Published : 22 Aug 2025, 03:21 AM
পৃথিবীর সাতটা আশ্চর্য তো আমাদের জানা। কিন্তু, অষ্টম আশ্চর্যের ব্যাপারে যেহেতু বিহিত হয়নি, আমরা ‘দাবি’ করতেই পারি যে, এই ‘ব-দ্বীপ’কে সেই স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
দাবি… দাবি… দাবি…
এই দাবি মানে ডিমান্ড না, ক্লেইম। এই দেশের মানুষ যখন খুশি যা খুশি তা-ই ক্লেইম মানে দাবি করতে পারে। সেটার ভিত্তি থাক বা না থাক। আর সেই দাবি যদি কোনো কারণে কারও চিন্তা প্রকৌশল ও মতাদর্শের খাপে ও খোপে পড়ে যায়, তাহলে ভিত্তিহীন হলেও, সেটাকে সত্য প্রমাণে কৌশলী হয়ে উঠি আমরা। যেনবা সেটাই সত্য, এর বাইরে আর কোনো সত্য নেই। কিংবা সত্যটা জানা থাকলেও, শুধু বিতর্ক উস্কে দেওয়ার জন্যই সেটা মানতে আমরা নারাজ।
উদাহরণ চান? আপাতত একটা দেই—“মুক্তিযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২০০০ জন।” একজন মুখের জোরে কথাটা তুলে দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতে। যেহেতু আমাদের কান সব সময় চিলেই নিয়ে যায়, ফলে আমরা চিলের পিছে ছোটা শুরু করে দিয়েছি বরাবরের মতোই। এই বয়ানকে সত্য দাবি করে এখন একটা পক্ষ রীতিমতো ফায়দা নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। কেননা, মতাদর্শিক কারণেই এই ভুয়া তথ্যটি তাদের পক্ষে সাফাই গাইবে। কে জানে, বাজারে কবে না আবার চালু হয়ে যায় যে, মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছুই ছিল না!
বাংলাদেশে এখন একটা পক্ষ মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্তাসত্তাকে সমালোচনার নামে নাকচ করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ইতিহাসের ক্রিটিক্যাল পাঠের স্বার্থে ও একপাক্ষিক বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে সমালোচনা একটি অনিবার্য কাজ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, প্রতি-বয়ানটিও মনগড়া হয়ে উঠবে। সেটি করলে বরং প্রতিষ্ঠিত সত্য আরও বেশি ‘বিশেষভাবে সত্য’ হয়ে ওঠে।
এই আলোচনা মনগড়া প্রতি-বয়ানকে কেন্দ্র করেই লিখিত।
২.
বাংলায় একটা শব্দ আছে, কুম্ভিলক। মানে, যিনি অন্যের লেখা নিজের নামে চালান। এই কাজটিকে বলে কুম্ভিলকবৃত্তি। ইংরেজি শব্দটি বরং অধিকতর জনপ্রিয়—প্লেজিয়ারিজম। বিদ্যায়তনিক কর্মকাণ্ডে কুম্ভিলকবৃত্তিকে চরমতম অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের সংস্কৃতি-রাজনীতির অন্যতম দুই দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শেখ মুজিবুর রহমানকে এই প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা ক্রমাগত করে চলেছে তাদের উত্তরপ্রজন্ম। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে অবশ্য কাজী নজরুলের কথা আসে। আসে গগন হরকরার কথাও। রবীন্দ্রনাথ নাকি নজরুলের কবিতা নিজের নামে চালিয়েছেন, গগনের গান নিজের নামে চালিয়েছেন ইত্যাদি!
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ক্ষণজন্মা লেখক। তাঁদের মধ্যে একটা সাহিত্যিক দ্বন্দ্ব লাগিয়ে দেওয়ার জন্য একটা পক্ষ একজনকে হিন্দুর কবি, আরেকজনকে মুসলমানের কবি পরিচয়ে পরিচিত করতে রীতিমতো সিদ্ধহস্ত। যদিও, রবীন্দ্র-নজরুল কেউই এই প্যাঁচকে প্রশ্রয় দেবেন না বা বেঁচে থাকলে দিতেনও না। কিন্তু, তাতেও কুচক্রী মানুষের মনগড়া গুজবের ফল্গুধারা থামত কি না, সে ব্যাপারটা অনিশ্চিত। যা দিনকাল পড়েছে!
