Published : 15 Sep 2026, 04:01 PM
দুপুর বা রাতের প্রধান খাবারের পর সোফায় অলস বসে থাকা বা বিছানায় শুয়ে পড়া অধিকাংশেরই চেনা প্রাত্যহিক কুঅভ্যাস।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় খাবার খাওয়ার পরপরই শরীরকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে ফেলা মানে মেদ বৃদ্ধি ও মেটাবলিজম অবশ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
পুষ্টিবিজ্ঞান ও স্লিপ মেডিসিনের আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রতিবেলার প্রধান খাবারের পর মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের একটি হালকা হাঁটা শরীরকে ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক ও অকাল বার্ধক্যের হাত থেকে বাঁচাতে ওষুধের মতো কাজ করে।
ভারী কসরত বা জিম করার প্রয়োজন নেই; খাবার শেষ করার ঠিক পরপরই অত্যন্ত আরামদায়ক গতিতে কয়েক মিনিট সচল থাকাই শরীরকে ভেতর থেকে চাঙা রাখার চাবিকাঠি।
খাবারের পর ১০ মিনিট হাঁটার ৭টি সুফল
২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক ল্যানসেট ও মেটা-অ্যানালিসিস গবেষণার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, সুনির্দিষ্ট শারীরিক সুফলগুলো নিচে তুলে ধরা হল।
রক্তে শর্করা বা ‘সুগার স্পাইক’ নিয়ন্ত্রণ: খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা প্রাকৃতিকভাবেই বাড়তে শুরু করে। এই সময়ে মাত্র ১০ মিনিট হাঁটলে শরীরের পেশিগুলো সেই বাড়তি গ্লুকোজকে সরাসরি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ফেলে। ফলে রক্তে শর্করার ক্ষতিকর ওঠানামা বা ‘পোস্ট-মিল গ্লুকোজ স্পাইক’ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
দীর্ঘ সময় বসে থাকার অলসতা বর্জন: ডেস্কে বা সোফায় একটানা বসে থাকার ফলে স্বয়ংক্রিয় ইনসুলিন উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। খাবারের পর হালকা হাঁটার অভ্যাসে ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে মেদ জমার প্রক্রিয়াকে রুখে দেয়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও চর্বি পোড়ানো: হাঁটার মাধ্যমে শরীর অতিরিক্ত ক্যালরি পোড়াতে শুরু করে। দিনে তিন বেলার প্রধান খাবারের পর ১০ মিনিট করে মোট ৩০ মিনিট হাঁটলে, কোনো বাড়তি ডায়েটের চাপ ছাড়াই দৈনিক কায়িক শ্রমের কোটা পূরণ করে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
পরিপাকতন্ত্রের আরাম ও হজমের গতি বৃদ্ধি: খাবারের পর হালকা হাঁটাচলা পাকস্থলী ও অন্ত্রের চলন সচল রাখে। এটি খাবারকে দ্রুত পরিপাক হতে সাহায্য করে। ফলে খাওয়ার পর পেট ভার হয়ে থাকা বা তীব্র অস্বস্তির অনুভূতি এক নিমেষে কেটে যায়।
অ্যাসিড রিফ্লাক্স ও বুক জ্বালাপোড়া হ্রাস: খাবার খেয়েই হুট করে শুয়ে পড়লে অভিকর্ষজ বলের কারণে পাকস্থলীর ক্ষতিকর অ্যাসিড সহজে খাদ্যনালী বেয়ে ওপরে উঠে আসে, যাকে চিকিৎসায় ‘জিইআরডি’ বলা হয়। শরীর সোজা রেখে ১০ মিনিট হাঁটলে এই রিফ্লাক্সের প্রকোপ প্রাকৃতিকভাবেই অনেক কমে যায়।
দুপুরের ঝিমুনি দূর করা: দুপুরের খাবারের পর মস্তিস্কে যে তীব্র অলসতা বা ঘুমঘুম ভাব আসে, ১০ মিনিটের হাঁটায় মগজে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়িয়ে সেটা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে কর্পোরেট বা অফিসগামী পেশাজীবীদের কাজের শক্তি বাড়াতে এটি কার্যকর।
সহজে দৈনিক ৩০ মিনিটের কোটা পূরণ: শরীরচর্চার অভাব পূরণ করতে একবারে ১ ঘণ্টা হাঁটার প্রয়োজন নেই। সকালের নাস্তা, দুপুরের ও রাতের খাবারের পর ১০ মিনিট করে ভাগ করে নিলে খুব সহজেই সারাদিনে ৩০ মিনিট হাঁটার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়।
খাবারের পর কখন এবং কীভাবে হাঁটবেন?
দ্রুত শুরু করা: খাবার শেষ করার পর খুব বেশি দেরি না করে দ্রুত হাঁটা শুরু করা উচিত, কারণ খাবার রক্তে মেশার মুহূর্তেই পেশিকে সচল করা সুগার নিয়ন্ত্রণের সেরা কৌশল।
ভারী কসরত নিষিদ্ধ: খাবারের পরপরই ভুলেও দৌড়ানো, জগিং করা বা ভারী কোনো ব্যায়াম করা যাবে না। এতে পরিপাকক্রিয়া ব্যাহত হয়ে পেটে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হতে পারে; শুধু আরামদায়ক গতিতে স্বাভাবিক হাঁটাই যথেষ্ট।
লক্ষণ বুঝে গতি কমানো: হাঁটার সময় যদি পেটে কোনো ধরনের অস্বস্তি বা মোচড় দেয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে হাঁটার গতি কমিয়ে দিতে হবে।
ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়ম: যাদের প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তারা ইনসুলিন ও ওষুধের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসকের পরামর্শে হাঁটার সময় নির্ধারণ করা উচিত।
লেখক: দিনাজপুরের রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের পুষ্টিবিদ লিনা আকতার।
আরও পড়ুন
নিয়মিত হাঁটছেন, তাও ওজন কমছে না? হাঁটার পদ্ধতিটাই হয়ত বদলাতে হবে