০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

রোদের ছোঁয়ায় সুস্থ দীর্ঘায়ু

সুস্থ থাকতে প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ৩০ মিনিট রোদ পোহানো যথেষ্ট।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Nov 2026, 01:08 PM

Updated : 04 Nov 2026, 01:08 PM

দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকা বা দীর্ঘায়ু পাওয়ার কথা উঠলেই সাধারণত পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং গভীর ঘুমের কথাই বলা হয়।

তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও দীর্ঘায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রচলিত অভ্যাসের বাইরেও আরেকটি প্রয়োজনীয় উপাদান প্রায়ই অবহেলা করা হয়, তা হলো ‘সূর্যালোক’ বা প্রতিদিন কিছুটা সময় রোদে কাটানো।

সঠিক নিয়ম মেনে পরিমিত মাত্রায় সূর্যের আলো গ্রহণ করা শরীরকে রোগমুক্ত রাখতে এবং গড় আয়ু বাড়াতে ঠিক ততটাই ভূমিকা রাখে, যতটা ভালো ডায়েট বা শরীরচর্চা করে থাকে।

জীবনযাপন-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘অ্যান্টি-এইজিং’ ও ‘রিজেনারেটিভ মেডিসিন’ বিশেষজ্ঞ ডা. সাবরিনা সোল্ট বলেন, “মানবদেহ প্রাকৃতিকভাবেই এমনভাবে তৈরি, যা সূর্যালোকের সংস্পর্শে এলে ভালো কাজ করে। হরমোন উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শরীরের ভেতরের ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ নিয়ন্ত্রণ করতে সূর্যের আলো ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত রোদ ত্বকের ক্ষতি করলেও, পরিমিত ও কৌশলগতভাবে রোদ পোহানো দীর্ঘায়ুর জন্য প্রয়োজনীয়।”

কতক্ষণ রোদে থাকা নিরাপদ ও উপযুক্ত?

যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা কেন্দ্র ‘নেক্সট হেলথ’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কিন শল্যচিকিৎসক ডা. দর্শন শাহ মন্তব্য করেন, “বিবর্তনের ইতিহাস অনুযায়ী মানুষ এক সময় সারাদিনই রোদের মধ্যে পার করত। তবে আধুনিক যুগে বদ্ধ ঘরে দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ফলে অধিকাংশ মানুষই এখন প্রয়োজনীয় সূর্যালোক থেকে বঞ্চিত। তাছাড়া, বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিকর ইউভিবি রশ্মির প্রকোপ বেড়েছে, যা ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।”

তাই রোদ থেকে উপকার পেতে হলে এর ভালো ও মন্দ দিক সম্পর্কে জানা থাকা চাই।

প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ৩০ মিনিট সরাসরি খোলা ত্বকে সূর্যের আলো লাগানো উচিত। এছাড়া প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিট রোদচশমা বা সানগ্লাস ছাড়া চোখের কোণায় ভোরের নরম আলো লাগালে, ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে সচল করে হরমোন উৎপাদনকে চাঙা রাখে।

দীর্ঘায়ু ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোদের ৪টি অবদান

এই বিশেষজ্ঞরা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত প্রধান ৪টি উপকারের কথা উল্লেখ করেছেন।

মন ভালো রাখা ও অবসাদ মুক্তি: সূর্যের আলো মস্তিস্কে ‘সেরোটোনিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটার বা হরমোনের নিঃসরণ দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা মেজাজ শান্ত রাখে, মনোযোগ বাড়ায় এবং মানসিক স্থিতিশীলতা আনে।

এটি দীর্ঘমেয়াদে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা, তীব্র অ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তা এবং বয়সজনিত স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকি কমায়।

চিকিৎসাবিদদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকলে স্ট্রোক, হৃদ্-রোগ রোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকি কমে, যা আয়ু বাড়াতে সাহায্য করে।

গভীর ও প্রশান্তিময় ঘুম: রাতে ভালো ঘুমের জন্য ক্যাফিন বর্জন বা স্ক্রিন টাইম কমানোর পাশাপাশি সকালের রোদ বেশ কাজ করে।  

ডা. সোল্টের মতে, “ভোরের আলো মস্তিস্কের পিনিয়াল গ্রন্থিকে সংকেত দেয় এবং তার ঠিক ১৪ ঘণ্টা পর শরীর প্রাকৃতিকভাবেই ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’ তৈরি শুরু করে। ফলে রাতে খুব সহজে এবং গভীর ঘুম আসে।”

সঠিক ঘুম বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সাহায্য করে।

প্রাকৃতিক ভিটামিন ডি-এর জোগান: হাড়, মস্তিস্ক এবং হৃদযন্ত্রের সুরক্ষার জন্য ভিটামিন ‘ডি’ অপরিহার্য।

ডা. দর্শন শাহ স্পষ্ট করে বলেন, “মানবদেহ নিজে থেকে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরি করতে পারে ঠিকই, তবে সেজন্য একটি বড় শর্ত হল ত্বককে অবশ্যই সরাসরি সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসতে হবে।”

নিয়মিত পরিমিত রোদ রক্তে ভিটামিন ‘ডি’-এর মাত্রা ঠিক রাখে, যা প্রবীণ বয়সে ‘অস্টিওপরোসিস’ বা হাড় ক্ষয় রোগ, হৃদরোগ এবং কিছু বিশেষ ক্যানসারের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রদাহ দূর করা: সূর্যালোক শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী প্রধান কোষ, বিশেষ করে ‘টি-সেল’-এর উৎপাদন ও কার্যকারিতাকে সরাসরি চাঙা করে তোলে, যা যেকোনো ভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

এছাড়া রোদ শরীরের ভেতরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফ্লামেইশন কমায়। যেহেতু হৃদরোগ থেকে শুরু করে আলঝেইমার’স-এর মতো প্রায় প্রতিটি দীর্ঘমেয়াদি রোগের মূল উৎস হল এই ইনফ্লামেইশন বা প্রদাহ, তাই পরিমিত রোদ পোহানো দীর্ঘায়ু পাওয়ার সহজ প্রাকৃতিক উপায়।

অতিরিক্ত রোদের ঝুঁকি ও সুরক্ষার নিয়ম

উপকারী হলেও দুপুরের কড়া রোদ বা অতিরিক্ত সময় রোদে থাকা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

ডা সোল্ট সতর্ক করে বলেন, “অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের কোলাজেন প্রোটিন ধ্বংস করে দ্রুত চামড়া কুঁচকে দেয় এবং ডিএনএ ক্ষতি করে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।”

তাই রোদ থেকে উপকার পাওয়ার জন্য সকালের নরম আলো বেছে নেওয়া এবং বাইরে বের হলে ‘নন-কমেডোজেনিক সানস্ক্রিন’ ব্যবহার করা, ছাতা বা চওড়া টুপি পরা এবং খাদ্যতালিকায় প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রাখা উচিত।

পুরনো খবর:

রোদের কারণেও ব্রণের সমস্যা দেখা দিতে পারে
চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা জরুরি
রাতে ফোন চার্জে দিয়ে ঘুমাচ্ছেন? এজন্য হয়ত কমছে ব্যাটারির আয়ু