Published : 27 May 2026, 05:52 PM
বর্তমানে সারা বিশ্বের মুসলমানরা ঈদুল আজহার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হযরত ইসমাইল (আ.)-এর স্মরণে মুসলমানদের কোরবানি অনেকটা বাইবেলে বর্ণিত আইজ্যাকের ‘আকেদাহ’ কাহিনির মতো। দুই ঐতিহ্যেই মূল গল্পটি প্রায় একই—একজন পিতা, আদরের পুত্র, একটি ছুরি, পাহাড় এবং ঈশ্বরের নির্দেশ।
আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে তার প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ আসে। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে সে কোরবানি থামিয়ে দেওয়া হয়। এ থেকে সহজেই বুঝতে পারা যায়, কোরবানির আসল শিক্ষা শুধু ভোগ বা ত্যাগ স্বীকার নয়, আরও গভীর কিছু।
কোরআনে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর পরীক্ষার বর্ণনা যেমন আছে, তোরাতেও একইভাবে আব্রাহাম ও আইজ্যাকের ঘটনাটি উল্লেখ রয়েছে। নামের ভিন্নতা থাকলেও শেষ দৃশ্যটি একই—একটি ভেড়া কোরবানি হয়, ছুরি থেমে যায়, ফেরেশতার আগমন ঘটে আর মানবশিশু রক্ষা পায়। উভয় ঐতিহ্যের শিক্ষাও কাছাকাছি—ঈশ্বর রক্ত চান না, তিনি মানুষের নৈতিক পরিশুদ্ধি চান।
এখানেই আব্রাহামীয় ঐতিহ্যের গভীর ধর্মতাত্ত্বিক বার্তা নিহিত রয়েছে, যা ইসলাম ও ইহুদি—উভয় ধর্মই ধারণ করে। আল্লাহর জন্য আমরা কী কোরবানি দিতে পারি, তা দিয়ে ঈমানের গভীরতা মাপা যায় না। বরং ঈমানের প্রকৃত গভীরতা বোঝা যায় আমরা কী কোরবানি করতে চাই না, তার মাধ্যমে। আর আজকের পৃথিবীতে এ শিক্ষাটি সবচেয়ে জরুরি।
আমরা এখন ঘৃণার এক অস্থির সময়ে বাস করছি। ইহুদি-বিদ্বেষ যেমন বাড়ছে, তেমনি পশ্চিমা বহু সমাজে ইসলাম-বিদ্বেষও বাড়ছে। অনেক সময় এ দুটিকে আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু বাস্তবে এ দুই ধরনের ঘৃণার গোড়া একই—ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষকে ঘৃণা করা। যে সমাজ কোনো একটি ঘৃণার চাষ করে, সেখানে অন্য ঘৃণাও ধীরে ধীরে জন্ম নেয়। যে নেতা একটির বিরুদ্ধে নীরব থাকেন, তিনি অন্যটির পথও খুলে দেন।
ফলে আজ ধর্মীয় নেতৃত্বের নৈতিক সাহস অত্যন্ত জরুরি। ইমামদের মসজিদে দাঁড়িয়ে ইহুদি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। রাব্বিদের সিনাগগে ইসলাম-বিদ্বেষের নিন্দা জানাতে হবে। শুধু নিজের সম্প্রদায়কে রক্ষা করা যথেষ্ট নয়; অন্যের নিরাপত্তা ও মর্যাদার পক্ষেও এখন দাঁড়াতে হবে। এটিই আজকের সময়ের শিক্ষা।
আমি দুই দশকের বেশি সময় ধরে মুসলিম-ইহুদি সম্পর্ক উন্নয়নের কাজে যুক্ত। উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতৃত্বের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। আমি প্রতিটি জায়গায় একই কথা বলি—ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা যদি ইহুদি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করে, তবে তা ইহুদি-বিদ্বেষ। একইভাবে ইসলামকে সন্ত্রাসবাদ কিংবা কিছু ভণ্ড ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একাকার করা ইসলাম-বিদ্বেষ। আমি দুটিই বলি, কারণ দুটিই সত্য।
এমন নৈতিক সাহসের বহু উদাহরণ আছে। ড. মোহাম্মদ বিন আব্দুল করিম আল-ইসার নেতৃত্বে ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ’ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা ইসলামবিরোধী এবং তা পাপ। তারা গবেষণা করে তুলে ধরেছে, ইহুদি-বিদ্বেষ ইসলামের শিক্ষা ও মূল্যবোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইহুদিদের মধ্যেও একই ধরনের সাহসিকতার উদাহরণ রয়েছে। নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে উপাসনালয়ে হামলার পর বহু ইহুদি ধর্মগুরু মসজিদে গিয়ে মুসলমানদের পাশে দাঁড়ান। তারা মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ঘৃণার রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
আজকের পৃথিবীতে ঘৃণার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই খোদ ঈমানি চেতনার প্রকাশ। একজন ইমাম যখন ইহুদি-বিদ্বেষী হামলার পর কোনো ইহুদি ধর্মগুরুর পাশে দাঁড়ান, সেটি ঈমানের অংশ। আবার একজন ইহুদি ধর্মগুরু যখন মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন, সেটিও ঈমানের অন্যতম দিক।
এসব ঘটনার কোনোটির সঙ্গেই হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর পাহাড়ের কোরবানির ঘটনা সরাসরি জড়িত নয়। কিন্তু প্রতিটিতে কোরবানির সেই মূল বার্তা আছে—ঈশ্বর মানুষকে যা রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়েছেন, তাকে ধ্বংস করতে অস্বীকার করা; ভোগ নয়, ত্যাগের মহিমা প্রচার করা।
তাই এবারের ঈদুল আজহার আসল প্রশ্ন এটি নয় যে, আমরা নিজেদের বিশ্বাসের জন্য কী ত্যাগ করতে প্রস্তুত। বরং প্রশ্ন হলো—এ বিশ্বাসের নামে আমরা একে অপরের প্রতি ঘৃণা, অপমান ও অবিচার থেকে বিরত থাকতে প্রস্তুত কি না।
আমরা কি সিনাগগের ভেতরে ফিসফিসিয়ে বলা মুসলমানবিদ্বেষী কথাগুলো প্রত্যাখ্যান করতে পারি? আমরা কি সেসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি, যা মাঝে মাঝে এক বিলিয়ন মুসলমানকে ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত করে? দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ক্ষেত্রে, যখন কেউ দেখছে না, তখনও কি আমরা ঘৃণা, অপমান ও অবমাননার ভাষা ও আচরণ থেকে বিরত থাকতে প্রস্তুত? ঈদুল আজহার শিক্ষা শুধু কোরবানিতে নয়, মানুষের প্রতি অন্যায় ও বিদ্বেষ পরিহার করার মধ্যেও নিহিত।
কোরবানির দিনে ঈশ্বর যেমন ছুরি চালানো বন্ধ করেন, আমাদেরও তেমনি অন্যকে আঘাত করার মানসিকতা বাদ দিতে হবে।
লেখাটি আরব নিউজ থেকে অনূদিত; এর লেখক রাব্বি মার্ক স্নাইয়ার একজন খ্যাতিমান মার্কিন-ইহুদি ধর্মগুরু ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত আন্তঃধর্মীয় সংলাপকর্মী। তিনি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলার কাজে যুক্ত। তিনি ফাউন্ডেশন ফর এথনিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং নামে সম্প্রীতিমূলক একটি সংগঠনের সভাপতি।