Published : 18 Jan 2026, 05:11 PM
বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের একটি উক্তি দিয়ে আলোচনাটি শুরু করা যাক। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তিনি সাবধান করে বলেছিলেন, “এআই তৈরি করতে পারাটা হবে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, যদি আমরা এর সুপ্ত বিপদগুলো এড়িয়ে চলতে না শিখি, তবে সম্ভবত এটাই হবে মানব সভ্যতার ইতিহাসের শেষ অর্জন।”
বর্তমান সময়ে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত খেলনাগুলো শিশুদের জন্য বিনোদনমূলক ও আকর্ষণীয় হিসেবে প্রচার পাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো নিরীহ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশের পথে অন্তরায় ও ঝুঁকি।
আসলে এআই-চালিত খেলনা বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? এগুলো সাধারণ কোনো জড় খেলনা নয়। মূলত এগুলো এমন সব আধুনিক যন্ত্র যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আপনার সন্তানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারে, তাদের বিচিত্র সব প্রশ্নের উত্তর দেয়, কল্পনাপ্রসূত গল্প শোনায় এবং অনেকটা সত্যিকারের বন্ধুর মতো আচরণ করে। বাজারজাত করার সময় এগুলোকে প্রায়শই ‘শিক্ষামূলক’ বা ‘ইন্টারঅ্যাক্টিভ’ খেলনা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু মূল উদ্বেগের জায়গাটি হলো, এই খেলনাগুলোর কথোপকথন ও প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয় এমন এক জটিল অ্যালগরিদম বা প্রোগ্রামের মাধ্যমে, যা শিশুর কোমল ও সংবেদনশীল মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়নি।
এআই খেলনা কেবল কথা বলা বা গান শোনানোর গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি শিশুর সঙ্গে এক ধরনের কৃত্রিম আবেগীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তবে মনে রাখা জরুরি, এই সম্পর্কটি কোনো মানবিক সম্পর্কের বিকল্প নয়। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফক্স থার্টিন নিউজ’-এর একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, ‘কুম্মা’ নামের একটি এআই টেডি বিয়ার শিশুদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিপজ্জনক কথোপকথনে জড়িয়ে পড়ছে। মূলত এরপর থেকেই বিষয়টি বিশ্বজুড়ে গবেষকদের নজরে আসতে শুরু করে।
একইভাবে ২০২৫ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘দ্য হিডেন ডেঞ্জার ইনসাইড এআই টয়েজ ফর কিডস’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে প্রথমবারের মতো এই সংকটের গভীরতা উন্মোচিত হয়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং শিশু বিশেষজ্ঞ ডানা সাসকিন্ড নিবন্ধটি লিখেছিলেন। তিনি এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক ধারণা রাখলেও, শিশুর বিকাশের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় বা ‘ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড’-এ এআইয়ের অসংযত ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তার মতে, শৈশবে মানবিক সাহচর্য ও কথোপকথনের বদলে অতিরিক্ত এআই খেলনার ব্যবহার শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দেয়, যাকে তিনি সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘ব্রেন স্টান্ট’ হিসেবে।
এই সংকট এখন একটি বৈশ্বিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় এআই খেলনার ব্যাপক ব্যবহার এবং সেসব দেশের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এই ঝুঁকির বাস্তবতাকে আমাদের সামনে নিয়ে আসছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদিও এখনো এসব খেলনা খুব একটা সহজলভ্য নয়, তবে গ্লোবাল মার্কেটের দ্রুত প্রসারের ফলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশেও এর বিস্তার ঘটবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
শিশুর বিকাশে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইউনিসেফ ইতোমধ্যে শিশু-কেন্দ্রিক নির্দিষ্ট নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তাদের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি এআই ব্যবস্থায় শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ লক্ষ্যে ইউনিসেফ শিশুদের জন্য এআই নীতিমালার ১০টি আবশ্যিক শর্ত সংবলিত একটি বিস্তারিত গাইডলাইনও প্রকাশ করেছে।
এআই খেলনার এই অদৃশ্য ঝুঁকিগুলো কীভাবে আমাদের আদরের সন্তানদের কাছে পৌঁছাচ্ছে? এর উত্তর হলো- আমাদের অলক্ষ্যেই তারা শিশুর কৃত্রিম ‘বন্ধু’ হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কোমো নিউজ’ এক প্রতিবেদনে দেখায় যে, ‘লাবুবু’ ও ‘লাফুফু’র মতো নকল ও সস্তা এআই খেলনা অনলাইনে সহজলভ্য হচ্ছে, যেগুলোর উত্তরের কোনো নিরাপত্তা মানদণ্ড নেই। এমনকি মার্কিন টিভি চ্যানেল ‘ফক্স থার্টিন’ দেখিয়েছে কীভাবে ‘কুম্মা’ নামক একটি খেলনা শিশুকে অনিরাপদ ও বিপজ্জনক কাজে প্ররোচিত করার মতো পরামর্শ দিচ্ছিল।
