Published : 10 Nov 2025, 12:44 PM
ফ্রাঁসোয়া-মারি দ্য আরুয়ে ছিলেন এক দারুণ প্রতিভাবান যুবক। প্যারিসের অভিজাত সমাজে তার বুদ্ধি আর কাব্যপ্রতিভার জন্য তিনি খুবই পরিচিত ছিলেন। তবে তার স্বাধীনচেতা মনোভাবই কাল হলো। ১৭১৬ সালের মে মাসে তিনি শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা করে কবিতা লেখেন, যার ফলে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
তবে আরুয়ে দমে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না। দ্রুতই তিনি ‘ভলতেয়ার’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন এবং ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে তার সমালোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন। এর ফলস্বরূপ তার জীবনে আসে আরও কঠিন সময়, কারাবাস। আর এই সবকিছুর সূত্রপাত হয়েছিল অযাচার নিয়ে লেখা তার একটি গল্পের মাধ্যমে।
১৭১৫ সালে ভলতেয়ার এক নতুন প্রকল্প হাতে নেন। তিনি ইডিপাসের পুরোনো গ্রিক গল্পটিকে ফরাসি দর্শকদের জন্য নতুন করে সাজাতে চাইলেন। এই গল্পে থিবসের রাজা ইডিপাস তার বাবাকে হত্যা করেন এবং নিজের মাকে বিয়ে করেন। গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লেস ‘ইডিপাস রেক্স’ নাটকে এই ট্র্যাজেডি প্রথম তুলে ধরেন।
১৬৫৯ সালেও ফরাসি নাট্যকার পিয়ের কর্নেইল এই নাটকটি নতুন করে লিখেছিলেন। কিন্তু ভলতেয়ার মনে করলেন, এই গল্পের একটি আধুনিক সংস্করণ প্রয়োজন, আর তিনি নিজেই সেই কাজটির জন্য সঠিক মানুষ। ১৭১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘সূর্যরাজা’ হিসেবে পরিচিত চতুর্দশ লুই মারা যান, কিন্তু কোনো স্পষ্ট উত্তরাধিকারী রেখে যাননি। ফ্রান্সের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী শাসক হিসেবে তিনি দেশের সমৃদ্ধি বাড়িয়েছিলেন এবং উপনিবেশ প্রসারিত করেছিলেন।
তবে তিনি ফ্রান্সকে তিনটি বড় যুদ্ধেও জড়িয়েছিলেন। তিনি ফ্রান্সে সব ক্ষমতা নিজের হাতে নেন এবং ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্টদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়ে ক্যাথলিক চার্চকে আরও শক্তিশালী করেন। রাজার নিজের ছেলে এবং তার নাতিও তার আগেই মারা যান। তাই তার ৫ বছর বয়সি প্রপৌত্রের জন্য একজন রাজপ্রতিনিধির প্রয়োজন হলো। এই দায়িত্ব এসে পড়ল ফিলিপ ডুক দ্য’অরলিয়েন্সের ওপর। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কার্যত দেশের শাসক হিসেবে কাজ করেন।
ফিলিপ ফ্রান্সের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনেন। তিনি অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং গ্রেট ব্রিটেনের সাথে জোট গঠন করেন। তিনি পুরোনো সামাজিক নিয়মকানুনও ভেঙে দেন, সেন্সরশিপের বিরোধিতা করেন এবং নিষিদ্ধ বইগুলো পুনরায় প্রকাশের অনুমতি দেন। রজার পিয়ারসন তার ‘ভলতেয়ার অলমাইটি’ বইয়ে লিখেছেন, “পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। দেশ এমন একজন ব্যক্তির হাতে আসে যিনি প্যারিসের প্রাণকেন্দ্রে থাকতেন। তিনি খাওয়া-দাওয়া, পান-ভোজন এবং আনন্দে মত্ত ছিলেন।”
ভলতেয়ারের জন্য, সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ায় সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত খুলে গেল। থিয়েটারকেই তিনি বেছে নিলেন জনসাধারণের কাছে স্বাধীনতা ও সহনশীলতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে। ‘ভলতেয়ার্স রেভোলিউশন’ বইয়ের সম্পাদক গেল নয়ার বলেন, “ভলতেয়ার তার ‘লেটারস অন ইংল্যান্ড’ (১৭৩৩) বইয়ে অনুমান করেছিলেন যে ইউরোপের মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষ পড়তে পারত। তাই, শতকের শেষের দিক পর্যন্ত বইয়ের চেয়ে নাটকের মঞ্চায়ন অনেক বেশি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।”
তার নাটক কোথায় মঞ্চস্থ হবে, সে বিষয়ে একটিই বিকল্প ছিল, যদিও প্যারিসে আরও অনেক থিয়েটার ছিল। ইয়ান ডেভিডসন তার ‘ভলতেয়ার: অ্যা লাইফ’ বইয়ে লিখেছেন, “কমেডি ফ্রঁসেজ-এর বিয়োগান্তক ও গুরুতর নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য আদালত কর্তৃক অনুমোদিত ও তত্ত্বাবধানে থাকার কারণে তাদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। প্রায় সব লেখকই কমেডি ফ্রঁসেজ-এর জন্য লিখতে চাইতেন।”
