Published : 21 Feb 2026, 01:20 AM
গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে আমরা পৌঁছলাম পাউলুস তপ্নের বাড়িতে। পঞ্চাশ পেরোনো এক কৃষক, মুখে মাটির গন্ধ লেগে থাকা মানুষের স্বাভাবিক সংযম। তাকে অনুরোধ করলাম, নিজের ভাষা মুণ্ডারিতে সেদিনের অবস্থা একটু বলতে। দু-একটা বাক্য শুরু হতেই শব্দের ফাঁকে ফাঁকে বাংলা ঢুকে পড়ল; কিছুক্ষণ পর বাক্যগুলো আর মুণ্ডারি রইল না, হয়ে গেল পুরোপুরি বাংলা। শেষে এক চিলতে হাসি দিয়ে তিনি বললেন, “এইটাই এখন আমাদের ভাষার অবস্থা।” কথোপকথনটি হয়েছিল দেশের প্রাচীন মুণ্ডা অধ্যুষিত গ্রামগুলোর একটি, ধামইরহাটের বেগুনবাড়িতে—যেখানে ভাষা এখনো আছে ঠিকই, কিন্তু তার স্বর ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
এটা শুধু পাউলুস তপ্ন বা বেগুনবাড়ি মুণ্ডা গ্রামের ভাষিক বাস্তবতা নয়। দেশের পাহাড়ি এলাকা হোক বা সমতল—আদিবাসী অধ্যুষিত প্রায় সব গ্রামে এখন একই চিত্র চোখে পড়ে। দৈনন্দিন কথাবার্তায় নিজেদের ভাষা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে প্রভাবশালী কোনো তৃতীয় ভাষা। শুরুতে মিশ্রণ, পরে নির্ভরতা আর শেষপর্যন্ত অভ্যাসে পরিণত হয় এটা। মাতৃভাষা আটকে থাকে ঘরের ভেতর সীমিত কয়েকটি শব্দে, প্রবীণদের স্মৃতিতে কিংবা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায়। একসময় মানুষ খেয়াল করে, মাতৃভাষার বড় অংশ অজান্তেই নিজের ভেতর থেকে হারিয়ে গেছে।
বাংলাদেশে বাংলা ছাড়া আর কী কী ভাষা আছে—এই সরল প্রশ্নের উত্তরে সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক শিক্ষিত মানুষও হাতেগোনা কয়েকটির বেশি নাম বলতে পারেন না। অথচ দেশে বাংলা ছাড়া চল্লিশেরও বেশি ভাষা রয়েছে। অধিকাংশ ভাষা আলাদা সত্তা হিসেবে নয়, বরং কোনো জাতিগোষ্ঠীর নামের ছায়ায় পরিচিত, ফলে ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আড়ালে থেকে যায়। আরও উদ্বেগের বিষয়, এসব ভাষার নাম ও ভাষাভাষীদের পরিচয় অনেক সময় জেলা শহর তো দূরের কথা, রাজধানীর জনপরিসরেও দৃশ্যমান হয় না। শহর, হাট বা বাজারে তারা নিজেদের ভাষায় কথা বলেন না; বলেন বাংলা কিংবা কোনো আপাত সর্বজনবোধ্য ভাষায়—কোথাও সাদরি, কোথাও মারমা, কোথাও চাকমা। ফলে ভাষাগুলো ঘরের ভেতর, পরিবার আর প্রজন্মান্তরের সীমিত ব্যবহারে আটকে পড়ে, আর ওই সংকোচনই ধীরে ধীরে তাদের অস্তিত্ব ক্ষয় করে।
‘কতগুলো ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা সাধারণত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে মানদণ্ড ধরে ১৪টির কথা বলি। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা সংখ্যাটিকে অনেক বেশি নির্মম করে তোলে। সরকার, একাডেমিক গবেষণা বা বেসরকারি অনুমানে যে চিত্র পাওয়া যায়, বাস্তবে বিপন্নতার মাত্রা তার চেয়ে অনেক গভীর। ২০১৮ সালে পরিচালিত ‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’য় ১৪টি ভাষাকে চরম বিপন্ন বা বিলুপ্তির পথে বলা হয়েছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীর সংখ্যা গড়ে পাঁচ হাজারের নিচে। তালিকায় ছিল রেংমিটচা, চাক, সৌরা, খিয়াং, খুমি, কোল, কডা, পাত্র বা লালেং, লুসাই, পাংখোয়া, কন্দ, খাড়িয়া, মালতো ও মুণ্ডারি।
কিন্তু ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে নৃগোষ্ঠী ভাষা ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ করতে গিয়ে ভিন্ন বাস্তবতা আমাদের সামনে এসেছে। এথনোগ্রাফি ও অংশগ্রহণভিত্তিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহের সময় শুধু ভাষাগুলোর শব্দতালিকা নয়; ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহার, প্রজন্মগত ব্যবধান, ধর্মীয় রূপান্তর, বিবাহপ্রথা, শিক্ষা ও পেশাগত পরিবর্তনের প্রভাবও কাছ থেকে দেখা হয়েছে। ফলে বোঝা গিয়েছে, বিপন্নতা শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক পরিবর্তনের বহুস্তরীয় অভিঘাতের সঙ্গে জড়িত এক চলমান প্রক্রিয়া।
