Published : 02 May 2026, 02:22 PM
ওপেকের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সদস্যপদ ত্যাগের ঘোষণাটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ঐক্যের কাঠামোগত ভাঙনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ২৮ এপ্রিল ওপেকের (OPEC) সভা শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ঘোষণা করে যে, ১ মে তারা ওপেকের এবং ওপেক প্লাসের সদস্যপদ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীল করার উপায় হিসেবে সদস্য দেশগুলোর উৎপাদন সীমিত করার তেল সিন্ডিকেটের নীতির প্রতি বছরের পর বছর ধরে চলা প্রকাশ্য অসন্তোষের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি এসেছে। কিন্তু তেলের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি মোটেই মূল কারণ নয় যা অন্য সবাই চেপে গিয়েছে। আর সেই কারণগুলোর ব্যাখ্যায় নিহিত আছে সেই সব তিক্ততা, যা গত ছয় দশক ধরে টিকে থাকা সংগঠনটি এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) অভ্যন্তরে জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার ও হুমকি উপলব্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। এখন তা-ই ক্রমবর্ধমান বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এটি জিসিসির আকস্মিক পতন নয়, বরং একটি ঐক্যবদ্ধ ব্লক হিসেবে তার সংহতির কাঠামোগত ক্ষয়। প্রতিটি উপসাগরীয় দেশ এখন নিজস্ব ভূগোল, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অভিজাত শ্রেণির হিসাব-নিকাশ এবং দেশীয় জনমতের চাপের আলোকে নিজস্ব বেঁচে থাকা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য হন্যে হয়ে স্বতন্ত্র কৌশল খুঁজে ফিরছে।
জিসিসি খণ্ডীকরণের মূল চালিকাশক্তি: নিরাপত্তা বিশ্বাসে বিভেদ
জিসিসি দেশগুলো আর তাদের নিজ নিজ দেশের জন্য তৈরি হওয়া হুমকি বা সকল জিসিসি দেশের জন্য একত্রে হুমকি মোকাবিলার জন্য ‘যৌথ নিরাপত্তার কৌশল বা দলগত পদক্ষেপ’—এই ধারণায় আর বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু কেন? জিসিসি দেশগুলোর বিশ্বাসে চির ধরার কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
সৌদি আরব বনাম সংযুক্ত আরব আমিরাত (কেন্দ্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা): রিয়াদ জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে শ্রেণিবিন্যাসের যে শৃঙ্খলা দীর্ঘ এত বছর ধরে অনুশাসন করে আসছিল, তা আর অন্য জিসিসি দেশগুলো মেনে নিতে রাজি নয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে ইউএই-র কাছে। সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য ডি-এসকেলেশন, ভঙ্গুর প্রতিবেশী দেশগুলোতে (ইয়েমেন, সুদান, সোমালিয়া) কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব রক্ষা এবং ‘ভিশন ২০৩০’-এর অধীনে জিসিসির রাজনৈতিক-ধর্মীয় নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেয়। অন্য দিকে আবু ধাবি চায় সচল ও লেনদেনভিত্তিক হেজিং, ইরানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ, ইসরায়েলের সঙ্গে গভীর নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং লোহিত সাগর বা হর্ন অব আফ্রিকায় স্থানীয় প্রক্সি ও বন্দর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রভাব। এটি খোলাখুলি সংঘাতের রূপ নিয়েছে—যেমন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের ইয়েমেন অভিযান, যার জবাবে সৌদি বিমান হামলা এবং আমিরাতের বাধ্যতামূলক প্রত্যাহার। সুদানের কেন্দ্রীয় সরকার সৌদি আরব সমর্থিত এবং তারা সৌদি এসএএফ (SAF)-এর সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ; পক্ষান্তরে আমিরাত সরকার বিপক্ষ শক্তি আরএসএফ (RSF)-কে সমর্থন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সোমালিয়ায় (আমিরাতের সোমালিল্যান্ড বন্দর চুক্তি বনাম সৌদির মোগাদিসু ঐক্য সমর্থন) একই প্রক্সি প্রতিযোগিতা চলছে।
