Published : 15 Jul 2025, 04:45 PM
ছুটির দিনে বেড়াতে বা অফিসের কাজে সফরে- সঙ্গে ট্রলি ব্যাগ বা স্যুটকেস তো থাকবেই। তবে এই স্যুটকেস কি আনন্দের স্মৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সঙ্গে করে বিপজ্জনক জীবাণুও নিয়ে আসতে পারে?
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রমণে ব্যবহৃত স্যুটকেসের নিচের চাকা ও তলার অংশে একটি পাবলিক টয়লেট সিটের তুলনায় ৫৮ গুণ বেশি ব্যাক্টেরিয়া থাকতে পারে!
এই তথ্য জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের পরিবেশ-বিষয়ক অণুজীব-বিজ্ঞানী অ্যামি-মে পয়েন্টার।
তিনি এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন লন্ডনের বিমানবন্দরের ট্রেন স্টেশনে।
গবেষণার চিত্র: কোথায় কতটা জীবাণু?
রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষণার সূত্র ধরে জানানো হয়- গবেষণায় ১০টি ‘হার্ডশেল’ বা শক্ত খোলস এবং ‘সফটশেল’ বা নরম খোলস স্যুটকেস বিভিন্ন অংশে বিশেষ ধরনের ‘সোয়াব নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।
সোয়াব মানে হল- একটি তুলার তৈরি ছোট টুকরা বা ছোঁয়া দেওয়ার উপকরণ, যা সাধারণত স্বাস্থ্য বা গবেষণায় ব্যবহার করা হয় নমুনা সংগ্রহ করার জন্য।
‘হার্ডশেল’ ধরনের স্যুটকেসের বাইরের আবরণটি শক্ত, মজবুত ও কড়া উপাদান দিয়ে তৈরি। পলিকার্বোনেট, এবিএস প্লাস্টিক বা অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি স্যুটকেসগুলো পানিনিরোধক বা ওয়াটারপ্রুফ হয়।
আর ‘সফটশেল’ স্যুটকেসের বাইরের আবরণ নরম কাপড় বা ‘সিনথেটিক ফ্যাব্রিক’ দিয়ে তৈরি যেমন- নাইলন, পলিয়েস্টার বা ক্যানভাস।
গবেষণায় দেখা যায়—
চাকা (হুইল)
সবচেয়ে বেশি জীবাণু মেলে স্যুটকেসের চাকার অংশে। এখানে টয়লেট সিটের তুলনায় ৫৮ গুণ বেশি ই. কোলাই, স্ট্যাফিলোকক্কাস ব্যাক্টেরিয়া এবং ‘ব্ল্যাক মোল্ড’ পাওয়া যায়।
স্যুটকেসের নিচের অংশ
এটিও অত্যন্ত জীবাণু বহনকারী এলাকা, যা প্রায় সবসময়ই মাটির সংস্পর্শে থাকে।
লাগেজ ট্রলির হাতল
বিমানবন্দরের লাগেজ ট্রলির হাতলে বহু মানুষ হাত দেয়। অথচ এগুলো কখনও পরিষ্কার করা হয় না। ফলে এসব হাতলেও বিপুল পরিমাণ ব্যাক্টেরিয়া জমে।
গবেষণায় দেখা যায়, ‘সফটশেল’ স্যুটকেস-এ ‘হার্ডশেল’য়ের তুলনায় জীবাণু ও ছত্রাক বেশি থাকে।
কেন এত জীবাণু জমে?
প্রশ্ন আসতে পারে কেন স্যুটকেস এতটা নোংরা হয়ে পড়ে? কারণ আমরা ব্যাগটি টানতে টানতে নিয়ে যাই বাড়ির বারান্দা, ফুটপাত, রাস্তা, স্টেশন, বিমানবন্দর, এমনকি গণশৌচাগারেও।
এসব জায়গা যে কতটা জীবাণুতে ভরা, তা সহজেই বোঝা যায়।
তারপর আবার সেই ব্যাগ নিয়ে ঢুকে পড়ি হোটেল কক্ষে বা নিজের বিছানায়। যেখানে আমরা ঘুমাতে যাই। এতে করে জীবাণুগুলো ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। এই জীবাণু স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বীমা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইনসিওর অ্যান্ড গো’-এর করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ মানুষ স্যুটকেস বিছানা বা টেবিলের ওপর রেখে তাতে জিনিসপত্র গুছিয়ে নেন।
অথচ গবেষকেরা বলছেন, এই অভ্যাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কী ধরনের রোগ ছড়াতে পারে?
যেসব ব্যাক্টেরিয়া ও ছত্রাক স্যুটকেসে পাওয়া গেছে-
ই. কোলাই/এসচেরিকিয়া কোলাই: এটি পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, এমনকি ‘কিডনি ফেইলিউর’য়ের মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
স্ট্যাফিলোকক্কাস: এটি ত্বকের সংক্রমণ, ফোড়া বা সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
ব্ল্যাক মোল্ড: এটি শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, মাথাব্যথা এমনকি অ্যাজমা রোগীদের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
স্যুটকেস পরিষ্কারের পন্থা
এই গবেষণার গবেষক ও বিশেষজ্ঞ অ্যামি-মে পয়েন্টার কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি বলে দিয়েছেন, যা মেনে চললে স্যুটকেস জীবাণুমুক্ত রাখা সম্ভব।
সচেতনভাবে ব্যাগ টানা: বিশেষ করে বাথরুম, স্টেশন প্ল্যাটফর্ম কিংবা পানি জমে থাকা জায়গা- এসব স্থানে ব্যাগ না টানতে চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে তুলে নিতে হবে।
বিমানবন্দরের বাথরুমে ব্যাগ না নিয়ে যাওয়াই ভালো। কারণ এসব স্থানে জীবাণু সবচেয়ে বেশি থাকে।
গন্তব্যে পৌঁছে স্যুটকেস মুছে ফেলা: হোটেল রুম বা বাড়িতে ফিরে আসার পর ব্যাগের বাইরের অংশ বিশেষ করে চাকা ও নিচের অংশে জীবাণুনাশক স্প্রে দিতে হবে। অথবা ‘অ্যান্টিব্যা্ক্টেরিয়াল ওয়াইপ’ বা সাবান-পানি মিশ্রিত কাপড় দিয়ে মুছে ফেলা যায়।
প্রতি মাসে একবার ভালোভাবে স্যুটকেস পরিষ্কার করতে হবে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ভ্রমণ করেন তাদের এটি করতেই হবে।
লাগেজ র্যাকে ব্যাগ রাখা: হোটেল কক্ষে ঢোকার পর কখনই স্যুটকেস বিছানায় রাখা যাবে না। বরং হোটেলের দেওয়া লাগেজ র্যাক ব্যবহার করতে হবে। এতে বিছানায় জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি কমে যায়।
ব্যাগ ধরার পর হাত ধুয়ে ফেলা: ব্যাগ হাতে নেওয়ার পর সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে অথবা ‘হ্যান্ড স্যানিটাইজার’ ব্যবহার করতে হবে। এতে হাত দিয়ে মুখে জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি থেকে বাঁচা যাবে।
অতিরিক্ত পরামর্শ
আরও পড়ুন
তোয়ালে দ্রুত নষ্ট হওয়ার যত কারণ
ঘরে যেখানে জীবাণুর মাত্রা ভয়ঙ্কর
প্রতিদিনের স্পর্শে জীবাণু পূর্ণ জিনিস