আমার শিক্ষক বিদ্যাদেব মুনীর চৌধুরী

তিনি যখন ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ পড়াতেন মনে হতো তিনিই যেন গোল রিমের পাওয়ারফুল চশমাপরা হতভাগ্য পিয়ের।

শামীম আজাদশামীম আজাদ
Published : 28 Nov 2023, 09:39 AM
Updated : 28 Nov 2023, 09:39 AM

তখনো লিও টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এর কাহিনিনির্ভর কোন নাটক বা সিনেমা, এমনকি কোন আলোচনাও, কিছুই দেখিনি। মূল কাহিনিও পড়িনি। যখন পড়তে গেলাম, পড়াতে এলেন নাট্যকার মুনীর চৌধুরী। মনে হল যেন তিনিই এ গ্রন্থের ‘লেখক’। তিনিই গোল রিমের পাওয়ারফুল চশমাপরা হতভাগ্য পিয়ের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির শীতল সাদা কংক্রিটের ক্লাশরুমে ঝুল ঝোলা ছাদের নিচে প্রায়ান্ধকার পরিবেশে মাইলকে মাইল শুধু মৃত মানুষ আর মরূভূম জেগে ওঠছে। অসামান্য আবেগে আমাদের সামনে একজন জীবিত মানুষ লিখে চলেছেন বহু আগের এক শিল্পসন্ন্যাসীর ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’। তাকে পরিচিত করতে তিনি নিয়ে আসছেন ‘আনা ক্যারেনিনা’, নেপোলিয়ানিক সময়, পাঁচ সম্ভ্রান্ত রাশিয়ান পরিবারের বল্গাহীনতা, রক্ষণশীলতা, সহনশীলতা ও গ্রহণশীলতা- ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি, আলেকজান্ডার পুশকিন, ফিওদর দস্তয়োভস্কি ও ইভান তুর্গেনিভ।

ইভান তুর্গেনিভ নাকি যুবক টলস্টয়ের উপন্যাস ত্রয়ী ‘চাইল্ডহুড’, ‘বয়হুড’ ও ‘ইয়ুথ’ পড়েই পাগল হয়ে তাকে ডেকে এনে ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন যে এর নামেই একদিন রাশিয়া চিনবে লোকে। হায় হায় এদেরতো চিনিই না, কী হবে! তাই এদের চিনতেই ক্লাশের ব্রেকে বা ক্লাশ শেষে রোকেয়া হলে ফেরার আগে আমার আর বাবলীর (বাবলী হক) দৌড়। সোজা নিউ মার্কেটের বলাকা সিনেমা হলের সামনে ফুটপাতে পুরনো বইয়ের দোকানে।

ফুটপাতে এসে দেখি আরো কত দীপাবলি। কেনা হয় ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, ‘রেবেকা’, ‘মা’ ও ‘ইস্পাত’, কত কি! ফিরে এসে আবার ক্লাশে দেখি রচিত হচ্ছে নতুন নতুন মানুষ। ওই চোখ ললাট চিবুক সব গলে যাচ্ছে ‘নাতাশা নাতাশা’ বলে। এই যে টলস্টয়, তিনি ইচ্ছেমত আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন যেখানে সেখানে। একদিন দেখি টলস্টয়ের স্ত্রী মহা ক্ষেপে গেছেন তার ওপর। আর আমরা বাড়ি ছেড়ে তার সঙ্গে বসে আছি রাশিয়ার ঠান্ডা কোন এক রেলস্টেশনে। দেখি পাদপ্রদীপের শিখার নিচে নৃত্য করছে শব্দ ও বাণী।

এমনই পড়ানো ছিল স্যারের। মনে হত গলাগলি করছে মূল ও অনুবাদ। আর স্যারের সাবুদানা কণ্ঠস্বর, কুয়াশাদৃষ্টি, ম্যাকবেথ মুখভঙ্গি, শব্দাঘাত ও নিবিষ্ট ধ্যান বাংলা বিভাগে তৈরি করেছে এক কিংবদন্তি। স্যার, আমার স্যার শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। স্যারের কব্জিতে একটা লালচে খয়েরি ঘড়ি ছিল। পরতেন খদ্দর বা দেশি সুতির লম্বা পাঞ্জাবি। তার পাজামা সাদা আর ঘেরওলা। স্যু পরা দেখেছি কি! মনে পড়ে না। ছিল বেল্টওলা স্যান্ডেল।

