Published : 20 Sep 2025, 06:18 PM
শাকবাড়িয়া নদীর পাড় দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছিল গম্ভীর সুরে, যেন নদী নিজেই হিসাব কষছে—`এবার কাদের পালা? ইলিয়াস বাহিনী নাকি দুলাভাই বাহিনী?’ গাঙচিলগুলোও সেদিন যেন হাসাহাসি করতে ভুলে গিয়েছিল। ডানার ঝাপটানি থেমে গিয়েছিল, তারা গাছের ডালে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসেছিল—মনে হচ্ছিল, এরাও বনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ঠিক তখনই বাবার হাহাকার ভরা সংলাপ কানে এসে বাজল—‘অনেক কষ্টে ধারদেনা করে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করে ছেলেকে ফিরিয়েছি।’
বাবা যেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলা নাটকের সংলাপ দিচ্ছেন। তবে নাটকটা কোনো প্রোমোশনাল শো নয়, একেবারে হাড়হিম করা বাস্তব। এ নাটকের দর্শক আমরা সবাই, কিন্তু টিকিট কিনতে কেউ রাজি নয়। কারণ এখানে নায়ক বন্দী, ভিলেন বন্দুক হাতে, আর দর্শকরা দুঃখে গিলতে থাকে দীর্ঘশ্বাস।
তিন দিন ডাকাতদের হাতে ছিল বাবার ছেলে। খাবার বলতে শুকনো ভাত, গায়ে পচা মাছের গন্ধ; ঘুম বলতে নৌকার তলদেশে আধমরা ঝিমুনি। এই তিন দিনে বাবার জীবনে সবচেয়ে বড় খেলা ছিল—‘ধারদেনা ম্যারাথন’। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি, খালাতো ভাইয়ের উঠোন থেকে মোড়ের চায়ের দোকান—সবখানেই একই সংলাপ: ‘ঋণ দিলে গ্যারান্টি সহকারে স্বর্গে জায়গা পাবা, না দিলে দুলাভাই বাহিনী সরাসরি টেনে নেবে।’
কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিল ছেলেটি। কিন্তু আজকাল কাঁকড়ার চেয়ে বড় কাঁকড়া হলো ডাকাত। কাঁকড়াগুলো বাজারে বিক্রি হয়, সংসার চালায়, কিন্তু ডাকাতরা শুষে খায় ঘাম, চোখের জল আর পকেটের শেষ মুদ্রা।
এবার আসি নামের খেলায়। পৃথিবীর ইতিহাসে যত বাহিনী দাপট দেখিয়েছে—লস্কর বাহিনী, হানাদার বাহিনী, গজনি বাহিনী, চেঙ্গিস খানের তাণ্ডবী সেনাদল, হালাকু খানের আগুনঝরা সৈন্যবাহিনী—সবকিছুই শুনলে মনে হয় রক্ত, আগুন আর ভয়ের কাহিনি। ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম মানেই কড়া শীতল বাতাস, মানেই মৃত্যুর শিস। কিন্তু এই সব রক্তমাখা নামের ভিড়ের মাঝে যদি হঠাৎ শোনা যায়—’দুলাভাই বাহিনী’—তখনই হাসি চেপে রাখা যায় না। মনে হয় না কোনো ডাকাত দলের নাম, বরং শ্বশুরবাড়ির পিকনিক কমিটির সভাপতি। যেন দুলাভাই মাইক হাতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছে—‘পরের খেলাটি হবে বালিশ মারামারি, সবাই প্রস্তুত! আর বিজয়ীদের জন্য পুরস্কার—মুক্তিপণ ছাড়াই বাড়ি ফেরার সুযোগ।’
এমন নাম শুনে যে কেউ অট্টহাসিতে গড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এই হাসির আড়ালেই আছে আতঙ্ক, যেখানে দুলাভাই মানেই আর আদরের আত্মীয় নয়—বরং হাতে এসএমজি, মুখে সিগারেট, আর চোখে সেই নির্দয় দৃষ্টি, যা ইতিহাসের সব রক্তাক্ত বাহিনীকেও হার মানাতে চায়।
ভাবুন তো, কোনোদিন যদি সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনাম হয়—‘আজ রাতের আতঙ্ক: দুলাভাই বাহিনী বনাম ভায়রা বাহিনীর দুর্ধর্ষ সংঘর্ষ!’ পাশের পাতায় বিজ্ঞাপন—‘বউভাত প্যাকেজ বাই দুলাভাই বাহিনী—প্রতিজন মাত্র ৯৯৯ টাকা।’ আরেক কোণে রেসিপি—‘কীভাবে পাঁচ মিনিটে দুলাভাই বাহিনীর জন্য বিরিয়ানি রান্না করবেন।’
কিন্তু হাসির আড়ালেই ভয় লুকিয়ে থাকে। সাধারণ জীবনে দুলাভাই মানে খাই-খাই মুখে বিয়েবাড়ির কাবাব টেনে নেওয়া, অথবা আলগা পাঞ্জাবি পরে টিভির রিমোট দখল করে বসে থাকা এক প্রাণখোলা আত্মীয়। কিন্তু সুন্দরবনের দুলাভাই? এসএমজি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা, চোখ টকটকে লাল, সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে গলা কেটে বলা—‘মুক্তিপণ কত হলো রে?’
জেলেদের জন্য এ এক অবিরাম দুর্ভোগ। তারা ভেবেছিল কাঁকড়া ধরে সংসার চলবে। কিন্তু দুলাভাই বাহিনী নৌকায় উঠলেই যেন ফ্রি ফিটনেস ট্রেনার হাজির হয়। ‘আরো জোরে বাই, না হলে দাঁড় দিয়ে পিঠ চড়াব’—এই হুকুম শোনায় তারা। দেখে মনে হয়, সুন্দরবনে নাকি খোলা হয়েছে ‘দুলাভাই জিম অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব।’
এমনকি কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলছে, যদি এই বাহিনী রাজনৈতিক দল বানায় তবে নাম হবে ‘দুলাভাই পার্টি’। আর যদি ব্যান্ড কনসার্ট করে তবে পোস্টারে লেখা থাকবে—‘লাইভ: দুলাভাই অ্যান্ড দ্য ক্র্যাব ক্যাচারস’।
কিন্তু বাস্তব হলো—নামের হাস্যকরতা যতই থাকুক, ভেতরে আছে ভয়ের থাবা। একসময় ছিল ‘ইলিয়াস বাহিনী’—যার নাম শুনলেই কাঁপত বঙ্গোপসাগর থেকে সুন্দরবন। ইলিয়াস ধরা না পড়লে মনে হতো, সে-ই সুপারম্যান। কিন্তু ইলিয়াস আত্মসমর্পণ করলেন, এরপর মারা গেলেন। মনে হলো, দস্যুতার অধ্যায় শেষ। কিন্তু এ দেশে ডাকাতিরও নাকি উত্তরাধিকার সূত্র আছে। তাই ইলিয়াসের বোনের স্বামী ‘বিহ্বল দল’ গড়ে তুললে বিস্ময়ের কিছু নেই। নামটা বদলে গ্রামবাসী দিল—‘দুলাভাই বাহিনী’। আজ না হয় কাল, হয়তো আসবে নতুন নাম—‘শ্যালক ফোর্স’ কিংবা ‘শ্বশুর সেনা’।
২০১৮ সালের নভেম্বরে সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা দিয়েছিল—৩২টি বাহিনী একসঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছে, সুন্দরবন দস্যুমুক্ত। টেলিভিশনের দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল, মেলায় লটারি জেতা লোকজন ফুল-মালা পরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেগুলো আসলে ছিল ‘দস্যু-ফেরত মেলা’। আত্মসমর্পণ করে সময় পার করল, আবার দস্যুতায় ফিরল। খবর বলছে অন্তত ১৪টি দল সক্রিয়, আর আত্মসমর্পণকারীদের ১১ জন আবার পুরনো পেশায়। যেন সরকারি ট্রেনিং নিয়ে তারা ‘রিফ্রেশার কোর্স’ শেষ করল।
এই চক্রের পেছনে আছে তথাকথিত ‘কোম্পানি মহাজনরা’। বাইরে তারা সাধারণ মাছ ব্যবসায়ী, ভেতরে তারা রাজা-বাদশাহ। তাদের হাতেই দস্যুদের তহবিল, মুক্তিপণ, অস্ত্রের যোগান, এমনকি বিষ দিয়ে মাছ ধরার নির্দেশ। ফলে নদীর জল হয়ে ওঠে 'বিষমিশ্রিত হিলশাস্যুপ'। সুন্দরবন ধ্বংস হয়, কিন্তু মহাজনের পকেট ভরে ওঠে।
জেলেরা তিনদিন ডাকাতের হাতে বন্দী থেকে যদি কোনো সার্টিফিকেট পেত, তবে হয়তো তাতে লেখা থাকত—‘ডাকাতি একাডেমি কর্তৃক প্রদত্ত: অভিজ্ঞ ডাকাতদের তত্ত্বাবধানে ৭২ ঘণ্টার নৌকা বাই কোর্স সম্পন্ন’।
মুক্তিপণ এখন সুন্দরবনের নতুন মুদ্রা—‘বনের ডলার’। কারো পরিবারে মুক্তিপণ দেওয়ার ক্ষমতা বেশি হলে তারা ভিআইপি বন্দী। আর টাকার জোগাড় না হলে? তারা হারিয়ে যায় নিখোঁজ তালিকায়।
তাহলে প্রশ্ন জাগে—যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, যে ছাত্র-যুবা বুকের রক্ত দিয়ে সরকারকে সরিয়েছিল, সেই ত্যাগ কোথায় গেল? পুরনো সব খারাপ কিছু যদি নতুন করে ফিরে আসে—সেই দস্যুতা, সেই বাহিনী, সেই চোরাচালান, সেই দূষণ—তাহলে এই নতুন সরকার আসলে কী করল? এ দেশের মানুষ কি শুধু নাটক পাল্টানোর জন্য সরকার সরিয়েছিল? নাকি সুন্দরবনকে আবার দুলাভাই বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য?
