Published : 08 Nov 2025, 07:20 PM
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘বয়ান’ শব্দটি অর্থ বদলে এক ধরনের অস্ত্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। বয়ান শব্দের আক্ষরিক অর্থ বক্তব্য, বর্ণনা, বিবরণ, ব্যাখ্যা ইত্যাদি। এই অস্ত্রের সবচেয়ে দক্ষ ব্যবহারকারীদের বেশির ভাগই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোক। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে জামায়াতে ইসলামী বয়ান তৈরির রাজনীতিতে শনৈ শনৈ এগিয়ে যাচ্ছে। তারা রাজনীতির মঞ্চে নয়, বরং ফেইসবুক, ইউটিউব, এক্সের স্ক্রল-স্ক্রিনেই সক্রিয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক শূন্যতা ও বিভ্রান্তির এই সময়ে, জামায়াতে ইসলামী তাদের বয়ান-প্রচারকদের মাধ্যমে নতুন এক প্রভাববলয় গড়ে তুলছে, যা আসন্ন নির্বাচনে মারাত্মক ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মুহম্মদ ইউনূস সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আসছে বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। যদিও সরকারের পক্ষে নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে এবং রাজনীতিতে সক্রিয় সবচেয়ে বড় দল বিএনপি তাদের মনোনীত প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করে দিয়েছে, তবু যথাসময়ে নির্বাচন হবে কিনা, এ নিয়ে জনমনে ব্যাপক সংশয় কাটেনি।
নির্বাচন যখনই হোক না কেন, ঘটনাচক্রে সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তাদেরই দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী উপায়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখা শেখ হাসিনা ও তার দলের পতন এবং পলায়নের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা এমনটাই হওয়ার কথা ছিল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক বয়ান তৈরির ব্যাপারটি বেশ আলোচিত হচ্ছে। এই বয়ান প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় অনেকেই জামায়াতকে এগিয়েও রাখছেন। অনেক জরিপে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ার কথাও জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঐতিহাসিক জয়গুলোও ওই বার্তাই দিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবির্ভাবে পৃথিবীজুড়ে রাজনৈতিক প্রচারণার ধারা, পদ্ধতি ইত্যাদি পালটে গেছে, সে কথা সবাই জানে। ফলে রাজনীতিতে বয়ান প্রতিষ্ঠায় এই প্ল্যাটফর্মগুলো এখন জনগণের কাছে পৌঁছানোর শক্ত হাতিয়ার। বয়ান কারা তৈরি করেন, ওই আলোচনায় ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ শব্দটি বর্তমানে বহুল চর্চিত।
রেস্টুরেন্ট, সাবান কিংবা মেকাপের বিজ্ঞাপনের জন্য যেমন ‘সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’ আছে, তেমনি রাজনীতির বাজারেও ‘পলিটিক্যাল সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’ আছে। অন্যান্য খাতের এই লোকেদের কেউ সহজার্থে, আবার কেউ নিন্দার্থে ভ্লগার, ইনফ্লুয়েন্সার ডাকলেও আমাদের দেশে যারা সামাজিক মাধ্যমে রাজনীতির আলাপ ফেরি করেন তাদের আমরা বলি অ্যাক্টিভিস্ট, চিন্তক, বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি। যে নামেই তাদের আমরা ডাকি না কেন, কাজ হিসেবে তারা তাদের কন্টেন্টের মাধ্যমে তাদের দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের মধ্যে তাদের রাজনৈতিক চিন্তা ও বয়ানকে প্রবাহিত ও প্রভাবিত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এমন পলিটিক্যাল সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রভাব রেখেছেন। তারা কীভাবে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রচারণা ও রাজনীতির আলাপকে ফ্রেম করে বয়ান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই নিয়ে ছিল আমার স্নাতকোত্তর থিসিস। ঠিক একই ঘটনা ঘটে যাচ্ছে বাংলাদেশে। তবে, তাদের হয়তো আমরা নজর দিয়ে দেখছি না।
তাই ভাবলাম, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমে বয়ান প্রতিষ্ঠায় ‘এগিয়ে থাকা’ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে তাদের ‘পলিটিক্যাল সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’ বা ‘চিন্তক-বুদ্ধিজীবীরা’ কীভাবে বয়ান প্রতিষ্ঠা করছেন তা একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।
রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চিরায়ত রীতি অনুযায়ী নিজেদের দলকে ইতিবাচক আর প্রতিপক্ষকে নেতিবাচকভাবে উপস্থানের ব্যাপার যে কোনো রাজনৈতিক প্রচারণাতেই থাকে, সেটি এক্ষেত্রেও আছে। তবে, চিরায়ত এই বয়ানের সংস্কৃতির বাইরেও জামায়াতে ইসলামীর বয়ান প্রচারকরা বেশ কৌশলী। চতুর বললে অনেকে নেতিবাচক ধরে নেবেন, তাই আরেকটি শব্দ বলা যাক সেটি, চালাক। রাজনীতির মাঠে যে কোনো পক্ষ কৌশলী ও চালাক হতে চেষ্টা করবে সেটিই স্বাভাবিক।
জামায়াতের পক্ষে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব বয়ান রাখছেন, সেগুলোতে যেমন প্রতিপক্ষকে নিয়ে তীব্র কটাক্ষ আছে, তেমনি আছে প্রতিপক্ষের অতীত নিয়ে জনতাকে আগাম হুঁশিয়ারি, নিজের দল নিয়ে সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ আছে, আবার আছে প্রতিপক্ষের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্বের বার্তাও।
উদাহরণ হিসেবে জামায়াতপন্থী এক ‘পলিটিক্যাল সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারের’ পোস্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি প্রচারণায় সরাসরি আক্রমণ নয় বরং যুক্তিনির্ভর আলোচনার কৌশল বেছে নিয়েছেন। তার লেখায় নিজের দলের প্রতি আবেগের চেয়ে বেশি, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আছে। তার লেখা পড়লে মনে হবে, যেন একজন নিরপেক্ষ চিন্তক যুক্তি দিয়ে বিষয়ভিত্তিক মন্তব্য করছেন। কিন্তু লেখার গভীরে তাকালে দেখা যাবে, এই যুক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ফ্রেমিং।
সম্প্রতি তিনি দুই দলের দুই সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়ে লিখেছেন এবং দুটি ক্ষেত্রেই প্রায় একই রকম যুক্তি প্রয়োগ করেছেন। জামায়াতের আমির যখন কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজের সময় কমানোর ঘোষণা দিলেন, তখন তিনি প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, “জামায়াত নিজেদের প্রতিষ্ঠানে এই নীতি প্রয়োগ করে কী ফল পাচ্ছে, তা আগে দেখা দরকার।”
অন্যদিকে বিএনপি নেতা তারেক রহমান সম্পর্কে যখন বলা হলো, “তিনি দেশে ফিরলেই দেশ বদলে যাবে”, তখন তিনি পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, “লন্ডনে অবস্থানকালে লন্ডন বিএনপিতে কী পরিবর্তন এসেছে?” দুই উদাহরণেই তিনি বলতে চাইছেন, বড় বড় দাবি শোনার আগে নিজের ঘরে বাস্তব ফলাফল দেখতে হবে।
কিন্তু মূল বিষয়টি শুধু তার এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিভিত্তিক আলোচনাতে নয় বরং তিনি কোন ঘটনা কীভাবে ফ্রেম করেছেন সেখানে। যোগাযোগে কোনো বার্তার প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করে সেটি ‘কোন দৃষ্টিকোণ থেকে’ উপস্থাপন করা হচ্ছে তার ওপর। ‘ফ্রেমিং থিওরি’-এর এই ধারণার ওপর ভর করে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার যোগাযোগবিদ শান্ত ইয়েনগার দেখিয়েছেন, রাজনীতি বা সংবাদ সাধারণত দুটি উপায়ে ফ্রেম তৈরি করে—এপিসোডিক ও থিমেটিক।