চশমার ফ্রেম মোটেও পিটারের (স্যার বলতেন পিয়ের) মত ছিল না। ছিল ভারি আর মোটা। এই এখন যা আবার সিক্সটিজ বলে ফিরে এসেছে। তবে তার ভেতরে দেখবার মত ছিল চোখের দৃষ্টি। সে চোখ করিডোরে কেমন মেঘের মত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধানের ঘরে সকালের সূর্যের মত। ক্লাশরুমে শরৎচন্দ্রের নির্বোধ শ্রীকান্ত, শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথের একশব্দে দুই অর্থকরা প্রেতিনী, কিংবা টলস্টয়ের পয়মাল পিটার। শ্রীকান্ত পড়াতে গেলে তিনি হয়ে যান শরৎ, শেক্সপিয়র পড়াতে ভূত। কি এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার!

তিনি যখন অন্য ক্লাশে, তখন বাংলা বিভাগের সামনের কংক্রিট দেয়ালে নদীর মত হেলান দিয়ে নিচে তার সাইকেলের সামনের বেতের বাস্কেটের বইগুলোর শিরোনাম পড়ার চেষ্টা করতাম। তার বগলে কোন আউট বই তা দেখার জন্য কত ফন্দি!

শুধু তাই নয়, বিকেলে সেমিনার রুমে রিহার্সেলে তিনি হয়ে যেতেন হাইকোর্টের বিচারক। উচ্চারণের অবহেলা তার কাছে অসহ্য ছিল। এ নিয়ে অবশ্য সব স্যারই সমান নির্মম। সন্ধ্যায় টিএসসিতে নাটক চলাকালে অন্ধকারে পেছনের সিটে বসা স্যার আমাদের একগুচ্ছ স্বেচ্ছাসেবকের কাছে হয়ে যেতেন বাৎসল্যে গলে যাওয়া বৈদূর্য মনি। আমি তার সব এমন করে দেখেছিলাম কি? জানি না, অথবা যখন দেখেছি তখন দেখার চোখ গজায়নি। যখন গজিয়েছে তখন এ বার্তা তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কোন উপায় নেই। তিনি ছিলেন পিতা, অভিভাবক, গুরু, নির্দেশক, কথার জাদুকর, শিল্পের স্বাদুকর আর প্রতিমা আমাদের- বিদ্যাদেব। যা বলছি তা-ই তার ইমেজ। মুনীর চৌধুরীর জলছাপ। 

টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় মুনীর স্যারের রাজবন্দী অবস্থায় জেলে বসে লেখা নাটক ‘কবর’ পড়েছি। তখনই তার অসাধারণ কাজ টাইপ রাইটারে বাংলা কি বোর্ড ‘অপ্টিমা মুনীর’ এর কথা জেনেছি। পরিবারে দুটো মাস্টার্স একদম ন্যূনতম পাশ। আমার জানামতে স্যারের ছিল তিনখানা পাশ। বাংলা, ইংরেজি ও আরবি। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এবং অন্যান্য বড় মানুষ শিক্ষকদের কাছে পেয়ে শুধু বিস্ময়ে আনন্দে হতবাক হয়ে থাকতাম। তাদের বগলে কোন আউট বই তা দেখার জন্য কত ফন্দি! তাদের টিউটোরিয়াল গ্রুপে পড়ার জন্য কত প্রার্থনা!

