ভ্রমণগদ্য
Published : 09 Nov 2025, 03:02 AM
চীনের বিখ্যাত লোকগীতি ‘দেবাংচের মেয়ে’র সুর কানে বাজতে বাজতে ট্যাক্সি করে গ্র্যান্ড বাজার থেকে হোটেলের দিকে ফিরছি। আমরা চারজন। আমি বসেছি সামনে। ড্রাইভারের পাশে। বাকিরা পেছনে। গ্র্যান্ড বাজারের সম্মোহনে তখনো সবাই আচ্ছন্ন। চুপচাপ।
সাঁই সাঁই করে গাড়ি এগোচ্ছে। দেবাংচের রূপবতী মেয়ে কেমারখান ছায়া ফেলে উড়ে আসছে যেন পেছনে। অদ্ভুত মোহনীয়তা! ঘোরগ্রস্ত! হঠাৎ গান! পাশে তাকাতেই দেখি ড্রাইভার অডিয়ো চালু করেছে। উইঘুর ভাষার গান। চোখ ফেরাতেই মাটির নিচে সুড়ঙ্গ। টানেল। সাঁই করে টানেল ত্যাগ করে গাড়ি উঠে পড়লো একটা উড়াল সড়কে।
শহর গেল বদলে। ঝকমক। আলোকিত। অসংখ্য সুউচ্চ ভবন। লাল নীল সবুজ। গাড়ি ছুটছে। হাতের তালুতে উরুমচি। রাস্তাঘাট কেটে কেটে ট্যাক্সি চলছে। কতক্ষণ? হুঁশ নেই। একসময় ব্রেক কষে ট্যাক্সি থামে। রঙিন তোরণ হাসে। তোরণের পেছনে অবাক চোখে হোটেল আমাদের দেখে। ভাড়া মিটিয়ে দিলে ট্যাক্সি ফের চম্পট দিল অলক্ষ্যে।
ট্যাক্সি থেকে পা ফেলতেই অদূরে সালামকে চোখে পড়ে। আব্দুস সালাম। আমাদের চীনা ম্যানেজম্যান্ট টিমের একমাত্র পুরুষ সদস্য। হ্যাংলা পাতলা লম্বাটে মুখের যুবক। উইঘুর। নন-মুসলিম। এই একটা ভুল ধারণা এখানে এসে আমাদের ভেঙেছে। সব উইঘুর মুসলিম নয়, অন্য ধর্মাবলম্বীও রয়েছে।
আমি সালামের দিকে এগিয়ে গেলে পেছন থেকে আমার সঙ্গীরা ডাকে। ‘আমি আসছি, আপনারা যান’ বললে তারা মিলিয়ে যায়। আমি সালামকে গিয়ে ধরি। সালাম ইংরেজি বলার চেষ্টা করেও বেশিদূর এগোতে পারে না। দুই একটা শব্দের পরই মুখ থুবড়ে পড়ে। কী আর করা? এই যন্ত্রণা গত দু’দিনে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। চীনাদের ইংরেজি জ্ঞান! দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল ‘বাইদো অ্যাপ’।
অশরীরী বাইদো দোভাষীর মতো কাজ করে। তাই পকেট থেকে মোবাইল বের করে বাইদোতে সালামকে জিজ্ঞেস করলাম, কী অবস্থা! কোথাও যাচ্ছ? সালাম আমার কথা শুনে তার মোবাইলে কী একটা বলে ইংরেজি অনুবাদ শোনায় আমাকে। সামনের ক্যাফেতে যাচ্ছি। যাবে?
যাব।
চলো তাহলে।

আমি সালামের সমান্তরালে হাঁটছি আর মনে মনে ভাবছি। চীনে এসেছি। যতটা সম্ভব ওদের সঙ্গে মিশতে হবে। স্থানীয় মানুষজনকে জানতে হবে। বাংলাদেশ থেকে আসার আগে পল্লব ভাই বলে দিয়েছিলেন। চীনাদের সঙ্গে মিশবেন বেশি। বন্ধুত্ব করবেন। জানবেন। তাহলেই আপনার ভ্রমণ সার্থক হবে।
পল্লব ভাই আমার বড় ভাই বন্ধু। এখন আমি সে পথেই হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতেই বললাম, সালাম তোমার বাড়ি কোথায়?
