Published : 02 Mar 2026, 10:59 AM
বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় আছে, যেটি আমরা বারবার ভুলে যেতে চাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। তখন হয়তো ক্ষমতাসীনরা ভেবেছিলেন, এতে রাজনৈতিক স্থিতি আসবে। কিন্তু পরিণতিতে বিচার থেমে গিয়েছিল, ন্যায় বিলম্বিত হয়েছিল, আর সমাজে একটি অদৃশ্য বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ক্ষমতায় থাকলে অপরাধের বিচার নাও হতে পারে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে আঘাত লেগেছিল সেই ক্ষত শুকাতে দুই দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল আমাদের।
আজ আবার আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি যেখানে ৫ অগাস্টের অভ্যুত্থানকালীন এবং পরবর্তী সময়ের ঘটনাগুলোর জন্য সর্বব্যাপী দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক ভাষণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে। আইনটি ১ জুলাই ২০২৪ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হয়েছে (ধারা ১(২))। অর্থাৎ এটি পেছনের ঘটনাকেও ঢেকে ফেলেছে। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে দায়ের করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নতুন মামলা দায়ের আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে (ধারা ৪(১))। সরকার যদি প্রত্যয়ন করে যে মামলা ‘গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে’ হয়েছে, তাহলে আদালত আর এগোতে পারবে না (ধারা ৪(২))। এমনকি অন্য যে কোনো বিদ্যমান আইনের ওপর এই অধ্যাদেশের বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে (ধারা ৩)। হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও সরাসরি আদালতে নয়; কমিশনের মাধ্যমে যাবে, এবং সেটি যদি ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে আদালতে মামলা চলবে না (ধারা ৫(১), ৫(৩))। এই বিধানগুলো মিলেই একটি কার্যকর দায়মুক্তির কাঠামো তৈরি হয়েছে।
আইনের ভাষা সরাসরি এবং অনেকটাই আবেগহীন শুষ্কতায় পূর্ণ, কিন্তু তার প্রভাব খুব মানবিক। আমি সম্প্রতি ভুক্তভোগী কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। এদের একজন নিহত পুলিশ সদস্যের স্ত্রী। আরেকজন রাজনৈতিক কর্মীর ভাই। একটি সংখ্যালঘু পরিবারের তরুণ বলছিলেন, “আমরা শুধু জানতে চাই কেন আমরা?”এরা জানেন, কারা এসবের পেছনে, কিন্তু দায়মুক্তির কারণে তারা অসহায়। তাদের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ নয়, কিন্তু সমস্যাটি তখনই অনেক বেশি প্রকট হয় যখন আদালতও চালিত হয় ক্ষমতার ইশারায়। এটি আমরা বারবার দেখেছি আমাদের ইতিহাসে।

নতুন সরকারের পুলিশ হত্যার পুনঃতদন্ত করতে চাওয়া নীতিগতভাবে স্বাগত জানাই। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্নটি আরেকটু জটিল। এটি কি সত্যিই সরকারের নীতিগত অবস্থান, নাকি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীকে চাপে রাখার কৌশল? গেম থিওরির আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনীতি আসলে একটি ‘বারবার প্রয়োগযোগ্য কৌশলের খেলা’ (Repeated Strategic Game)। এখানে প্রতিটি পক্ষ বর্তমান এবং ভবিষ্যতের লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে অবস্থান নেয়। দায়মুক্তি যখন দেওয়া হচ্ছিল, তখন নীরব থাকা হয়তো তাৎক্ষণিক সংঘাত এড়ানোর কৌশল ছিল, এবং তখনকার জন্য সুবিধাজনক ছিল পক্ষগুলোর জন্য। এটি তখন তাদের ‘একই’ প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার উপায় ছিল, কিন্তু এখন যখন তারা নিজেরা একে অপরের ‘প্রতিপক্ষ’ তখন পুনঃতদন্তের প্রশ্ন তুলে সরব হওয়া একটি কৌশলগত সংকেত, অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে বার্তা দেওয়া যে, খেলার নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে যদি প্রতিপক্ষ কোন কারণে অসহযোগিতা করে।
অতএব, পুনঃতদন্তের দাবি কেবল নৈতিক অবস্থান নয়; এটি ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হতে পারে। আবার এনসিপি-জামায়াতের তীব্র প্রতিক্রিয়াও একটি কৌশলগত প্রতিরোধ, যেটির মাধ্যমে তারা দেখাতে চায় যে দায়মুক্তি ভাঙলে রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হবে। ফলে পুরো পরিস্থিতিটি এক ধরনের কৌশলগত পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে প্রতিটি পক্ষ অপর পক্ষের সম্ভাব্য পদক্ষেপ অনুমান করে নিজের অবস্থান ঠিক করছে।
