Published : 25 Oct 2025, 01:44 AM
আমি চাকরিজীবন শুরু করেছিলাম পত্রপত্রিকা দিয়ে। পূর্বদেশ, চিত্রালী, বাংলাদেশ অবজারভার। তখন অবশ্য নাম ছিল পাকিস্তান অবজারভার—এই গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের শিল্পী হিসেবে ছাত্রজীবন থেকে চাকরি শুরু করেছিলাম। এগুলোর অফিস ছিল ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে। আমি তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। সেই সময় থেকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত, খণ্ডকালীন চাকরি হিসেবে। সেই সময় থেকে সারা জীবন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে জড়িয়ে আছি কোনো না কোনোভাবে।
বাংলাদেশ হওয়ার পর দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকাটিই দৈনিক বাংলা হল। তখন দৈনিক বাংলা পকেট কার্টুন শুরু করেছিল। ছোট আকৃতির ছিল সেটা। এটা ছিয়াত্তর সালের পরের কথা বলছি। এই দৈনিক বাংলা গ্রুপেরই অঙ্গীভূত সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কার্টুন আঁকা শুরু করলাম। প্রথমে এমনিতেই আঁকা শুরু করেছিলাম। পরে ‘টোকাই’ নামে একটি চরিত্র আমি আবিষ্কার করি। তারপরে তো এটা চলতে থাকল। একসময় তো এটা খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল। বিচিত্রা যত দিন ছিল, তত দিন টোকাই করেছি। সেই সময় নানান রকম অলংকরণও করেছি, কোনো কোনো সংখ্যার প্রচ্ছদও করেছি।
টোকাই নিয়ে একটা মজার ঘটনা বেশ মনে আছে। আমাদেরই পরিচিত এক ভদ্রলোক একদিন বললেন, আপনার টোকাই বেশ জমেছে, দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, কিন্তু আপনার ড্রইংয়ের সঙ্গে কথাগুলো কার লেখা? নামটা যদি একটু বলতেন! আমি তাকে বললাম, ড্রইংটা তো রনবী করে, আর কথাগুলো রফিকুন নবীর। উনি যেহেতু আমাকে চিনতেন, ফলে আমার রসিকতাটা উনি বুঝতে পেরে হেসে উঠলেন।
দৈনিক বাংলা এবং বিচিত্রার পর আমি দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় তোয়াব খানের অনুরোধে বেশ কয়েক বছর নিয়মিত কার্টুন আঁকি। সেই কার্টুনগুলোও খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এরপর বিচিত্রার সঙ্গে আগে যারা ছিলেন, তারা পরে সাপ্তাহিক ২০০০ বের করলেন। তাদের অনুরোধে সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় আবার কার্টুন আঁকা শুরু করলাম। সেটাও যত দিন ছিল, আমি তত দিন এঁকে গেছি। এটিও যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখন অনিয়মিতভাবে কিছু কিছু কার্টুন আঁকতে থাকি।

যেমনটা আগেই বলেছি, আমার চাকরিজীবনের শুরুই হয়েছে সংবাদমাধ্যম দিয়ে। এবং দীর্ঘ একটা সময় আমি যুক্ত ছিলাম এর সঙ্গে। ফলে, সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা হয়েছে। একসময় পত্রিকাগুলো ছাপা হত স্মল পাইকা লেটারে কম্পোজ করে। তখন অলংকরণগুলো ব্লকে হত। তারপর তো ধীরে ধীরে অফসেট মেশিন এল, প্রকাশনা ও মুদ্রণের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হল। এখন তো পত্রপত্রিকা খুব ঝকঝকে, তকতকে। গেটআপ, মেকআপও খুব চমৎকার হয়। শিল্পীরা কাজ করে কম্পিউটারে, তাতে সুবিধাও অনেক। দৈনিক বাংলা এবং বিচিত্রায় যখন কাজ করতাম, তখন ট্রেসিং পেপারে সরাসরি অলংকরণ এঁকে দিতাম। তারপর সেটা ওরা ট্রান্সফার করত ক্যামেরায়। এরপর করা হত প্লেট। তার মানে, অনেক ধাপ পেরিয়ে যেতে হত। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এখন তো অনেক সহজ ও সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। পত্রপত্রিকা মানুষের কাছে সবচেয়ে আদরণীয় একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে। পত্রপত্রিকা পড়ার অভ্যাস যাদের হয়ে যায়, তারা পত্রিকা না পড়ে থাকতে পারে না।
এখন তো সংবাদমাধ্যম প্রযুক্তির বিকাশের কারণে অন্য রূপ নিয়েছে, যাকে আমরা পোর্টাল বা অনলাইন পত্রিকা বলি। এটা সংবাদপত্রেরই আরেকটি সংস্করণ: একটা হচ্ছে কাগজনির্ভর, অন্যটি পর্দা (screen)নির্ভর। কাগজনির্ভর পত্রিকার সীমাবদ্ধতা হল, এর জায়গা সীমিত, নির্দিষ্ট আয়তনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। লেখককে বলে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট শব্দসংখ্যার মধ্যে লেখাটি সীমিত রাখার জন্য, তার বেশি হলে জায়গা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনলাইনে সেই সমস্যা নেই; এটা এক বিরাট সুবিধা। যারা ইতিমধ্যে অনলাইনে অভ্যস্ত, তারা অনলাইন পছন্দ করবে। কারণ, হাতের মধ্যে ছোট্ট মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই সবকিছু এবং তৎক্ষণাৎ দেখে নিতে পারে। এটা একটা বিরাট সুবিধা। আগ্রহের সংবাদটির জন্য পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। এ ছাড়া ইচ্ছেমত ছবি, অলংকরণ, অডিও-ভিডিও দেওয়ার সুবিধা তো আছেই। তা ছাড়া আগ্রহের সংবাদটি খুঁজে বের করাও অনেক সহজ হয়ে গেছে। এ কারণে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের অন্য একটা আবেদন আছে।
তবে এতক্ষণ যা বললাম সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে, তা সে কাগজনির্ভরই হোক, আর অনলাইন মাধ্যমই হোক; এগুলো হচ্ছে এর কারিগরি বা কলাকৌশলগত দিক। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের আসল দিক বা এর প্রধান দিক হচ্ছে এর আদর্শের জায়গা, এর নীতির জায়গা এবং বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতার জায়গা। আমার মনে হয়, এই জায়গাটায় খুব বড় একটা সংকট রয়ে গেছে। প্রায় সব পত্রিকার ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে সরকার থাকে, তাদেরই মুখপত্রের মত হয়ে যায়। আমি তো সেই পাকিস্তান আমল থেকে পত্রপত্রিকাগুলো দেখে আসছি। সেই উনসত্তরের আন্দোলনই বলি, আর একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়কালই বলি, তখন কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা খুব ভালো ছিল। অনেক মুক্তকণ্ঠ ছিল, মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীন ছিল। সব কথা অকপটে বলা যেত। উনসত্তর বা একাত্তরে বেশির ভাগ পত্রপত্রিকা বাস্তব অবস্থা তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সাহসী ভূমিকা পালন করেছে। যেমন আজাদ পত্রিকা, ইত্তেফাক তখন খুব মুখ্য ভূমিকায় ছিল। দৈনিক পাকিস্তান, মর্নিং নিউজ—এগুলো তো সরকারি পত্রিকাই ছিল। তাদের পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়াটা কঠিন ছিল। কিন্তু অন্যান্য পত্রিকা অনেক মুক্তকণ্ঠ ছিল। স্বাধীনভাবে অভিমত জানাবার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল তারা। স্বাধীনতার পরে এই চিত্র অনেক বেশি পাল্টে গেছে। আজও পর্যন্ত সেই পাল্টে যাওয়া চিত্রই আমরা দেখতে পাচ্ছি।
তারপরও আশা হারাতে চাই না। আমি চাই সংবাদমাধ্যম যেন একপেশে না হয়ে যায়, যেন সরকারের মুখপত্র না হয়ে যায়। শুধু সরকারই নয়, তারা যেন কোনো গোষ্ঠীর মুখপত্র না হয়ে ওঠে। তারা যেন স্বাধীনভাবে তাদের চর্চাটা করতে পারে, তারা যেন নিরপেক্ষতা বজায় রাখে। আজকের দিনে বহু পত্রপত্রিকা শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানায়, সুতরাং কেবল সরকারি প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ থাকলে হবে না, তারা যেন তাদের প্রতিযোগী গোষ্ঠী বা সাধারণ জনগণের স্বার্থের ব্যাপারেও নিরপেক্ষ থাকে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ঊনবিংশতম বর্ষপূর্তিতে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশের প্রথম নিউজ পোর্টাল হিসেবে এর অগ্রযাত্রা ও সাফল্য অব্যাহত থাকুক—এই কামনা করি।