রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজকদের এক আনন্দ-সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা সাংস্কৃতিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেদিনই বেগম সুফিয়া কামালকে সভাপতি ও ফরিদা হাসানকে সম্পাদক করে গঠিত হল একটি কমিটি– জন্ম নিল ‘ছায়ানট’।
Published : 14 Apr 2023, 10:37 AM
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে পাকিস্তান সরকারের বাধা সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিকে প্রতিবাদী করে তুলতে সহায়তা করেছে। জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে এ দেশে রবীন্দ্রচর্চায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তখন ছিল জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। ঢাকা শহরে জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে একটি কমিটি, বিচারপতি এস.এম. মুরশেদের নেতৃত্বে নাগরিকদের অন্য একটি কমিটি এবং প্রেস ক্লাবে তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের আরেকটি কমিটি গঠিত হয়।
আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান ছাড়াও এ তিনটি কমিটি মিলিতভাবে ২৪ থেকে ২৭ বৈশাখ চারদিন ব্যাপী রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালন করে। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে গিয়ে বিচারপতি মুরশেদ রবীন্দ্রনাথকে ‘উদার মানবতার কবি’ হিসেবে অভিহিত করেন। সামরিক শাসনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে উদ্দীপ্ত করে। রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এগিয়ে গেল এক ধাপ।
জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজকদের এক আনন্দ-সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা সাংস্কৃতিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেদিনই বেগম সুফিয়া কামালকে সভাপতি ও ফরিদা হাসানকে সম্পাদক করে গঠিত হল একটি কমিটি– জন্ম নিল ‘ছায়ানট’।
১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠার দু-বছর পর ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে (১৩৭০) ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের কার্যক্রম চালু করা হয়। এ সঙ্গীত শিক্ষালয়ের প্রথম বার্ষিকী উদযাপিত হয় ১৩৭১ সালের পহেলা বৈশাখ তখনকার ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলপ্রাঙ্গনে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে।
ছায়ানট এরপর থেকে ঋতুভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে সাংস্কৃতিক মহলে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করে। পহেলা বৈশাখ যথারীতি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন করে চলে ছায়ানট। কিন্তু শ্রোতাদের পক্ষ থেকে দাবি উঠল নববর্ষকে আবাহন করে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হবে।
ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলের মাঠ বড় অনুষ্ঠান করার পক্ষে উপযোগী নয়। তাই খোঁজ করা শুরু হলো উপযুক্ত জায়গার। নিসর্গবিদ্ ড. নওয়াজেশ আহমদ ১৯৬৭-তে চমৎকার এক জায়গা খুঁজে বের করলেন। এখনকার এই রমনার বটমূল। জায়গাটি তখন ছিল মানুষের চলাচলবিহীন এবং বড় বড় ঘাসে ছাওয়া। বিশাল এক অশ্বত্থ বৃক্ষ ছিল সেখানে। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রে লেখা হল ‘বটমূল’। কারণ পঞ্চবটের মধ্যে রয়েছে– অশ্বত্থ, বট, বিল্ব, আমলকী ও অশোক। তাই অশ্বত্থতলাকে বটমূল অভিহিত করতে কোনো অসুবিধা নেই।
ছায়ানটের সুহৃদ ও কর্মীরা মিলে জায়গাটা পরিষ্কার করে অনুষ্ঠান উপযোগী করে তুললেন। প্রথম প্রথম পহেলা বৈশাখের ভোরে রমনার সেই বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে খুব জনসমাগম হতো না। তবে ধীরে ধীরে শ্রোতা বাড়তে থাকে।
সেখানে সংগীত পরিবেশন করতে গিয়ে শিল্পীদের যথেষ্ট বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছিল গোড়ার দিকে। সনজীদা খাতুন লিখেছেন: ‘বটগাছের উপর থেকে ছোট ছোট শুঁয়ো পোকা ঝরে পড়তো ঘাড়ে, মাথায়, গায়ে। অনুষ্ঠান শেষে হাত পা ঘাড় চুলকে লাল করে ফেলতো সবাই। আশ্চর্য এই, গান চলাকালীন চুপ করে সয়ে যেতো ওই যন্ত্রণা। বেশি নড়াচড়া করলে দেখতে খারাপ হবে, বর্ষবরণে গান গাইতে গাইতে অস্থিরতা প্রকাশ করলে অনুষ্ঠানের সৌকর্য নষ্ট হবে। শিল্পী আর শিক্ষার্থীরা সে কথা মনে রেখেছে।
পরের বছর গাছের ডালেরই কতকগুলো ছোট ছোট কাঠি দিয়ে দিয়েছিলাম সবার হাতে। যেন ধীরভাবে শরীর থেকে পোকা সরিয়ে ফেলা যায়। পোকা সরিয়ে দিতে হোক বা যা-ই হোক, সবাইকে উদ্বুদ্ধ করবার জন্যে প্রশান্ত মুখে ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও’ এই প্রার্থনা উচ্চারণ করতেই হবে!’
প্রথমদিকে বর্ষ আবাহনের অনুষ্ঠানে কেবল রবীন্দ্রনাথের গানই থাকত। পরে যুক্ত হলো নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলালের গান এবং আরও পরে দেশের গান, লোকগীতি, লালনের গান ইত্যাদি।
পহেলা বৈশাখের এ অনুষ্ঠান বাঙালিকে তার জাতিসত্তা সম্পর্কে সচেতন করেছে। পাকিস্তানি শাসকরা যখন বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছিল, তখন ছায়ানটের এ অনুষ্ঠান মানুষের মনে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছে। মানুষ রমনার বটমূলে কেবল গান শোনার জন্যে সমবেত হয়নি, নববর্ষের প্রথম দিনে একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছে, আনন্দ প্রকাশ করেছে।
ছায়ানটের এ অনুষ্ঠান বাঙালিকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে। যে অধিকার নিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিকভাবে সংগ্রাম করে চলেছেন। সংস্কৃতিচর্চা রাজনৈতিক আন্দোলনে শক্তি যোগাল। গণঅভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম স্বাধীনতাযুদ্ধে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশে ছায়ানটের নববর্ষের অনুষ্ঠান আরও ব্যাপ্তিলাভ করল। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে চক্রান্ত থেমে নেই। ১৪০৮ সনের পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠান চলাকালে হঠাৎ বিরাট বোমা বিস্ফোরণ। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়লেন দর্শকদের কয়েকজন। মঞ্চের একপাশে দেখা গেল স্তূপ হয়ে পড়ে আছে মৃতদেহ। সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছেন সাতজন। পরে হাসপাতালে সন্ধ্যায় আরও দু-জন। কারা এ মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। পরে অবশ্য বোমা হামলার নায়কদের কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গেছে।
আশঙ্কা করা হয়েছিল পরের বছর বোধহয় রমনার বটমূলে জনসমাগম কম হবে। কিন্তু ১৪০৯-এ আরও বেশি করে মানুষ এলেন ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে। তারা জানান দিলেন বাঙালিকে কখনও ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করা যাবে না। বাঙালি অজেয়।
এতো বছর পর আজও ধর্মের দোহাই দিয়ে ছায়ানটের এ বর্ষ আবাহন, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা– এসব বন্ধের দাবি ওঠে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট সাম্প্রদায়িকতা, যার হাত ধরে এসেছে জঙ্গিবাদ। অশুভ রাজনৈতিক শক্তি তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যে এদের আশ্রয় দিয়েছে, লালন-পালন করেছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক শক্তি প্রতিবাদী হলেও, সাম্প্রদায়িকতা কেন জানি আমাদের গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে। ধর্ম আমাদের সাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা দেয় না। প্রকৃত ধার্মিক কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না; কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা করে রাজনৈতিক শক্তি সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করছে। এতে করে অলক্ষ্যে সমাজটা সাম্প্রদায়িক হয়ে যাচ্ছে, পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক বিবেচনা কাজ করছে। ফলে আমরা আমাদের বংশধরদের একটা সাম্প্রদায়িক প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলছি। এটা মানবিকতাবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ। সচেতন বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হচ্ছে এ ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা। দেশটাকে হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের ধারায় ফিরিয়ে আনতেই হবে; তা নইলে সকল বৈষয়িক অর্জন অর্হহীন হয়ে যাবে।
পহেলা বৈশাখে আমরা একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে দেশ মাতৃকার বন্দনা করব, আমাদের বাঙালিত্ব নিয়ে গর্ববোধ করব। হৃদয়ে অনুভব করব– আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
শুভ নববর্ষ। ১৪৩০ আমাদের সকলের জন্যে মঙ্গল বয়ে আনুক।