Published : 25 Jul 2025, 12:14 AM
বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসকে প্রাচীন থেকে প্রাচীনতর যিনি করে দিয়ে গেলেন, তার নাম হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। ১৯০৭ সালে তিনি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর এক বৌদ্ধবিহারে হাজার বছরের পুরনো বাংলা ভাষায় রচিত প্রায় ছেচল্লিশটি ‘বৌদ্ধ গান ও দোহা’র সন্ধান পান। শাস্ত্রী নিজেই প্রাচীন বাংলা ভাষায় লেখা এসব রচনার নাম রেখেছিলেন ‘চর্যাপদ’।
এই পদগুলোই বাংলা কাব্যসাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিহাস উলট-পালট করে দিল। আচার্য প্রবোধচন্দ্র বাগচী চর্যাপদের যে তিব্বতি অনুবাদ পরবর্তীতে আবিষ্কার করলেন, তাতে পদের সংখ্যা ছিল একান্নটি। তাই অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অতীন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, “মনে হয়, চর্যাপদের সংখ্যা একান্নটিই ছিল, পরে হয়তো কোনো কারণে তার কিছু নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকবে।”
চর্যাপদের সন্ধান ও গবেষণা আজও অব্যাহত রয়েছে। এখনও নতুন নতুন চর্যাপদ আবিষ্কৃত হচ্ছে। প্রাচীন বাংলা ভাষায় লেখা এই পদগুলোর যেমন সাহিত্যমূল্য আছে, একইভাবে এতে প্রাচীনকালের বাঙালির সমাজ-ছবিও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তবে চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও প্রবোধচন্দ্র বাগচীর মতে, চর্যাপদ খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে লেখা। কিন্তু ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও রাহুল সাংকৃত্যায়ন মনে করেন, চর্যাপদ আরও প্রাচীনকালের কাব্যসাহিত্য। তারা এই সময়কে আরও ২০০ বছর পিছিয়ে দিয়ে এর রচনাকাল খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী বলে উল্লেখ করেন।
যেহেতু চর্যাপদ প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত পদ, তাই বাংলা কাব্যসাহিত্যের পথচলা শুরু তখন থেকেই। চর্যাপদের পদগুলো মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লিখিত। লেখক হিসেবে পাওয়া গেছে চব্বিশজন (মতান্তরে তেইশজন) বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যের নাম। প্রথম পদটি রচনা করেছেন কবি লুইপা। এই কারণে টীকাকার মুনিদত্ত তাকে ‘আদি সিদ্ধাচার্য’ বলেছেন। তিব্বতি তালিকাতেও লুইপার নাম ছিল প্রথমে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম বাঙালি কবি লুইপা। এ থেকে বলা যায়, লুইপা বাংলা ভাষার আদিকবি, ‘প্রথম বাঙালি কবি’।
চর্যাপদ রচয়িতা কবিদের জীবনকথা সম্বন্ধে সঠিক তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। লুইপাকে ‘ব্স্তন-গুযরে শ্রীভগবদভিসময়’ নামে একটি তিব্বতি পুস্তিকাতে ‘বাংলাদেশের মানুষ বা বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীনকালের দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শহর তাঞ্জোরে সংরক্ষিত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি বাঙালি ছিলেন এবং চন্দ্রদ্বীপ অর্থাৎ আজকের বরিশালের বাসিন্দা। কারো কারো মতে, তিনি মগধের বাসিন্দা ছিলেন।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লুইপাকে রাঢ় অঞ্চলের মানুষ বলে উল্লেখ করেছেন। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের রাঢ় অঞ্চল ও ওড়িশা রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ জেলায় আজও তার নাম স্মরণ করা হয়। চর্যাপদের টীকাতে তার অন্য নাম ‘লূয়ীপাদ’ বা ‘লূয়ীচরণ’। রাহুল সাংকৃত্যায়ন বলেছেন, “লুইপা ছিলেন রাজা ধর্মপালের সচিব ও লেখক। তিব্বতি ঐতিহাসিক লামা তারানাথের মতে, লুইপা ছিলেন উদ্যানের রাজা উদয়নের করণিক বা লেখক। তখন তাকে লোকজন ‘সামন্ত শুভ’ নামে চিনত।”
কবি লুইপা চর্যাপদের প্রথম এবং ঊনত্রিশতম পদ ছাড়াও ‘শ্রীভগবদ অভিসময়’, ‘বজ্র-সত্ত্ব সাধনা’, ‘তত্ত্ব-স্বভাব দোহাকোষ গীতিকা দৃষ্টি নাম’, ‘শ্রীচক্র সম্বর অভি-সময় টীকা’ এবং ‘বুদ্ধদয়া’ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গে ‘অভিসময় বিভঙ্গ’ গ্রন্থ রচনা করেন।
সুনীতিকুমার দেখিয়েছেন, চর্যাপদের ভাষা এবং সেই ব্যাকরণগত দিকটায় এমন কতগুলো বিশেষত্ব আছে, যেগুলো কেবল বাংলা ভাষাতেই ব্যবহৃত হয়, আজও হচ্ছে। কতগুলো শব্দ নিঃসন্দেহে বাংলা, কতগুলো বাকভঙ্গি বাংলার নিজস্ব এবং যে-সমস্ত উপাদানকে রূপক ও উপমা হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে ধর্মতত্ত্ব বোঝানোর জন্য, ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিচারে সেগুলো বাংলার সমাজজীবনেই দীর্ঘকাল ধরে প্রাধান্য পেয়ে আসছে। এসব যখন নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হল, তখনই চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা বলে স্বীকার করে নিতে আর কোনো বাধা রইল না।
তবে চর্যাপদের সাহিত্যগুণ যা-ই থাক, ভাষা জটিল। সেই ভাষায় অনুধাবনের বাধা রসগ্রহণের প্রধান অসুবিধা। আচার্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাই বলেছেন, “চর্যাপদের ভাষা সান্ধ্যভাষা, কারণ সন্ধ্যাবেলার আলো আঁধারিতে যে রহস্যময়তা, সেই অপরিচয়ের আলো অন্ধকারে চর্যাপদ অস্পষ্ট।” মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ ভাষার নাম রেখেছেন ‘বঙ্গকামরূপী'।
লুইপার জীবনীকার তিব্বতি ঐতিহাসিক লামা তারানাথ তাকে যোগিনী ধর্মমতের স্রষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সিদ্ধসাধক কবি লুইপার জীবনযাত্রা ছিল কঠোর ও সাধনামূলক। তিনি সাধনা ও আত্ম-অনুসন্ধানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তার কবিতায় আধ্যাত্মিকতার গভীর অনুভূতি আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যের সন্ধানে বের হওয়া এবং আত্মার মুক্তি অর্জন করা মানুষের প্রধান লক্ষ্য। তার কবিতাগুলো সাধারণত সহজ ভাষায় লেখা। কিন্তু এর মধ্যে গভীর অর্থ ও দর্শন আছে। তিনি জীবনের দুঃখ, সুখ, প্রেম ও আত্মার মুক্তির কথা বলেছেন। তার কবিতায় আছে প্রাকৃতিক দৃশ্য, মানবিক সম্পর্ক এবং আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণ।
তবে লুইপার কবিতায় বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব স্পষ্ট। তিনি জীবনের অস্থিরতা ও মায়ার প্রতি সচেতন ছিলেন। তার কবিতায় আত্মার মুক্তির জন্য সাধনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। যেহেতু দশম শতকের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে পদাবলিগুলো আজকের মতো কাব্য হিসেবে পঠিত হতো, খোল-মন্দিরা-করতালসহ গীত হতো, তাই কবি লুইপার পদগুলোও তৎকালীন জনসমাজে বৈষ্ণব পদাবলির মতো গীত হতো। নীহাররঞ্জন রায়ের অনুমান, “ধ্রুপদ থাকায় সম্মেলক বা যৌথগান হিসেবে এগুলো গীত হতো এবং সেইদিক দিয়ে পরবর্তী কীর্তন বা বাউল গানের গায়ন পদ্ধতির সঙ্গে এর মিল থাকা হয়তো সম্ভব।”
পণ্ডিতরা বলছেন, চর্যাপদ বাংলা কীর্তনের প্রাচীনতম নিদর্শন। কথাটাকে আরেকটু বিস্তৃত করে বলা চলে, বাংলা গীতিকাব্যের আদি লক্ষণ যদি কোথাও স্পষ্ট ফুটে উঠে থাকে, তবে তা চর্যাপদে। তাই বাংলা কাব্যের ঊষালগ্নে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো কিরণ দিচ্ছে চর্যাপদ এবং সেই আলোকেই উদ্ভাসিত পরবর্তী বাংলা গীতিকাব্যগুলো। এই গীতিকাব্যের ধারা বাংলা সাহিত্যে আজও অম্লান। চর্যাপদের প্রথম পদটি যেহেতু লুইপার লেখা, তাই তিনিই যে বাংলা গীতিকাব্যের ‘প্রথম কবি’ বা ‘আদি লেখক’, তা আবারও প্রতিষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘প্রাচীন সাহিত্য’ বইয়ে কবি লুইপাকে ‘বাংলা সাহিত্যের আদি কবি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লুইপা