কখনো কখনো স্যার সাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন। ঢোলা পাজামা বা ট্রাউজার ভাঁজ করে বেড়ি আটকে। তখন ঊনসত্তরে সাইকেল স্ট্যান্ড বোধকরি ছিল না। ওটা সরাসরি বাংলা বিভাগের নিচে কলাভবনের সামনে নিচতলার করিডোরের কংক্রিটের শাদা দেয়ালে হেলান দিয়ে শুকনো ঘাসে দাঁড়িয়ে থাকতো। ডান হাতলের পাশে ছোট্ট উল্টানো রুপালি বাটির মত বেল। তার আগে সামনের চাকার ওপর হাতলের মধ্যভাগে আটকানো বেতের বাস্কেটে বই। হয়তো লাইব্রেরির। হয়তো তার নিজের। তাই তিনি যখন অন্য ক্লাশে, তখন বাংলা বিভাগের সামনের কংক্রিট দেয়ালে নদীর মত হেলান দিয়ে নিচে তার সাইকেলের সামনের বেতের বাস্কেটের বইগুলোর শিরোনাম পড়ার চেষ্টা করতাম।

বাংলা বিভাগে তখনো আব্দুল হাই স্মৃতি পাঠকক্ষ হয়নি। আমরা দোতলার ওপর থেকে শীতের রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্যারদের দেখতাম। ঢাকাই শাড়িতে নীলিমা ইব্রাহিম, শান্তিনিকেতনী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, দ্রুত হেঁটে যাওয়া আনোয়ার পাশা, চমস্কির চমকে উপ্ত রফিকুল ইসলাম, যৌবনদীপ্ত সৈয়দ আকরম হোসেন, নরম শ্বাসের মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান...। সাবসিডিয়ারি ইংরেজি পড়তে গিয়ে আরও পেয়ে গেলাম একগাদা ইংরেজি সাহিত্যের বাতি। রাশিদুল হাসান স্যার, হোসনে আরা আপা, পারভিন হক, রাজিয়া খান ও মুনীম স্যার। সাহিত্য যে কত উপাদেয় হতে পারে, মানুষগুলো যে বিত্তে নয় চিত্তে কি রূপময় ও চৌম্বকীয় হতে পারেন তা বুঝতে না বুঝতেই এসে গেল সেই আকাঙ্ক্ষার স্বাধীনতা এবং তা প্রাপ্তির উষালগ্নে আমাদের রাষ্ট্রীয় রত্নাবলী হরণের কাল।

তখন জানতামও না হেঁটে যাচ্ছি কিংবদন্তি, পেরিয়ে যাচ্ছি স্বর্ণাভ করিডোর। এদিকে ততদিনে দেশজুড়ে যে অস্থিরতা ছিল, তা বাড়ছে। আমরা ক্ষণে ক্লাশে ক্ষণে কোরাসে ফুঁসে ওঠছি। স্লোগানে স্লোগানে আর্টস ফ্যাকাল্টির বটতলা ফেটে যাচ্ছে। সামনে এগিয়ে আসছে যুদ্ধ। কদিন পরই সারা দেশের মানুষ গৃহ-সম্পত্তি-সম্ভ্রম-সুখ-প্রাণ সব হারাবে। হারাবে দেশের এই অমূল্যপ্রাণ শিক্ষকদেরও। যারা আমাদের প্রাণের মানুষ ও পিতার সমান। এ সোনার মানুষের কেউ কেউ আর কিছুদিন পরই খুন হবেন আল বদর, আল শামস আর দেশদ্রোহীদের হাতে। আর যারা বেঁচে থাকবেন তারা আসলে শুধু দৈবাৎ বেঁচে গেলেন বলে বেঁচে থাকবেন!

মানুষ বড় বিচিত্র প্রাণী। কোন কিছুই এবং কেউই চিরজীবী নন জেনেও পাশে থাকা প্রিয়জন হঠাৎ স্বাভাবিকভাবে চলে গেলে আতঁকে ওঠি। বলি কী করে সম্ভব! তারতো এখন যাবার কথা ছিল না। আর সেখানে আমাদের পরমজনদের দেশের এক মহাযুদ্ধের পর ঠিক স্বাধীনতার প্রাক্কালে অস্বাভাবিক নির্মম, বর্বর ও কাপুরুষোচিত ভয়াবহ তাণ্ডবে তদের মৃত্যু হল- সেটা কি কোনদিন মেনে নেবো? না।