Published : 27 Mar 2026, 02:26 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের সামনে একটি কুকুর মারা গেছে—খবরটা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রথম চোখে পড়ে। বেশিরভাগ সংবাদপত্রের কাছে এটা ‘নিউজ আইটেম’ হওয়ার যোগ্য বেলে বিবেচিত হয়নি। কারণ একই দিন অদক্ষ ড্রাইভারের কারণে দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে উঠতে উঠতে গিয়ে একটি বাস পদ্মায় পড়ে যায়। আর তাতে অন্তত ৩০জন মানুষের সলিল-সমাধি ঘটে। এতগুলো মানুষের নির্মম মৃত্যুর ঘটনার কাছে সামান্য এক কুকুরের মৃত্যু তেমন সামান্য ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত। কিন্তু যখন জানলাম, কুকুরটি ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট’ হয়ে মারা গেছে, তখন মাথায় অনেক প্রশ্ন ভিড় করল। কারণ বিদ্যুৎ সাধারণত মানুষকে মারে, কুকুরকে নয়—অন্তত আমাদের উন্নয়নের গল্পে তো এমনটাই লেখা থাকে।
কুকুরের মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের সামনে। বৃষ্টির পানিতে থৈ থৈ করছে চারপাশ। দৃশ্যটি রোমান্টিক হতে পারত, যদি না সেখানে উন্নয়নের ‘কারেন্ট’ প্রবাহিত হতো। একটি অবলা কুকুর সেই ল্যাম্পপোস্টের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ বুঝতে পারল, ইহজাগতিক সব মায়া ছিন্ন করে সে আসলে এক ‘উন্নত’ ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রবেশ করছে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে তার শরীর দিয়ে বয়ে গেল কয়েক হাজার ভোল্টের ‘উন্নয়নের জোয়ার’। কুকুরটি মারা গেল। আধা ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ বন্ধ হলো, এক ঘণ্টা পর লাশ সরল। তারপর আবার সব আলোকিত। আহ, কী চমৎকার শৃঙ্খলা! দূর থেকে দেখলে মনে হয়, জ্ঞানের আলোয় ভাসছে পুরো এলাকা। কাছে গেলে বোঝা যায়—সেই আলো কখনো কখনো শক দেয়!
কুকুরটির ভুল ছিল সে জেনজি (Gen-Z) প্রজন্মের কোনো ‘পেট ইনফ্লুয়েন্সার’ ছিল না। সে ছিল নেহাতই এক দেশি কুকুর, যার কোনো ফেসবুক-ইন্সটাগ্রাম-টুইটার-হ্যান্ডেল নেই। সে জানত না যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংস্কার মানে হলো—বাইরে থেকে চুনকাম করা আর ভেতরে বৈদ্যুতিক তারগুলোকে জালের মতো বিছিয়ে রাখা যাতে যে কেউ যেকোনো সময় ‘নির্বাণ’ লাভ করতে পারে।
হল সংস্কারের জন্য এক মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। আমরা ভেবেছিলাম সংস্কার মানে হয়তো ছাদ চুইয়ে পানি পড়া বন্ধ হবে, কিংবা তারের জঞ্জাল কমবে। কিন্তু না! সংস্কারের আসল মাহাত্ম্য বোঝা গেল সূর্যসেন হলের সামনে। নতুন ল্যাম্পপোস্ট লাগানো হয়েছে ক্যাম্পাসকে ‘আলোকিত’ করতে। এখন ক্যাম্পাস এতই আলোকিত যে, রাস্তার পানি পর্যন্ত বিদ্যুতে জ্বলজ্বল করছে। এই উন্নয়নের জোয়ারে শিক্ষার্থীরা শুধু ভাসছে না, রীতিমতো ‘শক’ খেয়ে কাঁপছে। প্রশাসন হয়তো ভাবছে, শিক্ষার্থীদের শরীরে একটু কারেন্ট থাকলে পড়ালেখায় গতি বাড়বে। জীবনের নিরাপত্তা? ওটা তো স্রেফ একটা শব্দ, যা ডিকশনারিতে ভালো লাগে, হলের ডাইনিংয়ে নয়।
প্রশাসনের কাছে যখন কুকুরের মৃত্যুর খবর গেল, তারা নিশ্চয়ই দুঃখ পেয়েছে। তবে দুঃখ প্রকাশের আগে একটা মিটিং দরকার। মিটিংয়ের আগে আরেকটা মিটিং। তারপর একটা কমিটি। তারপর সেই কমিটির রিপোর্ট। রিপোর্টে লেখা থাকবে—“ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এই ‘ভবিষ্যৎ’ নামের জায়গাটা খুব রহস্যময়। সেখানে সব সমস্যার সমাধান হয়। শুধু বর্তমানটা একটু কষ্টে থাকে।

এবার আসা যাক আমাদের বেড়াল-প্রেমী ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের প্রসঙ্গে। নির্বাচনের আগে তিনি বেড়াল কোলে নিয়ে ছবি তুলে ভাইরাল হয়েছিলেন। তখন মনে হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বুঝি এক টুকরো ‘ডিজনি ল্যান্ড’ হতে যাচ্ছে। তার ভক্তরা স্লোগান দিল—‘ক্ষমতার রাজনীতি নয়, মমতার রাজনীতি।’ কী অপূর্ব! এক সময় তিনি বেড়ালের জন্য ঘর উপহার দিয়ে আরও আলোচিত হলেন। কোলে-মাথায় বেড়াল নিয়ে ছবিতে পোজ দেওয়া হলো, বেড়াল-প্রেমীদের ভোটে ব্যালট বাক্স ভরে উঠল। তিনি হলেন ডাকসুর ভিপি! এরপর থেকে তার সেই বেড়াল-প্রেম আর ভাইরাল হয় না!
সাদিক কায়েম এখন ব্যস্ত। রাজনীতি করতে গেলে অনেক কাজ থাকে। মিটিং, প্রোগ্রাম, পোস্টার—সব মিলিয়ে সময় পাওয়া কঠিন। তাই হয়তো তিনি খেয়াল করেননি, তার ক্যাম্পাসে একটি কুকুর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে।
অবশ্য কুকুরটা যদি বেড়াল হতো, তাহলে হয়তো বিষয়টা একটু ভিন্ন হতো। কারণ বিড়ালের সঙ্গে তার একটা ইতিহাস আছে। কুকুরের সঙ্গে নেই। সাদিক কায়েমের সেই বেড়াল-প্রেম এখন যেন দূর তেপান্তরের হাটে নিলাম হয়ে গেছে। ক্ষমতার চেয়ারে বসলে মানুষের বোধহয় ‘প্রজাতিগত’ পছন্দ বদলে যায়। বেড়ালের জন্য ঘর আছে, কিন্তু কুকুরের জন্য আছে জ্যান্ত ইলেকট্রিক তার। সাদিক কায়েম কি জানতেন না যে বেড়ালের সাত জান থাকলেও কুকুরের একটাই জান? আজ যদি সেই পানির ওপর দিয়ে তার প্রিয় কোনো বেড়াল যেত, তবে কি ভিপি সাহেবের ‘মমতা’ জাগত?
আসলে আমাদের রাজনীতিটা অনেকটা বেড়ালের মতোই। সুযোগ বুঝে মিউ মিউ করে কোলে ওঠে আর কাজ ফুরিয়ে গেলে আঁচড় দিয়ে পালিয়ে যায়। নির্বাচনি প্রচারণার সেই ‘বেড়াল-বিলাস’ এখন হলের দেয়ালে দেয়ালে উপহাসের মতো ঝুলে আছে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে পশুপ্রেম মানুষের জীবনের চেয়েও দামি হয়ে উঠেছে। রাজধানীর শাহজাদপুরে এক নারী তিনতলার কার্নিশ থেকে বেড়াল বাঁচাতে গিয়ে নিজেই নিচে পড়ে মারা গেলেন। জেনজিদের কাছে কুকুর-বেড়াল মানে স্রেফ পশু নয়, তারা হলো ‘ফ্যামিলি মেম্বার’।
এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মৃত কুকুরটি যদি কোনো জেনজি শিক্ষার্থীর ‘বেস্টি’ হতো, তবে কি প্রশাসন এত সহজে পার পেত? হয়তো পরদিন নীলক্ষেত মোড়ে ‘জাস্টিস ফর ডগি’ হ্যাশট্যাগ নিয়ে মানববন্ধন হতো। কিন্তু মৃতটি ছিল ক্যাম্পাসের এক সাধারণ কুকুর। তার না ছিল কোনো নেমট্যাগ, না ছিল কোনো রাজনৈতিক পরিচয়। তাই তার মৃত্যু কেবল এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রাখার ‘অজুহাত’ হয়েই রইল।
নতুন প্রশাসন এসেছে। উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রক্টর—সবাই এখন শুভেচ্ছার ফুলে ডুবে আছেন। অভিনন্দনের জবাব দিতে দিতেই তাদের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফেইসবুকে পোস্ট হচ্ছে—‘শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসন গড়ার অঙ্গীকার।’ কিন্তু এই ‘শিক্ষার্থীবান্ধব’ শব্দটির সংজ্ঞা কী? হলের গেটে বিদ্যুতায়িত পানি জমিয়ে রাখা? নাকি এক মাস হল সংস্কারের নামে নাটক করে শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে বাধ্য করা? শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা এখন লটারি জেতার মতো। আপনি যদি ভাগ্যক্রমে বিদ্যুতের তার এড়িয়ে হলে ঢুকতে পারেন, তবে আপনি বিজয়ী। আর যদি পা হড়কে পানিতে পড়েন, তবে আপনি স্রেফ একটি ‘দুর্ঘটনা’।
প্রশাসন হয়তো ভাবছে, ‘আরে মরেছে তো একটা কুকুর! কোনো মানুষের বাচ্চা তো মরেনি।’ কিন্তু জনাব, আজ যেখানে কুকুর মরেছে, কাল সেখানে একজন ছাত্র মরবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে? নাকি তখন আপনারা বলবেন— ‘শিক্ষার্থীটি অসতর্ক ছিল, সে কেন পানিতে পা দিতে গেল?’
হল সংস্কারের জন্য এক মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার পর যখন শিক্ষার্থীরা ফিরে এল, তারা দেখল—দেয়ালের রং বদলেছে কিন্তু তাদের ভাগ্য বদলায়নি। গণরুমের সেই চেনা গন্ধ, ভাঙা জানালা আর এখন বোনাস হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘বৈদ্যুতিক ফাঁদ’।
সূর্যসেন হলের সামনে যে কুকুরটি মারা গেল, সেটি আসলে আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থারই এক প্রতীকী মৃত্যু। আমাদের প্রশাসন এখন ফুল আর বেড়াল-প্রেমের রাজনীতিতে এতই মশগুল যে, মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ প্রাণ (মানুষ হোক বা কুকুর) তাদের নজরে পড়ে না। তারা আকাশ ছোঁয়া উন্নয়নের গল্প বলে, কিন্তু মাটির নিচের ড্রেনেজ আর তারের সংস্কার করতে ভুলে যায়।
সাদিক কায়েমের সেই ‘মমতার রাজনীতি’ এখন শীতের সকালের কুয়াশার মতো অদৃশ্য। বেড়ালের ঘরগুলো হয়তো এখন ধুলোয় ঢাকা আর কুকুরের লাশগুলো ঢাকা পড়ছে ‘উন্নয়নের’ পোস্টারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত একটি নতুন কোর্স চালু করা—‘কিভাবে বৈদ্যুতিক শক এড়িয়ে হলে যাতায়াত করতে হয়।’ আর সাদিক কায়েম সাহেবকে অনুরোধ, আপনি যখন আবার বেড়াল কোলে নিয়ে পোজ দেবেন, তখন একবার সূর্যসেন হলের সামনের সেই কালভার্টটার দিকে তাকাবেন।
তারা এখনো শেখেনি, একটি কুকুরের মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের মৃত্যু না—এটা একটি ব্যর্থতার প্রতীক। এটা বলে দেয়, কোথাও একটা তার খোলা আছে, কোথাও একটা দায়িত্বে অবহেলা আছে। সূর্যসেন হলের সামনে যে পানিতে বিদ্যুৎ ছিল, সেটা শুধু একটা কারিগরি ত্রুটি না। এটা একটা মানসিক ত্রুটি। আমরা বাইরে আলো জ্বালাতে ব্যস্ত, ভেতরের অন্ধকারটা ভুলে যাচ্ছি। আমরা ল্যাম্পপোস্ট বসাচ্ছি, কিন্তু নিরাপত্তা বসাচ্ছি না। আমরা হল সংস্কার করছি, কিন্তু চিন্তার সংস্কার করছি না।
এই কুকুরটি তাই শুধু একটি কুকুর না। এটা আমাদের উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি। একটা আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের দেখতে পারি—অবশ্য যদি দেখতে চাই!