কফি এনেমা: শরীর বিষমুক্ত করার মরণফাঁদ
মলদ্বার দিয়ে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে দেহ বিষমুক্ত করার পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ ফেইসবুক বা ইন্সটাগ্রামে এক শ্রেণীর বিকল্প চিকিৎসা প্রচারকারীদের কল্যাণে ইদানীং ‘ডিটক্সিফিকেশন’ বা শরীর থেকে বিষাক্ত বর্জ্য বের করার নানান অদ্ভুত পদ্ধতি দেখা যায়।
এই ট্রেন্ড বা ধারার মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে বিপজ্জনক একটি পদ্ধতি হল ‘কফি এনেমা’।
মলদ্বার দিয়ে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে কোলন বা মলাশয় এবং যকৃত বা লিভার পরিষ্কার করার এই অবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটিকে লিভার ভালো করা, ক্যানসার নিরাময় এবং তাৎক্ষণিক ক্লান্তি দূর করার এক অলৌকিক উপায় হিসেবে দাবি করা হয়।
তবে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট এবং হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও অবৈজ্ঞানিক।
কফি এনেমা মানুষের শরীরকে ডিটক্স তো করেই না, বরং এটি অন্ত্র ফুটো হয়ে মৃত্যু ডেকে আনার মতো মারাত্মক চিকিৎসাগত ঝুঁকি তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘এফডিএ’ এবং হার্ভার্ড হেল্থ পাবলিশিং’-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে, চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কফি এনেমার কোনো চিকিৎসাগত বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটি মানুষের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. মাইকেল পিকো, আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির গবেষক এবং লিভার রোগ বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ের ক্ষতিকর দিক এবং শরীরের আসল ডিটক্স বিজ্ঞান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
কফি এনেমার অন্ধকার ইতিহাস: এর সূত্রপাত যেখান থেকে
এনেমা হল এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যার মাধ্যমে মলদ্বার থেকে পায়ুপথ দিয়ে বিশেষ তরল পদার্থ সরাসরি বৃহদান্ত্রে বা কোলনে প্রবেশ করানো হয়। সাধারণত শক্ত মল নরম করতে এবং সহজে মলত্যাগ করাতে এটি সাহায্য করে। পেটের কোনো পরীক্ষা বা অপারেশনের আগে অন্ত্র পুরোপুরি পরিষ্কার করার জন্য এটি দেওয়া হয়। অনেক সময় সরাসরি অন্ত্রে ওষুধ বা স্যালাইন পাঠানোর জন্যও এটি ব্যবহার করা হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৭ সালের দিকে) জার্মান যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যথানাশক ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিলে নার্সরা আহত সৈন্যদের ব্যথা কমাতে, পানির বদলে এনেমা পদ্ধতিতে তরল কফি ব্যবহার শুরু করেছিলেন।
পরে ১৯৩০-এর দশকে জার্মান-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. ম্যাক্স গারসন, তার বহুল বিতর্কিত ক্যানসার থেরাপি ‘গারসন থেরাপি’-র প্রধান অংশ হিসেবে এই কফি এনেমাকে যুক্ত করেন।
তার দাবি ছিল, কফি মলদ্বার দিয়ে শোষিত হয়ে ক্যাফিনের মাধ্যমে লিভারের পিত্তনালীকে প্রসারিত করে এবং শরীর থেকে সব ক্যানসার কোষ ও টক্সিন বা দূষিত পদার্থ বের করে দেয়।
তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরীক্ষায় এই দাবির শতভাগ ভুল ও অবৈজ্ঞানিক ফাঁদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
কোনো উপকার নেই, উল্টো ক্ষতিকর
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি এবং মেডিকেল জার্নাল ‘আমেরিকান জার্নাল অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’-তে প্রকাশিত, একাধিক ক্লিনিক্যাল রিভিউতে প্রমাণিত হয়েছে যে, এনেমা হিসেবে কফি ব্যবহার করলে তা লিভারের কোনো উপকার করে না।
মুখ দিয়ে কফি পান করলে ক্যাফিন যেভাবে কাজ করে, মলদ্বার দিয়ে প্রবেশ করালে তা লিভারের পিত্তরসের ওপর কোনো বিশেষ প্রভাব ফেলে না।
উল্টো এটি কোলনের স্বাভাবিক ‘পিএইচ’ বা ক্ষারীয় মাত্রা এবং মাইক্রোবায়োম বা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সুরক্ষালয়কে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
মৃত্যুর ঘটনা