ভলতেয়ার তার নাটক ‘ইডিপাস’ নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন, কিন্তু কমেডি ফ্রঁসেজ সেটি শুরুতে প্রত্যাখ্যান করে। তবে তারা তাকে সম্পূর্ণ বাতিল করেনি, বরং কিছু সংশোধনের পরামর্শ দেয়। ভলতেয়ার বেশ কয়েক বছর ধরে সেই সংশোধন নিয়ে কাজ করে যান। অবশেষে, ১৭১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি, থিয়েটারটি তার সংশোধিত নাটক মঞ্চস্থ করতে রাজি হয়।
তবে ভলতেয়ারের সাফল্যের সময়টি ছিল প্রতিকূল। যখন তিনি তার নাটক নিয়ে কাজ করছিলেন, কবিতা লেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, সেসব তার বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত। এমনই একটি কবিতায় রাজপ্রতিনিধি ফিলিপের অযাচারমূলক কর্মকাণ্ড উঠে আসে। এমনকি উদার শাসক ফিলিপেরও কাছে এটি বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল।
১৭১৭ সালের ১৬ মে, ভলতেয়ারকে গ্রেপ্তার করে কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেন, দাবি করেন যে তিনি এই কবিতাগুলো লেখেননি। কিন্তু তিনি ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজন বন্ধুর কাছে কবিতার রচয়িতা হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন, যারা আসলে গুপ্তচর ছিল।
ডেভিডসন লিখেছেন, “বাস্তিলের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। দশ ফুট উঁচু দেয়াল, তিনতালা, গ্রিল, খিল এবং বার, খারাপ খাবার আর সূর্যের আলোর অভাব ছিল।” সবচেয়ে খারাপ ছিল, ভলতেয়ার জানতেন না তিনি কবে মুক্তি পাবেন। তার কোনো বিচার হয়নি; তার আটকের মেয়াদ সম্পূর্ণরূপে রাজপ্রতিনিধির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল।
১১ মাস পর, রাজপ্রতিনিধি ফিলিপ ভলতেয়ারের প্রতি দয়া দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৭১৮ সালের ১৪ এপ্রিল তাকে মুক্তি দেয়। ভলতেয়ারকে আরও কয়েক মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়, কিন্তু অবশেষে তাকে প্যারিসে অবাধে প্রবেশ ও প্রস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়। ১৭১৮ সালের ১৮ নভেম্বর, যুবক ভলতেয়ারের জীবনের প্রথম বড় সাফল্য আসে: কমেডি ফ্রঁসেজ-এ তার নাটক ‘ইডিপাস’ মঞ্চস্থ হয়।
নাটকটি দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ডেভিডসন লিখেছেন, “অভূতপূর্ব ৩২টি প্রদর্শনী টানা মঞ্চায়িত হয়। সম্ভবত এর জনপ্রিয়তার পেছনে রাজপ্রতিনিধির কেলেঙ্কারিগুলোও কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ভলতেয়ার শুধু রাজতন্ত্রের ওপরই আক্রমণ করেননি, তিনি চার্চের দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতার বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন।”
নাটকের একটি বিখ্যাত সংলাপে রানি জোকাস্টা বলেন, “আমাদের পুরোহিতরা এমন নন যা মূর্খ লোকেরা ভাবে; তাদের জ্ঞান কেবল আমাদের সরলতার উপর নির্ভরশীল।” ক্যাথলিক চার্চের তখনো অনেক ক্ষমতা ছিল, তাই এমন মন্তব্য করাটা ছিল বিপজ্জনক, দর্শকরাও এটি শুনে উত্তেজিত হয়েছিলেন।
ফ্রাঁসোয়া-মারি আরুয়ে (২১ নভেম্বর ১৬৯৪ – ৩০ মে ১৭৭৮) ‘ভলতেয়ার’ নামে বেশি পরিচিত। আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে ফরাসি দার্শনিক ও লেখক ভলতেয়ার তার কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি প্রাচীন গ্রিক নাটক ‘ইডিপাস’-এর একটি নতুন সংস্করণ তৈরি করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ছিলেন ফরাসি আলোকপ্রভা যুগের এক লেখক, দার্শনিক, ব্যঙ্গকার ও ইতিহাসবিদ।
তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও রসিকতার জন্য যেমন খ্যাত, তেমনি খ্রিস্টধর্ম বিশেষ করে ক্যাথলিক চার্চ ও দাসপ্রথার সমালোচনার জন্যও পরিচিত ভলতেয়ার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের পক্ষে তিনি কথা বলেছেন।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন।