Published : 02 Aug 2025, 05:18 PM
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের অবসানের পর দেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান হতে যাচ্ছে—বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বিষয়টি আলোচনায় এনেছেন। আপনি কী দেখেন?
এরকম একটি প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমিও দেখছি। সে জন্য আমি উদ্বিগ্ন। আমি বাংলাদেশকে সব সময় একটা সত্যিকার অর্থে উদারপন্থী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চাই এবং এখানে গণতন্ত্র হবে সবচেয়ে বড় বিষয়। সেই জায়গায় যদি এখন এমন এমন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়, যারা গণতন্ত্রেই বিশ্বাস করে না। পরিষ্কার ঘোষণা দিয়ে করে না। আবার তারা নিজেরা জোর করে চাপিয়ে দিতে চায় মতবাদকে, এটা নিঃসন্দেহে এলার্মিং সিচুয়েশন। কিছু কিছু দলের মধ্যে এমনও কথা আছে যে মহিলাদের তারা কিছুতেই সামনে আনতে চায় না। মহিলাদের তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা তো দূরের কথা, তারা সামাজিক ক্ষমতায়নও করতে চায় না। এসব দলের যদি উত্থান হয় এই দেশে, তাহলে তো পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।’
মির্জা ফখরুলের সাক্ষাৎকারটি যেদিন প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, সেদিনই এর প্রতিক্রিয়ায় বিবৃতি দেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ—যে দলের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করিম কিছুদিন আগেই একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, তারা ক্ষমতায় এলে দেশে শরিয়া আইন চালু করবেন। তারা বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের মতো একটি দেশ বানাতে চান কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওই সাক্ষাৎকারে তিনি ‘হ্যাঁ’ বলেন। এই ঘটনার কিছুদিন আগে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আরেক সিনিয়র নেতা আশরাফ আলী আকন আমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তানকে তাদের ‘মডেল’ মনে করার কথা বলেন।
মির্জা ফখরুলের সাক্ষাৎকারের বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরাও বাংলাদেশে রাজনীতি করছি। আমরা তো এমন কোনো শক্তির উত্থান দেখছি না। তিনি যদি এমন কোনো শক্তির উত্থান দেখেন, তাহলে তা পরিষ্কার করে বলা উচিত। কিন্তু তা না করে অনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এমন নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করাকে আমরা অশুভকর বলে মনে করছি। তার এই বয়ান পতিত ফ্যাসিবাদের বয়ানকে সমর্থন করে।”
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু গত বছরের জুলাই মাসে অভুতপূর্ব অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে দক্ষিণপন্থীদের শুধু উত্থান নয়, বরং বিকাশ ঘটেছে বলে নানা ঘটনায় প্রতীয়মাণ হয়েছে। সুতরাং, এর প্রবণতা ও পরিণতি নিয়ে খুব খোলামেলা আলোচনা না করলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অধিকতর অন্ধকারে ধাবিত হবে—এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
শুরুতেই এটা মেনে নেওয়া সঙ্গত যে, দক্ষিণপন্থার উত্থান ও বিকাশ শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটা এখন বৈশ্বিক প্রবণতা। দক্ষিণপন্থা মানে শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নয়, বরং যেকোনো ধর্মভিত্তিক কট্টর রাজনীতিই দক্ষিণপন্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও ধর্ম ও ধর্মভিত্তিক দলের উত্থান, বিকাশ ও প্রভাব বাংলাদেশের চেয়েও বেশি। বিজ্ঞানমনস্ক গণতান্ত্রিক দুনিয়ার অনেক রাষ্ট্রও দক্ষিণপন্থার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। একাডেমিক পরিসরে দক্ষিণপন্থা বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ভালো-মন্দ নিয়ে অনেক আলোচনা আছে।
ধর্মীয় শাসনে মানুষ কতটা নিরাপদে বসবাস করতে পারে, সেই আলোচনা যেমন আছে, তেমনি ধর্মকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের বাইরে রাখার সুবিধার পক্ষেও জোরালো মত রয়েছে। কিন্তু সেসব আলোচনা ছাপিয়ে যে বিষয়টি বোঝা দরকার সেটি হলো, পৃথিবীর সব অঞ্চল ও সব দেশের মানুষের মানসকাঠামো একভাবে গড়ে ওঠে না। মরুময় মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের যে মানসকাঠামো ও চিন্তার গঠন, নদীমাতৃক সবুজ শ্যামল উর্বর ভূমি বাংলাদেশের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা মানুষের চিন্তা-বোধ-দর্শন ও মানসকাঠামো সেরকম হবে না। বাংলাদেশের জলবায়ু, মাটি ও এর অন্যান্য অনুষঙ্গ এই ভূখণ্ডের মানুষকে উদার হতে সহায়তা করে। যে কারণে এখানে যেকোনো ধরনের কট্টরপন্থার বিকাশ হওয়া বা মৌলবাদী চিন্তায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাইলে তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন পাওয়া কঠিন।
মনে রাখতে হবে, এই দেশে ইসলাম প্রচারের জন্য আসা পীর-আউলিয়াদেরকে যেমন মানুষ গ্রহণ করেছে, তেমনি এখানে ফকির-বাউলদের সহজিয়া দর্শনও বিকশিত হয়েছে। এই দেশে যুগের পর যুগ মুসলমান ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করেছে। কিন্তু তারপরও এখানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও অস্থিরতা লাগানো হয়েছে মূলত রাজনৈতিক স্বার্থে।
