Published : 18 Sep 2025, 03:24 AM
মৃত্যু কখনো কখনো জীবনের চেয়েও বড় গল্প বলে যায়। পনেরো শতকের মগহর-এ ঠিক তাই ঘটেছিল। কিংবদন্তি বলে, সন্ত কবীরের নশ্বর দেহকে ঘিরে সেদিন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল দুই সম্প্রদায়- হিন্দু ও মুসলমান। একদল চায় দাহ করতে, অন্যদল চায় কবর দিতে।
বিশ্বাস আর অধিকারের সংঘাত যখন তুঙ্গে, তখন এক শিষ্য এসে তার দেহের ওপর থেকে চাদরটি সরিয়ে দেন। কিন্তু সেখানে কোনো মরদেহ ছিল না, ছিল শুধু একরাশ তাজা ফুল। অবশেষে সেই ফুল ভাগাভাগি করে নিয়েছিল দুই পক্ষ, নিজ নিজ সংস্কারে সম্পন্ন হয়েছিল শেষকৃত্য।
এই কাহিনি ঐতিহাসিক সত্যের নিরিখে যাচাইযোগ্য না হলেও, এর প্রতীকী তাৎপর্য অপরিসীম। কবীর, যিনি আজীবন কোনো একক ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার কথা বলে গেছেন, তার শেষযাত্রাও যেন সেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক জীবন্ত দলিল হয়ে রইল।
কে ছিলেন এই কবীর? তিনি ছিলেন পঞ্চদশ শতকের এক মরমী কবি, সমাজ সংস্কারক এবং সর্বোপরি এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর, যার জন্ম ও জীবন আজও রহস্যের কুয়াশায় ঢাকা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বারাণসীর কাছে লহরতারা পুকুরে এক পদ্মপাতার ওপর তাকে শিশু অবস্থায় পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে নীরু ও নীমা নামের এক মুসলিম তাঁতি দম্পতি তাকে পুত্রস্নেহে পালন করেন। হিন্দুধর্মের পীঠস্থান কাশীতে এক মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠার এই মিশ্র পরিবেশই হয়তো তার সমন্বয়বাদী দর্শনের ভিত্তি রচনা করেছিল।

কবীরের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তার শিক্ষালয় ছিল সমাজ, তার জ্ঞান আহৃত হয়েছিল জীবন থেকে। পেশায় ছিলেন একজন সাধারণ তাঁতি। কিন্তু এই সাধারণ জীবিকাই তার দর্শনে এক অসাধারণ মাত্রা যোগ করেছিল। তার কাছে তাঁতের টানা-পোড়েন সুতোর বুনন ছিল জীবন ও জগতের এক নিঁখুত রূপক। মানবদেহ তার কাছে ছিল এক ‘ঝিনি চাদরিয়া’ বা সূক্ষ্ম চাদর, যা পরম যত্নে বোনা হয়েছে। কিন্তু মানুষ তার লোভ, লালসা আর অহংকারের দাগে সেই চাদরকে কলঙ্কিত করে।
তাই তিনি গেয়েছেন, এই জীবনের চাদরটিকে ঠিক যেভাবে পাওয়া গিয়েছিল, সেভাবেই নিষ্কলঙ্ক রেখে ফিরিয়ে দেওয়াই মানুষের ধর্ম। তার কায়িক শ্রম আর আধ্যাত্মিক সাধনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কর্মের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন ঈশ্বরকে।
কবীরের সময়ে সমাজ ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামি ও আচার-অনুষ্ঠানের বেড়াজালে আবদ্ধ। একদিকে ছিল ব্রাহ্মণদের শাস্ত্রীয় কঠোরতা, অন্যদিকে মোল্লাদের একচেটিয়া আধিপত্য। কবীরের শানিত যুক্তি আর তীব্র বিদ্রূপের তির ধেয়ে গিয়েছিল দুই শিবিরের ভণ্ডামির বিরুদ্ধেই। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন মূর্তিপূজার সার্থকতা নিয়ে, তীর্থযাত্রার কার্যকারিতা নিয়ে। তার সহজ অথচ গভীর কথা আজও প্রাসঙ্গিক: ‘পাথর পূজে হরি মিলে, তো ম্যায় পূজুঁ পাহাড়’। অর্থাৎ, পাথর পূজা করে যদি ঈশ্বরকে পাওয়া যেত, তবে তিনি আস্ত পাহাড়কেই পূজা করতেন।
তার কাছে মন্দিরের পাথর বা মসজিদের ইটের চেয়েও বড় ছিল মানুষের অন্তর, যেখানেই পরমাত্মার আসল বাস। তিনি হিন্দু বা মুসলমান, কাউকেই ছাড় দেননি। যারা শুধু বাহ্যিক আচারে মগ্ন, তাদের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছেন, “মাথায় টুপি আর গায়ে ছাপ দিয়ে কী হবে, যদি অন্তরে থাকে কপটতা?”
