানতেও পারেন, নাও পারেন।
তার ‘খোলা চিঠি’র বরাতে জানি, তিনি নিজেকে বোকাসোকা মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। আদতে এই পৃথিবী কতিপয় বিরলপ্রজ, আত্মসম্মানে বলিয়ান ও দেশপ্রেমে দীক্ষিত মানুষের কল্যাণে সুন্দর হয়। তার মৃত্যু নিয়ে তার আত্মজ ঋত সরকার ও অনুজ চিররঞ্জন সরকারের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করতে চাই। তার মৃত্যুর রহস্য খোলাসা হোক। পাঁচটায় বাসায় ফিরবেন বলে বের হয়ে রাজধানী পেরিয়ে কয়েক নদী পার করে আরেক জেলায় মেঘনার দেখা কীভাবে পেলেন? সিসিটিভির সূত্র ধরেও অনেক পথরেখা খুঁজে বের করা অসম্ভব নয়।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের তাবৎ কাগজে লিখেছেন এবং প্রায় দশটি পত্রিকায় চাকরি করেছেন। তার ‘খোলা চিঠি’তে সংবাদমাধ্যমের বিপর্যস্ত অবস্থা নিয়ে কিছু ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। ওই ইঙ্গিতগুলোও খোলাসা করা জরুরি। এই জরুরি দায়িত্ব সংবাদপত্রের নীতিনির্ধারক থেকে রাষ্ট্রকাঠামোর দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের।
বিভু দা’র পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, সত্য লিখতে গেলে কখনো কখনো ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য হারাতে হয়। তিনি তেমন স্বাচ্ছন্দ্য চাননি, তবে জীবন সংগ্রামে বিব্রত হতেও চাননি। এখানে দিনেমার দার্শনিক সাইরেন কিয়ের্কেগার্ডের একটি কথা তুলে ধরতে চাই। প্রায় দুইশ বছর আগে তিনি বলেছিলেন, সত্য প্রকাশ মানে আগুনে হাত দেওয়া। আর আগুনে হাত দিলে হাত পুড়বেই। বিভু দা কি সেই আগুনেই তীর্থ খুঁজে নিলেন? এই প্রশ্ন আমাকে, আপনাকে, দেশজাতির বিবেক ও বুদ্ধিকে নাড়া দেবে। তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্থানের মধ্য দিয়ে তিনি সাংবাদিকতায় সত্য প্রকাশের এক কঠিন ল্যাবরেটরির দরজা খুলে দিয়ে গেলেন।
পঞ্চগড়ের সন্তান বিভুরঞ্জন ১৯৫৪ সালে জন্মেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে তিনি সাংবাদিকতায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু সততা ও দেশপ্রেম থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। মনে মনে আশা করতাম, তিনি জীবনের কোনো এক পর্যায়ে একটি আত্মজীবনী লিখবেন, যাতে তাঁর পাঁচ দশকে দেখা বাংলাদেশ আমরা জানতে ও দেখতে পারি। এই আশার দোলাচলে তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার ‘খোলা চিঠি’তে যে সত্যের তালাশ দিয়ে গেছেন, ওই সত্যের আকাশের নক্ষত্রের কাছে ভবিষ্যতের সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষকদের ফিরতে হবে। এমন শেষ নক্ষত্রের একটি নাম বিভুরঞ্জন সরকার।