কফি এনেমা করতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ গুরুতর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর রেকর্ড আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকীগুলোতে নথিবদ্ধ রয়েছে।
অন্ত্র পুড়ে যাওয়া ও প্রক্টোকোলাইটিস: ওভেনে গরম করা কফি সামান্য অসাবধানতাবশত মলদ্বারে প্রবেশ করালে ভেতরের সংবেদনশীল নরম ‘মিউকোসা’ স্তর পুড়ে যায়।
চিকিৎসা সাময়িকী ‘গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল এন্ডোস্কোপি’-তে এমন বেশ কিছু ‘কেস স্টাডি’ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে কফি এনেমার কারণে রোগীরা গুরুতর ‘প্রক্টোকোলাইটিস’ বা মলাশয়ের অভ্যন্তরীণ তীব্র প্রদাহ ও ক্ষতে আক্রান্ত হয়েছেন।
ইলেক্ট্রোলাইটের মারাত্মক ঘাটতি ও মৃত্যু: কফি এনেমার কারণে ‘কোলন’ থেকে প্রচুর পরিমাণে তরল ও লবণ প্রাকৃতিকভাবে বের হয়ে যায়। ফলে শরীরে সোডিয়াম ও পটাসিয়ামের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, যাকে বলে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা।
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কফি এনেমার কারণে তৈরি হওয়া চরম ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতিতে ‘হার্ট ফেইলিউর’ হয়ে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন রোগীর সরাসরি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সেপসিস এবং অন্ত্রে ছিদ্র: এনেমা টিউবের অসতর্ক ব্যবহারের কারণে মলাশয়ের দেয়াল ফুটো বা ছিদ্র হয়ে মলমূত্র পেটের ভেতরের রক্তে মিশে ‘সেপসিস’ বা ‘ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন’-এর সৃষ্টি করে, যা জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
শরীর নিজেই এক সুপার-ডিটক্সিন: লিভার ও কিডনির আসল কাজ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যানুসারে— শরীরকে ডিটক্স বা বিষমুক্ত করার জন্য বাইরে থেকে কোনো জুস, কফি এনেমা কিংবা দামি ডিটক্স পাউডারের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই।
যকৃৎ বা লিভারের কাজ: লিভার হল মানবদেহের আসল ডিটক্স কারখানা। প্রতিদিন যা খাওয়া হয়, তার ভেতরের সমস্ত টক্সিন বা দূষিত পদার্থ, ওষুধের অতিরিক্ত কেমিক্যাল এবং ক্ষতিকর উপাদান, লিভার তার এনজাইমের সাহায্যে ভেঙে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও পানিতে দ্রবণীয় করে দেয়।
কিডনি বা বৃক্কের কাজ: লিভারের ফিল্টার করা সেই বিষাক্ত তরল বর্জ্যগুলোকে কিডনি বা বৃক্ক প্রতিনিয়ত ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়।
এছাড়া ফুসফুস কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে এবং ত্বক ঘামের মাধ্যমে বাকি বর্জ্য দূর করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ভিত্তিক ডিটক্সের ৩টি আসল নিয়ম
যদি কেউ সত্যিই তার লিভার ও শরীরকে সুস্থ ও টক্সিনমুক্ত রাখতে চান, তবে অবৈজ্ঞানিক এনেমা বর্জন করে ৩টি নিয়ম মেনে চলা যেতে পারে।
আঁশযুক্ত সুষম খাবার খাওয়া: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, পূর্ণ শস্য এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফলমূল রাখা উচিত। আঁশ প্রাকৃতিকভাবেই কোলনের ভেতরের বর্জ্যকে সহজে মলত্যাগের মাধ্যমে বের করে দেয়।
প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও অ্যালকোহল বর্জন: লিভারের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে অতিরিক্ত চিনি, ডালডা, ট্রান্স ফ্যাট, ফাস্টফুড এবং অ্যালকোহল পুরোপুরি বর্জন করা উচিত।
পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান: লিভার ও কিডনির স্বাভাবিক ফিল্টারিং বা ছাঁকন ক্ষমতা সচল রাখার পাশাপাশি শরীরকে প্রাকৃতিকভাবেই আর্দ্র ও বিষমুক্ত রাখতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
মনে রাখতে হবে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন বা ইনফ্লুয়েন্সারদের কথায় প্ররোচিত হয়ে নিজের সুস্থ অন্ত্রে কফি এনেমার মতো বিপজ্জনক পরীক্ষা চালানো চরম মূর্খতা।
যদি পরিপাকতন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য বা গ্যাসের সমস্যা থাকে, তবে ঘরে বসে কোনো টোটকা না করে অবিলম্বে একজন নিবন্ধিত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের সরাসরি পেশাদার পরামর্শ নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন
