Published : 19 Mar 2026, 08:50 AM
রোজা শেষ হতে চলেছে, জমজমাট ঈদ বাজারের খবর আসছে সংবাদমাধ্যমে। দোকান মালিক সমিতি আশা করছে, এবার ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দেশের ২৫ লাখ দোকানে কমপক্ষে দুই লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। অবশ্য এই বাণিজ্যের অর্ধেকই হবে পোশাকের দোকানগুলোতে।
পোশাকের দোকানই শুধু নয়, ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যটন স্থানগুলোতে মানুষের ঢল নামে। চলাচল বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খাতের ব্যবসা চাঙ্গা হবে; পরিবার নিয়ে দুবেলা ভালো খাবারের আশায় মাছ-মাংসের দোকানে ভিড় বাড়বে, মশলার দোকানে বেচাকেনা বাড়বে। ঈদকে কেন্দ্র করে জমে উঠবে মেলা। শুধু সংস্কৃতির দিক থেকেই নয়, উৎসব এলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও যেন জোয়ার আসে!
উৎসবের অর্থনীতি: কক্সবাজারে কী হয়?
উৎসবের অর্থনীতি বোঝার জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বেশ চমৎকার একটি উদাহরণ হতে পারে। গোটা রোজা মাসজুড়ে ওখানে ব্যবসায় ভাটা পড়ে, কিন্তু ঈদ আসার সঙ্গে সঙ্গে রোজার ধীরগতি কাটিয়ে এই পর্যটন স্থানটি যেন নতুন করে জীবন ফিরে পায়। দুই বছর আগের তথ্যের দিকে তাকালেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে।
২০২৪ সালে ঈদের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলগুলো প্রায় ৭০০ কোটি টাকা আয় করেছিল, তাও শুধু দেশীয় পর্যটকদের ওপর ভর করে। প্রায় প্রতিবছরই ঈদের আগে এসব হোটেলের ৯০ শতাংশেরও বেশি কক্ষ ভাড়া হয়ে যায়। ঈদের দিন থেকে প্রতিদিন অন্তত এক লাখেরও বেশি পর্যটক শুধু কক্সবাজারে ভিড় করে।
টেইলর সুইফট ও উৎসবের অর্থনীতি
অবশ্য উৎসবকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির চাকা সচল হওয়ার এই রীতি সারা দুনিয়াজুড়েই দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পপ তারকা টেইলর সুইফটের কথাই ধরা যাক! ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনি সংগীত নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। ১৭ মার্চ ২০২৩ থেকে শুরু করে ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত চলা এই ‘মিউজিক ট্যুর’ এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফার ট্যুরে পরিণত হয়েছে, যেখানে কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন ডলার হাতবদল হয়েছে।
প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফোর্বস-এর মতে, শুধুমাত্র লস অ্যাঞ্জেলেসের ছয়টি শো থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে ৩২০ মিলিয়ন ডলার; ওই শহরের বাজারে ন্যূনতম তিন হাজার ৩০০টি নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সুইফটের সেই ট্যুরের নানা খুঁটিনাটি দিক নিয়ে সিএনএন একটি বিশেষ প্রতিবেদনে লিখেছিল, “যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিতে টেইলরের মিউজিক ট্যুরের অবদান ছিল প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার।” দ্য ইকোনমিক টাইমসের হিসেবে, প্রতিটি শো থেকে টেইলর সুইফট আয় করেছেন ১৩.৬ মিলিয়ন ডলার। সঙ্গে শো-কে কেন্দ্র করে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি, হোটেল বুকিং, পরিবহন খাতে ব্যস্ততা ও খাবারের দোকানের তুমুল ব্যবসা তো আছেই।
বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ
টেইলর সুইফটের মতো না হলেও, উৎসব এলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাও অদম্য বেগে ঘুরতে শুরু করে। তা ছাড়া বাংলাদেশ তো এমনিতেই ‘বারো মাসে তেরো পার্বণের’ দেশ। একদিকে যেমন উৎসব লেগে থাকে, আবার সেই উৎসবকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিও সচল হতে শুরু করে। এ যেন নাচুনে বুড়িকে ঢোলের বাড়ি শোনানোর মতো!
বাংলাদেশের বড় উৎসবগুলোর মধ্যে ঈদ, দুর্গাপূজা, বড়দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ এবং চৈত্র সংক্রান্তি উল্লেখযোগ্য। এর সঙ্গে অসংখ্য স্থানীয় উৎসবেরও দেশ বাংলাদেশ। লালন উৎসব, বিজয় মেলা, শহর-উপশহর ও গ্রামে নানা ধরনের মেলা বছরজুড়ে লেগেই থাকে। মাজারের ওরসকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী মেলা চলে এই দেশে। সেই মেলাকে কেন্দ্র করে আশেপাশের অনেকগুলো গ্রামের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যায়। এসব উৎসব ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক বৈচিত্র্যকেও সমৃদ্ধ করে।
এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের মাঝমাঝি সময়টার দিকেই তাকাই না কেন? এই তিন সপ্তাহে দেশে বড় চারটি উৎসব হতে চলেছে—ঈদুল ফিতর, স্বাধীনতা দিবস, চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ। এর বাইরে বাংলাদেশে রোজাও কিন্তু এক ধরনের উৎসবই। রোজাকে কেন্দ্র করে বাজারের প্রায় সব সূচক বেড়ে যায়, ধর্মপ্রাণ মানুষের নানামুখী প্রস্তুতি থাকে।
উৎসবের অর্থনীতি কত বড়?
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির ২০২৪ সালের গবেষণা বলছে, শুধু রমজান মাস ও ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ১.৭ ট্রিলিয়ন টাকার লেনদেন হয়। শুধু বড় বড় বিপণিবিতান নয়, বেশিরভাগ লেনদেন হয় নামধামহীন খুচরা দোকানগুলোতে। খাদ্য, পোশাক, ভ্রমণ এবং অন্যান্য পণ্য ও সেবা কিনতে বাড়তি ব্যয়ের মাধ্যমে এই অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে জলের মতো টাকা (রেমিট্যান্স) ঢুকতে থাকে।
এই মার্চ মাসের প্রথম ১৬ দিনে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা ঢুকেছে ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের এই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। অবশ্য প্রতি বছরই এই টাকার পরিমাণ বাড়ছে। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ প্রবাহের হিসেব; অনানুষ্ঠানিক উৎস মিলিয়ে প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
পহেলা বৈশাখ ঘিরে মোট আর্থিক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন রিপোর্ট বলছে, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখী বোনাস হিসেবে পান ৩১৭ কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশের ফ্যাশন শিল্পের বার্ষিক বিক্রির প্রায় অর্ধেক হয় ঈদুল ফিতরের সময়, আর প্রায় ২৫ শতাংশ বিক্রি হয় পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে।
‘জেগেছে বাঙালির ঘরে ঘরে, এ কী মাতন দোলা’
শুধু বড় পরিসংখ্যানই নয়, উৎসবকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র বিক্রেতা, তাদের কারিগর এবং মৌসুমী শ্রমিকদের জন্যও বিরাট সুযোগ তৈরি হয়; যেটি অনানুষ্ঠানিক খাতকে (ইনফরমাল সেক্টর) শক্তিশালী করে। যেকোনো অর্থনীতির দ্রুত ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকল্প নেই।
গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখ মানেই বৈশাখী মেলার রঙিন আয়োজন। এসব মেলা শুধু উৎসব নয়, বরং হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। এখানে হাতে তৈরি নানা ধরনের কারুপণ্যের সমাহার বসে। অনেক পরিবার সারা বছরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র—যেমন বাসনপত্র ও আসবাব—এসব মেলা থেকে সংগ্রহ করার জন্য অপেক্ষা করে।
শিশুদের জন্য মেলা প্রাঙ্গণ যেন ভিন্ন এক আনন্দের জগৎ হয়ে ওঠে। মাটির পুতুল, বাঁশের বাঁশি, রঙিন বেলুন, ঢোল, পুঁতির মালা, নকল গয়না এবং কাঁচের চুড়িতে ভরে থাকে চারপাশ। মিষ্টি ও নাস্তার দোকান বসে, আর কারিগররা তাদের বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্য নিয়ে হাজির হন। গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা এ সময় নতুন হিসাবের বই খোলার ঐতিহ্য ‘হালখাতা’ পালন করেন। হালখাতা শুধু পুরনো দেনা-পাওনা মেটানোর দিন নয়, বরং নতুন বছরে গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনেরও প্রতীকী উৎসব।
বাংলাদেশের হাজার হাজার কারিগর ও শিল্পীর জন্য বৈশাখী মেলা একটি বড় সুযোগ। অনেক ব্যবসায়ী সারা বছর মন্দার ভেতর দিয়ে যান, কিন্তু উৎসবের সময় সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। শহরের দর্জিদের জন্য ঈদ ও পহেলা বৈশাখের আগের ব্যস্ততা প্রায় কিংবদন্তির মতো।
উৎসব ঘনিয়ে এলে বহু মানুষ নিজেদের শিকড়ের কাছে ফিরে যায়। এই যাতায়াত পরিবহন খাতে বড় প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতও চাঙ্গা হয়। শহরের অনেকেই উৎসবের ছুটি কোনো নিরিবিলি পর্যটন এলাকায় গিয়ে নির্বিঘ্নে কাটাতে ভালোবাসেন বলে রিসোর্টগুলোতে উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়।
শুধু বাংলাদেশে নয়, উৎসবের এই প্রবণতা পৃথিবীর নানা দেশে লক্ষ্য করা যায়। সারা বছর ধরে ঠান্ডায় নিভু নিভু জ্বলতে থাকা রেস্টুরেন্ট গ্রীষ্মকালে আলোকজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সারা বছরের ব্যবসার ক্ষতি বড়দিনের মাসব্যাপী উৎসবে তুলে নেয়।
উৎসব যেন রাজনীতির গ্যাঁড়াকল না পড়ে
উৎসবে রাজনীতিকে মেশালে সেটি আর সর্বজনীন থাকে না। কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের মতাদর্শ প্রতিফলিত হতে শুরু করলে অন্য মতাদর্শের মানুষেরা উৎসব বর্জন করে। ভীতি সঞ্চার করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা মেলা যখন হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়—তখন এর প্রভাব যে কতশত সাধারণ পরিবারে পড়ে, সেটি চিন্তা করা হয় না।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে যদি রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা না যায়, তবে এর প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে। উৎসবে রাজনীতি মেশানোর আরেকটি ক্ষতির দিক হলো, তাতে জনসাধারণের অংশগ্রহণ কমে যায়; এর ফলে বেচাকেনাও কমে—যেমন আমরা গত বছরের একুশে বইমেলায় দেখেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ধর্মের অজুহাতে অসংখ্য উৎসব বন্ধ করে দেওয়ার নজির স্থাপন করা হয়েছে। এতে স্থানীয় মানুষের রুটি-রুজি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপকার হয়নি।
বাংলাদেশে উৎসব শুধু আনন্দ নয়—এটি অর্থনীতির জন্য রক্ত সঞ্চালনের মতো। একটি দেশকে সচল রাখতে এই প্রবাহ অপরিহার্য। ফলে উৎসবগুলোকে নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। সেটি রাখতে পারলে এর সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে। শুধু শহরের ব্যবসায়ী নয়, বরং গ্রামের কারিগর, ফেরিওয়ালা, অস্থায়ী দোকানদার এবং শিল্পীদের কাছেও পৌঁছাবে, যারা তাদের সঙ্গীত ও নৃত্যের মাধ্যমে মেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। সরকারের উচিত উৎসবের অর্থনীতির গুরুত্ব অনুধাবন করে নানাভাবে উজ্জীবিত করা। সরকারি প্রণোদনা এক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা রাখবে।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসব শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়; এটি তাদের বেঁচে থাকারও উপায়।