অন্য সদস্যরা: কাতার মধ্যস্থতা শক্তি এবং সফট পাওয়ারের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সংহত করতে চায় (আল জাজিরা, মুসলিম ব্রাদারহুড সম্পর্ক)। ওমান নিরপেক্ষ ভারসাম্যকারী হিসেবে রয়েছে; কুয়েত ও বাহরাইন সৌদি-ঘেঁষা কিন্তু সতর্ক। যার ফলাফল হিসেবে আরবদের মধ্যে কখনোই কোনো ‘আরব ন্যাটোর’ আদলে কোনো সমন্বিত প্রতিরক্ষা জোট গড়ে ওঠেনি; বরং তারা তাদের নিজ নিজ দেশের নিরাপত্তার মতো নাজুক বিষয়টি আমেরিকার কাছে বর্গা দিয়ে রেখেছে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকেরও অধিক সময় ধরে। আবারও জিসিসি দেশগুলোতে অবস্থিত আমেরিকার ভাড়া করা নিরাপত্তা অবস্থানের ওপর ইরানের আত্মরক্ষামূলক আক্রমণ এবং এর ফলে ঘটে যাওয়া কোল্যাটারাল ড্যামেজের পরেই কেবল জিসিসি দেশগুলো বুঝতে পারে যে, নিজের দেশের নিরাপত্তা কখনও বর্গা দেওয়া যায় না। ইতিপূর্বেও জিসিসি দেশগুলো তাদের নিজ নিজ দেশে অবস্থিত আমেরিকার ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরাক, লিবিয়া ও ইয়েমেনের শিয়া সংগঠনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর পরেও তারা ভেবেছিল ইরানও ঠিক লিবিয়া বা ইরাকের মতো ভঙ্গুর রাষ্ট্র, যারা নিজের দেশের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা মিটিয়েছে বছরের পর বছর। ইরান যে কারও রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না, তার বাস্তবতা বোঝার পরেই কেবল জিসিসি দেশগুলো টের পায় নিরাপত্তা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান যুদ্ধোত্তর (২০২৫–২০২৬) বাস্তবতা: সাম্প্রতিক সংঘাত সাময়িক প্রতিরক্ষামূলক সমন্বয় তৈরি করলেও বিভেদ উন্মোচিত করেছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে আমিরাত ইসরায়েলের নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে; অন্যরা এটাকে অস্থিতিশীলকারী মনে করে। সৌদিরা চায় মধ্যপ্রাচ্যে একটা ভারসাম্য, যেখানে না ইসরায়েল না ইরান—কেউই যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে না পারে। অধিকাংশ জিসিসি দেশ চায় কোনোভাবেই যেন ইরান ইসরায়েলের চেয়ে বেশি শক্তিশালী না হয়ে ওঠে। অর্থাৎ তারা ইসরায়েলের উত্থানে উদ্বিগ্ন নয়, বরং শক্তিশালী ইরানের কারণে উদ্বিগ্ন। ইরান চায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন ভূখণ্ড এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সকল অবরোধের অবসান ও স্বাধীনভাবে নিজেদের দেশকে গড়ে তুলতে। তারা আন্তর্জাতিক সংগঠনের কাছে নিশ্চয়তা চায় যেন তারা কখনও অনৈতিকভাবে আক্রমণের শিকার না হয়। ইরান সৌদির ভারসাম্য চায়, কিন্তু আমিরাত যেন ইসরায়েলের সহযোগিতায় ইসরায়েলের এক নতুন ক্লায়েন্ট স্টেটে পরিণত না হয়। আর এর জন্য ইরানের মূল্যায়ন ভিন্ন, তাই তারা সৌদি-আমিরাতের ঐক্যবদ্ধ কৌশল গড়ে উঠতে দিতে চায় না। আমিরাতের ২০২৬ সালের এপ্রিলে ওপেক এবং ওপেক প্লাস থেকে প্রস্থান ব্লক শৃঙ্খলার চেয়ে অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নয়, বরং আমিরাতের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনের জন্য নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তার অঙ্ক কষতে চাওয়ার প্রতিফলন।
এই পার্থক্যগুলো নিরাপত্তায় ‘বিশ্বাস ও মতবাদ’ থেকে উদ্ভূত। কিছু জিসিসি দেশ এখনও যৌথ জিসিসি/মার্কিন গ্যারান্টিকে কার্যকর মনে করে; অন্যরা (বিশেষ করে আমিরাত) দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, বৈচিত্র্যকরণ (চীন, রাশিয়া, ভারত) এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে ‘পরিকল্পিত বিভেদীকরণের’ ওপর বাজি ধরে বাব আল-মান্দেবের মতো সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে চায়।
এটি ভবিষ্যতের ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোকে কীভাবে গঠন করবে (২০২৬–২০৩৫ অবধি)
জিসিসি সম্ভাব্য ঐক্যবদ্ধ ব্লক থেকে বিলুপ্ত হয়ে ক্রমশ দ্বিপাক্ষিকতার একটি শিথিল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে। ক্ষমতা রিয়াদে কেন্দ্রীভূত না হয়ে একাধিক প্রায়শই প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ছে:
সৌদি আরব (রিয়াদ): রাজনৈতিক ভারসাম্যকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে কূটনৈতিক হেভিওয়েট হিসেবে আবির্ভূত হবে। আকার, তেলের প্রভাব ও ‘ভিশন ২০৩০’ ব্যবহার করে মধ্যস্থতা (ইরান, ইয়েমেন) এবং মিশর, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তার জোট গঠন করে লোহিত সাগরের স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে। ছোট ছোট দেশগুলোর একে অপরের সঙ্গে বিভেদীকরণের বিরোধিতা করবে। আরও প্রাতিষ্ঠানিক আঞ্চলিক ব্যবস্থার পক্ষে চাপ দেবে কিন্তু বাস্তববাদী চুক্তি মেনে নেবে। তবে গাজা-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলাতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবিতে অটল থাকার সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারে, যা ইতিমধ্যেই এমবিএস (MBS) আমেরিকার কাছে স্পষ্ট করেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (আবু ধাবি/ দুবাই): অর্থনৈতিক-নিরাপত্তা বিঘ্নকারী ও ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’-এর উদ্যোক্তা হিসেবে জায়োনিস্ট শক্তির প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং পশ্চিমাদের ল্যাপ ডগে পরিণত হতে পারে। যা মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে অজনপ্রিয় হবে এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। লজিস্টিক, অর্থায়ন ও লেনদেনভিত্তিক নিরাপত্তার সচল কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান করছে (ইসরায়েল সম্পর্ক, হর্ন অব আফ্রিকার বন্দর, প্রযুক্তি/এআই)। এর কৌশল শূন্যতা তৈরির ঝুঁকি নেয় (ইয়েমেন/ সুদান/ সোমালিয়ায় প্রক্সি সমর্থন), কিন্তু বাব আল-মান্দেবের মতো চোকপয়েন্টের ওপর অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ দিলেও তা বাস্তবসম্মত হওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে সৌদির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলে এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বী মেরু হয়ে উঠতে পারে।
কাতার ও ওমান: মাধ্যমশক্তি বা মধ্যস্থতাকারী মেরু হিসেবে দোহা মিডিয়া প্রভাব ও হেজিং (ইরান/ তুরস্ক সম্পর্ক) ধরে রেখেছে; মাস্কট অপরিহার্য নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী। কেউই আধিপত্য বিস্তার করবে না, কিন্তু জিসিসির পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিকতা রোধ করবে।
বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠন:
তুরস্ক ও মিশর: প্রতিরোধক হিসেবে উত্থান ঘটবে। আঙ্কারা ও কায়রো স্থিতিশীলতা ও খণ্ডীকরণ-বিরোধিতায় সৌদির সঙ্গে মিলিত হয়ে জিসিসি বিভেদের শূন্যতা পূরণ করছে। সৌদি-মিশর-তুরস্ক অক্ষ আমিরাত-ইসরায়েলের লোহিত সাগর/ হর্ন অব আফ্রিকা অভিযানের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
ইরান: যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে কিছুটা দুর্বল হলেও তারা দ্রুত রাশিয়া এবং চীনের সাহায্যে তাদের সামরিক শক্তি ফিরে পাবেই। শুধু তা-ই নয়, কোনো আন্তর্জাতিক বাইন্ডিংস না থাকলে পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু তার প্রক্সিরা টিকে আছে এবং থাকবে যতদিন না ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন ভূখণ্ড নিশ্চিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভেদীকরণ ইরানকে নতুন প্রক্সি খুঁজে পেতে সাহায্য করবে এবং এতে এসিমেট্রিক যুদ্ধের ধারণা আরও গভীরভাবে ছোট দেশগুলোর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
নন-স্টেট অ্যাক্টরস/ হাইব্রিড প্রতিপক্ষ: প্রক্সি, বিচ্ছিন্নতাবাদী (ইয়েমেনের এসটিসি, সোমালিল্যান্ড) ও মিলিশিয়ারা জিসিসি প্রতিযোগিতা থেকে লাভবান হয়ে রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করবে। সেই সঙ্গে বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াবে।
বহিরাগত খেলোয়াড়: যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। চীন, রাশিয়া ও ভারত অর্থনৈতিক শূন্যতা পূরণ করছে কিন্তু নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না।
সামগ্রিক গতিপথ কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে? ‘প্রতিযোগিতামূলক বিভেদীকরণ’ মডেল অনুসৃত হলে ঐক্যবদ্ধ জিসিসি নেতৃত্বের পরিবর্তে আরও বেশি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, প্রতিদ্বন্দ্বী করিডোর (সৌদির নিওম বনাম আমিরাতের বন্দর) এবং নির্বাচিত জোট হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য। এতে লোহিত সাগরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং হর্ন অফ আফ্রিকায় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে ছোট রাষ্ট্রগুলো নন-স্টেট অ্যাক্টরদের একছত্র চারণভূমি হয়ে উঠতে পারে, যাদের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত স্পন্সরদের হাতে নাও থাকতে পারে।
ইসরায়েল ফ্যাক্টর: গাজা ও লেবাননে ‘দাহিয়া ডকট্রিন’
গাজা আর লেবাননে দাহিয়া ডকট্রিন গ্রহণের ফলে এবং দীর্ঘদিনের হত্যাযজ্ঞের কারণে পশ্চিমা বিশ্বের জনসাধারণের বিবেক জাগ্রত হওয়ায় ইসরায়েল সরকার গুরুতরভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি ইসরায়েলের জন্য এক কাঠামোগত বাধা হিসেবে দাঁড়াতে শুরু করেছে। গাজা ও লেবানন অভিযান ইসরায়েল সরকারকে আরব বিশ্বজুড়ে গভীরভাবে অজনপ্রিয় করে তুলেছে (আরব ওপিনিয়ন ইনডেক্স ২০২৫: ৮৭% স্বীকৃতির বিরোধী; অনেক দেশে ইসরায়েল হুমকির শীর্ষে)। উপসাগরীয় দেশগুলোতেও জনমত ইরান নয়, ইসরায়েলকেই প্রধান অস্থিতিশীলকারী হিসেবে দেখে।
জিসিসিতে প্রভাব: আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-সম্পর্কিত শাসকরা (আমিরাত, বাহরাইন) দেশীয় প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য নিরাপত্তা সহযোগিতা রাজনৈতিকভাবে বিষাক্ত। এটি স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া ও জিসিসি জোটের সম্প্রসারণকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। ফলে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষরকারীরা বাধ্য হয়েই ইসরায়েলের সঙ্গে শুধু ‘নীরব’ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ স্বাভাবিকীকরণে ইতস্তত করেছে। ইসরায়েলের গাজা গণহত্যার কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে রিয়াদকে অভ্যন্তরীণভাবে চরম জনঅসন্তোষের মুখে পড়তে হতে পারে বিধায় তারা এই পথ থেকে সরে এসেছে।
