যেভাবে কাঠের তৈজসপত্রের যত্ন নিলে টেকে বেশি দিন
জোরে ঘষে পরিষ্কার করলে কাঠের জিনিসে দাগ পড়ে যায়। ফলে সেখানে জীবাণু তৈরির সম্ভাবনা বাড়ে।
কাঠের বাটি, চামচ, খুন্তি, কাটিং বোর্ড, ট্রে বা পরিবেশনের পাত্র ব্যবহারে যেমন নান্দনিকতা আসে, তেমনি খাবার পরিবেশনেও তৈরি হয় আলাদা আবহ।
তবে কাঠের তৈরি এসব জিনিসের যত্ন নিতে হয় একটু বুঝেশুনে। অতিরিক্ত পানি, দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখা, ঠিকমতো না শুকানো বা ভুল পরিষ্কার করার পদ্ধতিতে কাঠ ফুলে যেতে পারে, ফাটল ধরতে পারে, এমনকি ছত্রাকও জন্মাতে পারে।
ব্যবহারের পরপরই পরিষ্কার
গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসমিয়া জান্নাত বলেন, “কাঠের পাত্র বা চামচ ব্যবহারের পর দীর্ঘক্ষণ এঁটো অবস্থায় ফেলে রাখা ঠিক নয়। বিশেষ করে তেল, ঝোল, মসলা বা মিষ্টিজাতীয় খাবার লেগে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো।”
প্রথমে নরম কাপড় বা কাগজ দিয়ে বাড়তি খাবার মুছে ফেলতে হবে। এরপর কুসুম গরম পানি ও অল্প মৃদু থালা-বাসন ধোয়ার সাবান দিয়ে নরম স্পঞ্জের সাহায্যে আলতো করে ঘষে পরিষ্কার করাই সঠিক উপায়। তারপর পরিষ্কার পানি দিয়ে সাবান ধুয়ে ফেলতে হবে।”
তবে কাঠের গায়ে শক্ত ব্রাশ, ধাতব মাজুনি বা ধারালো কিছু দিয়ে ঘষা যাবে না। এতে উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ছোট ছোট আঁচড় তৈরি হতে পারে।
“এসব আঁচড়ে খাবারের কণা ও ময়লা জমে থাকার আশঙ্কাও থাকে। পরিষ্কারের সময় কাঠের স্বাভাবিক গঠন অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করাই স্বাস্থ্যকর উপায়, বলেন এই অধ্যাপক।
গরম পানি ও সাবান পানিতে দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে রাখা যাবে?
কাঠের তৈজসপত্র পরিষ্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এগুলোকে দীর্ঘক্ষণ পানিতে ডুবিয়ে রাখা যাবে না।
গরম পানি বা সাবান পানিতে ভিজিয়ে রাখলে কাঠ পানি শোষণ করে ফুলে যেতে পারে। পরে শুকানোর সময় সংকুচিত হয়ে ফাটল ধরতে পারে বা জোড়া আলগা হয়ে যেতে পারে।
অতিরিক্ত গরম পানি কাঠের ওপরের প্রলেপ বা তেলের স্তরও নষ্ট করতে পারে।
তাই বাসন ধোয়ার পাত্রে অন্য তৈজসপত্রের সঙ্গে কাঠের জিনিস ডুবিয়ে না রেখে আলাদাভাবে দ্রুত পরিষ্কার করা উচিত।
কুসুম গরম পানিতে সাবান মিশিয়ে স্পঞ্জ ভিজিয়ে নেওয়া যায়, তবে কাঠের পাত্রটি সেই পানিতে ডুবিয়ে রাখা উচিত নয়। পরিষ্কার করার পর সাবানের অবশিষ্টাংশ ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে, না হলে সাবানের গন্ধ কাঠে বসে যাবে।
শুকানোর সঠিক পদ্ধতি
কাঠের তৈজসপত্র পরিষ্কারের পর শুকানোর বিষয়টিও অবহেলার নয়। প্রথমে পরিষ্কার, শুকনো ও শোষণক্ষম কাপড় দিয়ে পানি মুছে নিতে হবে। এরপর বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় পাত্রটি রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেন, তাসমিয়া জান্নাত।
বাটি হলে উল্টো করে এমনভাবে রাখতে হবে যাতে ভেতরে পানি আটকে না থাকে। কাঠের চামচ বা খুন্তি হলে যাতে দুই পাশেই বাতাস লাগে সে ব্যবস্থা করতে হবে।
কাঠের জিনিস ভেজা অবস্থায় বন্ধ আলমারি, ড্রয়ার বা ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা স্বাস্থ্য সম্মত না। এতে আর্দ্রতা আটকে থেকে দুর্গন্ধ ও ছত্রাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আবার সরাসরি কড়া রোদে দীর্ঘক্ষণ রাখা বা আগুন, চুলা ও অতিরিক্ত তাপের কাছে শুকানোও ঠিক নয়।
অতিরিক্ত তাপে কাঠের আর্দ্রতা দ্রুত কমে গিয়ে ফাটল ধরতে পারে। পুরোপুরি শুকানোর পরই জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখতে হবে।
কত দিন পরপর গভীরভাবে পরিষ্কার উচিত?
