Published : 07 May 2026, 03:37 PM
গরম এখন আর শুধু অস্বস্তির বিষয় নেই, রীতিমতো স্বাস্থ্য-ঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শহুরে পরিবারগুলোতে এসি কেনার প্রবণতা বাড়ছে দ্রুত।
তবে এসি কিনতে গিয়ে চকচকে মেশিনটা দেখে মন ভরলেও, মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে— মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল কত আসবে?
এই প্রশ্নের ভয়েই অনেকে এসি কিনতে গিয়েও ফিরে আসেন। আবার অনেকে না বুঝেই কিনে পরে অনুশোচনায় পড়েন।
আসলে একটু হিসাব জানলে কোন এসি কিনবেন, কীভাবে ব্যবহার করবেন— সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
‘থ্রি-স্টার’ এবং ‘ফাইভ-স্টার’— পার্থক্যটা শুধু তারার সংখ্যায় নয়
ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার ইলেকট্রিক মিস্ত্রি রনি হোসেন বহু বাড়িতে এসি লাগিয়েছেন।
তার অভিজ্ঞতা বলেছেন, “একই ক্ষমতার অর্থাৎ দেড় টন আর দুটো এসির বিদ্যুৎ খরচ কিন্তু এক হয় না।
সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে স্টার রেটিং। বাজারে মূলত ‘থ্রি-স্টার’ এবং ‘ফাইভ-স্টার’ মডেল বেশি চলে। তারার সংখ্যা যত বেশি, এসি তত বেশি শক্তিসাশ্রয়ী।”
সহজ কথায়, ফাইভ-স্টার এসি কম বিদ্যুৎ খরচ করে একই পরিমাণ ঠাণ্ডা দেয়।
ঢাকার রিংরোড এলাকার হোলসেল ইলেকট্রনিক্স সিটির কর্ণধার ফয়সাল হোসেন বলেন, “সংখ্যায় হিসেবে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়।”
একটি ‘ফাইভ-স্টার’ দেড় টন এসি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ০.৮ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে। প্রতিদিন আট ঘণ্টা চললে দিনে যাচ্ছে ছয় থেকে সাড়ে ছয় ইউনিট। মাসে সেটা দাঁড়ায় প্রায় ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকার মধ্যে।
‘থ্রি-স্টার’ এসিতে কত বেশি গুনতে হয়?
‘থ্রি-স্টার’ দেড় টন এসি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১.১ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। প্রতিদিন আট ঘণ্টা চালালে দৈনিক খরচ আট থেকে নয় ইউনিট। মাস শেষে বিল আসে প্রায় ১৮০০ থেকে ২২০০ টাকার কাছাকাছি।
তার মানে শুধু স্টার রেটিংয়ের পার্থক্যে প্রতি মাসে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। বছরে এই হিসাব করলে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকার তফাত।
যারা ভাবছেন ‘ফাইভ-স্টার’ এসির দাম বেশি বলে ‘থ্রি-স্টার’ কিনবেন, তারা আসলে কম টাকায় মেশিন কিনে বেশি টাকায় বিদ্যুৎ কিনছেন।
দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সেই দামের ফারাক বিদ্যুৎ বিলেই পুষিয়ে যায়।
ইনভার্টার প্রযুক্তি— যেভাবে কাজ করে
বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে গেলে বিক্রেতারা ইনভার্টার বা ডুয়াল ইনভার্টার এসির কথা বলেন। অনেকে বোঝেন না, অনেকে বিশ্বাস করেন না। আসলে এই প্রযুক্তিটা বেশ কার্যকর।
সাধারণ এসি চালু হলে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চলে, ঠাণ্ডা হলে বন্ধ হয়। আবার গরম হলে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চালু হয়। এই বারবার চালু-বন্ধের প্রক্রিয়ায় প্রতিবার বেশি বিদ্যুৎ লাগে।
ইনভার্টার এসি এই কাজটা করে না। এটি ঘরের তাপমাত্রা অনুযায়ী কম্প্রেসরের গতি কমায় বা বাড়ায়। পুরো বন্ধ করে না। ফলে বিদ্যুৎ খরচ অনেক কম হয়।
পাশাপাশি মেশিনের ওপর চাপও কম পড়ে বলে এসির আয়ু বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ইনভার্টার প্রযুক্তির এসিই বেশি সাশ্রয়ী।
মেশিন ভালো হলেই হবে না, ব্যবহারটাও জানতে হবে
অনেকে ভালো এসি কিনেও মাস শেষে বড় বিল দেখে অবাক হন। কারণ শুধু মেশিন নয়, ব্যবহারের অভ্যাসও বিল নির্ধারণ করে।
এসির তাপমাত্রা ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রিতে রেখে দেওয়া খুব সাধারণ একটা ভুল। এতে কম্প্রেসর সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চলে, বিদ্যুৎ খরচ বাড়ে।
সাধারণভাবে ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রিতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। শরীরের জন্যও ভালো, বিদ্যুৎ বিলও কম আসে।
রনি হোসেন বলেন, “ঘর ভালোভাবে সিল করা না থাকলেও বিল বাড়ে। দরজা-জানালার ফাঁক দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস বেরিয়ে গেলে এসি বারবার বেশি পরিশ্রম করে। পর্দা বা ব্লাইন্ড ব্যবহার করলে সরাসরি রোদ ঘরে কম আসে, এসি তুলনামূলক কম চাপে ঠাণ্ডা রাখতে পারে।”
“নিয়মিত সার্ভিসিং না করলেও বিল বাড়ে। ফিল্টারে ধুলা জমলে এসিকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। মাসে একবার ফিল্টার পরিষ্কার করা উচিত। এই ছোট্ট কাজটাই বিদ্যুৎ খরচ কমাতে পারে উল্লেখযোগ্যভাবে” বলেন তিনি।
একবার বুঝলে সিদ্ধান্তটা আর কঠিন লাগে না
এসি কেনার সিদ্ধান্তটা শুধু দামের ওপর নির্ভর করে নেওয়া ঠিক নয়। একটু হিসাব করলে বোঝা যায়, সামান্য বেশি দামে ‘ফাইভ-স্টার’ বা ইনভার্টার এসি কিনলে মাস থেকে বছরের হিসাবে বিদ্যুৎ বিলে যে সাশ্রয় হয়, তা দিয়ে সেই বাড়তি দাম উঠে আসে।
আর ব্যবহারের অভ্যাস একটু বদলালে তাপমাত্রা ঠিক রাখা, ঘর সিল করা, ফিল্টার পরিষ্কার রাখা— মাসিক বিলে বড় পার্থক্য আনা সম্ভব।
আরও পড়ুন