বিভক্তিকরণ ত্বরান্বিত করবে: ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরব দেশের জনক্ষোভ ইয়েমেন, সোমালিয়া ও সুদানে আমিরাত-ইসরায়েল কর্মকাণ্ডকে ‘বিভক্তিকরণের অক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেছে। এটি কাতার, তুরস্ক ও ইরানের ‘প্রো-ফিলিস্তিন’ সফট পাওয়ারকে আরও জনপ্রিয় এবং এই মিত্র শক্তিকে শক্তিশালী করে তুলবে।
দীর্ঘমেয়াদি: জিসিসি অভিজাতদের স্বায়ত্তশাসন সীমিত করবে। ভবিষ্যতের যেকোনো ক্ষমতাকেন্দ্রকে এই বৈধতার যৌক্তিকতা সামলাতে হবে, নয়তো অস্থিরতার ঝুঁকি নিতে হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল থেকে জিসিসি দেশগুলোর অধিকাংশ সদস্যকে আরও ‘আরব-কেন্দ্রিক’ নিজস্ব অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। এতে ইরানই সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের বড় শক্তি হওয়ার সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করবে।
ইসরায়েল সরকারের তীব্র অজনপ্রিয়তা জিসিসি দেশগুলোর ইসরায়েলের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান গ্রহণের প্রক্রিয়াকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। এটি প্রকাশ্য স্বাভাবিকীকরণকে সীমিত করছে এবং ইসরায়েল-বিরোধী জনমতকে তীব্র করে তুলছে।
১ মে ২০২৬: ওপেকের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক থেকে প্রস্থান শুধু একটি জ্বালানি বাজারের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্য ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকবে। এটি একই সঙ্গে তিনটি জিনিসের অবসান ঘটায়: ১. জিসিসির ঐক্য একটি টেকসই কৌশলগত বাস্তবতা—এই মিথের সমাপ্তি। ২. ওপেক মৌলিকভাবে ভিন্ন নিরাপত্তা অবস্থানের রাষ্ট্রগুলোর উৎপাদন স্বার্থ সমন্বয় করতে পারে—এই কল্পকাহিনীর অবসান। ৩. আরব বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো অঞ্চলটির নিরাপত্তা সম্মিলিতভাবে পরিচালনা করতে পর্যাপ্ত সাধারণ স্বার্থ ধারণ করে—এই অনুমানের পতন।
এবং এটি একই সঙ্গে তিনটি নতুন বাস্তবতার সূচনা করে: ১. পাঁচ বা তার বেশি প্রতিযোগী ক্ষমতাকেন্দ্রবিশিষ্ট একটি প্রকৃত বহুমেরু উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো। ২. একটি দ্বিপাক্ষিকীকৃত জ্বালানি বাজার—যেখানে উৎপাদন, মূল্য নির্ধারণ এবং রপ্তানি পথ কার্টেলের শৃঙ্খলার পরিবর্তে কৌশলগত সমন্বয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ৩. একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা—যেখানে ছোট রাষ্ট্র, সেতুবন্ধনকারী শক্তি এবং নন-আরব অ্যাক্টররা প্রভাব অর্জন করে।
‘প্রতিযোগিতামূলক বিভাজন’ মডেলটি কেবল সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্কবার্তা নয়; আজকের তারিখে এটিই বর্তমান বাস্তবতার সঠিক বর্ণনা। নতুন মধ্যপ্রাচ্যে পথচলা প্রতিটি রাষ্ট্রের কৌশলবিদদের জন্য এই গতিপ্রকৃতি বোঝা আর ঐচ্ছিক নয়—এটি অপরিহার্য। উপসাগরের বিভাজন পৃথিবীর জন্য একটি সুযোগ যেমন, তেমনই একটি বিপদও বটে। যে রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকবে ও সমৃদ্ধ হবে, তারা হবে সেই সব রাষ্ট্র—যারা বিভাজিত অংশগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগাতে পারবে, কিন্তু তাদের সংঘাতে নিজেরা হারিয়ে যাবে না।