উরুমচি। এখানেই আমি ২০ বছর ধরে আছি। আমার শৈশব কেটেছে এই শহরে।
বাহ! তাহলে তো তুমি এই শহর সম্পর্কে অনেক জানো।
হুম।
তোমার বয়স কত?
২৭।
গ্র্যাজুয়েশন করেছো?
না। আমি আন্ডার গ্রেড। এখানে এরকমই বেশি। সবাই আগেভাগে কাজে ঢুকে পড়ে।
ও আচ্ছা।
এরই মধ্যে আমরা ক্যাফের সামনে পৌঁছে গেলাম। কাছেই ছিল। ক্যাফেতে ঢুকতে যাবো, তখনই কারা যেন সালামকে ডাকলো পেছন থেকে। ঘাড় ঘুরাতেই দেখি দুজন মেয়ে ও একজন ছেলে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সালাম চীনা ভাষায় ওদের সম্ভাষণ জানালো। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলে ওরা চোখ বড় বড় করে বললো, ‘বাংলাদেশ! মানজালা!’
সালাম হেসে মাথা নাড়লো। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! ‘মানজালা’ আবার কী? পরে জেনেছিলাম, চীনারা বাংলাদেশকে ‘মানজালা’ বলে ডাকে। পরে ওরা ওদের নাম বলল। মেয়ে দুটির নাম লি ও জিন। আর ছেলেটি জিয়ান। সবাই কাস্টম বিভাগের প্রশিক্ষণার্থী। সালামের বন্ধু।
ক্যাফেতে ঢুকে একটা টেবিল নিয়ে আমরা বসলাম। কফি হাতে ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। মাঝে মাঝে আমাকেও দুই একটা প্রশ্ন করছে। আমি বাইদোতে তার উত্তর দিচ্ছি। একসময় আমি প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা তোমাদের এখানে মজার কোনো গল্প নেই? সালাম বোধহয় প্রথমটায় ঠিক বুঝলো না। বাইদোতে প্রশ্ন করলো, কীসের গল্প?
আমি বলললাম, মজার কোনো গল্প। এই ধরো অনেকদিন ধরে প্রচলিত আছে। তোমরা শৈশব থেকে যা শুনে আসছো। সালাম এবার হাসলো। ওর বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টা বললে ওরাও হেসে উঠলো। তারপর উইচ্যাটে আমাকে একটা লিংক দিয়ে সালাম বললো, হোটেলে গিয়ে পড়ো। বুঝলাম মজার কিছু হবে।
রাত ঘনিয়ে এলে হোটেলে ফিরে শরীর আর চলছিল না। নিজেকে নিঃশক্তি মনে হচ্ছিলো। গ্র্যান্ড বাজারে লম্বা ঘোরাঘুরি কেনাকাটা হয়েছে। কেমারখান তখনো ঘুর ঘুর করছে। আর না পেরে সকালে সালামের দেওয়া লিংকটা পড়াবো পরিকল্পনা করে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিলাম।
এক যে ছিল এক পর্বত। নাম তার তিয়ানশেন। বিশাল তার শরীর। আকাশ ছুঁই ছুঁই উচ্চতা। হাত পা ছড়ানো শত শত মাইল বিস্তৃতি। উত্তর দক্ষিণে আসন। গায়ে জড়ানো ভাঁজভাঙা শাড়ি। যেই সেই শাড়ি নয়, তুষারে গাঁথা শুভ্র রেশমি শাড়ি। রোজ প্রত্যুষে সে জেগে উঠে মুখ ঝলমলিয়ে। সাদা মুক্তোর দাঁতে হেসে গড়িয়ে পড়ে দিগন্তজুড়ে।
আর আঁধার নামলে? সে এক রহস্যপুরী! আকাশের সব তারা খসে পড়ে নিচে। ওই পর্বতের কূলে। জমে রাতভর গল্পের মেলা। শত শত পরী, দেব-দেবী, তারকারাজি অবাক বিস্ময়ে শুনে সে গল্পগাঁথা। সেখানে বাস করতো এক দেবী। নাম ছিল তার শি ওয়াংমু। যেমন ছিল তার রূপ তেমন ছিল তার শক্তিমত্তা। সে ছিল অসীম শক্তির অধিকারী।