এ প্রসঙ্গে একটা মুখে মুখে ফেরা গুজব-গল্প (গল্পগুজব নয়) মনে পড়ে গেল। গুজব নাকি গল্প, নাকি কল্পগল্প, কী বলব জানি না। তবে, (কল্প)-কাহিনিটা এমন—
‘গীতাঞ্জলি’ লিখেছিলেন মূলত কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু, ১৯১৩ সালে এই ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নজরুল নয়, নোবেল দেওয়া হয় রবীন্দ্রনাথকে। কেননা, তিনি নজরুলকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তার কাছ থেকে লেখাগুলো নেন। পরে, সেটা আর ফেরত না দিয়ে, নিজের নামে ‘গীতাঞ্জলি’ নামক কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেন। এর চেয়ে বড় কুম্ভিলক আর কেউ হয়!
রবীন্দ্রনাথ যেহেতু নজরুলের ভাষাকে সহজে ইংরেজিতে ভাষান্তর করার ক্ষমতা রাখেন না, সেহেতু তিনি আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসকে খুব অনুনয়-বিননয় করলেন। অর্থের প্রলোভন দেখালেন। তিনি অনুবাদই শুধু করলেন না, ভূমিকাও লিখে দিলেন ভাষান্তরের। কিন্তু, রবীন্দ্রনাথ যেমন নজরুলকে বোকা বানাতে পেরেছেন, তেমনই ইয়েটসকেও বোকা বানালেন। যাওবা ভূমিকা লেখক হিসেবে ইয়েটসের নাম দিয়েছেন, কিন্তু, যেহেতু ইতোমধ্যেই ইয়েটসকে টাকাপয়সা দিয়ে কিনে ফেলেছেন, সেহেতু ভাষান্তরটা রবীন্দ্রনাথ নিজের নামেই চালিয়ে দিয়েছেন। কত বড় কুম্ভিলক!
এর পরে, রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ কবি ও রয়েল সোসাইটি অব লিটারেচারের সদস্য থমাস স্ট্যার্জ মুরকে তার নাম নোবেল কমিটির কাছে মনোনীত করার জন্য অর্থের বিনিময়ে প্রলোভন দেখালেন। ইয়েটসের মতো মুরও গলে গেলেন। প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে মুর রবীন্দ্রনাথের নাম নোবেল কমিটির কাছে প্রস্তাব করেন। রবীন্দ্রনাথ পেয়ে গেলেন নোবেল পুরস্কার, যেটি পাওয়ার কথা আসলে নজরুলের। কেননা, ‘গীতাঞ্জলি’ তো নজরুলেরই লেখা!
এরপরে মঞ্চে আবার আবির্ভাব ঘটে প্রমীলা দেবীর। সাল ১৯২৪। তিন বছরের পরিচয়ের পর নজরুল ইসলামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আশালতা সেনগুপ্ত। নজরুল তার নাম দেন প্রমীলা। এই প্রমীলা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি। নজরুলের কবি প্রতিভায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে বশে আনার জন্য প্রমীলাকে নজরুলের সঙ্গে বিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ এবং কু-মতলব আঁটেন যেন প্রমীলা নজরুলকে অসুস্থ করে ফেলতে পারেন। সেই অপচেষ্টা সফলও হয়। ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি চিরতরে বাকরুদ্ধ ও স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়েন নজরুল।
এই হলো সেই কাহিনি, যা মুখে মুখে বিভিন্ন প্রজন্ম বিভিন্ন জনের কাছে নানান মশলামিশ্রিত প্রকরণে শুনেছেন। কেউ কেউ এ কল্পকাহিনি শুনে হেসেছেন, উড়িয়ে দিয়েছেন; আবার কেউ কেউ সত্যই বিশ্বাস করেছেন। সত্যই কি এটা কল্পকাহিনি, নাকি এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আছে? সেই সত্যাসত্য যাচাই এ লেখার উদ্দেশ্য নয়, কেননা কল্পকাহিনিকে বদলাতে গেলে, তাতে কাহিনির মজাটা নষ্ট হয়ে যায়। বরং, হেসে উড়িয়ে দেওয়াই শ্রেয়।
কল্পকাহিনির পথ ছেড়ে এবার এখানে বরং কয়েকটি তথ্য দেওয়া যাক।
প্রথমত, ‘গীতাঞ্জলি’ প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে। ‘গীতাঞ্জলি’র কবিতাগুলো লেখা হয় ১৯০৪ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে। ১৯১২ সালে এর সংক্ষিপ্ত ইংরেজি সংস্করণ ‘সং অফারিংস’ প্রকাশিত হয়। ইংরেজিতে ভাষান্তর করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ভূমিকা লেখেন ডব্লুই. বি. ইয়েটস। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের এই ইংরেজি সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে থমাস মুর নোবেল কমিটির কাছে রবীন্দ্রনাথের নাম মনোনয়নের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে নোবেল জেতেন রবীন্দ্রনাথ।
