Published : 29 May 2026, 11:50 PM
সামান্য কারণে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, বিশেষ করে টেঁটাযুদ্ধের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। অথচ এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া দেশের অনেক আলোকিত ও আলোচিত মানুষের জন্মস্থান।
সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বিখ্যাত ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, কবি আল মাহমুদের মতো ব্যক্তিদের স্মৃতিধন্য এই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত সংগীতাঙ্গনে হামলা হয়েছে, অন্তত দুই বার। ভূমি দখলের চেষ্টা চলছে। ২০২১ সালের মার্চ মাসে এই সংগীতাঙ্গনে তাণ্ডব চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করা হয়। তখন অনেক দুর্লভ নথিপত্রসহ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিবিজড়িত অনেক বাদ্যযন্ত্র পুড়ে যায়। এর আগে ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ১৫টি মন্দির ও তিন শতাধিক বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। ফেইসবুকে কথিত ধর্মীয় অবমাননাকর ছবি পোস্টের অভিযোগ তুলে এই ভয়াবহ হামলা চালায় একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী।
সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শনিবার (৩০ মে) ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামে সাম্প্রতিক সময়ের একটি জনপ্রিয় সিনেমার প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এটির প্রদর্শনী ঠেকাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্যাম্পেইন চালায় একটি পক্ষ। কারা সেই পক্ষ সেটি কারো অজানা নয়।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছবিটির প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনের সদস্য। এক বছর ধরে ‘ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা’ শিরোনামে তারা চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে আসছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় শনিবার বিকাল ৩টায় অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনের আয়োজন করে সংগঠনটি।
কিন্তু জেলার কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা সিনেমাটি প্রদর্শন না করার বিষয়ে ফেইসবুকে নানা পোস্ট করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রদর্শনীর অনুমতি বাতিল করে দেয়। বিকল্প হিসেবে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অথবা সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে প্রদর্শনী আয়োজনের জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের জানানো হয়, ঈদের ছুটিতে দুটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ। সব মিলিয়ে শনিবার এই সিনেমার প্রদর্শনী হবে কি না, তা অনিশ্চিত। তার চেয়ে বড় কথা, যেহেতু এই সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধের হুমকি এসেছে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছ থেকে এবং এই গোষ্ঠী বেশ প্রভাবশালী, ফলে বিকল্প ভেন্যুতে সিনেমার প্রদর্শনী হলেও সাধারণ মানুষ সেখানে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা হাফেজ নাসুরুল্লাহ মুয়াজ নিজের ফেইসবুকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীর ফটোকার্ডে লাল ক্রসচিহ্ন দিয়ে একটি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর। এই শহরে আল্লামা ফখরে বাঙ্গাল রহ. একসময় সিনেমা বন্ধ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কুচক্রী মহল আবারও শহরে সিনেমা চালু করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। সাধারণ ছাত্রসমাজ ও সচেতন জনগণের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানাচ্ছি, এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আমরা প্রশাসনের সুদৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি, যাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ থাকে।’
তিনি লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর।’ কিন্তু একটি শহরে শুধু আলেম-ওলামা থাকেন না। অন্য পেশার এবং অন্য ধর্মের মানুষও থাকে। সব ধর্ম ও মতের মানুষের আনন্দ উদযাপনের অধিকার সেখানে থাকে। একটি শহরে সিনেমা প্রদর্শিত হলে যাদের ভালো লাগবে তারা যাবে। যারা এটা পছন্দ করেন না, তারা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সেন্সর পাওয়া একটি সিনেমা কোনো শহরের সিনেমা হলে কিংবা অন্য কোনো ভেন্যুতে প্রদর্শনে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার কোনো গোষ্ঠীর থাকতে পারে কি না এবং দিলে সেখানে রাষ্ট্র বা সরকারের কী ভূমিকা নেওয়া উচিত—সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র পাওয়ার পরে যে সিনেমাটি রাজধানী ঢাকায় চললো, যে সিনেমাটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা ধর্মীয় অবমাননার কোনো অভিযোগ নেই, সেটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কেন চলবে না বা সেখানে কেন চলতে দেওয়া হবে না? ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি বাংলাদেশের বাইরের কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বা ছিটমহল?