দুজন মানুষ তাদের ধর্মীয় ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস করলেও তাদের মাঝখানে অবিশ্বাস, অনাস্থা ও সন্দেহের দেয়াল তুলে দিয়েছে রাজনীতি—যা প্রকারান্তরে ক্ষতি করেছে দেশের ও মানুষের। কেননা রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ ধর্মকে মানুষের চেয়ে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করে মূলত তাদের দলীয় স্বার্থে। তাছাড়া যখনই কোনো একটি দেশে একটি বিশেষ ধর্ম রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে বা কোনো একটি ধর্মকে যখন রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া হয়, তখন স্বভাবতই ওই দেশে অন্য ধর্মের মানুষেরা জীবন সংকটে পড়ে। যেমন ভারতের হিন্দু, মিয়ানমারে বৌদ্ধ এবং বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর দেখিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল তাদের রাজনীতি করে এবং সকল মানুষের ওপর তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, আদর্শ ও দলীয় কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে চায়। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে জনগণের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভেদ তৈরি হয়। একটি ধর্মের মানুষ নিজেদেরকে অন্য ধর্মগুলোর মানুষের চেয়ে নিজেদেরকে অধিকতর ক্ষমতাবান ও প্রিভিলেজড মনে করে। এই মনে করাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দক্ষিণপন্থী দলগুলো নিজেদের মতবাদ জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়—যেটি সামগ্রিকভাবে দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ব্যাহত করে। গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে।
মির্জা ফখরুলের মতো একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের শঙ্কাটা সেখানেই। তিনি বলছেন, “আমি বাংলাদেশকে সব সময় একটা সত্যিকার অর্থে উদারপন্থী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চাই।” তার মানে দক্ষিণপন্থা বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে তিনি গণতন্ত্র বিকাশের পথে অন্তরায় হিসেবে দেখছেন। যদিও গণতন্ত্র নিজেই একটি উদার মতবাদ। কেউ উদার না হলে তার পক্ষে গণতান্ত্রিক হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং ‘উদারপন্থী গণতন্ত্র’ বলে কিছু হয় কি না, সেটি অন্য তর্ক।
মির্জা ফখরুলের সাক্ষাৎকারটি যেদিন প্রকাশিত হলো সেদিনই সন্ধ্যায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা থেকে এক হিন্দু কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ফেইসবুকে মহানবীকে (সা.) নিয়ে ‘কটূক্তি’ করে পোস্ট দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় ‘উত্তেজিত জনতা’ পরের দুদিন ওই কিশোরের বাড়িসহ ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের’ ১৫টির বেশি বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। পরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। ১৭ বছরের ওই কিশোর একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
গত বছরের ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পরই খুলনায় উৎসব মণ্ডল নামে এক তরুণকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে বেদম মারধর করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মহানবীকে (স.) কটূক্তি করেছেন। প্রথমে একটি জাতীয় দৈনিকে ওই তরুণের মৃত্যুর খবর বলা হলেও পরে তারা লিখেছে তিনি বেঁচে আছেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এক তরুণীকে কান ধরে ওঠবস করানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি আরেকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় কয়েকজন তরুণ একটি আবাসিক হোটেলে রেইড দিয়েছেন। একটি কক্ষ থেকে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে বের করে এনেছেন যারা স্বামী-স্ত্রী নন। তাদেরকে বকাঝকা করা হচ্ছে। ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে জেরা করা হচ্ছে যে, কেন তারা হোটেলে এসেছেন? পোশাক নিয়ে এক ছাত্রীকে হেনস্তার দায়ে গত মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী মোস্তফা আসিফ অর্ণবকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে কথিত ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একদল লোক শাহবাগ থানায় গিয়ে হট্টগোল করেন—যার কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। তারা অর্ণবের মুক্তির দাবিতে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন।
গত বছরের ৫ অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে বেশ কিছু মাজার ভাঙা হয়েছে। শুধু তাই নয়, একজন সাবেক সংসদ সদস্যের কবরে আগুন পর্যন্ত দেয়া হয়—যে ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বেই বিরল। রংপুর, জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন স্থানে তৌহিদী জনতার ব্যানারে নারীদের খেলা বন্ধ করে দেওয়াসহ নানা ঘটনা ঘটানো হয়েছে—যার মধ্য দিয়ে দেশে ধর্মীয় রাজনীতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে বলে মনে হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশকে উগ্র ও জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র প্রমাণের চেষ্টা বহু বছর ধরেই চলছে। এটা প্রমাণ করা গেলে এখানে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাক গলানো সহজ। আবার প্রতিবেশী দেশও যদি বিশ্বকে এই বার্তা দিতে পারে যে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন ধরনের সরকার গঠিত হলেও দেশটা মূলত কট্টরপন্থিদের হাতে চলে গেছে—তাহলে এই সরকারকে বিতর্কিত ও বিব্রত করা সহজ।