Published : 12 Jul 2026, 09:01 PM
প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে জাতীয় সংসদের দিনের বাকি কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।
রোববার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা তার রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনের স্মৃতিচারণ করেন।
আলোচনা শেষে সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। এরপর জমির উদ্দিন সরকারের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
পরে স্পিকার বলেন, “সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দিনের কার্যসূচির অন্যান্য সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখা হল।”
এরপর সংসদের বৈঠক সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
জমির উদ্দিন সরকার রোববার ভোরে মারা যান। অধিবেশনের শুরুতে তার মৃত্যুর খবর জানিয়ে স্পিকার বলেন, “তার মৃত্যুতে সংসদ পরিবার শোকাহত এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে।”
প্রশ্নোত্তর চলার এক পর্যায়ে বিএনপির সংসদ সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে দিনের অন্য কার্যক্রম স্থগিত করে শোক আলোচনায় যাওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সংসদ চলাকালে কোনো সাবেক স্পিকারের মৃত্যু হলে অন্য কার্যক্রম স্থগিত রেখে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা এবং পরে অধিবেশন মুলতবি করে তাকে সম্মান জানানোর নজির রয়েছে।
জবাবে স্পিকার বলেন, দায়িত্ব পালনরত কোনো সংসদ সদস্য মারা গেলে সংসদের কার্যক্রম সঙ্গে সঙ্গে স্থগিত করা হয়। তবে সাবেক স্পিকারের মৃত্যুর ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি আগে হয়েছে বলে তার জানা নেই।
জমির উদ্দিন সরকারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আলোচনা শেষে দিনের বাকি কার্যক্রম স্থগিত রাখা হবে বলে জানান তিনি।
‘তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান’
বিএনপির সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন শোক আলোচনায় জমির উদ্দিন সরকারকে ‘দেশের প্রবীণ আইনজীবীদের একজন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, জমির উদ্দিন সরকার আইন ও সংসদ—দুই অঙ্গনেই ‘একটি প্রতিষ্ঠান’ ছিলেন।
রাজনীতি, আইন পেশা, মন্ত্রিসভা ও সংসদ পরিচালনায় জামির উদ্দিন সরকারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি।
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আইনজীবী হিসেবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আদালতে যাতায়াত করেছেন জমির উদ্দিন সরকার। তার পরিচিত হ্যাট, ছাতা এবং আদালতে চলাফেরার ধরন আইন অঙ্গনের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, জমির উদ্দিন সরকার ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং দীর্ঘ সময় আইন পেশায় ছিলেন। লেখালেখি ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও তিনি রাজনীতিকদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবেন।
বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন ‘একজন সফল আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ’ হিসেবে বর্ণনা করেন জমির উদ্দিন সরকারকে।
তিনি বলেন, “বিচারপ্রার্থীদের প্রতি জমির উদ্দিন সরকারের আন্তরিকতা এবং দল ও দেশের প্রতি তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
‘আপাদমস্তক জেন্টলম্যান’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শোক আলোচনায় অংশ নিয়ে জমির উদ্দিন সরকারকে ‘সুটেড বুটেড আপাদমস্তক জেন্টলম্যান’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে আইনজীবী হিসেবে জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা সমালোচনা শোনেননি। দল, সংসদ ও আইন পেশার প্রতি তিনি শতভাগ নিবেদিত ছিলেন।
জমির উদ্দিন সরকার এবার নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “তিনি পার্লামেন্টে ছিলেন। তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি আইনজীবী ছিলেন। তিনি আইন প্রণয়নকারী ছিলেন। তিনি স্পিকার ছিলেন, তিনি সাবেক (ভারপ্রাপ্ত) রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং সেরকম একজন সাকসেসফুল মানুষ আমাদের জন্য ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।”
বিনা ফিতে আইনি সহায়তার স্মৃতিচারণ
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, বিগত সরকারের সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনি সহায়তা দিয়েছেন জমির উদ্দিন সরকার। এজন্য তাকে ফি দেওয়ার চেষ্টা করেও তারা সফল হননি।
জমির উদ্দিন সরকারের বক্তব্য স্মরণ করে তিনি বলেন, “তিনি বলতেন এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। এটি আমার জন্য সুযোগ। একসাথে রাজনীতি করেছি। তাদের জীবনের এই কঠিন চ্যালেঞ্জিং মুহূর্তে আমার মধ্যে সামান্য মানবতা থাকলে আমার পক্ষে তার কাছ থেকে তাদের পক্ষে ফি নেওয়া সম্ভব নয়।”
স্পিকার হিসেবে জমির উদ্দিন সরকার সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতেন এবং আইন অঙ্গনে তিনি অনেকের ‘গুরু’ ছিলেন বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।
‘ইলেকশন ছাড়া গণতন্ত্রে পৌঁছানো যায় না’
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জমির উদ্দিন সরকার তার কাছে ‘পরম আত্মীয়ের মত’ ছিলেন এবং তাকে পুত্রের মতো স্নেহ করতেন।
তাকে ‘সেলফ মেড ম্যান’ হিসেবে বর্ণনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, “নিজের মেধা ও পরিশ্রমে তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আইন, ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান ছিল।”
তিনি বলেন, জমির উদ্দিন সরকার ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ও নীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রথমে জাগদল এবং পরে বিএনপিতে যোগ দেন।
দল, রাজনীতি ও উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি জমির উদ্দিন সরকারের ‘অবিচল আনুগত্য ছিল’ মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, “আমাকে সবসময় একটা কথা বলতেন, ‘ইলেকশন করবে। ইলেকশনের মধ্যে দিয়ে যাবে। ইলেকশন ছাড়া কিন্তু কখনো গণতন্ত্রে পৌঁছানো যায় না’।”
‘জাতি এক মহান সন্তানকে হারাল’
আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “জাতি একজন মহান রাজনীতিক, আইনজ্ঞ ও সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছে।”
কয়েকটি সংসদে জমির উদ্দিন সরকারের সহকর্মী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, স্পিকারের আসনে বসে জমির উদ্দিন সরকার যেভাবে সংসদ পরিচালনা করতেন, তা তাকে মুগ্ধ করেছিল।
স্পিকার বলেন, “জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তার বিরুদ্ধে কখনও কারও কাছ থেকে কোনো অভিযোগ শুনিনি।”
শনিবার রাতে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন জানিয়ে স্পিকার বলেন, রোববার সকালে তারও যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু সেই সুযোগ হয়নি।
রোববার ভোরে শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জমির উদ্দিন সরকার; তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।