Published : 11 Mar 2026, 04:12 PM
তেলনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো, ধর্মীয় মতাদর্শগত প্রতিযোগিতা, পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের তাগিদ, আঞ্চলিক শক্তির পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গভীরভাবে প্রোথিত জাতিগত জটিলতা—এই পাঁচটি আন্তঃসম্পর্কিত উপাদান মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘদিন ধরে উত্তপ্ত, অস্থির এবং ক্রমপরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিণত করেছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্য বহু দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত চলমান সামরিক অভিযান এই উত্তাপকে আরও তীব্র ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে সংঘটিত এই আক্রমণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু, সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বিপর্যস্ত হওয়ার মতো নাটকীয় ঘটনা সত্ত্বেও ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্র এক বিরল মাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করেছে। দ্রুত নতুন নেতৃত্বের অভিষেক, সামরিক প্রতিক্রিয়ার নিরবচ্ছিন্নতা এবং আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের তাৎক্ষণিক সক্রিয়করণ—সব মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; গভীরভাবে প্রোথিত একটি সিস্টেম-নির্ভর শাসনব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ইরানের সিস্টেম-নির্ভর রাজনৈতিক কাঠামো
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ১৯৭৯ সালের শিয়া ইসলামি বিপ্লবের পর এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে, যার ভিত্তি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। এখানে সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের প্রতীক হলেও ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি বিস্তৃত, বহুস্তরীয় এবং বিপ্লব-উত্তর নিরাপত্তা ও আদর্শিক অগ্রাধিকারের ওপর নির্মিত। বিপ্লবী গার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা সংস্থা, বাসিজ মিলিশিয়া, নির্বাচিত সরকার এবং অর্থনৈতিক ফাউন্ডেশন—এই বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বয়ে ইরানে এমন এক জটিল ক্ষমতা-জাল গড়ে উঠেছে, যা ব্যক্তিনির্ভরতার পরিবর্তে কাঠামোগত স্থায়িত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাকেই অগ্রাধিকার দেয়। এই কাঠামোকে গবেষকেরা প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা (systemic resilience) বলে অভিহিত করেন, কারণ এটি নেতৃত্ব পরিবর্তন বা বাহ্যিক আঘাতের মধ্যেও কার্যকর থাকে।
এই কাঠামোর বিপরীতে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ব্যক্তিনির্ভর; ফলে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আংশিক সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইরানে খামেনির মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো সমঝোতার পথে যায়নি; বরং আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। কারণ ইরানের রাজনৈতিক আদর্শ, নিরাপত্তা কাঠামো এবং বিপ্লবী পরিচয় রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি, যা ব্যক্তির মৃত্যুতে পরিবর্তিত হয় না।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচিও এই সিস্টেম-নির্ভর কাঠামোর অংশ। ২০১৫ সালের JCPOA চুক্তি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সীমিত করলেও ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গেলে ইরান পুনরায় উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। ইরানের দৃষ্টিতে পরমাণু কর্মসূচি কেবল প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রতীক। ফলে ইরান কখনোই পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়।
এই প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে ইরানের ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক জোটের অংশ করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি ‘ইরান–চীন–রাশিয়া অক্ষ’—যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং বৈশ্বিক শক্তির পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইরানের সামরিক কাঠামো
ইরানের সামরিক কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল ও বহুমাত্রিক। এখানে দুটি সমান্তরাল সামরিক বাহিনী রয়েছে—ইরানিয়ান আর্মি (Artesh) এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)। আর্মি রাষ্ট্রের প্রচলিত সামরিক বাহিনী, যার দায়িত্ব সীমান্ত রক্ষা, প্রচলিত যুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষা। অন্যদিকে আইআরজিসি একটি আদর্শিক ও বিপ্লব-রক্ষাকারী বাহিনী, যার দায়িত্ব আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং ইরানের বৈদেশিক সামরিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা।
আইআরজিসির অধীনে থাকা কুদস ফোর্স ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া পরিচালনা করে। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ইরানকে বহুমুখী অপ্রচলিত যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দেয় এবং দেশটিকে নিজের সীমানার বাইরে গিয়েও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করে।
ইরানের সামরিক কাঠামোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থা। বিপ্লব-পরবর্তী চার দশকের নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা থেকে ইরান এই ধারণায় পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যেকোনো সময় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমান ধীরে ধীরে ইরানের কৌশলগত সংস্কৃতি ও প্রতিরক্ষা নীতির স্থায়ী অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশটি এমন একটি সামরিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যেখানে স্থানীয় কমান্ডাররা প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামরিক প্রতিক্রিয়া থেমে যায় না। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এই কাঠামোর কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।
ইরানের সামরিক স্থিতিস্থাপকতাকে আরও দৃঢ় করেছে চীন ও রাশিয়ার বহুমাত্রিক সহায়তা। রাশিয়ার স্যাটেলাইট নজরদারি ও সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইরানকে আক্রমণের পূর্বাভাস নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করছে, যা যুদ্ধে দেশটিকে কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে। একই সময়ে চীনের সাইবার প্রতিরক্ষা সহায়তা ইরানের জ্বালানি, যোগাযোগ ও সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার আক্রমণ প্রতিহত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তি বিনিময় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে ইরানের সামরিক কাঠামো কেবল নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর নয়, দুই শক্তিধর রাষ্ট্রের সমন্বিত সহায়তায় দৃঢ় ও বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে।
ইরানের কৌশলগত গভীরতার নীতি (Strategic Depth Doctrine) এই সামরিক কাঠামোর রাজনৈতিক দর্শন। ইরান বিশ্বাস করে যে তার নিরাপত্তা শুধু নিজের সীমান্তের ভেতরে নয়; ইরাক–সিরিয়া–লেবানন–ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে ইরান তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্মুখ প্রতিরক্ষা (forward defense) হিসেবে পরিচালনা করে। ইসরায়েল এই নেটওয়ার্ককে অস্তিত্বগত হুমকি মনে করে এবং ২০২২ সাল থেকে অক্টোপাস নীতি (Octopus Doctrine) অনুসরণ করছে—যেখানে শুধু প্রক্সি নয়, সরাসরি ইরানের ভেতরে আঘাত করা হয়। বিজ্ঞানী হত্যা, সাইবার আক্রমণ, পরমাণু স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা—সবই এই কৌশলের অংশ।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-লক্ষ্য
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর সমন্বিত হামলা চালাবার ফলে মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বসহ প্রায় দুই হাজারের মত মানুষ ইতিমধ্যে নিহত হয়েছে। দেশটির পরমাণু স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, বিপ্লবী গার্ডের সদর দপ্তর, তেল রিফাইনারি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। ইরানের পাল্টা আক্রমণে ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সকল মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দ্রুত যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক লক্ষ্য এবং ধারণা ছিল খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে নতুন নেতৃত্ব আসবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার মত আংশিক বা পূর্ণ সহযোগিতার পথ বেছে নেবে। এর মধ্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্র্যাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যে দীর্ঘ উদ্বেগ তা দূর হবে।
কিন্তু প্রাথমিক সে লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন বহুমাত্রিক লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রর প্রথম লক্ষ্য হলো ইরানের পরমাণু সক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা। দ্বিতীয়ত, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব—বিশেষ করে হিজবুল্লাহ, ইরাকি মিলিশিয়া, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়ার ইরানপন্থি বাহিনী—দুর্বল করা। তৃতীয়ত, ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখবার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চতুর্থত, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা ভেঙে দেওয়া। পঞ্চমত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানো।
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জাতিগোষ্ঠী—কুর্দিদের—ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার বহুমাত্রিক লক্ষ্য অর্জনের একটি পথ খুঁজছিল, বিশেষ করে ইরাকের ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে। কিন্তু কুর্দি রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সিরিয়ার কুর্দিদের ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিক সহযোগিতা করলেও পরে সেই অবস্থান থেকে সরে যাওয়া—যার ফলে মার্কিন নীতির প্রতি তাদের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়—এসবই পরিকল্পনাটিকে দুর্বল করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এবং কুর্দি আঞ্চলিক সরকারের যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করার ব্যাপারে অনীহা। ফলে কুর্দি ফ্যাক্টরকে কেন্দ্র করে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার যে কৌশল ওয়াশিংটন বিবেচনা করেছিল, তা বাস্তবে কার্যকর হওয়ার আগেই ভেঙে পড়ে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিস্তৃত কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে, তা কেবলমাত্র তেহরানের সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে অচল করে সরকার পতনের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। দূর থেকে মিসাইল বা বোমাবর্ষণ করে এমন লক্ষ্য পূরণ করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। ফলে স্থল অভিযানের প্রশ্নটি অনিবার্যভাবে সামনে এসেছে। কিন্তু এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দ্বিধা: স্থল অভিযান যেমন বিপজ্জনক, তেমনি তা অবিশ্বাস্য রকম ব্যয়বহুল।
ইরান আয়তনে ইরাকের প্রায় চারগুণ বড়। যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই সিএনএন জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার, আর প্রতিদিনের গড় ব্যয় কমপক্ষে এক বিলিয়ন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর ওপর ইরানের পাল্টা আক্রমণে আরও কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি।
এ অবস্থায় প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এমন ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযানে নামা আদৌ যুক্তিযুক্ত হবে কিনা—ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা এখন সেই প্রশ্নই নতুন করে বিবেচনা করছেন।
স্থল অভিযানের সম্ভাব্যতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল সামরিক ঝুঁকির প্রশ্ন নয়; এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব পড়তে পারে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে তেল ও গ্যাসের বাজারে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, তার প্রতিক্রিয়া অবশ্যম্ভাবীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও পড়বে—জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নতার মাধ্যমে। অর্থাৎ, যুদ্ধের ব্যয় কেবল সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা বিস্তৃত অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলেও ছড়িয়ে পড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠছে: ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে কতটা টেকসই, যখন সামরিক ঝুঁকি, অর্থনৈতিক অভিঘাত এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সবকিছুই একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
অপরদিকে, ইরানের লক্ষ্য স্পষ্ট। তারা যুদ্ধকে সাময়িকভাবে স্থগিত করতে নয়, পুরোপুরি বন্ধ করতে চায়। তেহরানের দৃষ্টিতে যুদ্ধবিরতি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেবে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় আক্রমণের পথ খুলে দিতে পারে। তাই ইরানের কৌশলগত হিসাব সরল—যে কোনো মূল্যে যুদ্ধে টিকে থাকা। তাদের যুক্তি হলো, যদি আফগান তালেবান বা ইয়েমেনের হুতিরা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাপ সহ্য করে টিকে থাকতে পারে, তবে ইরানের মতো রাষ্ট্র আরও অনেক বেশি সক্ষমতা নিয়ে তা করতে পারবে। টিকে থাকা এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনার ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া—এই দুইয়ের সমন্বয়কেই ইরান তার সম্ভাব্য কৌশলগত বিজয়ের প্রধান পথ হিসেবে দেখছে।
ফলে পুরো সংঘাতটি এখন কার্যত একটি জিরো-সাম গেমে (Zero-sum game) পরিণত হয়েছে। যে খেলায় কোনো পক্ষেরই ছাড় দেওয়ার বাস্তব সুযোগ নেই। যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ভর করছে এক পক্ষের স্পষ্ট পরাজয়ের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই যুদ্ধে বিজয়ী হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তার প্রভাব আরও সুদৃঢ় হবে এবং ইসরায়েল আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরও প্রভাবশালী অবস্থান অর্জন করবে। বিপরীতে, ইরান যদি টিকে থাকতে সক্ষম হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের সূর্যাস্ত ঘটতে শুরু করবে এবং বিদ্যমান ক্ষমতার ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে তেহরানের দিকে ঝুঁকে যাবে।