এই দীর্ঘ মাঠ-অভিজ্ঞতা ও গুণগত বিশ্লেষণ থেকে যা স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো বিপন্ন ভাষার সংখ্যা আর শুধু ১৪টিতে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তত ২২টি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অবশ্য এই তথ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যানভিত্তিক জরিপ থেকে আসেনি; বরং ধারাবাহিক মাঠপর্যবেক্ষণ, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং ভাষাভাষীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতা থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে এই উদ্বেগ যৌক্তিক ভিত্তি পেয়েছে। আমরা লক্ষ্য করছি, অনেক ভাষা ব্যবহারিক দিক দিয়ে ওই জনগোষ্ঠীর শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। কোথাও কেবল ষাটোর্ধ্বরা নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষা ব্যবহার করছেন। আবার কোথাও শব্দভাণ্ডারের অর্ধেকই হারিয়ে গিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে বাংলা শব্দে।
ভাষার অবস্থা বোঝাতে ইউনেসকোর একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। ওই মানদণ্ড অনুযায়ী দেশের ২২টি জাতিগোষ্ঠীর ভাষার অর্ধেকের বেশি ‘চরমভাবে বিপন্ন’ এবং বাকিগুলো ‘ভয়াবহভাবে বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত। চরমভাবে বিপন্ন তালিকায় রয়েছে, লালেং, মালতো, কুরুখ, কোল, কডা, পাংখোয়া, কোচ, খুমি, খিয়াং, চাক, ঠার, আত্তং ও মেগাম, অর্থাৎ মোট ১৩টি ভাষা। ভয়াবহভাবে বিপন্ন বলা হচ্ছে কন্দ, সৌরা, মুন্ডা, মাহালি, খাড়িয়া, রেংমিটচা, লুসাই, বম এবং গুর্খালি নামের ভাষাগুলোকে।
এর মধ্যে কন্দ, খাড়িয়া ও রেংমিটচা ভাষায় কথা বলতে পারা মানুষের সংখ্যা ৫০০-এরও কম। বিশেষভাবে খাড়িয়া ও কন্দ ভাষায় দুজন করে, আর রেংমিটচা ভাষা মোট ছয়জন ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ এই ভাষাগুলোর ধারক-বাহক এখন হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ।কন্দ, মাহালি, খাড়িয়া, কোল, কডা, কোচ, মেগাম ও গুর্খালি ভাষাগুলোর ব্যবহার মূলত বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ভাষাগুলো পৌঁছানোর সুযোগ প্রায় শূন্য। এসবের বাইরে অধিকাংশ ভাষার ব্যবহার এখন শুধু নিজ পরিবার বা কিছু নির্দিষ্ট মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বর্তমান সময়ে কোনো ভাষাকে টিকে থাকতে হলে শুধু কথা বলা বা পরিবারের মধ্যে তার ব্যবহারই যথেষ্ট নয়। ডিজিটাল মাধ্যমে দৃশ্যমান থাকা এবং অভিযোজন করা জরুরি। কিন্তু এই ২২টি ভাষার কোনোটিরই কার্যকর ডিজিটাল উপস্থিতি বা অনলাইন মিডিয়া ব্যবহার নেই। প্রায় প্রতিটি ভাষাই ডিজিটাল পরিসর বিবেচনায় প্রায় শূন্যের কোটায়। কুড়ুখ, সৌরা বা মুন্ডার মতো কিছু ভাষা এখনও পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে কথোপকথনের মাধ্যম হিসেবে টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক কাজে এগুলোর ব্যবহার নেই।
