Published : 10 Dec 2025, 07:07 PM
আজ আমরা কথা বলব একজন সুফি সাধককে নিয়ে যিনি নিজের খানকায় বসে বুক পেতে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি হানাদারের বুলেটের সামনে। তিনি একাত্তরের রণাঙ্গনের এক নিভৃতচারী শহীদ—শাহ্ সুফি হযরত মাওলানা সোলাইমান শাহ্ চিশতী (রহ.)।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা। পদ্মা নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষা এক নিভৃত পল্লী গোলাপনগর। আজকের দিনে সেখানে গেলে দেখবেন হাজারও মানুষের ভিড়, বিশাল মাজার শরিফ, আর ভক্তদের কান্নাভেজা প্রার্থনা। কিন্তু একাত্তরের এপ্রিলে এই গোলাপনগরের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। তখন বাতাসে ছিল বারুদের গন্ধ আর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপার থেকে ভেসে আসছিল মৃত্যুর পরোয়ানা।
সোলাইমান শাহ্ আদতে এই অঞ্চলের মানুষ ছিলেন না। জনশ্রুতি আছে, তার আদি নিবাস ছিল বরিশাল জেলায়। আধ্যাত্মিক সাধনার টানে তিনি ঘর ছেড়েছিলেন যৌবনেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের করিমপুর এবং বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ঘুরে, রাজশাহীর চরাঞ্চল হয়ে ষাটের দশকে তিনি এসে থিতু হন ভেড়ামারায়। প্রথমে ঘোষপাড়া গ্রামে কিছুদিন থাকলেও, নির্জনতা প্রিয় এই সাধক অবশেষে বেছে নেন পদ্মা তীরের এই গোলাপনগর এলাকাটিকে। সেখানে খড়ের তৈরি এক সাদামাটা কুঁড়েঘরে তিনি ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তার কোনো রাজপ্রাসাদ ছিল না, ছিল না কোনো বিত্তবৈভব। ছিল কেবল একদল ভক্ত আর আল্লাহর জিকির।
কিন্তু ১৯৭১ সাল এমন এক সময় ছিল, যখন এই নির্জনতাও নিরাপদ ছিল না।
মার্চ-এপ্রিল মাসে কুষ্টিয়া অঞ্চল ছিল এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ যুদ্ধ বা ‘ব্যাটল অব কুষ্টিয়া’র কারণে পাকিস্তানি বাহিনী তখন দিশেহারা এবং ক্ষিপ্ত। তারা তখন কেবল মুক্তিযোদ্ধা খুঁজছে না, খুঁজছে ওইসব মানুষদের—যারা সমাজের কেন্দ্রবিন্দু। পাকিস্তানি জান্তার ‘পোড়ামাটি নীতি’ বা স্কর্চড আর্থ পলিসির একটা অংশ ছিল স্থানীয় কমিউনিটি লিডার বা প্রভাবশালীদের হত্যা করা, যাতে সাধারণ মানুষ ভয় পায় এবং আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। একজন পীর বা সুফি সাধক, যার কথায় হাজার মানুষ এক হয়, তিনি স্বাভাবিকভাবেই ছিলেন তাদের টার্গেট।
দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় (সম্ভাব্য ১২ এপ্রিল)। পাকশী ব্রিজ বা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দিক থেকে পাকিস্তানি হানাদারেরা ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রবেশ করে ভেড়ামারায়। তাদের গন্তব্য ছিল গ্রামগুলো তছনছ করা। একপর্যায়ে এই নরপিশাচদের দল হানা দেয় গোলাপনগরের সেই শান্ত কুঁড়েঘরটিতে।
সাধারণত যুদ্ধের সময় মানুষ জান বাঁচাতে পলায়ন করে। কিন্তু সোলাইমান শাহ্ ছিলেন ভিন্ন ধাতের মানুষ। তিনি জানতেন, তার ভক্তরা, তার মুরিদরা ভীতসন্ত্রস্ত। তিনি পালিয়ে গেলে এই সাধারণ মানুষগুলোর মনোবল ভেঙে যাবে। তাই তিনি তার আস্তানাতেই অবস্থান করলেন। সঙ্গে ছিলেন তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ৮ জন সহচর বা মুরিদ।
হানাদার বাহিনী যখন তার কুঁড়েঘর ঘেরাও করল, তখনো তিনি শান্ত। কোনো অনুনয় নয়, কোনো বিনয় নয়। একাত্তরের সেই বিকেলে গোলাপনগরের মাটি সাক্ষী হলো এক জঘন্য হত্যাকাণ্ডের। পাকিস্তানি হায়েনারা সোলাইমান শাহ্ এবং তার ৮ জন নিরস্ত্র সঙ্গীকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁঝরা হয়ে যায় সাধকের বুক। লুটিয়ে পড়েন তিনি এবং তার সহচরেরা। পদ্মা তীরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে বারুদের গন্ধে আর শহীদের রক্তে।
সোলাইমান শাহ্ প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, সুফিবাদের শিক্ষা কেবল তসবিহ জপা নয়, বরং জালিমের সামনে মাথা নত না করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করাও। শাহ্ সুফি হযরত মাওলানা সোলাইমান শাহ্ চিশতী (রহ.)-এর এই অবস্থান, এই শাহাদাত ছিল এক ধরনের ‘প্যাসিভ রেজিস্ট্যান্স’। তিনি পালিয়ে যাননি, নিজের মাটি ও মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভক্তরা সেই রক্তভেজা স্থানেই গড়ে তোলেন তার মাজার শরিফ। আজ সেখানে বিশাল গম্বুজ, শান-শওকত। প্রতি বছর চৈত্র মাসের ২৭, ২৮ ও ২৯ তারিখে সেখানে বিশাল ওরশ হয়। লাখো মানুষ সমবেত হন ওরশে। ভারত, ভুটান এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন। কেউ আসেন মানত পূরণ করতে, কেউ আসেন আধ্যাত্মিক প্রশান্তির খোঁজে। কিন্তু এই লাখো মানুষের ভিড়ে আমাদের কতজন জানি যে, আমরা আসলে একজন ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’ বা ‘শহীদ সুফি’র মাজার জিয়ারত করছি?
গোলাপনগরের এই মাজারটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ বা ‘লিভিং মনুমেন্ট’। একাত্তরে ধর্ম ব্যবসায়ীরা যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ হত্যা করছিল, তখন সোলাইমান শাহের মতো প্রকৃত ধার্মিকরা জীবন দিচ্ছিলেন সেই ধর্মের মান বাঁচাতে, মানবতা রক্ষা করতে।
সোলাইমান শাহের শাহাদাত আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, একাত্তরের জনযুদ্ধে কেউই নিরাপদ ছিলেন না—না কৃষক, না শ্রমিক, না পীর-ফকির। এই যুদ্ধে অবদান কেবল তাদেরই নয় যারা ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করেছেন, অবদান তাদেরও—যারা নিজেদের অবস্থানে অটুট থেকে জীবন দিয়েছেন।
আজ যখন আমরা গোলাপনগরে যাই, তখন যেন মনে রাখি, এই মাজারের প্রতিটি ইটের নিচে চাপা আছে একাত্তরের করুণ ইতিহাস। এখানকার মাটিতে মিশে আছে সোলাইমান শাহ্ ও তার ৮ সহচরের পবিত্র রক্ত।
গোলাপনগরের বাতাসে কান পাতলে আজও হয়তো শোনা যায় ইসলামের অমোঘ সত্য, ‘শহীদেরা মরে না, তারা জীবিত, কেবল আমরা তা অনুভব করতে পারি না।’