Published : 02 Mar 2026, 01:30 PM
ওজন কমাতে গেলে সবচেয়ে বেশি ভাবি— কী খাচ্ছি, কতটা ব্যায়াম করছি। ক্যালরি কাউন্ট করি, জিমে ঘাম ঝরাই, ডায়েট চার্ট মেনে চলি।
তবে ওজন কমার এই সমীকরণে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়— সেটা হল ঘুম।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “ওজন নিয়ন্ত্রণে খাবার ও শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি ঘুম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হয়, ক্ষুধা বেড়ে যায় এবং ক্যালরি জমা হতে থাকে চর্বি হিসেবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন’য়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতি শরীরে ‘লেপটিন’ ও ‘ঘ্রেলিন’ নামের দুটি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে।
‘লেপটিন’ হল ‘পেট ভরা’র হরমোন— এটি মস্তিষ্ককে বলে যে খাবার যথেষ্ট হয়েছে। ‘ঘ্রেলিন’ হলো ক্ষুধার হরমোন—এটি বলে যে আরও খাবার দরকার।
ঘুম কম হলে লেপটিনের মাত্রা কমে যায় এবং ঘ্রেলিনের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে ক্ষুধা বেড়ে যায়, বিশেষ করে শর্করা ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমান, তাদের তুলনায় যারা পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ঘুমান- তারা দিনে গড়ে ২০০-৩০০ ক্যালরি বেশি খান।
এই অতিরিক্ত ক্যালরি শুধু খাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঘুমের ঘাটতি হলে শরীরের ‘রেস্টিং মেটাবলিক রেট’ (বিশ্রামকালীন ক্যালরি খরচ) কমে যায়। অর্থাৎ শরীর কম ক্যালরি খরচ করে।
ফলে খাওয়া খাবার শক্তি হিসেবে ব্যবহার না হয়ে চর্বি হিসেবে জমা হয়। বিশেষ করে রাতের খাবার দেরি করে খেলে বা রাতে কম ঘুম হলে এই প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়।
অনেকে নিয়মিত ডায়েট ও ব্যায়াম করেও ওজন কমতে দেখেন না— এর পেছনে প্রায়ই ঘুমের ঘাটতি থাকে।
ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত সময় ঘুমালেও যদি ঘুমের গুণগত মান খারাপ হয় (যেমন- নাক ডাকা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, বারবার ঘুম ভাঙা) তাহলে হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হয়।
নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম না হলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের হরমোন আরও বেশি বিকৃত হয়।
ঘুমের অভ্যাস যেভাবে ঠিক করা যায়
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
সপ্তাহান্তেও এই সময়ের বেশি তারতম্য করা যাবে না।
ঘুমের আগে দুয়েক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম (মোবাইল, ল্যাপটপ) কমিয়ে দিতে হবে। ঘর অন্ধকার, শান্ত ও ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্যাফিনযুক্ত পানীয় (চা, কফি) বিকেলের পর এড়িয়ে চলা উচিত। নিয়মিত ব্যায়াম করা উপকারী। তবে ঘুমের তিন-চার ঘণ্টা আগে নয়।
রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে হালকা খাবার খেতে হবে।
ঘুমের অভ্যাস ঠিক করলে ওজন কমানোর প্রক্রিয়া সহজ হয়। ঘুম কম হলে শরীর ক্যালরি জমিয়ে রাখার প্রবণতা তৈরি করে। ভালো ঘুম হলে ‘লেপটিন’ ও ‘ঘ্রেলিন’য়ের ভারসাম্য ঠিক থাকে, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং মেটাবলিজম সক্রিয় থাকে।
তাই ওজন কমানোর লড়াইয়ে খাবার ও ব্যায়ামের পাশাপাশি ঘুমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সাত থেকে নয় ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম— এটি ওজন কমানোর একটি গোপন অস্ত্র।
আরও পড়ুন