০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

সন্দেহের ভিত্তিতে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে বহিষ্কার নয়: কলকাতা হাই কোর্ট

১৯৭০-এর দশক থেকে কত মানুষ সীমান্ত পার হয়ে এসেছে, তাদের সবাইকে ধরে ফেরত পাঠানো কি আদৌ বাস্তবসম্মত কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত।

সন্দেহের ভিত্তিতে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে বহিষ্কার নয়: কলকাতা হাই কোর্ট

কলকাতা হাই কোর্ট। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 09 Oct 2026, 08:18 PM

Updated : 09 Oct 2026, 09:06 PM

আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং কেবল সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে কাউকে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে দেশ থেকে বের করে দেওয়া যাবে না বলেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হাই কোর্ট।

বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সহিদুল হক নামে রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার এক বাসিন্দাকে দুই মাস ধরে আটকে রাখা ও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ দায়ের করা একটি আবেদনের শুনানিতে বৃহস্পতিবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য এ কথা বলেন।

শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ লিখেছে, সহিদুল হকের স্ত্রী ‘ফরেনার্স রিজিয়নাল রেজিস্ট্রেশন অফিস বা এআরআরও এর জারি করা ডিপোর্টেশন আদেশ এবং তার স্বামীর আটকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন।

এর প্রেক্ষিতে শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, সহিদুল হকের ওই বহিষ্কারাদেশ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কোনো নাগরিককে জোরপূর্বক বহিষ্কারের মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ ও সময় দেওয়া উচিত।”

শুনানিতে আদালত জানতে চায়, সহিদুলকে কেন গত দুই মাস ধরে আটকে রাখা হয়েছে এবং তার জাতীয়তা ও পরিচয় নির্ধারণে কর্তৃপক্ষ কেন ‘স্পষ্ট ও প্রদর্শনযোগ্য আইনি প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করেনি।

রিট আবেদনকারীর আইনজীবী রবিউল ইসলাম আদালতকে বলেন, তার মক্কেলকে গত ৮ অগাস্ট থেকে আটকে রাখা হয়েছে, যার একমাত্র ভিত্তি ছিল কয়েকজন প্রতিবেশীর দেওয়া মৌখিক অভিযোগ ও সন্দেহ।

এর পরেই বিচারক সৌগত ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, কেবল এ ধরনের অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে কীভাবে একজনের জাতীয়তা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব?

পরে সীমান্ত অঞ্চলের বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এ বিচারপতি বলেন, ১৯৭০-এর দশক থেকে কত মানুষ সীমান্ত পার হয়ে এসেছেন? তাদের সবাইকে ধরে ফেরত পাঠানো কি আদৌ বাস্তবসম্মত বা সম্ভব?

হাই কোর্ট বলেছে, কেবল মানুষের মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে কাউকে অনুপ্রবেশকারী বলা যায় না। যে কোনো ব্যক্তিকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সঠিকভাবে পরীক্ষা করে দেখা।

তবে রাজ্য সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে যুক্তি দেন, ওই ব্যক্তি জালিয়াতি করে আধার, প্যান ও ভোটার কার্ডের মত গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় নথি সংগ্রহ করেছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

কিন্তু সরকারের পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য ধোপে টেকেনি। বিষয়টির সার্বিক সংবেদনশীলতা ও উপযুক্ত বিচারিক একতিয়ারের কথা বিবেচনা করে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেন, যাতে এটি বিষয়ভিত্তিক উপযুক্ত বেঞ্চে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। উপযুক্ত বেঞ্চ শুনানি না করা পর্যন্ত সহিদুলের বহিষ্কারের আদেশ স্থগিত থাকবে বলেও রায় দেন তিনি।

নাগরিকত্ব, পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকা নিয়ে ভারতে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্কের মধ্যে হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ এল। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।

রাজ্যের বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, বিজেপিকে সুবিধা দিতে বিপুলসংখ্যক প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নাম বাদ পড়া অনেক মানুষ সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং অবৈধ নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বহিষ্কারের আশঙ্কায় রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসআইআর প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে বিবেচিত ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে।