Published : 16 Aug 2025, 08:12 AM
দেশে সংস্কার-প্রচেষ্টা আর নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড়ের ঢাকঢোল এমনভাবে বাজছে যে ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য ভোট, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন নয়—এসব ঘোষণার শব্দে গ্রামীণ বাংলার কান্না চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই রাজনৈতিক কোলাহলের আড়ালে রাজশাহীর মতিহার থানার বামনশিকড় গ্রামে ঘটে গেছে নীরব কিন্তু করুণ এক মৃত্যুকাহিনি—ক্ষুধা আর ঋণের দমবন্ধ চাপে নিভে গেছে একই পরিবারের চারটি প্রাণ।
মিনারুল ইসলাম, এক সাধারণ গ্রামীণ মানুষ, যিনি প্রতিটি দিন অভাবের সঙ্গে লড়েছেন, শেষমেশ স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করেছেন। রেখে গেছেন এক টুকরো চিরকূট—‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না।’ এই কয়েকটি শব্দ শুধু এক ব্যক্তির হতাশা নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির অক্ষমতার নগ্ন স্বীকারোক্তি, যেখানে ক্ষুধা ও ঋণের ভারে মানুষ জীবনের সব সম্পর্ক, সব আশা ছিঁড়ে ফেলে মৃত্যুকে মুক্তি মনে করে।
মিনারুলের জীবন আমাদের দেশের লাখো দরিদ্র মানুষের প্রতিচ্ছবি। নির্দিষ্ট পেশা ছিল না, যে দিন যে কাজ পেতেন, তাই করতেন এবং ওই কাজের বিনিময়ে যা পেতেন, তাই দিয়ে সংসার চলত। কৃষিকাজ, ঠিকা শ্রম, বাসের হেলপার—সবকিছুই করেছেন তিনি। তবুও সংসারের প্রয়োজন মেটেনি। এই অভাবের ফাঁক পূরণ করতে গিয়ে তিনি পড়ে যান এনজিও ও বেসরকারি ঋণের চক্রে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ একসময় আশার আলো নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এখন তা অনেক ক্ষেত্রে অসহায় মানুষের গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। চড়া সুদ আর কিস্তির কঠোর চাপে পড়ে বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে।
দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার গ্রামে বাস করে এবং তাদের একটা বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এদের মধ্যে ঋণ শোধ করতে গিয়ে নিজেদের জমিজমা বা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয় এমন সংখ্যা নেহায়েত কম। এনজিওগুলো ঋণ দেওয়ার সময় যে সহজ শর্তের কথা বলে, কিস্তি আদায়ের সময় সেই নমনীয়তা আর থাকে না। ঋণের কিস্তি দিতে না পারলে তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়, যা অনেক সময় আত্মহত্যার মতো চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতে বর্তমানে প্রায় ৩০০টিরও বেশি এনজিও কাজ করছে। এদের মধ্যে কিছু বড় এনজিওর সুদের হার ২০ শতাংশ থেকে ৩০শতাংশ পর্যন্ত। এই উচ্চ সুদের হার এবং সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তির কঠোর নিয়ম অনেক সময় দরিদ্র মানুষের আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। ফলে তারা এক ঋণ শোধ করতে আরেক ঋণ নেয় এবং এভাবেই ঋণের চক্রে আটকে পড়ে। ঋণের জালে আটকা গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী আয় থেকে কিস্তির টাকা শোধ করতে হিমশিম খায়।
চিরকূটে লেখা ‘খাওয়ার অভাবে’ কথাটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে আত্মনির্ভরতার কথা বললেও বাস্তবে হাজারো পরিবার এখনো দিনে তিনবেলা খাবার পায় না। সরকারের হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করেছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে বেশি। কিন্তু খাদ্য উদ্বৃত্তের এই দেশে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১৮.৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, আর ৫.৬ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যে—যাদের দৈনিক পর্যাপ্ত ক্যালরি জোটে না। এর মূল কারণ আয়ের অভাব, বাজারে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক সুরক্ষার অপ্রতুলতা। ভিজিএফ, ভিজিডি, ও খাদ্য সহায়তার কর্মসূচি অনেক এলাকায় সঠিকভাবে পৌঁছায় না বা রাজনৈতিক বিবেচনায় বণ্টিত হয়। বর্তমান সরকার আবার এর অনেকগুলো বন্ধ করে দিয়েছে।
মিনারুলদের মৃত্যু আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে—আমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে ক্ষুধা এখনও মৃত্যুর কারণ? যেখানে ঋণশোধের চাপে মানুষ সন্তানসহ আত্মহত্যা করে? যেখানে সরকার, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের সাফল্যের গল্পে এতটাই মগ্ন যে, প্রান্তিক মানুষের কান্না তাদের কানে পৌঁছায় না? আমরা উন্নয়ন সূচকে এগোচ্ছি, সেতু, মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকার—খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা—এখনও অনেকের জন্য অধরা। মিনারুলদের জীবনের মানোন্নয়নে কোনো কার্যকর পরিকল্পনা আমাদের চোখে পড়ে না। অথচ সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ঋণগ্রস্ত, যার বড় অংশ প্রান্তিক শ্রেণির। এর মধ্যে এনজিও ঋণের গড় বার্ষিক সুদের হার ২০ শতাংশের বেশি, যা অস্থায়ী আয়ভিত্তিক মানুষের জন্য অসহনীয়।