সে বাস করতো ওই পর্বতের অনুপম এক প্রাসাদে। সেখানে কারও যাওয়া মানা। শুধু কল্পনায় গল্প বোনা। প্রাসাদের পাশে ছিল দেবীর একান্ত এক গোসলখানা। যেই সেই গোসলখানা নয়। দেবীর গোসলখানা বলে কথা! সপ্ত পাহাড়ে ঘেরা। তুষার গলা পানি। সুশীতল। জুড়ায় প্রাণ। সুনসান নীরবতা। কিন্তু দেবী পা রাখতেই সব খান খান। জলাধারে কলকল। পাখির উড়ান। মুক্ত আকাশ। দেবীর বন্দনায় তারারা গেয়ে উঠে গান!
দূরের মেঘ আসে উড়ে! ছায়া দিতে মেলে পাখা। কী আনন্দ! কী শিহরন! বিহঙ্গ নিকেতন! লোকমুখে উচ্চারিত হচ্ছে আজও সেই নাম, ‘তিয়ানচি’ জলাধার। ইংরেজিতে ‘হেভেনলি লেক’। চীনের শিশুরা পৌরাণিক ওই গল্প শুনে শুনে আজও ঘুমের রাজ্যে হারায়। আর দলে দলে পর্যটকেরা যায় তিয়ানচিকে দেখতে। উরুমচি সিটি থেকে ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।

সকালে ঘুম ভাঙলে আগের দিন রাতে দেওয়া সালামের লিংকে এই গল্প পড়ে শরীর শিউরে উঠি। দারুণ! দারুণ জায়গা। হেভেনলি লেক। স্বগীয় হ্রদ। যেতেই হবে দেখতে। গ্রুপ লিডার মুকুল স্যারকে বলতে হবে। সবাইকে বলতে হবে এই কাহিনি। দারুণ এক রোমাঞ্চ নিয়ে সকালের ক্লাসে ঢুকি।
আজ সেমিনারের দ্বিতীয় দিন। ক্লাস আছে দুটি। বক্তা জো পেইজাং। প্রথমটির। জো জিনজিয়াং কমার্স সেন্টারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সুদর্শন মধ্যবয়সি স্মার্ট। ক্লাসের বিষয় ‘চায়না ওভারভিউ’। আমরা বেশ মনোযোগী। চমৎকার পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন চলছে। স্লাইডের পর স্লাইড ধরে জো চায়নার ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, জাতিগোষ্ঠী, শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি ইত্যাদি বিবৃত করে চলেছেন। প্রবল আগ্রহভরে সেটা আমরা কর্ণপাত করছি।
এর মধ্যে কে একজন হঠাৎ প্রশ্ন করে করলো, চীনারা প্রধানত কোন ধর্মাবলম্বী? জো মনে হলো কিছু বুঝলো না। পাশে বসে ছিলেন ইংরেজি অনুবাদক জিন ইউয়ান। তিনি প্রশ্নটি পুনরায় উদ্ধৃত করে নিশ্চিত হয়ে জোকে চীনা ভাষায় বুঝিয়ে বললেন। জো চাইনিজ ভাষায় কী একটা উত্তর দিলে জিন আমাদের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট করে বললেন, আমরা ‘সিসিপি’তে বিশ্বাসী। ‘সিসিপি’ হল চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি।
চীনে প্রতিটি মানুষ ধর্মবিশ্বাসে স্বাধীন। প্রতিটি জাতি গোষ্ঠীর নিজস্ব ধর্ম, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, উৎসব, সংস্কৃতি আছে। বহু রাজনৈতিক দল আছে। তবে নেতৃত্বদানকারী পার্টি হিসেবে ‘সিসিপি’র আদর্শই চীনাদের মূল বিশ্বাস। দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণ। শিউরে উঠলাম। ধর্ম নিয়ে কোনো কূপমণ্ডূকতা নেই। ১৪০ কোটির উপরে এতো মানুষকে জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে এক সুতোয় গাঁথার আর কী সূত্র থাকতে পারে?