নজরুলের বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। যখন কবিতাগুলো লেখা শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ, তখন নজরুলের বয়স ৫ থেকে ১১ বছর। দুনিয়াতে সর্বনিম্ন ১৭ বয়সে নোবেল পেয়েছিলেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই (২০১৪ সালে)। কল্পগল্পের কথা বাদ দিলেও, মাত্র ১৪ বছর বয়সে একজন নোবেল পাওয়ার দাবিদার হয়ে উঠবেন, এটা অবিশ্বাস্য।
কাজী নজরুল ইসলামের বিরলপ্রজ ছান্দসিক প্রতিভার প্রথম ঝংকার ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে, মানে ‘গীতাঞ্জলি’ প্রকাশিত হওয়ারও ১২ বছর পরে। যার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় সাড়ে ২৩ বছর বয়সে, তিনি ১১ বছর বয়সে ‘গীতাঞ্জলি’ লিখেছিলেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য? ভাষা-শিল্পরূপ-প্রকরণ ইত্যাদির আলাপ তো বাদই থাকল।
দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথ মারা যান ১৯৪১ সালের ৭ অগাস্ট (২২ শ্রাবণ)। নজরুল তখনও সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ। প্রমীলার সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের দূরতম কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না। নজরুল ১৯৪২ সালে প্রাথমিকভাবে অসুস্থ হন মানে রবীন্দ্রনাথ ততদিনে মারা গেছেন। ধীরে ধীরে চিরতরে বাকরুদ্ধ ও স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়েন তিনি। এর আগে ১৯৩৯ সালে চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন প্রমীলা। নজরুল এটা স্বভাবতই মানতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুও নজরুলকে ধাক্কা দেয়। রবীন্দ্রনাথও নজরুলকে তার আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, যেটা নজরুল ১৯৪১ সালের ৬ এপ্রিল মুসলিম ইন্সটিটিউট হলে অনুষ্ঠেয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজত জয়ন্তীর আয়োজনে সভাপতির ভাষণে স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায়ই বলতেন, “দ্যাখ উন্মাদ, তোর জীবনে শেলীর মত, কীটসের মত খুব বড় একটা ট্র্যাজেডি আছে, তুই প্রস্তুত হ”।’ ফলে, রবীন্দ্রনাথ ও প্রমীলাকেন্দ্রিক অসুস্থতার ষড়যন্ত্র-তত্ত্বেরও কোনো ভিত্তি নেই।
আবার, গগন হরকরার ‘গান চুরি’রও কোনো ভিত্তি নেই। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রবীন্দ্রনাথ মূলত লিখেছেন ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ গানের সুরে অনুপ্রাণিত হয়ে। এই গানটি গগন গেয়েছেন, কিন্তু সুরটি তারও নয়। এটি লোকজ বাউল সুর, যা আবহমান কাল থেকেই বাংলা সঙ্গীতের অংশ হয়ে আছে। তবুও রবীন্দ্রনাথ এই গানের ঋণ স্বীকার করেছেন ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ১৩২২ সালের বৈশাখ সংখ্যায়, গগনকে প্রথমবারের মতো জনদরবারে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। গগনের গুরু লালন ফকিরকেও রবীন্দ্রনাথই প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ‘প্রবাসী’তে। কিন্তু, দুষ্টুচক্রের শিক্ষিত হোতারা রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে হয় জেনে, নতুবা না-জেনে ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব উৎপাদন করেই গেছে।
৩.