এ কারণেই বাংলাদেশে ‘পুলিশ হত্যার তদন্ত’ এখন রাজনৈতিক মঞ্চের উত্তপ্ত স্লোগানও বটে। রাজনীতি অনেক সময় হিসাব-নিকাশের খেলা হয়ে ওঠে। এখানে লাভ-ক্ষতির বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি পুনঃতদন্তের দাবি তুলেছে; অন্যদিকে এনসিপি-জামায়াত নেতাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্যণীয়। যদি পুলিশ হত্যার পুনঃতদন্ত হয়, তবে সম্ভাব্য দায়বদ্ধতার নেতিবাচক প্রভাব এনসিপি-জামায়াতের জন্য বাড়বে। জামায়াত এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, পুলিশ হত্যার দায়মুক্তি একটি ‘মীমাংসিত বিষয়’। অথচ হত্যাকাণ্ডের বিচার কখনো ‘মীমাংসিত’ হয় না। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সারজিস আলম ঘোষণা দিয়েছেন, পুনঃতদন্ত হলে এবং দায়মুক্তি প্রত্যাহার করা হলে তারা পুনরায় অভ্যুত্থানের ডাক দেবেন। এটি ‘ঝুঁকি বৃদ্ধির কৌশল’ (Escalation Strategy), অর্থাৎ রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে পিছু হটাতে বাধ্য করার চেষ্টা। গেম থিওরির ভাষায়, যখন সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন সংশ্লিষ্ট পক্ষ ঝুঁকি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করে। এই ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ইঙ্গিত করে যে, তদন্ত হলে তাদের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, অন্তত জনমনে এমন ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ফলে তারা তাদের রাজনৈতিক মূল্য বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে, যেমন অভ্যুত্থানের ডাক। কিন্তু এই কৌশল রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক, কারণ এতে বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক দরকষাকষির উপাদানে পরিণত হয়।
একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রশ্ন, তদন্তকে ভয় পাওয়ার কারণ কী?
এনসিপির নেতারা ‘ন্যায়ের’ পক্ষে বলছেন; আবার নিজেদের ‘পক্ষে’ দায়মুক্তি বলবৎ রাখার জন্যও জোরে কথা বলছেন। এই দ্বৈত অবস্থান শুধু নীতিগত বৈপরীত্য নয়; এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতি সরাসরি হুমকি। এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে।
যদি ৫ অগাস্টের অভ্যুত্থানে প্রাণহানির জন্য শেখ হাসিনার বিচার দাবি করা হয়, তবে একই সময়ের এবং পরবর্তী সময়ের সব হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হতে হবে। বিচার কোনো একমুখী প্রক্রিয়া নয়; এটি সমান্তরাল নৈতিক বাধ্যবাধকতা। ট্রানজিশনাল জাস্টিস তত্ত্ব অনুযায়ী, রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় সংঘটিত সহিংসতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, সমন্বিত দায়বদ্ধতা বা ‘Comprehensive Accountability’ নিশ্চিত করা, অর্থাৎ সব পক্ষের অপরাধ তদন্ত ও বিচার করা। যুদ্ধাবস্থা ছাড়া একই ‘অপরাধমূলক’ কাজের জন্য এক পক্ষের বিচার আর অন্য পক্ষের দায়মুক্তি ন্যায়বিচার নয়; সেটি ‘নির্বাচিত ন্যায়বিচার’। আইনের শাসনের স্বীকৃত মূল নীতি হলো, আইনের চোখে সবাই সমান। যদি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের আওতায় আসে, তবে একই সময়ের পুলিশ হত্যা, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নির্যাতন কিংবা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনাগুলোও সমানভাবে বিচারাধীন হতে হবে। অন্যথায় আমরা বুঝব, ক্ষমতার অবস্থান অনুযায়ী আইনের প্রয়োগ ভিন্ন।
শুধু পুলিশ হত্যার পুনঃতদন্ত করলে আর অন্য ঘটনাগুলো অমীমাংসিত রেখে দিলে বিচার আংশিক হয়ে যাবে। আবার দায়মুক্তি বহাল রেখে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা চালালে সেটিও গ্রহণযোগ্য হবে না। বিচারকে যদি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বানানো হয়, তাহলে রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। আর্জেন্টিনা প্রথমে দায়মুক্তি দিয়েছিল; পরে তা বাতিল করে বিচার করেছে। চিলিতে পিনোশের ইনডেমনিটি আন্তর্জাতিক আইনি চাপে ভেঙে পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা বা নির্বিচার দায়মুক্তি (blanket amnesty) দেয়নি; তারা সত্য-স্বীকারের শর্তে সীমিত ক্ষমার পথ নিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুও যুদ্ধাপরাধীদের সীমিত ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন; মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ এসব ছিল ক্ষমার বাইরে। প্রতিটি উদাহরণই দেখায়—হত্যা কখনও ‘মীমাংসিত বিষয়’ হয় না, যতক্ষণ না বিচার হয়।
বাংলাদেশ আজ একটি নৈতিক পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে। আমরা কি আবার দায়মুক্তির পথে হাঁটব? নাকি বলব, যে-ই হোক, যেখানেই হোক, হত্যার বিচার হবে?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তো বটেই, যেকোনো রাষ্ট্রের শক্তি তার আইন ও ন্যায়বিচার। আমরা যদি সেটি ভুলে যাই, ইতিহাস আবারও আমাদের কঠিনভাবে মনে করিয়ে দেবে, যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়মুক্তি আমাদের জন্য কঠিন সময় নিয়ে এসেছিল একদিন।