প্রাচীন সিদ্ধাচার্য ছিলেন, তিনি ভারতীয় চুরাশি সিদ্ধাচার্যের একজন। লুইপাকে ‘দ্বারিকপাদের শিষ্য’ বলা হয়ে থাকে। তিনি নির্বিঘ্নে ধ্যান করার জন্য বাংলায় গঙ্গার ধারে চলে যান। এখানে তিনি ১২ বছর মাছের অন্ত্র খেয়ে জীবনধারণ করেন বলে মনে করা হয়। তিনি তখন থেকে ‘মৎস্যান্ত্রাদ’, ‘মচ্ছিন্দ্রনাথ’, ‘মচ্ছেন্দ্রপাদ’, ‘মোছন্দর’, ‘মীনপাদ’, ‘মৎস্যেন্দ্রপাদ’, ‘মীননাথ’ বা ‘মৎস্যেন্দ্রনাথ’ নামেও পরিচিতি পান। তিব্বতি ভাষায় লুই শব্দের অর্থ ‘যে ব্যক্তি মাছের অন্ত্র ভক্ষণ করেন’। সুকুমার সেন মনে করেন, লুই শব্দটি প্রাচীন বাংলা শব্দ লোহিত (লোহিত = রোহিতা = রুই) থেকে এসেছে।
কোনো কোনো ঐতিহাসিক ভারতীয় ঐতিহ্যের আদিসিদ্ধ মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথ আর লুইপাকে একই ব্যক্তিরূপে উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। তারা লুইপার জীবনের সঙ্গে মৎস্যেন্দ্রনাথের জীবনের অনেক মিল খুঁজে পান। কিন্তু ভারতীয় ঐতিহ্যে মৎস্যেন্দ্রনাথকে ‘চন্দ্রদ্বীপের কৈবর্ত’ বলা হয়েছে। মৎস্যেন্দ্রনাথের জন্মমৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট সময় জানা যায় না। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, মৎস্যেন্দ্রনাথ সপ্তম শতকের মধ্যভাগের কবি। তিনি অষ্টম শতকের শুরুর সময় পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। অবশ্য অন্য গবেষকদের সঙ্গে তার এই ধারণার মতানৈক্য রয়েছে।
কথিত আছে, মৎস্যেন্দ্রনাথ মাছের পেট থেকে হর-পার্বতী রহস্যকথা শুনে সিদ্ধি লাভ করেন। বৌদ্ধধর্মের মহাযান শাখার শূন্যবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় নাথধর্ম। তাদের আদি দেবতা হলেন নিরঞ্জন। এই নিরঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয় শৈবশক্তির ভাবনা। তাই শিবকে নাথপন্থীরা আদিগুরু বা আদিনাথ বলে থাকে। আদিনাথ-রূপী শিবের শিষ্য ছিলেন মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথ। তাই পার্থিব জগতে নাথধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এই মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথকেই গণ্য করা হয়। তার অন্যতম শিষ্য ছিলেন গোরক্ষনাথ ও চৌরঙ্গী নাথ।
স্কন্ধপুরাণে আছে, ভৃগুবংশের এক ব্রাহ্মণ একদিন পুত্রসন্তানের পিতা হন। এই সন্তান পিতৃ-মাতৃঘাতী হবে, এমন আশঙ্কায় ব্রাহ্মণ তার পুত্রকে সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করেন। একটি বৃহদাকার সামুদ্রিক মাছ শিশুটিকে গিলে ফেলে। এসময় শিব ও পার্বতী ক্ষিরোদসাগরের একটি দ্বীপে ছিলেন। পার্বতীর অনুরোধে শিব যোগশাস্ত্র বর্ণনা করছিলেন। মাছের পেট থেকে শিশুটি এই শাস্ত্রকথা শুনে ফেলে। তাই শিব উক্ত মাছের পেট থেকে তাকে উদ্ধার করে নিজের কাছে রাখলেন। শিব তার নাম দিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথ।
আধুনিক গবেষকরা মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথকে চর্যাপদের কবি লুইপা বলে মানতে রাজি হননি। তারা দুজনকে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, চর্যাপদে ২১ নম্বর পদের টীকায় মৎস্যেন্দ্রনাথের চারটি পদের উল্লেখ আছে। তবে কোনো পূর্ণাঙ্গ পদ নেই। তিনি সপ্তম শতকের কবি। ওই গবেষকরা পৃথক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে মৎস্যেন্দ্রনাথকেই ‘প্রথম বাঙালি কবি’ বলেছেন। কিন্তু বাংলা গীতিকাব্যের আদিরূপ হিসেবে চর্যাপদ যেহেতু আজ সর্বজন স্বীকৃত, তাই সেই চর্যাপদের প্রথম পদের লেখক হিসেবে লুইপা ‘প্রথম বাঙালি কবি’। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, “বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম কবি শবরপা। শবরপার পদগুলোর ভাষা সবচেয়ে প্রাচীন। তাই শবরপা বাংলা ভাষার প্রথম কবি।” কিন্তু উল্লিখিত কারণে এই মতও গৃহীত হয়নি।