রবীন্দ্রনাথকে ‘কুম্ভিলক’ প্রমাণের অসার চিন্তা টিকবে না। এগুলো মনগড়া এবং ভিত্তিহীন। মূলত, রাজনৈতিক মতাদর্শের বলে রবীন্দ্রনাথকে জব্ধ করার অপচেষ্টা থেকেই এই অসাধুদের এসব জনপ্রিয় নড়াচড়া তৈরি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যথোপযুক্ত সমালোচনায় তাদের মনোযোগ নেই, অথচ কতভাবেই না বদনাম না-ছড়িয়েও রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করা যায়। সমালোচনা করা যায়, কারণ রবীন্দ্রনাথ দেবতাও নন, তার উদ্ভাবিত বা প্রচারিত কোনো ধর্মও নেই। কিন্তু, তৎকালীন পূর্ব বাংলায় তথা বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পাকিস্তানি ভাবধারা নিয়ন্ত্রিত মতাদর্শীরা অপপ্রচার চালিয়েছেন কুতর্কের দোকান খুলে।
রবীন্দ্রনাথকে তো লড়াই করেই অর্জন করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। ফরহাদ মজহারের ‘রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রনাথ পাঠ’ গ্রন্থটি পড়লেই এটা স্পষ্ট বোঝা যায়। এই লড়াইয়ে যারা অগ্রগণ্য তাদেরই একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব যার নিজের মধ্যেই ছিল। সেই শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিও মতাদর্শিক কারণে তাকে অপছন্দকারীদের নানা বিদ্বেষ আছে। যে পালে নতুন হাওয়া লাগিয়েছে তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’।
এই গ্রন্থটি নাকি টাকার বিনিময়ে অন্য একজন লিখে দিয়েছেন, কিন্তু তা প্রকাশিত হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। এখন মুশকিল হলো, অন্যের লেখা নিজের নামে চালালে সেটাকে ‘কুম্ভিলকবৃত্তি’ বলা হলেও, নিজের লেখা অন্যের নামে চালিয়ে দিলে এর সংজ্ঞা কী হবে, তা কোথাও বলা নেই। যার সম্বন্ধে এই ‘উদারতার অপবাদ’ সম্প্রতি এসেছে, তার নাম মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি নাকি টাকার বিনিময়ে বই লিখে শেখ মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনাকে খুশি করে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন!
নিশ্চিতভাবেই এই কাজ ‘কুম্ভিলকবৃত্তি’র সংজ্ঞায় পড়ে না, কেননা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র এই লেখার বিষয় ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ, যা তিনি ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত রাজবন্দী অবস্থায় জেলে বসে লিখেছিলেন। তিনি মারা যান ১৯৭৫ সালের অগাস্ট ট্র্যাজেডিতে। আর গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। বইটির ভূমিকা প্রস্তুত করা হয় ২০০৭ সালে, শেখ হাসিনা কারা অন্তরীণ থাকাকালীন। তার মানে, এই বইয়ের লেখক হিসেবে ‘শেখ মুজিবুর রহমানে’র নাম যাওয়ার সঙ্গে তার নিজের কুম্ভিলক হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। আবার, যাকে বলা হচ্ছে ‘প্রকৃত লেখক’, সেই জাবেদ পাটোয়ারীকেও ‘কুম্ভিলক’ বলার সুযোগ নেই, কারণ তিনি ‘নিজের নামে অন্যের লেখা’ প্রকাশ করেননি। এই যে জটিলতা বা কমপ্লেক্সিটি তৈরি করা হলো, এর প্রকৃত আভিধানিক সংজ্ঞা তৈরি করা মুশকিল হবে। আমরা শুধু বলতে পারি—‘আত্মজীবনী’ তুমি কার? মুজিবের নাকি জাবেদের?
৪.
অতীত ঘেঁটে আমরা জানি যে, বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরশাসক ও রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কবি হওয়ার খায়েশ মেটাতে অনেকেই ‘রাজকবি’র প্রচ্ছন্ন পরিচয়ে এরশাদের কবিতা লিখে দিয়েছিলেন। সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন মহলে হাসাহাসিও হয় প্রায়ঃশই। তাহলে কি সত্যই শেখ হাসিনা ক্ষমতা খাটিয়ে জাবেদ পাটোয়ারীকে দিয়ে তার বাবার নামে বই লিখিয়েছেন?
এ প্রসঙ্গে আপাতত না ভেবে, আমরা বরং দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-বিতর্কের কথা তুলি। একটি প্রাচ্যের, অপরটি পাশ্চাত্যের।
প্রাচ্যের বিতর্কটি খোদ বাংলা সাহিত্যের। চতুর্দশ শতাব্দী, তথা শ্রীচৈতন্য-পূর্বকালের। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই বিতর্কটি চণ্ডীদাস-সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। সেকালে পাশাপাশি সময়ে চারজন চণ্ডীদাসের আবির্ভাব ঘটে, যাদের প্রত্যেকেই রাধাকৃষ্ণের প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে লিখেছেন। প্রায় ১২৫০টির মতো আবিষ্কৃত কাব্যে বা ভণিতায় বিভিন্ন কবির পাশাপাশি বড়ু চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস এবং চণ্ডীদাসের নাম পাওয়া যায়। তারা একই ব্যক্তি নাকি ভিন্ন ভিন্ন—এ বিষয়ে সাহিত্য সমালোচক ও ঐতিহাসিকগণ কবিদের লিখিত ‘ভণিতা’র রচনাশৈলীকে প্রামাণ্য ধরে বিভিন্ন ব্যাখ্যাসহ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, চারজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি। তাদের মধ্যে চণ্ডীদাসকে বলা হয়েছে ‘বৈষ্ণব পদাবলী’র অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচয়িতা; এবং বড়ু চণ্ডীদাস ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের রচয়িতা। চৈতন্য-পরবর্তী বাকি দু’জন ভণিতা-স্রষ্টা তত গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, তারা চণ্ডীদাস-সমস্যাকে ঘনীভূত করতে ‘ভূমিকা’ পালন করেছেন বলা যায়।
প্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠকবির কাহিনি থেকে এবার যাওয়া যাক পাশ্চাত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ও কবির কাছে। পাশ্চাত্যেরটি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারকে ঘিরে। ‘মার্লোভিয়ান তত্ত্ব’ নামে একটি তত্ত্ব আছে। যে তত্ত্ব বলতে চায় যে, উইলিয়াম শেক্সপিয়ার নামে কোনো লেখক আদৌ ছিলেন না। মূলত বিখ্যাত নাট্যকার ক্রিস্টোফার মার্লোই শেক্সপিয়ার ছদ্মনামে লিখেছেন অসংখ্য কবিতা ও নাটক। কারও কারও মতে, মার্লো শেক্সপিয়ার লিখিত তিনটি ‘বার্ড নাটকে’র সহলেখক ছিলেন। এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে তাদের জন্মসাল, উভয়েরই জন্ম ১৫৬৪ সালে। মার্লো বেঁচে ছিলেন মাত্র ২৯ বছর, শেক্সপিয়ার ৫২ বছর। সমসাময়িক হওয়ায় বিতর্কের রসদ যথেষ্টই ছিল। কিন্তু, এগুলোর কোনটিই সর্বাংশে কেউ আজোব্দি প্রমাণ করতে পারেননি। শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবেই এগুলোর কেতাবি অস্তিত্ব রয়ে গেছে।
চণ্ডীদাস, শেক্সপিয়ার ও রবীন্দ্রনাথের এই বিখ্যাত উদাহরণগুলো এজন্যই টানা যে, বিতর্ক উস্কে দিয়ে মহৎ ব্যক্তিদের অবদানকে কেড়ে নেওয়া যায়নি। বরং, তাদের রচনাশৈলীর প্রসাদগুণের কারণেই সেগুলো যুক্তি ও ঐতিহাসিক সত্যাসত্যের ক্রিটিক্যাল পাঠের মধ্য দিয়ে উত্তরপ্রজন্মের কাছেও নৈর্ব্যক্তিক বিবেচনা থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
এই একই ঘটনা ঘটবে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ক্ষেত্রেও। কুতর্ক ও বিতর্ক উস্কে দিয়েও, কুচক্রীরা এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না যে, গ্রন্থটির লেখক ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ নন। তিনি হয়তো প্রতিষ্ঠিত লেখক নন, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যা লিখেছেন, তা কয়েক কোটি টাকা কেন, এর দ্বিগুণ টাকা খরচ করেও সেই অভিজ্ঞতা ৫০ বছর পরে লিখে ফেলা সম্ভব নয়।
