Published : 28 Jul 2025, 03:57 PM
রাতের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই বিচলিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে যদি ঘড়ির কাঁটা তিনটা ছুঁয়ে যায়, তখন ঘুম ফিরে পাওয়া যেন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
এই অভিজ্ঞতা বেশিরভাগ মানুষই জীবনে কখনও না কখনও অনুভব করেছেন। তবে ঘুমের মাঝে জেগে ওঠা সবসময় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না।
ঘুম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অনেক সময় স্বাভাবিক। আসল কথা হল, ঘুম ভেঙে গেলে কী করবেন? আর কী করা একেবারেই উচিত নয়।
রিয়েল সিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঘুম ফিরে পেতে বিজ্ঞানসম্মত এবং মানসিক প্রশান্তিমূলক কিছু উপায় নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. ফিলিপ লিন্ডম্যান এবং মনোবিজ্ঞানী ডা. ক্যারোলিনা এসটেভেজ।
নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা
রাতের মধ্যে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়াটা যে স্বাভাবিক, সেটা প্রথমেই মানতে হবে।
ড. লিন্ডম্যান বলছেন, “ঘুমের স্বাভাবিক চক্রেই মাঝেমধ্যে জেগে ওঠা ঘটে থাকে। তবে অনেক সময় আমরা সেগুলো মনে রাখি না।”
এমন পরিস্থিতিতে মনের মধ্যে শান্ত একটি দৃশ্য কল্পনা করতে হবে। চোখ খোলা থাকলেও সমস্যা নেই, কল্পনার সাহায্যে নিজেকে কোনো পছন্দের জায়গায় ‘হাঁটাচলা’ করতে দিন বা মনে মনে ‘উড়ে’ যান সেখানে।
অন্ধকার ঘরে চোখ বন্ধ করে এমন ভাবনায় ডুবে থাকার মাধ্যমেই ঘুম ধীরে ধীরে ফিরে আসতে পারে।
আলো না জ্বালানো
ঘুম ভাঙার পর আলো জ্বালানো একেবারেই উচিত নয়। এটি শরীরের মেলাটোনিন উৎপাদন ব্যাহত করে, যা ঘুমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ড. লিন্ডম্যান বলেন, “আলো, খাবার, ওষুধ এসব কিছু যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলবেন যদি অসুস্থ না হন।”
বাইরের আলো প্রবেশ করলেও সমস্যা হতে পারে। তাই ভালো মানের আলো আটকানোর পর্দা বা চোখ ঢাকার মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি।
শিথিল হওয়ার কৌশল ব্যবহার
ডা. এসটেভেজ জানাচ্ছেন- স্ট্রেস বা চাপ, উদ্বেগ, অসুস্থতা, ক্ষুধা, কিংবা পরিবেশগত অস্বস্তির কারণে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে, শারীরিক ও মানসিকভাবে শিথিল হওয়া জরুরি।
এই সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস বা পেশি শিথিলকরণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। উদাহরণ স্বরূপ, ৪-৭-৮ শ্বাস কৌশলটি খুব কার্যকর।
এতে নাক দিয়ে ৪ সেকেন্ড শ্বাস নিয়ে, ৭ সেকেন্ড ধরে রেখে, মুখ দিয়ে ৮ সেকেন্ডে শ্বাস ছাড়তে হয়। এটি শরীরের উদ্বেগ কমিয়ে ঘুমে সহায়তা করে।
বিছানা ছেড়ে অন্য ঘরে যাওয়া
ঘুম আসছে না। এমন অবস্থায় বিছানায় শুয়েই আছেন? এটা আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ড. লিন্ডম্যান বলেন, “২০ মিনিট কেটে গেলেও যদি ঘুম না আসে, তাহলে বিছানা ছেড়ে অন্য ঘরে চলে যান।”
ডা. এসটেভেজ-এর পরামর্শ, “এমন একটি ঘরে যান যেখানে আরামদায়ক পরিবেশ আছে। যেমন- সোফা বা আরেকটি বিছানা। সেখানে শুয়ে পড়লে মস্তিষ্ক নতুনভাবে বিশ্রাম নেওয়ার সংকেত পেতে পারে। তবে আলো জ্বালানো বা অতিরিক্ত কিছু খোঁজার চেষ্টা করবেন না।”
মোবাইল বা টিভি থেকে দূরে থাকা
ঘুম ভাঙার পর অনেকেই মোবাইলে সময় দেখতে যান বা টিভি চালিয়ে দেন। তবে এটা ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু।
ড. লিন্ডম্যান বলেন, “মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবলেটের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো মেলাটোনিন স্তর নষ্ট করে দেয়।”
এমন পরিস্থিতিতে কিছুর দরকার হলে পুরানো ধাঁচের একটি বই পড়া যেতে পারে। তবে ইলেকট্রনিক ডিভাইস সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।
সময় দেখা থেকে বিরত থাকা
ঘড়ির দিকে তাকানো যতটা নিরীহ মনে হয়, বাস্তবে তা উদ্বেগ সৃষ্টি করে ঘুম বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সময় দেখলে মস্তিষ্ক চাপে পড়ে, ফলে ঘুম আরও দূরে সরে যায়।
তাই বারবার সময় দেখার অভ্যাস থাকলে ঘড়ি চোখের আড়ালে সরিয়ে রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
শব্দদূষণ থেকে মুক্ত
অনেক সময় বাইরের শব্দ বা বাসার অন্যান্য আওয়াজ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এই সমস্যা সমাধানে সাউন্ড মেশিন ব্যবহার করা যায়।
এতে সাদা শব্দ, পিঙ্ক শব্দ বা সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ ব্যবহার করে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা যায়। চাইলে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করেও শব্দ কমানো যেতে পারে।
দিনের বেলায় শারীরিক পরিশ্রম
সারাদিন কাজের পর যে গভীর ঘুম আসে, সেটা সবারই জানা। নিয়মিত ব্যায়াম করলে রাতের ঘুম আরও গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন হয় বলে জানাচ্ছেন ডা. এসটেভেজ।
তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী ব্যায়াম না করে হালকা কিছু স্ট্রেচিং বা হাঁটা ভালো হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
সবকিছু করেও যদি ঘুম না ফেরে এবং এটি নিয়মিত ঘটতে থাকে, তাহলে সমস্যার গভীরে যেতে হবে।
অনিদ্রা বা অন্যান্য ঘুমজনিত রোগ-এর ইঙ্গিত হতে পারে এই ধরনের ঘুমভাঙা। এমন ক্ষেত্রে একজন ঘুম বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ডা. এসটেভেজ বলেন, “ঘুমের রুটিন ঠিক রাখা, রাতের বেলা উত্তেজনাপূর্ণ কাজ না করা এবং ভালো ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা একটি কার্যকর পথ হতে পারে।”
আরও পড়ুন
ঘুম ভাঙে ঠিক অ্যালার্ম বাজার আগেই? জেনে নিন কেন এমন হয়
রাতে ভালো ঘুমের জন্য বাদ দিতে হবে যেসব খাবার