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের ভূমিকা স্পষ্ট নয় বা তারা এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিয়েছে বলে শোনা যায়নি। তবে এটা ধরে নেওয়া যায় যে, প্রশাসনও সিনেমা প্রদর্শনের বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে না। কারণ হুমকিটা এসেছে যে ধর্মীয় গোষ্ঠীর তরফে, তাদের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি কোনো সরকারই কোনোদিন নেয়নি। নেয়নি বলেই দেশে উগ্রবাদ ও মৌলবাদের বিস্তার ঘটেছে। শুদ্ধ সংস্কৃতির ওপর এই দেশে বারবার আঘাত এসেছে। কিন্তু যারা আঘাত করেছে, তাদের কাউকে এর জন্য শাস্তি পেতে হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বরং এই গোষ্ঠীর যে বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে, সেটি নিশ্চিত করতে মূলধারার সব দলই তাদের কাছে মাথা নত করেছে। তাদেরকে ক্ষমতার অংশীদার করেছে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারে ভাঙচুর, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙে দেওয়া, বাউলদের ওপর আক্রমণ, নারীদের খেলা বন্ধ করে দেওয়া, কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে মানুষ মেরে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখার মতো ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে নানা অজুহাতে সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ করেছে। কখনো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কখনো সামাজিক আচরণ বা পোশাকের কারণে মানুষকে হেনস্তা করেছে। বাউল-ফকিরদের ওপর হামলা, তাদের চুল কেটে হেনস্তা করা, নারীদের পোশাক নিয়ে কটূক্তি, নারী-অধিকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়েছে। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি কারাগারে ছিলেন। বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী ও ছায়ানট ভবনেও হামলা হয়েছে—যা একসময় কারো কল্পনায়ও ছিল না। কিন্তু এসব ঘটনা দেশের চিরায়ত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং নাগরিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত বলে বিবেচিত হলেও এগুলো প্রতিহত করা এবং এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে রাষ্ট্র খুব বেশি আগ্রহী হয় না।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই দেশে এখনও বাংলা বছরের প্রথম দিন তথা পয়লা বৈশাখের শোভযাত্রার নাম কী হবে, তা নিয়ে তর্ক হয়। বাঙালি সংস্কৃতির একটি উৎসবকে ধর্মের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে ‘মঙ্গল’ শব্দের খৎনা করে দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে আনন্দ শোভাযাত্রা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখ-ই আকবর ইত্যাদি নাম দেওয়া হয়। এই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বিভিন্ন মোটিফ, বিশেষ করে পেঁচা নিয়েও বিতর্কের অন্ত নেই। পেঁচাকে অশুভ পাখি বা হিন্দু সংস্কৃতির অংশ বলে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। কিন্তু এইসব হামলা ও বয়ানকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির ওপর ধারাবাহিক আঘাতের অংশ। এসব ঘটনার পেছনে যে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধন ছিল, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
দেশের জেলা উপজেলা শহর থেকে যে সিনেমা হলগুলো গায়েব হয়ে গেল, তার পেছনে যে শুধু ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা, ঘরে স্যাটেলাইট চ্যানেলযুক্ত টেলিভিশনের বিকাশ এবং সেই কারণে দর্শকশূন্যতাই দায়ী, না নয়। বরং সিনেমা হল হাওয়া হয়ে যাওয়ার পেছনে আছে একটি দীর্ঘমেয়াদী ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব। বিভিন্ন শহরের সিনেমা হলগুলো বন্ধের কারণগুলো গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে এর সত্যতা মিলবে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, মব সন্ত্রাসের দিন শেষ। কিন্তু দেখা গেল মব সন্ত্রাস পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং যারা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসে নেতৃত্ব দিয়েছে বা উসকানি দিয়েছে, তারা এখনও সক্রিয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধে যে ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সেটি স্পষ্টতই হুমকি। এটিও একধরনের মব। মব করে সিনেমা, নাটক বা অন্য কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়ার অনেক ঘটনাই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটেছে বলে অনেকে ওই আমলকে ‘মবের শাসন’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু একটি নির্বাচিত সরকারের আমলেও যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এইধরনের কর্মকাণ্ড করার সাহস করে বা সত্যিই এইধরনের হুমকি দিয়ে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দিতে পারে, সেটি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। তাতে জনপরিসরে এই বার্তাটিই যাবে যে, বিএনপি সরকারও ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাছে অসহায় এবং শুদ্ধ ও সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে এই সরকার সহায়ক নয়। সরকারের উচিত, এখনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হস্তক্ষেপ করা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবস্থান বাংলাদেশের বাইরে নয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছবির প্রদর্শনী বন্ধে প্রচার