এমনকি শেখ মুজিবুর রহমানের আদিনাম হিসেবে ‘দেবদাস চক্রবর্তী’ নামক একজন ব্যক্তিকে জুড়ে দিয়েও ব্যাপক মাত্রায় অযাচিত আলাপ তুলেছে উদ্দেশ্যবাদী নেটিজেনদের একটা মন্দ অংশ। শুধু তা-ই নয়, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র প্রচ্ছদের ছবিতে লেখকের নামের স্থলে এই তথাকথিত মিথ্যা-ভুয়া ‘দেবদাস চক্রবর্তী’র নাম বসিয়ে অপপ্রচারও চালিয়েছে এই দুষ্টুচক্রটি। আর এখন তো খোদ তাকে লেখক হিসেবে অস্বীকার করা হচ্ছে হলুদ সাংবাদিকতার অপকৌশলে। যেখানে দাবি করা হচ্ছে, পুলিশের সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীসহ ১২৩ জন মিলে এই বইটি রচনা করেছেন। বিনিময়ে তাদের এক কোটি টাকা ও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় একটি করে ফ্ল্যাট দিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী সরকার।
মুখ্যত, জাবেদ পাটোয়ারী কোনো স্বীকৃত লেখক নন। ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগের যে ‘সফট পাওয়ার’ ছিল বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী, তাদের মধ্যে অনেকেই স্বীকৃত লেখক। তখনকার সরকার চাইলে যে কাউকে দিয়েই প্রায় বিনা পয়সায় এই কাজটি করাতে পারত, এতটাই একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিল তাদের। এমনকি বইটির ভূমিকায় যে ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতাপূর্বক নাম উল্লেখ করা হয়েছে—বেবী মওদুদ, এনায়েতুর রহিম, এ. এফ. সালাহ্উদ্দীন আহমদ, শামসুল হুদা হারুন, শামসুজ্জামান খান প্রমুখ—তাদের যে কাউকে এসব হলুদ প্রতিবেদনে ‘লেখক’ বললেও একটা দ্বিধা তৈরি হতো, কেননা তারা প্রত্যেকেই স্বীকৃত লেখক ও গবেষক। কিন্তু, বিস্ময়করভাবে নাম এসেছে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার, যিনি কি না ‘প্রাচীন প্রস্তর যুগে’ (এসবির প্রধান থাকাকালে) খোয়াব দেখেছিলেন একদিন ‘বড় হয়ে’ তিনি এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদাধিকারী হবেন। যুক্তির বলিহারী!
সত্য হলো, জাবেদ পাটোয়ারী শেখ মুজিব সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ-প্রকল্প দলের নেতৃত্বে ছিলেন। সেটি শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা কোনো গ্রন্থ নয়। এর নাম ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন, বাংলাদেশ’। জাবেদ পাটোয়ারী ও ২২/২৩ জনের এই দলটির কাজ ছিল পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবুর রহমান সম্বন্ধে যত গোয়েন্দা প্রতিবেদন ছিল, সেগুলো বাছাই করে সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশযোগ্য করে তোলা, যা বইটির মুখবন্ধেও লেখা আছে। শেখ মুজিবের ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়াচীন’ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস-সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যেমনটা আসলে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ও। এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে পরিকল্পিত গ্রন্থ-প্রকল্পটিও তাই। কিন্তু, এর বিনিময়ে যদি প্রত্যেকজনকে দুই কোটি (নগদ এক কোটি ও ফ্ল্যাট এক কোটি মূল্যমান ধরে) টাকা করে ‘পুরস্কার’ দেওয়া হয়, তা সন্দেহাতীতভাবেই তদন্তযোগ্য অপরাধ। এর বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত করুক। দোষীদের সাজা দিক। কিন্তু, তার সত্যতা যাচাইয়ের অভিপ্রায়ে মূল লেখকের লেখাকে খারিজ করে দেওয়া এক চরম অপরাধ, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি কুরুচিপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
৫.