কাঠের তৈজসপত্রের গভীরভাবে পরিষ্কারের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময়সূচি প্রযোজ্য নয়। কত ঘন ঘন ব্যবহার হচ্ছে, কী ধরনের খাবার রাখা হচ্ছে এবং ব্যবহারের পর কতটা ভালোভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে এসবের ওপরই বিষয়টি নির্ভর করে।
তাই প্রতিবার ব্যবহারের পর সাধারণভাবে পরিষ্কার করাই উপযুক্ত। আর নিয়মিত ব্যবহৃত কাঠের কাটিং বোর্ড, চামচ ও খুন্তিতে তেলতেলে ভাব, দুর্গন্ধ বা মসলার আস্তরণ জমলে প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়তি যত্ন আবশ্যক হয়ে ওঠে।
তবে সপ্তাহে একবার বা মাসে একবার গভীর পরিষ্কার করা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।
কাটিং বোর্ডে কাঁচা মাংস, মাছ বা ডিম কাটলে খাবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তাসমিয়া জান্নাত বলেন, “ব্যবহারের পরপরই সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার এবং সম্পূর্ণ শুকিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। কাঠের বোর্ডে গভীর ফাটল, স্থায়ী দুর্গন্ধ বা এমন দাগ তৈরি হলে যা পরিষ্কার করা যাচ্ছে না, সেটি বদলে দেওয়াই নিরাপদ।”
মসলার হলুদ দাগ দূর করবেন যেভাবে
রান্না ও পরিবেশনের ফলে হলুদ, মরিচ, জিরা বা অন্যান্য মসলার রং কাঠের গায়ে লেগে যেতে পারে। বিশেষ করে হলুদের দাগ সহজে চোখে পড়ে। দাগ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার করলে তা দূর করা তুলনামূলক সহজ হয়।
প্রথমে সাধারণ সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। এরপরও দাগ থাকলে অল্প বেইকিং সোডার সঙ্গে কয়েক ফোঁটা পানি মিশিয়ে হালকা পেস্ট তৈরি করা যেতে পারে।
নরম কাপড় দিয়ে দাগের জায়গায় খুব আলতোভাবে ঘষে পরে ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে।
তবে এই পদ্ধতি ব্যবহারের আগে পাত্রের অল্প জায়গায় পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। কারণ সব কাঠের ধরন ও ওপরের প্রলেপ এক রকম নয়। বেশি জোরে ঘষলে কাঠের রং বা প্রলেপ উঠে যেতে পারে।
এছাড়া দাগ দূর করতে ব্লিচ, শক্ত রাসায়নিক পরিষ্কারক বা অতিরিক্ত ঘষামাজা ব্যবহার করা যাবে না। দাগ পুরোপুরি না উঠলেও যদি পাত্রটি পরিষ্কার, দুর্গন্ধমুক্ত ও অক্ষত থাকে, তাহলে শুধু রংয়ের দাগের কারণে অতিরিক্ত ঘষার প্রয়োজন নেই।
দুর্গন্ধ দূর করতে
কাঠের চামচ বা বোর্ডে পেঁয়াজ, রসুন, মাছ বা মসলার গন্ধ থেকে যেতে পারে। প্রথমে সাবান ও পানি দিয়ে পরিষ্কার করে পুরোপুরি শুকিয়ে নেওয়া জরুরি। গন্ধ থেকে গেলে অল্প বেইকিং সোডা পানির সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কাঠের গায়ে পেস্ট দীর্ঘক্ষণ লাগিয়ে ফেলে রাখা যাবে না।
লেবুর রস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা ভালো। অ্যাসিডিক উপাদান কিছু কাঠের প্রলেপ বা উপরিভাগের রংয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সব ধরনের কাঠের তৈজসপত্রে একই পরিষ্কারক ব্যবহার করা উচিত নয়।
দুর্গন্ধ যদি পরিষ্কারের পরও থেকে যায়, বিশেষ করে কাঠের ভেতরে ছত্রাকের দাগ বা গভীর ফাটল থাকলে, সেটি খাবারের কাজে ব্যবহার না করাই ভালো।
