Published : 25 Mar 2026, 09:15 PM
শুরুতেই বলে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩২ নম্বরের বাড়ি বলতে আমরা যে বাড়িটিকে চিনি, সেই বাড়ির নম্বর ৩২ নয়। ধানমন্ডির ওই সড়কের নম্বর ৩২ আর শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির নম্বর ৬৭৭। যদিও যুগের পর যুগ এই বাড়িটি ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ৩২ নম্বরের বাড়ি’ বলেই পরিচিত হয়েছে, যে পরম্পরা আজও চলমান।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে বর্বর অভিযান শুরু করেছিল, সেটার অন্যতম লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের এই বাড়ি। যার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় মেজর সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইয়ে। ১৯৭১ সালে মেজর সিদ্দিক সালিক ছিলেন অত্যন্ত প্রতাপশালী ব্যক্তি। তিনি ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রেস লিয়াজোঁ অফিসার; মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস অবরুদ্ধ বাংলাদেশের সংবাদপত্রের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। সিদ্দিক সালিক ১৯৭৬ সালে ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ নামে বইটি প্রকাশ করেছিলেন। বইটির মুখবন্ধে তিনি অভিযোগ করেছেন, সে সময় লেখালেখির জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে তিনি কিছু ডকুমেন্ট চেয়েছিলেন—যা তাকে দেওয়া হয়নি। যাই হোক, এরপরও ‘অপারেশন সার্চলাইট’সহ নানা বিষয়ে জানার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক গ্রন্থ, যাতে বিস্তারিতভাবে এসেছে ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাদের ৩২ নম্বর অভিযানের আদ্যোপান্ত।
‘অপারেশন সার্চলাইট’ দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ঢাকায় অভিযানে নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী আর সারা দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে অভিযান চালান মেজর জেনারেল খাদিম। আর পুরো অপারেশনের গতি-প্রকৃতি ঢাকায় বসে পর্যবেক্ষণ করেন লে. জেনারেল টিক্কা খান।
সিদ্দিক সালিকের বর্ণনা অনুযায়ী, অপারেশন সার্চলাইটের মূল অভিযান রাত একটায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় বেশ আগেই আক্রমণ শুরু হয়। যখন এই আক্রমণ শুরু হয়, তখন পাকিস্তান রেডিও তরঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ধরা পড়ে। কণ্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছিল এটা আগেই রেকর্ড করা, যে বার্তায় শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইয়ে সিদ্দিক সালিক এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: “the voice of Sheikh Mujibur Rehman came faintly through on a wavelength close to that of the official Pakistan Radio. In what must have been, and sounded like, a pre-recorded message, the Sheikh proclaimed East Pakistan to be the People’s Republic of Bangla Desh.” (Witness to Surrender, page: 75)। সিদ্দিক সালিক পরের দিকে বলেছেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন শেখ মুজিব। এর কিছুক্ষণ পরেই তিনি রকেট লাঞ্চারের দুটি ফায়ারের শব্দ শুনতে পান, যা মূলত ফার্মগেট এলাকায় ব্যারিকেড সরাতে সেনারা ব্যবহার করেছিল।
সিদ্দিক সালিকের বর্ণনা অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমানের ৩২ নম্বর বাড়িতে (মূলত ৬৭৭ নম্বর বাড়ি) সে রাতে অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন লে. কর্নেল জেড. এ. খান ও মেজর বেলাল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেনারা যখন মুজিবের বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল, তখন বাড়ির সামনে থেকে গুলি ছোড়া হয়। তবে এ প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। এরপর কয়েকজন সেনা বাড়ির দেওয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেখানে স্টেনগানের ফায়ার আর চিৎকারে মুজিবকে ডেকে সেনারা তাদের আসার বার্তা দেয়। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসেনি। এরপর পাকিস্তানি সেনারা শেখ মুজিবের শোয়ার ঘরে বাইরে থেকে তালা দেখতে পায়। সৈন্যরা গুলি করে তালা ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর মুজিবকে আটক করা হয় আর তার পরিবারের সদস্যদের নেওয়া হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। শেখ মুজিবুর রহমানকে আটকের অভিযান শেষ হওয়ার পর ৫৭ ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর জাফর তার ওয়ারলেসে বার্তা দেন: ‘বিগ বার্ড ইন কেজ, আদারস নট ইন দেয়ার নেস্ট... ওভার’ (BIG BIRD IN THE CAGE... OTHERS NOT IN THEIR NESTS… OVER). (Witness to Surrender, page: 75)। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয়। এরপর স্থানান্তর করা হয় ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউজে, যেখান থেকে কয়েক দিন পর অতি গোপনীয়তায় তাকে করাচিতে নেওয়া হয়।
এদিকে ২৫ মার্চের পর ১৯৭১ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ছিল নিষিদ্ধ এলাকা। বাড়িটি ছিল ফাঁকা। সামনে সব সময় থাকত পাকিস্তানি সেনা প্রহরা।
২০২৬ সালে এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন ইতিহাসের খেরো খাতায় অনেক পাতা যুক্ত হয়েছে। বুড়িগঙ্গায় বয়ে গেছে অনেক পানি। রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও পালাবদলের পরিক্রমায় বদলে গেছে রাজনৈতিক বয়ান। এমন বাস্তবতায় একান্ত ব্যক্তিগত কাজে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর গিয়েছিলাম ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে। কাজ শেষে যখন ফিরছিলাম, তখন কৌতূহলবশত রিকশা থেকে নেমেছিলাম ৩২ নম্বরের সামনে। বাড়িটি বিধ্বস্ত, অগ্নিদগ্ধ; বাড়ির সামনের বেদীমূল ধ্বংসস্তূপ। মুঠোফোনে কয়েকটি ছবি তুলেছিলাম। এ সময় পাহারারত বাংলাদেশ পুলিশের কয়েকজন সদস্যের জেরার মুখে পড়লাম। আমি কে, কেন ছবি তুলছি—নানা প্রশ্ন। ১৯৭১ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে কেউ গেলে পাকিস্তানি পুলিশ বা নিরাপত্তাকর্মীরা জিজ্ঞাসাবাদ করত কিনা তা জানা নেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে একটি আগুনে পোড়া, বিধ্বস্ত বাড়ির ছবি তুলতে পুলিশ কেন বাধা দিল, বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর।
পুলিশের তাগাদা বা খানিকটা তাড়া খেয়ে ৩২ নম্বর থেকে ফিরে এসেছিলাম। আসার সময় বিধ্বস্ত বাড়ির আধা ভাঙা কক্ষের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই ভাঙা বাড়ির পোড়া ইটগুলো কাউকে যেন অভিশাপ দিচ্ছে; যে ইটগুলো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে ও ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টসহ নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী।
কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের অন্যতম অবলম্বন ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তার প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে যাচ্ছে-তাই ব্যবহার করেছেন; লুটপাট ও ভোটাধিকার হরণের হাতিয়ার বানিয়েছেন। যে কারণে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ও নানা স্থাপনার প্রতি মানুষের ক্ষোভের যৌক্তিকতা তৈরি করা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষী ৩২ নম্বর বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া, ভাঙা, কিংবা বারবার ভাঙা কতটা পরিকল্পিত সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ধানমন্ডি থেকে ফেরার পথে প্রার্থনা ছিল—যারা এই বাড়িটি পুড়িয়েছেন, বারবার গুঁড়িয়েছেন, তারা তৃপ্ত হন; তাদের ক্ষোভ প্রশমিত হোক আর সবার মনে যাতে শান্তি বিরাজ করে। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালের কালরাত্রির স্মৃতি বহনকারী ঐতিহাসিক এই বাড়িটি নিয়ে অন্তরে কোনো আবেগ, অনুভূতি বা কষ্ট অনুভব করে থাকলে নিশ্চয়ই একদিন এই বাড়িটি ভিন্ন ব্যঞ্জনা নিয়ে বাঙালি জাতির সামনে হাজির হবে। হয়তো এই বাড়িটিই একদিন হয়ে উঠতে পারে পাপমোচনের স্থান।