দেশের বাজেট আলোচনা, নীতি প্রণয়ন কিংবা নির্বাচনি ইশতেহারে প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের জন্য সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খুব কমই থাকে। বরং উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বেশি গুরুত্ব পায়, যা রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহারযোগ্য। অথচ ঋণগ্রস্ত দরিদ্র মানুষের জন্য সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদের পুনর্বাসন ঋণ, জরুরি খাদ্য সহায়তা ও নগদ ভাতা বৃদ্ধি, বেকারদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসব কার্যক্রম ছাড়া ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। ক্ষুদ্রঋণ অনেক সময় দরিদ্র মানুষের জীবন উন্নত করার বদলে দুঃস্বপ্ন ডেকে আনে। তাই ঋণ প্রদানের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই, ঋণের পরিমাণ ও কিস্তির হার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা, ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা বা কর্মসংস্থান তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং মানসিক চাপ মোকাবিলায় পরামর্শ ও সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন—এসব উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে।
মিনারুলের পরিবারের মৃত্যু আমাদের সমাজের একটি অসম চিত্র তুলে ধরে। একদিকে দেশে কিছু মানুষের হাতে সম্পদের পাহাড় জমছে, অন্যদিকে কিছু মানুষ দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য লড়ছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের শীর্ষ ১০শতাংশ ধনী মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৫০শতাংশ রয়েছে, যেখানে নিচের ৫০শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র ১০শতাংশ সম্পদ। এই বৈষম্য সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। যখন সম্পদ এবং সুযোগের এমন অসম বণ্টন হয়, তখন দরিদ্র মানুষরা আরও দরিদ্র হয় এবং তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ থাকে না।
এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে। কেবল রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, প্রয়োজন মানবিক ও বিশ্লেষণমূলক পদক্ষেপ। ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাদের সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং কিস্তি আদায়ের পদ্ধতি মানবিক করতে হবে।
মিনারুলের ঘটনা দেখায় যে আর্থিক সংকট শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি মানসিক সংকটও তৈরি করে। ক্রমাগত ঋণের চাপ, আয় না থাকা, পরিবারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা—এসব মিলে হতাশা ও বিষণ্নতা বাড়ায়। কিন্তু গ্রামে বা ছোট শহরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ বলছে, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অন্তত ১৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে, কিন্তু তাদের ৯২ শতাংশ কোনো চিকিৎসা পান না। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সামাজিক কর্মসূচি, সচেতনতা এবং বিনামূল্যে কাউন্সেলিং সেবা চালু করা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।
মিনারুলের পরিবারের মৃত্যু কেবল তাদের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতা। এই ঘটনা আমাদের মানবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যখন একজন মানুষ তার পরিবারকে নিয়ে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সরকার, সমাজ, প্রশাসন, এবং সর্বোপরি আমরা সবাই ব্যর্থ। মিনারুলের মতো কেউ কেউ আত্মহত্যা করে মুক্তি খুঁজেন, কিন্তু হাজারো মিনারুল এখনও ভাতের স্বপ্ন নিয়ে অনাহারে কাটান। তাদের জন্য আমাদের কী করণীয়? এই প্রশ্নটি বারবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। মিনারুল হয়তো ভেবেছিলেন, মৃত্যু তাকে মুক্তি দেবে। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের জন্য এক অমোঘ সতর্কবার্তা—যদি আমরা প্রান্তিক মানুষের জন্য খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে উন্নয়নের স্লোগান শুধু কাগজে-কলমে থাকবে। ঋণ ও ক্ষুধা যেন আর কোনো জীবন কেড়ে নিতে না পারে, তার জন্য সরকার, এনজিও, সমাজ—সবাইকে মিলে দায় নিতে হবে। মিনারুলদের আত্মাহুতির চিরকূট আমরা আর দেখতে চাই না। ক্ষুধা ও ঋণের দমবন্ধ অবস্থা যেন আর কোনো শিশুর শৈশব, কোনো মায়ের চোখের আলো, কোনো পিতার আশা কেড়ে না নেয়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে জরুরি প্রতিশ্রুতি।