এমন এক অদ্ভুত অবস্থা, যেখানে কান্নার ভেতর থেকেও হাসি বের হয়ে আসে। দুলাভাই বাহিনী শুনলে প্রথমে হাসি পায়—মনে হয় পারিবারিক মিলনমেলার নিমন্ত্রণপত্র। কিন্তু আসল রূপ জানলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সরকার যখন দস্যুমুক্তির সার্টিফিকেট ঝুলিয়ে দেয়, আমরা হাততালি দিই। আবার যখন শুনি দস্যুরা ফিরেছে, তখন ভাবি—‘তাহলে এতদিন আমরা কাকে মুক্ত করলাম? সুন্দরবন, না সরকার?’
শেষমেশ সুন্দরবনের দস্যুতার গল্প হয়ে ওঠে শোক ও ব্যঙ্গের মিশেল। নাম শুনে হেসে লুটোপুটি হওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবে তাদের রক্তচোষা থাবায় টিকে থাকা কঠিন। বাবা ছেলেকে ফেরাতে ধারদেনা করে মুক্তিপণ দিলেন, আর আমরা সবাই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দেখলাম—কাঁকড়ার চেয়ে ভয়ঙ্কর সেই দস্যুদের ছায়া।
সত্যিটা হলো—সুন্দরবন আজ দুলাভাই বাহিনীর নামের মতোই এক কৌতুকময় ট্র্যাজেডি, যেখানে হাসতে গিয়ে চোখ ভিজে যায়। মানুষ বন্দী হয়, নদী বিষে ভরে ওঠে, আর মুক্তিপণ হয়ে দাঁড়ায় জাতীয় অর্থনীতির ‘নতুন সঞ্চয়পত্র’। যদি কাল কোনো মন্ত্রী দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে ঘোষণা দেন—‘মুক্তিপণকে এখন থেকে রেমিটেন্স হিসেবে গণ্য করা হবে’—তবু কেউ অবাক হবে না। তখন আমাদের নতুন জাতীয় স্লোগানও ঠিক হয়ে যাবে: ‘সুন্দরবন বাঁচাও, দুলাভাই হঠাও!’
কিন্তু এ স্লোগানের আড়ালে লুকিয়ে থাকে করুণ এক সত্য। সরকারের প্রতিটি সাফল্য ঘোষণাই যখন মানুষের জীবনে নতুন দুর্ভোগের জন্ম দেয়, তখন ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ কথাটা শোনায় এক টাকার লজেন্সের মতো—মিষ্টি কম, আঠা বেশি। মানুষ ধীরে ধীরে বুঝে গেছে, সুন্দরবনের কাঁকড়া কিংবা বাঘ কোনোদিনও আসল ভয় ছিল না। সবচেয়ে বড় ভয় হলো সেই মানবিক হিংস্রতা, যা নতুন নামে, নতুন বাহিনীতে, নতুন শ্লোগানে বারবার ফিরে আসে।
এই দস্যুতা শুধু টাকার থলি খালি করে না; ছিঁড়ে নিয়ে যায় জীবনের প্রতি বিশ্বাস, নিরাপত্তার প্রতি আস্থা আর ভবিষ্যতের প্রতি ভরসা। সুন্দরবন বাঁচুক বা না বাঁচুক, মানুষের মনের ভেতরের সেই আস্থা যখন বারবার জিম্মি হয়, তখন দেশটা আর সত্যিকার অর্থে মুক্ত থাকে না—শুধু এক বাহিনী থেকে আরেক বাহিনীর কাছে ‘হস্তান্তরিত’ হতে থাকে।