গত দু’দিন ধরেই কাছের এক বিপণিবিতানের কথা শুনছিলাম আমরা। উরুমচিতে আমরা পৌঁছেছিলাম দুইভাগে। একটি দল আগে। আরেকটি একদিন পরে। আমরা ছিলাম পরের দিনের দলে। আর এসেই শুনেছিলাম কাছেই নাকি ঢাকার বসুন্ধরা কিংবা যমুনার মতো বিশাল এক শপিং মল আছে। অগ্রবর্তী দলটি নাকি ইতোমধ্যে সেখানে ঘুরেও এসেছে প্রথমদিনই।
কিন্তু আমাদের সময় হচ্ছিলো না। কারণ ছিল। এক. পৌঁছার দিন আমরা ছিলাম প্রচণ্ড ক্লান্ত। দুই. পরপর দুটি ফ্লাইটে চোখের পাতা বেশিক্ষণ এক রাখা সম্ভব হয়নি। চারদিকে এতকিছু দেখার ছিল! আর পরের দিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সবাই ছুটেছিল গ্র্যান্ড বাজারে। তাই আজকের বিকেলের ক্লাশ শেষে সাড়ে সাতটার মাঝে ডিনার সেরে ওয়ান্ডা প্লাজার উদ্দেশ্যে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম।
১০ মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু চিত্র ভিন্ন। বিশাল চোখমুখ বন্ধ এক ইমারত। ৮০/৯০ ফুট উঁচু। সুপ্রশস্ত। চারদিকে সুপরিসর ফুটপাত। তারপর লেন বাই লেন রাস্তা। নাকের ডগায় বিআরটি বাসস্টেশন। তবে মেট্রো এদিক দিয়ে যায়নি। ভিড় বাট্টা একদম নেই। ফাঁকা ফাঁকা চারদিক।
এদিকে তখন পড়ন্ত বিকেল। আমাদের দলটা মার্কেটের সামনে ব্যস্ত হয়ে গেল ছবি আর সেলফি তুলতে। দূরে বেলা গড়াচ্ছে, তবুও মানুষের ভিড় বাড়ছে না। দুই একজন যা-ও বিক্ষিপ্তভাবে আসছে, ফুড়ুৎ করে মস্ত বাক্সের মতো গম্ভীর ভবনটার গর্ভে তারা চালান হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা ঘনবসতিপূর্ণ দেশের মানুষ। বড় কোনো মার্কেটের চিত্রটাই আমাদের কাছে ভিন্ন। ওর সাথে এর কোনভাবেই মিল খাওয়াতে পারছি না।
অগত্যা ক্ষীণ পায়ে মার্কেটের বহিরাংশ পরখ করতে থাকি। হকার-ফেরিওয়ালা নেই। হাক ডাক নেই। নিঃশব্দ বাতাসের মতোই সব উদাসী। বাইরের দিকে বাচ্চাদের কয়েকটা রাইডে দেখলাম একটিমাত্র দেবশিশু পিতামাতার পাশে খেলছে। ওদিকে সূর্য অস্ত যায় যায়। গোধূলী চলে এলো। চোখ জ্বেলে জানান দিল সড়কবাতি। সন্ধ্যা ঘনাতেই দূরের তুষারাবৃত তিয়ানশেনের হু হু শীতল শ্বাসের ধাক্কায় শিহরনে উঠে আমরা মার্কেটের পেটে ঢুকে পড়লাম।
চলবে…