Published : 08 Jan 2026, 12:19 PM
দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে এক ঘরোয়া আড্ডায় পুরনো কথাটাই নতুন করে শুনলাম। ভদ্রলোক রাজনীতিই করেন সারাক্ষণ কিন্তু তার সামাজিক জানাশোনা ও পড়ালেখার আকাঙ্ক্ষা তীব্র। ফলে দলীয় রাজনীতির বাইরেও বৃহত্তর চোখে সমাজকে দেখেন। কথা প্রসঙ্গে বলেই ফেললেন, আমাদের রাজনীতির বড় সংকট হচ্ছে যোগ্যতা দেখে সঠিক মানুষকে আমরা সঠিক জায়গায় বসাতে পারি না। দল, আত্মীয় কিংবা কোনো না কোন সংকীর্ণ বিবেচনাকে যোগ্যতার ওপরে বসিয়ে দেই। ফলে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক নেতৃত্ব পায় না। প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায় না বলে রাষ্ট্রও নড়বড়ে হয়ে যায়। সবচাইতে বড় বিপদ হচ্ছে দুর্বল, অযোগ্য, দলদাস লোকজনের কারণেই ফ্যাসিবাদ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। দলদাস লোকজনের কারণেই দলীয় সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে ভয় পায়। সুষ্ঠু নির্বাচনের বদলে দিনের ভোট রাতে হয়, কখনো ভোট ছাড়াই নির্বাচন হয়, কখনো আমি আর ডামির মতো প্রহসনের নির্বাচন মেনে নিতে হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না বলে, গণতন্ত্র বিকশিত হয় না, গণতন্ত্র বিকশিত হয় না বলে ফ্যাসিবাদ বিকাশের সুযোগ পায়। ভদ্রলোকের কথা শেষ না হতেই আড্ডায় থাকায় একজন ফোঁড়ন কেটে বললেন, ভাই, এবার শুনছি ‘ম্যানেজড নির্বাচন’ হবে?
এই প্রথম ‘ম্যানেজড নির্বাচনে’র কথা শুনে আমিও আগ্রহী হলাম। জিজ্ঞেস করলাম ভাই, এটার মানে কি? উনি আর হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন না। বললেন, পরে জেনে নিয়েন।
এই আড্ডার কদিন পরেই পত্রিকায় দেখি ‘ম্যানেজড নির্বাচন’ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্র বিজ্ঞানের খ্যাতিমান অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী। ‘আঞ্চলিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি’ শীর্ষক ঢাকায় জানুয়ারির ৪ তারিখে হয়ে যাওয়া এক সেমিনারে ২০২৬ আলোচক হিসাবে অংশ নিয়ে দিলারা চৌধুরী বলেছেন, দেশে ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ গড়ে ওঠেনি। তারা প্রধান প্রধান ইস্যুতে কেউ একমত নন। এ কারণেই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’ দিলারা চৌধুরী মনে করেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘ম্যানেজড’ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এটা হলে বাংলাদেশ সংকট থেকে বের হতে পারবে না।
তার এই আশঙ্কার কথা অন্যদের ভাবাচ্ছে কিনা জানি না কিন্তু ৫ জানুয়ারি সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন জমা দেওয়ার বুথ পরিদর্শনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, সবার সহযোগিতা নিয়ে নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দিতে পারবে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এখনো কনভিন্সড যে আমরা একদম ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল (সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য) ইলেকশন দিতে পারব, সবার সহযোগিতা নিয়ে।’ আসন্ন নির্বাচন নিয়ে দুশ্চিন্তা না করার আহ্বান জানিয়ে সিইসি বলেন, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।
সিইসির এই আশা জাগানিয়া প্রত্যয় প্রকাশিত হওয়ার দিনই সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট মামলা করেছেন এক আইনজীবী। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ ৫ জানুয়ারি এ রিট আবেদন করেন। খবরে প্রকাশ, একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তারিখ রেখে গত ১১ ডিসেম্বর ঘোষিত তফসিলের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে তার আবেদনে। সেই সঙ্গে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নতুন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে বিবাদী করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাই কোর্ট বেঞ্চে আবেদনটির ওপর শুনানি হতে পারে। আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ বলেন, ‘অন্তবর্তীকালীন সরকারের কথা সংবিধানে কোথাও উল্লেখ নেই। তাই এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হতে পারে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে।’
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা জমা দেওয়ার পর বাছাই শেষ হয়েছে। অনেকের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। আপিল করেছেন তারা। আপিল শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের হালফিল সম্পর্কে পুরো ধারণা প্রকাশ করা কঠিন। জোট ও ভোটের সমীকরণ কি দাঁড়াবে সেটা বুঝতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু কতগুলো বিষয় এখন পর্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে–
