২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

শীতের আগেই গাবতলী-কল্যাণপুর সড়কে ধুলার ভোগান্তি

“প্রতিদিন দীর্ঘ সড়কে পানি ছিটাতে হলে অতিরিক্ত জ্বালানি লাগবে। বর্তমানে তেলের দামও অনেক বেশি। বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে,” বলেন ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা।

শীতের আগেই গাবতলী-কল্যাণপুর সড়কে ধুলার ভোগান্তি

রাজধানীর গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল মোড় হয়ে কল্যাণপুর পর্যন্ত সড়কে ধুলাবালির কারণে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

সাখাওয়াত সুপন কৌশিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Oct 2026, 11:22 PM

Updated : 27 Oct 2026, 11:22 PM

আবর্জনা আর বালুবাহী ট্রাক চলাচল ছাড়াও নির্মাণসামগ্রী ইট-খোয়া-বালু ফেলে রাখার কারণে রাজধানীর গাবতলী থেকে কল্যাণপুর পর্যন্ত সড়কে ধুলায় ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

আন্তঃজেলা বাস ছাড়াও সবরকমের যানবাহন চলে ওই সড়কে। ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই পথে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই চলতে হচ্ছে নাক-মুখ-ঢেকে।

পানি ছিটিয়ে ওই সড়ক পরিষ্কার রাখার পরিকল্পনার কথা বললেও জ্বালানি খরচ নিয়েও ভাবছে নগর কর্তৃপক্ষ। আর দূষণের মূল উৎস খুঁজে সেখানে কাজ করার কথা বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

‘গাড়ি গেলেই ধুলা উড়ে’

গাবতলী এলাকায় রিকশা চালান রফিকুল ইসলাম। দিনের বেশিরভাগ সময়ই সড়কে থাকতে হয় তাকে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গাড়ি গেলেই ধুলা উড়ে। মাঝে মাঝে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কাশিও আসে। কিন্তু রিকশা চালানো বন্ধ রাখলে তো আয় হবে না।”

টেকনিক্যাল মোড়ের কাছাকাছি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব আবদুল হক বলেন, “হাঁটতে বের হলে ধুলা নাকে-মুখে লাগে। তখন শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এখন তো আগের মতো বয়স নাই। অল্পতেই নানারকম সমস্যা দেখা দেয় শরীরে।”

টেকনিক্যাল মোড়ের কাছে ফুটপাতের দোকানি আবদুল কাদের বলেন, ধুলায় দোকানের পণ্য বারবার পরিষ্কার করতে হয়। ক্রেতারাও অস্বস্তি বোধ করেন। তারা ধুলা লাগা জিনিস দেখলে নিতে চান না।”

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নাসরিন আক্তারের কথায়, “মাস্ক ব্যবহার করলেও সবসময় স্বস্তি পাই না। গাড়ি পাশ দিয়ে গেলেই সারা শরীরে ধুলা লাগে। পরিষ্কার কাপড়ে বাসা থেকে বের হয়ে অফিস পর্যন্তও যাওয়া যায় না।”

আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী জালাল উদ্দিন বলেন, “ঢাকায় তো সারা বছরই ধুলা। শীতের শুরু থেকে ধুলা আরও বাড়তে থাকে। এখন অক্টোবর, সামনে শীত আসছে। সামনে ধুলার ভোগান্তি বাড়বে আরও বেশি, যদি না ভালোমতো পথঘাট নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়।”

দূষিত শহরের তালিকায় তিন-চারে ঢাকা

বায়ুমান সূচকে (একিউআই) প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকার ওপরের দিকেই থাকে ঢাকার নাম। কখনও শীর্ষেও উঠে যায়।

রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় ১৭৬ স্কোর নিয়ে বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় ১৬৮ স্কোর নিয়ে ছিল চতুর্থ অবস্থানে।

একিউআই স্কেল অনুযায়ী, এ দুদিন ঢাকার বাতাসের মান ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’, যা নির্দেশ করে বাতাসে ভাসমান দূষণকারী উপাদানের ঘনত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

একিউআই স্কেলে স্কোর ১০১ থেকে ১৫০ এর মধ্যে থাকলে বাতাসের মান ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’। স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে তা ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১ এর বেশি হলে তা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে ধরা হয়, যা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

‘নিয়মিত পরিষ্কার রাখা কঠিন’

ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “কল্যাণপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত সড়কটি রোড সুইপার (বাহন) দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা কঠিন। এ সড়কে ময়লা ও বালুবাহী ট্রাক চলাচল করে। এসব ট্রাক থেকে প্রতিদিন সড়কে ময়লা ও বালি পড়ে। ফলে একবার পরিষ্কার করার পরও আবার সড়ক নোংরা হয়ে যায়।”

তিনি বলেন, “আমি কল্যাণপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত রোড সুইপার অবশ্যই ব্যবহার করব। তবে পুরো সড়ক নিয়মিত পরিষ্কার করা যায় না। এখানে ময়লা-বালির ট্রাক চলে, তারা প্রতিদিন ময়লা করে। তারপরও শীত মৌসুমে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা চালানোর চেষ্টা করব।”

সড়কে পানি ছিটানোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “দুই-তিন দিন পরপর ওয়াটার ব্রাউজার দিয়ে পানি ছিটানোর চেষ্টা করব। বিশেষ করে দিনের বেলায় পানি ছিটানোর চেষ্টা করব। শ্রমিকদেরও বলব যেন বালিগুলো পরিষ্কার করে।”

ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পানি ছিটিয়ে ধুলাবালি কমানোর পরিকল্পনা আছে। ওয়াটার ব্রাউজার দিয়ে পানি ছিটালে ধুলাবালি কমবে। কিন্তু এতে জ্বালানি খরচ অনেক বেশি হবে।

“প্রতিদিন দীর্ঘ সড়কে পানি ছিটাতে হলে অতিরিক্ত জ্বালানি লাগবে। বর্তমানে তেলের দামও অনেক বেশি। বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। রোড সুইপার মেশিনে অনেক তেল লাগে। তাই পানি ছিটানোর পরিকল্পনা থাকলেও কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।”

তিনি বলেন, “আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিদিন ওই মেশিন ব্যবহার করে নিয়মিত পানি ছিটানো, সুইপিং করা বাস্তবসম্মত না। সেই সক্ষমতাটা আসলে নেই। এগুলো কেউ প্রকাশ্যে বলবে না। তাই দিনশেষে ধুলাবালি থেকেই যাবে।”

ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদও বলছেন, “প্রচুর জ্বালানি লাগে সত্যি। তবে রোড সুইপার যন্ত্রের সংখ্যা বাড়ানো গেলে একবার পরিষ্কারের পর কয়েক দিন সড়কটি তুলনামূলক পরিষ্কার রাখা সম্ভব হতে পারে।”

জ্বালানি খরচ কমাতে বিকল্প যন্ত্রপাতি বিবেচনায় নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এমন কিছু খুঁজছি, যেটা দিয়ে সহজে কাজ করা যায়। এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেলচালিত যানবাহন ও যন্ত্রপাতিতে প্রচুর জ্বালানি খরচ হয় এটা সত্যি। সহজে ব্যবহার করা যায়, এমন বিকল্প যন্ত্রপাতি পেলে খরচ কমে আসবে।”

দূষণের উৎস কামনোর ওপর জোর

সড়কে ধুলাবালির কারণগুলো খুঁজে বের করে সেখানে কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। বায়ু দূষণ রোধে নির্মাণকাজে তদারকির কথা বলছেন তারা।

পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ সামগ্রিক বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ নির্মাণকাজ। আর নির্মাণকাজের মাধ্যমে দূষণ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশীদার সরকার নিজেই।

“নির্মাণকাজের অধিকাংশ চুক্তিতে আইনগত বিধান অনুযায়ী জনভোগান্তি রোধে যাবতীয় করণীয় প্রতিপালনের বিষয়টি ঠিকাদারের জন্য বাধ্যতামূলক থাকে। নির্মাণকাজের কারণে জনদুর্ভোগ ও জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদার- উভয়েরই দায় রয়েছে।”

তিনি বলেন, “শাস্তিযোগ্য অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত না করার জন্যেই আজকের এই প্রবল অরাজক অবস্থা। সরকার যদি জনস্বাস্থ্য এবং একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শ্বাসপ্রদাহ, বিকলাঙ্গতা থেকে মুক্তি দিতে চায়, তাহলে সেই দায়িত্ব সরকারের পালন করা উচিত এবং শাস্তির মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু সড়কে পানি ছিটানো বা পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জ্বালানিচালিত থেকে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর যথেষ্ট নয়। সড়ক ও আশপাশে ছড়িয়ে থাকা বালি, ইটের গুঁড়া ও নির্মাণসামগ্রীর ধুলা নিয়ন্ত্রণসহ সামগ্রিকভাবে দূষণের উৎসগুলো কমাতে হবে।

“একাধিক উৎস থেকে দূষণ হচ্ছে। শুধু পানি স্প্রে করলেই আমরা সুফল পাব, বিষয়টা এমন নয়। আমাদের দূষণের উৎসগুলো কমাতে হবে। উৎসগুলো কমাতে না পারলে এভাবে সমস্যার সমাধান করা যাবে না।”

বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বিষয়ে এ অধ্যাপক বলেন, “জ্বালানিচালিত যন্ত্রপাতির বদলে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে। তবে এ পরিবর্তন একবারে সম্ভব নয়।”

বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কেনার আগে সেগুলোর কার্যকারিতা, পরিচালন ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

“যে যন্ত্রপাতিগুলো আমরা নিয়ে আসব, সেগুলোর কার্যক্রম কেমন, রক্ষণাবেক্ষণ কেমন, জীবনচক্র কেমন, সেগুলো আগে চিন্তা করতে হবে। দেখা গেল, আমি যন্ত্রপাতি নিয়ে এলাম, কিন্তু সেগুলো পড়ে থাকল। দেশে অনেক কিছুই আসে, পরে আর ব্যবহার করা হয় না।”

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “দুটি কাজ পাশাপাশি চলতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে আসার পাশাপাশি দূষণের উৎস কমানোর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চাইলে উৎস কমাতেই হবে।”