মনে রাখা দরকার, এই গ্রন্থের যখন কাজ শুরু হয়, তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। শেখ হাসিনার লেখা ভূমিকা থেকে জানা যায় যে, ২০০৪ সালের চারটি খাতা হাতে পাওয়ার পর এগুলোকে গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি ধরে কাজ এগোনো হয়। আট বছর পর গ্রন্থটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা প্রকাশনী ইউনিভার্সটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে প্রকাশিত হয়। ইউপিএলের মতো প্রকাশনী সবকিছু নিশ্চিত না হয়ে এই গ্রন্থ প্রকাশ করেছে বলে যারা মনে করেন, তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন।
এই গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গ্রন্থটি ‘আওয়ামীকরণে’র দোষে দুষ্টু নয়। শেখ মুজিব যেমন কাল্ট হয়ে উঠেছিলেন, অ্যান্থনি মাসকেরহানসের মতে, ‘দ্য ডেমি গড’, এই গ্রন্থে হাসিনাশাহীর সেই জোরারোপিত ‘দেবতা’র খোঁজ মেলে না। বর্ণনায় একজন সাদামাটা ভূমিপুত্রের তরুণ রাজনীতিক হয়ে ওঠার গল্পটিই উঠে এসেছে। ১৯৪৭ সালের ভারতভাগের ফলে কলকাতা ও দার্জিলিং কী করে পূর্ববাংলার হাতছাড়া হয়ে গেল, সেই কাহিনি আছে এই বইয়ে। কলকাতা হাতছাড়া হওয়ার কাহিনি পাওয়া যায় আবুল মনসুর আহমেদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ নামক আত্মজৈবনিক গ্রন্থে। কিন্তু, দার্জিলিং হাতছাড়া হওয়ার বেদনাদায়ক কাহিনি শেখ মুজিব ছাড়া ওই সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী আর কারও গ্রন্থে এত নিটোলভাবে ফুটে ওঠেনি। এই ইতিহাস ১২৩ জনের যৌথ প্রচেষ্টা কেন, ইতিহাসের সাক্ষী না-হওয়া কারও পক্ষেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।
তাছাড়া, গল্প ও কল্পকাহিনি টানার ইচ্ছে থাকলে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত নয়, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের পুরো পরিভ্রমণকেই মলাটবন্দি করা সম্ভব ছিল। স্বাধীনতার পর ডিকটেশন দিয়ে আত্মজীবনীর সেই কাজটি শুরুও করেছিলেন তিনি।
এমনকি পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে যারা তার প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের প্রশংসিত ভূমিকার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন, যেমন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বা চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী। অথচ, ২০১২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে যা কিছু আওয়ামী বয়ানের বিরুদ্ধে যায়, তার সবকিছুই ফেলে দেওয়ার কথা ছিল কিংবা বয়ান প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংযোজন করার কথা ছিল। সেগুলো কি হয়েছে? বরং অসমাপ্ত রেখেই এটি প্রকাশিত হয়েছে। সেজন্যই এর নামকরণ যথার্থ হয়েছে।
গ্রন্থের ভূমিকা থেকেই স্পষ্ট যে, এর পাণ্ডুলিপি খুবই জরাজীর্ণ ছিল। জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপি পাঠোদ্ধারে প্রয়োজনীয় সম্পাদনা-পরিমার্জনা করা, টীকাভাষ্য লেখা একটি স্বীকৃত সর্বজনীন একাডেমিক পদ্ধতি, যা সম্পাদক বা সম্পাদকমণ্ডলী কর্তৃক সম্পন্ন হয়। ‘চর্যাপদ’ কিংবা ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ আবিষ্কারকরাও সেই পদ্ধতি অবলম্বন করেই পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করেছেন। এখন সেগুলোতে, বিশেষত টীকাভাষ্যে যদি ইতিহাসের কোনো বিচ্যুতি ঘটানো হয়ে থাকে, তাহলে সেই দায় সম্পাদকেরই বটে, লেখকের না।
আবার, বহুজনের আত্মজীবনী যৌথভাবে লেখা হয়েছে, যেখানে আত্মজীবনী যার তিনি ডিকটেশন দিয়েছেন, প্রসিদ্ধ কোনো লেখক নিজের রচনাশৈলী প্রয়োগ করে লিখেছেন (এমন উদাহরণ ভুরিভুরি)। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তা ঘটেনি। তবে, ঘটলেও এর মূল লেখক শেখ মুজিবুর রহমানই থাকতেন। কিন্তু, এই মুজিববিরোধী কাল এমন নির্বোধের মতো ১২৩ জনকে আবিষ্কার করল, যারা যৌথ আত্মজীবনীকার হওয়ারও স্বীকৃত গ্রহণযোগ্যতা পাবেন না।
৬.
