১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মাঙ্গোশি ও কথা বলা গাছেরা, পঞ্চম পর্ব

এক ফুলের খোঁজে মাঙ্গোশি ঢুকে পড়ে কথা বলা গাছেদের জগতে।

অরণ্য পাশা অরণ্য পাশা

Published : 22 Sep 2025, 04:43 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:20 PM

তারপর মাঙ্গোশি শুকনো পথ ধরে হাঁটতে লাগলো, দূরের ম্লান সবুজ মেঘের মতো বনভাগের দিকে। অনেকটা পথ হাঁটল, বহু ভাঙা গাছের পাশ দিয়ে গেল, আর তাদের জন্য মন খারাপ হয়ে গেল।

অবশেষে যখন সূর্য আকাশে হেলে পড়তে শুরু করেছে, তখন সে পৌঁছাল সেই বনভাগে যা এখনো জীবিত। সে ভেতরে ঢুকল, সেখানে ছিল উষ্ণতা। বাতাসে গাছের ছাল আর ঝোপের গন্ধ ভেসে আসছে। কাছেই কোথাও পশুর হাঁচির মতো শব্দ শোনা গেল।

কিছু পাখি ডালপালায় ব্যস্ত হয়ে উড়াউড়ি করছিল। মাঙ্গোশি আরও ভেতরে ঢুকতে লাগল। হঠাৎই কানে এলো অনেকগুলো কণ্ঠের গুঞ্জন, মৃদু, ধীর, উঁচু-নিচু ঢেউয়ের মতো, যেন একসঙ্গে অনেকে কথা বলছে। তার মনে হলো, পুরো বন তাকে লক্ষ্য করছে। কিন্তু চোখ তুলে তাকালে সে কেবল মেহগনি আর ওবেচে গাছ, ঝোপঝাড় আর লতাগুল্ম দেখতে পেল। কাছাকাছি আর ডালের ওপরে কোথাও খসখস শব্দ হচ্ছে।

সে হাঁটতে থাকলো। গুঞ্জন ধীরে ধীরে আরও জোরালো হতে লাগল। অবশেষে, ক্লান্ত হয়ে মাঙ্গোশি একটি ঢিবির ওপর বসে পড়ল বিশ্রাম নিতে। চারপাশে গাছের শিকড়ের দিকে তাকাল, হয়তো সেই বিশেষ ফুলটা চোখে পড়বে। কিন্তু কিছুই নেই, শুধু অদ্ভুত রঙের মাশরুম আর একটি সাপের খোলস।

মাঙ্গোশি এতটাই ক্লান্ত যে, অল্পক্ষণের জন্য চোখ লেগে গেল। তার পাশে দাঁড়ানো ওবেচে গাছটা নিচু হয়ে তার ডাল নামাল আর বললো, তাহলে, তুমি অবশেষে এলে।

ওকে ঘুমোতে দাও, বললো এক সিকামোর।

এমন সময়ে কীভাবে সে ঘুমোতে পারে?

ওকে একা থাকতে দাও। ও এখনো জানে না কী ঘটছে, আর কী ঘটতে চলেছে।

কিন্তু ওকে জানতেই হবে। দেরি হওয়ার আগে, ও-ই একমাত্র আমাদের কথা সবাইকে বলতে পারবে।

কিন্তু ও কি প্রস্তুত?

সে এখন এখানে এসেছে। এর মানে ও প্রস্তুত।

তাহলে ওকে কে বলবে?

আমি বলব, গভীর কণ্ঠে জানাল এক বৃদ্ধ গাছ।

আমি সব শুনেছি, মাথা তুলে বললো মাঙ্গোশি।

তাহলে, কী বলতে যাচ্ছো আমাকে? আমি এখানে আছি, আর আমি প্রস্তুত।

তুমি এখানে কেন এসেছো? জিজ্ঞেস করল বৃদ্ধ বাওবাব গাছ।

ঠিক আগের মতোই গাছেরা নড়ে এলো, তার চারপাশে জড়ো হলো। তাদের ডাল নিচু হয়ে এলো, যেন তাকে ভালো করে দেখতে চায়।

সে খুব ছোট, ফিসফিস করে বললো এক তালগাছ।

ও কীভাবে সাহায্য করবে? ও তো অনেক ছোট, বললো এক শঙ্কুযুক্ত গাছ।

যারা বড়, তারাই তো আমাদের কেটে ধ্বংস করছে। হয়তো ছোটরাই সাহায্য করতে পারবে। অন্তত তারা শোনে। দেখো, সে এখন মন দিয়ে শুনছে, বললো এক উবে গাছ।

আমরা তো এতদিন শুধু এটুকুই চেয়েছিলাম, কেউ যেন আমাদের শোনে, জবাব দিল এক সেগুন গাছ।

চুপ কর সবাই! সবচেয়ে প্রবীণ গাছ কথা বলছে, বললো এক মুখোশগাছ।

আবারও বাওবাব প্রশ্ন করল, তুমি এখানে কেন?

আমি একটা ফুল খুঁজতে এসেছি। সেই ফুল আমার মায়ের অসুখ সারাতে পারবে। পুরো গ্রামকেও সাহায্য করবে।

আমি জানি তুমি কোন ফুল খুঁজছো। কিন্তু তুমি সেটা পাবে না। কারণ যে গাছের পাশে ফুলটি জন্মাত, সেটি কেটে ফেলা হয়েছে।

কেটে ফেলা হয়েছে? চমকে চিৎকার করে উঠল মাঙ্গোশি।

কিন্তু কে কাটল সেটা?

তোমাদের লোকজন, রাগী স্বরে উত্তর দিল একটি ছোট গাছ।

তার মানে, গম্ভীর কণ্ঠে বললো বাওবাব, তোমারই মানুষেরা এটা করেছে।

কেন?

কেন? বাওবাবও প্রশ্ন করল, আর তখনই এক অদ্ভুত শব্দ ছড়িয়ে গেল গাছেদের মধ্যে, পাতার ভেতর, কাণ্ডের ভেতর। প্রথমে মনে হলো হাসির শব্দ।

তোমরা হাসছো কেন? জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।

না, এটা হাসি নয়। এ হলো বাতাসের শব্দ, বনের ভেতর নতুন যে ফাঁকগুলো তৈরি হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে বাতাস ঢুকে যে হাহাকার করে, সেটাই শুনছো, বললো ছোট গাছটি।

তুমি জানতে চাও কেন তারা আমাদের কেটে ফেলে? ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল বাওবাব।

হ্যাঁ, যদি বলার আপত্তি না থাকে।

তোমাকে বলার আগে কেন মানুষ আমাদের কেটে ফেলে, তার চেয়ে আগে আমাদের পরিচয় দেওয়া উচিত।

আমি তো ভেবেছিলাম, তোমরা গাছ।

কিন্তু তুমি কি জানো, গাছ আসলে কী?

মাঙ্গোশি চারদিকে তাকাল, তালগাছ, ইরোকো, ওবেচে, বাওবাব, খাটো গাছ, লম্বা গাছ ও কুঁজো গাছ। সে ভেবেছিল, সে জানে গাছ মানে কী। কিন্তু এখন তার মনে হলো, হয়তো সে ঠিক জানেই না।

তাহলে, তোমরা কী?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমরা তোমাকে নিয়ে যাব সময় আর পৃথিবীর নানা প্রান্তে, এক যাত্রায়।

কিন্তু কীভাবে?

খুব সহজ। স্বপ্নের ভেতরে নিজেকে ছেড়ে দাও, আর আমাকে আঁকড়ে ধরো।

মাঙ্গোশি বাওবাব গাছটিকে জড়িয়ে ধরল। চোখ বন্ধ করল। নিজেকে সমর্পণ করল সেই বিশাল গাছের কাছে।

হঠাৎ মাঙ্গোশি উড়ে চলেছে, দূর আকাশে! ডালপালার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে দেখল, যতদূর চোখ যায়, শুধু গাছের সমুদ্র। তারা সব আলোয় ঝলমল করছে, জাদুকরীর মতো।

আমরা শুধু গাছ নই, গভীর কণ্ঠে বললো বাওবাব।

আমরা পৃথিবীকে ধরে রাখি।

আমরা আকাশ আর মাটির মধ্যে সেতুবন্ধন।

আমরা দিই সেই বাতাস, যা মানুষ শ্বাস নেয়।

আমরাই করি পরিবেশকে স্থির আর শান্ত।

আমাদের রয়েছে মহাশক্তি, আরোগ্যের ক্ষমতা।

আমরা মনুষ্য জাতির চেয়েও প্রাচীন।

তারপর মাঙ্গোশি অনুভব করল, তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাটির নিচে। সেখানে সে দেখল অসংখ্য শিকড়, শিকড় থেকে শিকড় ছড়িয়ে, জড়িয়ে, একে অপরকে ধরে রেখেছে বিশাল পৃথিবীর নিচে।

ওগুলো কী? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।

এগুলো আমাদের শিকড়, বাওবাব বললো।

এই শিকড় দিয়েই আমরা গাছেরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলি, খবর ভাগ করি, এমনকি ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও টের পাই।

আর কী করতে পারে শিকড়? জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।

আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। অনেক সময় মনে হয় একটা গাছ মরে গেছে। কিন্তু যদি শিকড় জীবিত থাকে, তবে গাছ আবারও বেড়ে উঠতে পারে। মাটির নিচেই ঘটে আসল জাদু। এটা একেবারে আলাদা এক দুনিয়া। শুধু শিকড়ের জাল ধরে ধরে তুমি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পর্যন্ত চলে যেতে পারো।

আমি জানতামই না গাছ এত আশ্চর্যজনক! বিস্ময়ে বললো মাঙ্গোশি।

আমাকে উদাহরণ হিসেবে নাও।

আমার প্রতিটি অংশ কাজে লাগে।

আমার পাতা আর ছাল থেকে তৈরি হয় ওষুধ।

আমার ফল হয় পুষ্টিকর।

আমার শিকড় সারিয়ে তোলে বহু পরিচিত আর অচেনা রোগ।

আমার ছায়া দেয় শান্তি আর দূর করে অশুভ।

একটি গাছ আসলে মানুষের মতো। আমাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা স্বভাব আছে। তুমি কি টের পাওনি, আমরা প্রত্যেকেই কতটা ভিন্ন?

হ্যাঁ, আমি টের পেয়েছি, বললো মাঙ্গোশি। এবার তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?

ভালো করে ধরে থাকো! আমরা যাচ্ছি সারা পৃথিবী ঘুরে, মহাগাছদের দেখতে, আর সেই সঙ্গে দেখতে মহা-বেদনা।

চলবে...