প্রতি সপ্তাহেই বাজারে আসছে নতুন সব অত্যাধুনিক এআই খেলনা, যা শিশুকে নাম ধরে ডাকে এবং তার নিত্যসঙ্গী হতে চায়। এগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর শিক্ষামূলক গুণের দাবিও প্রবল। বলা হয় যে, এগুলো শিশুর স্ক্রিন টাইম বা পর্দার আসক্তি কমিয়ে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ উল্টো। একজন রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে চোখ মেলাানো, আদর পাওয়া কিংবা সরাসরি শেখার কোনো বিকল্প যন্ত্র হতে পারে না। এই মানবিক স্পর্শই শিশুর মস্তিষ্কে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় দশ লাখ ‘নিউরাল কানেকশন’ তৈরি করে, যা তার ভাষা শিক্ষা, সামাজিক দক্ষতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি।
এআই খেলনা কীভাবে শিশুর বিকাশে ক্ষতি করছে, তা গভীরভাবে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই খেলনাগুলো সবসময় তাত্ক্ষণিক সাড়া দেয় এবং কোনো কিছুতেই বিরক্ত হয় না। এর ফলে এআই-নির্ভর শিশুরা বাস্তব জীবনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, ত্যাগ স্বীকার, ধৈর্য ধরা কিংবা সামাজিক সমঝোতা শিখতে ব্যর্থ হয়। তারা সম্পর্কের জটিলতা, প্রকৃত আবেগ ও দায়িত্ববোধ বুঝতে পারে না। আমরা কি সেই ট্রয় নগরীর বাসিন্দাদের মতো ভুল করছি না? যারা উপহার ভেবে কাঠের ঘোড়াটিকে শহরের ভেতরে এনেছিল, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ধ্বংসাত্মক বিপদের কথা বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেনি।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৬ মাস বয়সের শিশুরাও রোবটের প্রতি মানুষের মতোই সাড়া দিতে শুরু করে। তারা এআই খেলনাকে কেবল একটি যন্ত্র না ভেবে একজন সত্যিকারের সঙ্গী মনে করে ভুল করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা অধিকার সংস্থা ‘ইউএস পিআইআরজি এডুকেশন ফান্ড’-এর এক সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা গেছে, কিছু এআই খেলনা শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কথা বলছে কিংবা বিপজ্জনক পরামর্শ দিচ্ছে। আজ আমরা শিশুদের হাতে যে যন্ত্র তুলে দিচ্ছি, তার দীর্ঘমেয়াদী কুফল হয়তো তারা যখন তরুণ বয়সে পা রাখবে তখন বোঝা যাবে। তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই এখন বেশি জরুরি।
শিশুরা কেন এআইয়ের দিকে এত বেশি আকৃষ্ট হয়? এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো, শিশুর মস্তিষ্ক জন্মগতভাবেই সেই সব জিনিসের প্রতি বেশি মনোযোগী হয় যা তার ক্রিয়াকলাপের প্রতি ‘রেসপন্সিভ’ বা সংবেদনশীল। যেহেতু এআই তার কথা শোনে ও উত্তর দেয়, তাই সে সহজেই এর মায়াজালে আটকা পড়ে। তবে আমাদের জানতে হবে আমাদের শিশুরা ঠিক কী শিখছে এবং তাদের মস্তিষ্কে কোন ধরনের তথ্যের বীজ রোপণ করা হচ্ছে।
আগামী দিনে এআই খেলনা আরও সস্তা ও সহজলভ্য হবে। তাই সচেতন অভিভাবক হিসেবে কোনো খেলনা কেনার আগে অনলাইনে তার রিভিউ ও নির্ভরযোগ্য গবেষণাগুলো পড়ে দেখা জরুরি। আপনার সন্তানের দৈনিক রুটিনে এআই বা পর্দার জন্য বরাদ্দ সময় সীমিত করুন এবং তাকে বাইরে খেলাধুলা, বই পড়া ও পরিবারের সঙ্গে প্রকৃত আড্ডায় উৎসাহিত করুন। আপনার সন্তান যখন এআইয়ের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে, তখন তাকে আপনার স্নেহ ও সাহচর্য দিয়ে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনুন।
যদি কোনো শিশু ইতোমধ্যে এআই খেলনার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, তবে প্রথমেই তা হঠাৎ করে কেড়ে নেবেন না। বরং তার পরিবর্তে আকর্ষণীয় কোনো বিকল্প- যেমন নতুন বোর্ড গেম, পার্কে ঘুরতে যাওয়া কিংবা হাতে-কলমে শেখার কোনো মজার কাজ দিন। শিশুর একাকিত্ব বা বিরক্তির কারণটি বোঝার চেষ্টা করুন এবং সে অনুযায়ী সমাধান বের করুন।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিকে আমাদের মানবিক গুণাবলির প্রতিপক্ষ না বানিয়ে বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। শৈশবের সেই অমূল্য সময়ে আমরা কোন সত্তাকে আমাদের শিশুর মনে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছি, তার ওপরই নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ। তাই অভিভাবক, শিক্ষক ও নীতি নির্ধারক- সবাইকেই এখনই সোচ্চার হতে হবে। প্রযুক্তির আলো যেন আমাদের মানবিকতার প্রদীপটিকে নিভিয়ে না দেয়, সেই শপথই হোক আমাদের আগামী দিনের পাথেয়।