লেখাটা শেষ করি শেখ মুজিবুর রহমানের একজন প্রবল প্রতিপক্ষ ও সমালোচনাকারীর সূত্র উল্লেখ করে। তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশের অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী, লেখক ও গবেষক বদরুদ্দীন উমর। লেখক ও গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান এ ব্যাপারে আমাদের যোগসূত্র তৈরি করে দিয়েছেন। ফেইসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘আমার ৩/৪ জন বন্ধু (তাঁদের মধ্যে দু-একজন স্বনামখ্যাত, নাম বললে সকলেই চিনবেন, আমি নাম বলতে চাই না) কিছুদিন আগে বেশ আয়োজন করে বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাৎকার নিতে বা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, উমর সাহেবের মুখ থেকে এমন একটা কথা বের করা যে মুজিবের নামে প্রকাশিত বইগুলো আসলে তাঁর লেখা নয়, অন্য কেউ লিখেছে। তাঁরা নিজেরা এমনটা বিশ্বাস করেন এবং বরাবর বলে/প্রচার করে আসছেন। তবে উমর সাহেবের মতো একজনের মুখ থেকে এমন একটা কথা বের করতে পারলে তো দারুণ হয়! কিন্তু তাঁদেরকে বেশ হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। আমি নিশ্চিত সূত্রে জানি, উমর সাহেব তাঁদের উৎসাহে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছেন। এমনিতে সকল বিষয়ে মুজিবের বিরোধী বা তাঁর ব্যাপারে তীব্র সমালোচনা মুখর হলেও, উমর সাহেব তাঁদের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছিলেন, কমবেশি সম্পাদনা থাকতে পারে (কোন বইয়ের না থাকে?), তবে বইগুলো মুজিবেরই লেখা, তিনি পড়ে বুঝেছেন। অন্য কারো পক্ষে এ কথাগুলো এভাবে লেখা সম্ভব নয়। আমি আমার যে-বন্ধুদের কথা বললাম, তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন সম্পর্কে আমার ধারণা, তিনি মুজিবের একটি বইও পড়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি কখনো। তাঁর ঈমান ওঁকে বলে দিয়েছে, ওগুলো মুজিবের লেখা নয়।’
শেখ মুজিবুর রহমান কোনো কল্পগল্প লিখেননি, তিনি লিখেছিলেন তার অভিজ্ঞতা। কিন্তু, এখনকার বাংলাদেশে তার বিরোধীদের চিন্তাকাঠামোটা ভিন্ন। তারা ঐক্যের কথা বলে মুজিবের সবকিছুকেই খারিজ করে দিতে চান। তাই তারা নিজেদের মতো করে কেচ্ছাকাহিনি নির্মাণ করছেন। নিজেরা না পারলে মিডিয়াকে ব্যবহার করছেন, আগের আমলেও যেমনটা করা হয়েছে। এবার সেই কোপ গিয়ে পড়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনীতে। কিন্তু, কোপটা জায়গা মতো পড়েনি, কুড়ালের হাতলটাই উল্টো চৌচির হয়ে গেছে!
শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে শতসহস্র সমালোচনা আছে, কিন্তু, যারা এ ধরনের ঘৃণা-প্রকল্প গ্রহণ করে তার বিরুদ্ধে লড়ছেন, তারা মুজিবের পাহাড়সম উচ্চতাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবেন তো?