একটি ভাষা টিকে থাকার জন্য তার লিখিত রূপ থাকা আবশ্যক। অথচ অধিকাংশ ভাষারই কোনো লিপি বা স্ক্রিপ্ট নেই। লিপিহীনতার কারণে মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারও সীমিত। লালেং, কন্দ, কোল, কডা, রেংমিটচা ও মেগাম ভাষার ক্ষেত্রে লিখিত উপকরণ বা সাক্ষরতার অভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এসব ভাষা কেবল মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করছে। প্রতিটি কথার মধ্যে লুপ্ত হচ্ছে প্রজন্মের যোগসূত্র, প্রতিটি বাক্য ফিকে হয়ে যাচ্ছে নতুন চোখের সামনে। ফলে, এই ভাষাগুলো টিকে থাকা শুধু অতীতের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা নয়; এটি এক ক্রমশ হ্রাসমান অস্তিত্ব, যা সঠিক যত্ন না পেলে আগামী প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যেতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তালিকাভুক্ত ২২টি ভাষার একটিরও পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বীকৃতি নেই। ২০১৭ সাল থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা বা ককবরক, গারো ও ওঁরাও-সাদরি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষাভিত্তিক বই চালু হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে বিপন্ন অন্যান্য ভাষাগুলো রাষ্ট্রীয় নীতি বা সামাজিক পরিবর্তনমূলক উদ্যোগে তেমন জায়গা পায়নি। ফলে ভাষা সংরক্ষণ সীমিত পরিসরে আটকে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি অব্যক্ত সমস্যা—অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ই নিজের মাতৃভাষা রক্ষায় আগ্রহ দেখায় না। বিশেষ করে কন্দ বা মেগাম ভাষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সংগঠিত উদ্যোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
এটা স্পষ্ট যে, যথাযথ সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশের এই ২২টি অমূল্য ভাষা এবং এইসব ভাষাকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে পারে। সরকারের আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে বাংলাদেশের জনজাতির ভাষাগুলোর শব্দভাণ্ডার, নানাবিধ ব্যাকরণিক ফিচার, মৌখিক সাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং একইসঙ্গে কিছু ভাষার বর্ণমালা, ফন্ট ও কিবোর্ড তৈরির মাধ্যমে ডিজিটালি সংরক্ষণের কাজ এগোচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভাষাকে শুধু ডিজিটাল ভাণ্ডার বা রিপোজিটরিতে যত্নের সঙ্গে তুলে রাখলেই তা বেঁচে থাকে না। ভাষা টিকে থাকে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার, শিশুদের শেখা ও খেলাধুলা, পারিবারিক কথোপকথন এবং সামাজিক স্বীকৃতির ভেতর দিয়ে। ডিজিটাল সংরক্ষণ জরুরি। কিন্তু তা ব্যবহারের সুযোগ, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন ও সামাজিক স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত না হলে টেকসই হয় না।
বিপন্ন ভাষার সংখ্যা ১৪ থেকে ২২-এ পৌঁছনোকে নিছক একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন মনে করা আত্মঘাতী হবে। কারণ, এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট জাতিগুলোর ভাষিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, জাতিগত আত্মপরিচয় ও হাজার বছরের ঐতিহ্যিক জ্ঞানের পরম্পরা বিপন্ন হতে চলেছে। পাউলুসের নিজের ভাষায় কথা বলতে না পারার হাসিটা তাই তার আদিম সারল্যের চিহ্ন নয়, এটা তার অবচেতনে জমে থাকা জাতিগত অসহায়ত্বের প্রকাশ। তার উচ্চারণকেও একইভাবে ব্যক্তিগত আক্ষেপ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। তার বলা “এইটাই এখন আমাদের ভাষার অবস্থা”—এখন বহুবর্ণা বাংলাদেশের ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসার দৃশ্য, এদেশের বিপন্ন ভাষিক বাস্তবতার সারাংশ। অবশ্য এখনো সময় আছে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের। কিন্তু ওই সময়টা খুব বেশি নয় অবশ্যই।