ক). প্রার্থীদের, এমনকি স্টার প্রার্থীদের হলফনামা অনুসারে আয়-ব্যয়ের যে হিসাব বেরিয়েছে তাতে অঙ্কের যোগফল মিললেও মানুষের মনে প্রশ্ন যাবে না। হলফনামায় দেওয়া পেশা ও আয়ের যে চেহারা আর প্রকাশ্যে তাদের জীবনযাপনের ব্যয়ের যে অনুমিত অঙ্ক–দুটোয় আকাশ-পাতাল ফারাক। অনেকের পেশায় ‘গৃহিনী’ স্ত্রীর সম্পদ স্বামীর চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফলে রাজনীতিবিদদের জীবনযাপনের ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সঙ্গতিকে তুলনা করে অর্থনৈতিক সততা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট আশাবাদ দেখার সুযোগ খুব একটা নেই। এই খামতিই আমাদের আগামী দিনের নির্বাচন, রাজনীতি, সংস্কার সম্পর্কে যে আভাস দেয়, সেখানে আশাবাদী হওয়াটা খুব শক্ত ভিত পায় না।
খ). রাজনীতিতে আদর্শ ও নৈতিক সততা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবার ছোট দলের বড় নেতারা বড় দলের সমর্থকদের ভোট পাবার আশায় নিজেদের দল, দলীয় প্রতীক ও দলের আদর্শ যেভাবে দ্রুততম সময়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন, তাতে রাজনীতিতে নৈতিকতা ও আদর্শ যে ক্ষীয়মান তাতে আর সন্দেহ রইল না।
গ). যারা নানাভাবে নির্দিষ্ট দলীয় আদর্শ ও সামষ্টিক আদর্শের কথা বলে টেলিভিশনের টকশোতে তারকা মর্যাদা পেয়েছেন, এরকম রাজনীতিবিদরাও বড় দলের আনুকূল্যের জন্য যেভাবে নিজেদের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে হেয় করেছেন, সেটাও হতাশাজনক। এই ক্ষুদ্র লোভাতুর মন ও নতজানু মান নিয়ে কার্যকর রাষ্ট্র তৈরির সম্ভাবনাকে বড় করে দেখা বেশ কঠিন। ফলে নির্বাচনে জেতার জন্য নীতিহীন যে কোনো কাজে এসব ছোট দলের বড় নেতাদের যুক্ত হতে দেখলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
তাহলে এবারের নির্বাচন কেমন হবে? সেটা কি সিইসির বলা ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন হবে, নাকি অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণিত করে ‘ম্যানেজড’ নির্বাচন হবে?
সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য হয়তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু ইতোমধ্যে নির্বাচনের মাঠে থাকা প্লেয়াররা নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনা নিয়ে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলেছেন। এক্ষেত্রে প্রশাসনের একতরফা আচরণের অন্তত একশটি উদাহরণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলছেন, একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি প্রশাসন পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি একটি দলের চেয়ারপার্সন দেশে আসার পর বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ একটি পার্টি অফিসের দিকে তাদের কেবলা ঠিক করে ফেলেছেন। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ’। সম্প্রতি বিবিসি বাংলা একটি সংবাদ করেছে, ‘একপাক্ষিক নির্বাচনের শঙ্কা জামায়াত-এনসিপির, কী বলছে ইসি?’ শিরোনামে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মিটিং করে সাংবাদিকদের কাছে জামায়াতের নেতারা অভিযোগ করে বলেছেন, ‘গত কয়েক দিনের সরকারের আচরণে এবং প্রটেকশনের নামে যে বাড়াবাড়িটা চলছে সেসব আচরণে এই আশঙ্কা তো শুধু আমাদের মনেই তো নয়, আপনাদের মনেও এটা স্বাভাবিকভাবে জাগার কথা যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা নাই।’
জামায়াত এটিকে নির্বাচনের কৌশল হিসাবে নিচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নও থাকছে। তবে, জনমানুষের কাছে এই দাবি যদি সত্যি বলে প্রতিভাত হয় তাহলে সমূহ বিপদ। কেননা এবারের নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না করা যায় সেটা বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী করে তুলতে পারে। সেই আত্মঘাতী প্রবণতার মধ্যে ফ্যাসিবাদের দোসর তো বটেই স্বয়ং ফ্যাসিবাদই হাজির হতে পারে স্বরূপে।
ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশ এক রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এখানে পুরাতন ধ্যান-ধারণা ও পুরাতন প্রবণতার রাজনীতি যতই শক্তিমান চেহারা নিয়ে বিরাজমান থাকুক না কেন, তাকে মোকাবিলা করতে হবে নতুন জেনারেশনের পরিবর্তনআকাঙ্ক্ষী রাজনৈতিক মনোবাসনার। ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের ফলে জনতার একাংশের মনস্তত্বে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার বারুদ স্তূপীকৃত হয়ে আছে সেটাকে কোন শক্তি দেখিয়ে দমন করা সম্ভব হবে না। দলীয় শক্তির বড়ত্বের নামে, ধর্মকে ব্যবহারের আবরণে ক্ষমতা প্রাপ্তির চেষ্টার নামে জনমানুষের সেই পরিবর্তনআকাঙ্ক্ষাকে নিবৃত্ত করতে গেলেই বিপদ বাড়বে। তাই যে কোন ধরণের ম্যানেজড নির্বাচনের প্রচেষ্টা দেশকে দারুণতর বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, সিভিল-মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি, গোয়েন্দাতন্ত্র, বিচারবিভাগ, অন্তরবর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলি–সবাইকে তাই সতর্ক থাকতে হবে। যে কারও পক্ষপাতিত্ব, ভুল আচরণ, দলদাসত্ব একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনাকে যদি ম্যানেজড নির্বাচনের দিকে ঠেলে দেয় তবে তার ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হবে সবাইকে।