এপিসোডিক ফ্রেমিং হলো নির্দিষ্ট ঘটনা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক উপস্থাপন, যেখানে দায় বা মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয় কোনো একটি ঘটনায়। এতে দর্শক ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখে, আর বৃহত্তর কাঠামোগত কারণ অদৃশ্য থেকে যায়।
অন্যদিকে, থিমেটিক ফ্রেমিং হলো সেই ঘটনাকে সামাজিক বা নীতিগত প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা, যেখানে মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে সমস্যার মূল কাঠামো বা সংস্কৃতি।
জামায়াতপন্থী ওই ইনফ্লুয়েন্সার নিজের দলের প্রসঙ্গে এপিসোডিক ফ্রেমিং ব্যবহার করেছেন। তিনি জামায়াতের আমিরের বক্তব্য নিয়েছেন একটি আলাদা উদাহরণ হিসেবে এবং তার লেখার ভেতর দিয়ে জামায়াতে যে দলের ভেতরে প্রশ্ন তোলা, যুক্তিনির্ভর পর্যালোচনা ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি আছে, এই ধারণা তৈরি করেছেন।
কিন্তু প্রতিপক্ষ বিএনপির ক্ষেত্রে তিনি ফ্রেম বদলে ফেলেছেন। সেখানে ব্যবহার করেছেন থিমেটিক ফ্রেমিং। তারেক রহমানের মন্তব্য বা নেতৃত্বের ধরনকে তিনি শুধু একটি বক্তব্য হিসেবে দেখেননি, বরং বিএনপির নেতৃত্বসংস্কৃতির ব্যর্থতা ও ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে এক ব্যক্তির বক্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা।
এই দুই বিপরীত ফ্রেমিংয়ের মিশ্রণই তার কৌশলের মূল শক্তি। নিজের দলের সমালোচনায় তিনি যুক্তির মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করছেন, আর প্রতিপক্ষের সমালোচনায় ওই বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের কাঠামোগত ত্রুটির ছবি আঁকছেন। পাঠকের মানসপটে তিনি হয়ে উঠছেন একজন নিরপেক্ষ বিশ্লেষক। কিন্তু তার বার্তার ভেতরে সূক্ষ্মভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এক রাজনৈতিক অবস্থান। যুক্তির মুখোশে তিনি আসলে মতাদর্শের গল্পই বলছেন। যেখানে দলের প্রধানের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে নিজেকে সৎ দেখানো, আর উত্তর চাওয়া মানে প্রতিপক্ষকে সন্দেহের গহ্বরে ঠেলে দেওয়া।
আবার একই দলের আরেক ‘পলিটিক্যাল সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’ বিএনপি নেতাদের ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ও অপরাধের প্রসঙ্গ টেনে আনছেন, বিশেষ করে যারা মনোনয়ন পেয়েছেন। কে ভালো আর কে মন্দের আলোচনা সেখানে স্পষ্ট। প্রতিপক্ষকে তিনি কোথাও চাঁদাবাজ বলছেন, কোথাও বলছেন ভণ্ড। আবার প্রতিপক্ষের এক সম্ভাব্য প্রার্থী ‘শুধু দাড়ি রাখেন ও নামাজ পড়েন’ বলে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, বলে দাবি করছেন। অর্থাৎ বিএনপিকে এমন দল হিসেবে দেখাচ্ছেন যেখানে ভালো, ধার্মিক বা নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষের ঠাঁই নেই।
এই ইনফ্লুয়েন্সারের বক্তব্য রাজনীতির বয়ানে প্রতিপক্ষ নিয়ে চিরায়ত ‘নেগেটিভ ফ্রেমিং’-এর মাধ্যমে বয়ান প্রতিষ্ঠার ধারা ধরে রাখলেও, আরেক ধারার ইনফ্লুয়েন্সার আছেন যারা আবার বিএনপি কোথায় ভুল করছে এবং সম্ভাব্য কী কারণে বিএনপি ভোটের হিসাবে ‘ধরা’ খেতে পারে সেই আলোচনা তুলছেন। ওই ফ্রেমিংকে আমি বলছি ‘আহারে’ ফ্রেমিং। মানে হলো, এই ধরুন আপনার শত্রু কোনো এক সিদ্ধান্ত নিল বা কাজ করল, যা তাকে বিপদে ফেলতে পারে। এবার আপনি মনে মনে খুশি হলেও জনসম্মুখে এসে বলছেন, “আহারে অমুক যদি এই ভুলগুলো না করত”।
জামায়াতের ইনফ্লুয়েন্সাররা বয়ান প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য হারে এই ‘আহারে’ ফ্রেমিংকে বেছে নিয়েছেন। যাকে আমরা ভদ্রভাবে ‘স্যুডো-এম্প্যাথেটিক ফ্রেমিং’ বা ‘ছদ্ম-সহানুভূতিমূলক ফ্রেমিং’ বলতে পারি। যেখানে সহানুভূতির আড়ালে প্রতিপক্ষকে নির্বোধ, বিশৃঙ্খল হিসেবে দেখানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
যেমন, তারা লিখছেন, বিএনপি তার অন্তর্কোন্দল থামাতে পারছে না, এই কোন্দল, মনোনয়ন-বঞ্চিতদের সমর্থকদের বিক্ষোভ, বিদ্রোহী প্রার্থী এগুলো বিএনপিকে ডোবাবে। প্রতিপক্ষকে সরাসরি আক্রমণ না করে, এক ধরনের মায়াভরা তাচ্ছিল্যের ভাষায় তাদের উপস্থাপন করা হচ্ছে। যেমন, “ফজলুর রহমানরে এই দল নমিনেশন দিল! আহারে বিএনপির কী হবে!” অথবা “জাকির খান বিএনপি করে, আহারে বিএনপির কী হবে।”
এই যে, কৃত্রিম সহানুভূতির পেছেনে মিশে থাকা উপহাস, এর উদ্দেশ্য ফজলুর রহমান, জাকির খান কিংবা বিশৃঙ্খল আসনগুলোতে বিএনপির প্রতি সমর্থন টলিয়ে নিজেরা জেতা নয়। বরং, নিজেদের দলের কর্মপদ্ধতি জনগণের চোখের বাইরে রেখেও এই বয়ান তৈরি করা যে, আমরা রাজনৈতিকভাবে সঠিক জায়গায় খুঁটি গাড়া দল আর আমাদের প্রতিপক্ষ লাইনচ্যুত হয়ে গেছে। আবার আমাদের রাজনৈতিক মানসিকতা এতই ভাল যে, “তাদের জন্য আমাদের অনেক মায়া”।
আবার এসবের সঙ্গে তারা লাইন যুক্ত করে বলে দিচ্ছেন, যে এগুলো ‘জামায়াতকে সুবিধা দেবে’। অর্থাৎ তাদের এই বয়ান প্রতিষ্ঠা আর তারা যে জামায়াতের সুবিধা নিয়ে ভাবেন সেগুলো দলের সামনে ধরে ধরে দেখিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিতও সেখানে আছে।
আবার আরেক ধারার ইনফ্লুয়েন্সাররা নিচ্ছেন ভয়-নির্ভর রাজনৈতিক বয়ানের কৌশল। যেখানে তারা যুক্তির ছদ্মবেশে সাধারণ ভোটারের মনস্তত্ত্বে একটা আগাম ভীতি ঢুকিয়ে রাখছেন। নানা উদাহরণ আর সম্ভাবনার কথা বলে তারা এটি স্পষ্ট করতে চাইছেন যে, বিএনপি একটি সম্ভাব্য ‘স্বৈরাচার’ হতে চলেছে। তাদের পোস্টগুলোতে নিজেদের বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করতে কখনও কখনও পরিসংখ্যান বা তথ্যের উল্লেখ করা হচ্ছে। যদিও সেগুলো যাচাই করা কঠিন। যেমন, তারা বলছেন, গত ১৫ মাসে ‘বিএনপি কতখানি অপরাধ করেছে’ তার পরিসংখ্যান আছে, কিংবা ‘ব্যবসায়ীরা কতটা বিরক্ত’ তার বাস্তব চিত্র না দেখলে বোঝা যাবে না। এসব দাবি পাঠকের মনে একটা বস্তুনিষ্ঠতার আবহ সৃষ্টি করছে। বাস্তবে তথ্যের উৎস না দিলেও, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘প্রমাণ আছে’ বলে বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
এসবের বাইরে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এই প্রচারকরা জামায়াতের ‘ধর্মীয় অবস্থান’, ‘সততা’, ‘ত্যাগ’, ‘দলের ভেতরকার গণতন্ত্রচর্চা’ ইত্যাদি তুলে ধরে নৈতিকভাবে জামায়াতকে একটি উঁচু আসনে বসাচ্ছেন।
যেমন, ‘জামায়াতের নেতারা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হচ্ছেন’, তারা ‘ইবাদতের অংশ মনে করে রাজনীতি করেন’, ‘দাড়ি-টুপিওয়ালা ধার্মিক ব্যক্তি জামায়াতেই মানায়’ ইত্যাদি উদাহরণের ভেতর দিয়ে তারা দলটির আদর্শিক পবিত্রতার একটি ইমেজ তৈরি করছেন। এর বিপরীতে বিএনপিকে ‘চোর’, ‘মুনাফেক’, ‘দুর্নীতিবাজ’, ‘বিশ্বাসঘাতক’, ‘অধৈর্য’, ‘ক্ষমতালোভী’ ইত্যাদি বিশেষণে অভিহিত করে নৈতিকভাবে নিচ হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
চালাকিই বটে, তবে কৌশলী চালাকি। রাজনীতি বয়ানে এটুকু চালাকি কতটা ভালো বা মন্দ তা মাপার দায় কিংবা অধিকার কেবলই পাঠকের।