কিন্তু শুধু ভাঙার গানই তিনি গাননি, তিনি গড়ার পথও দেখিয়েছিলেন। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘প্রেম’। এই প্রেম জাগতিক ভালোবাসার ঊর্ধ্বে এক বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক অনুভূতি, যা দিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায়। শাস্ত্রের জটিল তত্ত্ব বা কঠোর যোগাভ্যাসের পরিবর্তে তিনি এই সহজ প্রেমের পথকেই শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। তার কাছে ঈশ্বর ছিলেন ‘প্রিয়তম’, আর মানবাত্মা ছিল তার ‘বিরহিনী’ প্রেমিকা। এই প্রেমই মানুষকে জাতপাত, ধর্ম আর সম্প্রদায়ের বিভেদ ভুলিয়ে দেয়।

এই প্রেমের পথে চলতে গিয়ে যার হাত ধরা সবচেয়ে জরুরি, তিনি হলেন ‘গুরু’। কবীরের জীবনে তার গুরু রামানন্দের প্রভাব ছিল অনেক। কারণ তার মতে, “ঈশ্বর পথ হারিয়ে ফেললে গুরুই সঠিক পথের সন্ধান দেন, কিন্তু গুরুকে হারালে ত্রিভুবনে আর কোনো আশ্রয় থাকে না”। তার সেই বিখ্যাত উক্তি- “গুরু গোবিন্দ দোনো খাড়ে, কাকে লাগুঁ পায়। বলিহারি গুরু আপনো, গোবিন্দ দিয়ো মিলায়।” অর্থাৎ, গুরু ও গোবিন্দ (ঈশ্বর) দুজনেই যদি একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ান, তবে তিনি আগে গুরুর চরণ স্পর্শ করবেন। কারণ সেই গুরুই তাকে ঈশ্বরের সন্ধান দিয়েছেন।
কবীর ছিলেন একাধারে মরমী সাধক ও সমাজবিপ্লবী। তিনি বর্ণবৈষম্য প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত হেনেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সব মানুষের রক্তই লাল, জন্মানোর সময় কারও গায়ে জাতের কোনো চিহ্ন থাকে না। কর্মই মানুষের আসল পরিচয়। সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষদের তিনি আপন করে নিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে বসে আহার করেছেন, তাদের জীবনের কথা তার দোঁহায় তুলে এনেছেন।
ছয় শতাব্দী পেরিয়ে এসে আজকের এই বিভেদদীর্ণ পৃথিবীতে কবীর আশ্চর্যরকমভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন ধর্মের নামে মানুষে মানুষে প্রাচীর তোলা হয়, তখন কবীরের সমন্বয়ের বাণী এক ঝলক তাজা বাতাসের মতো। যখন পরিচয়ের সংকটে ভোগা এক প্রজন্ম নিজেদের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলছে, তখন কবীর শেখান যে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘মানবতা’।
তিনি নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। তার বাণী মুখে মুখে ফিরত। পরবর্তীকালে তার শিষ্যরা তা ‘বিজক’ নামক গ্রন্থে সংকলন করেন। তিনি কোনো নতুন ধর্ম বা ‘পন্থা’ প্রতিষ্ঠা করতে চাননি, বরং চেয়েছিলেন মানুষের ভেতরের চোখ খুলে দিতে। তার সহজ কথাগুলো কোনো নির্দিষ্ট কাল বা ভূগোলে আবদ্ধ নয়। তা এক চিরকালীন সত্যের প্রতিধ্বনি, যা আজও আমাদের শেখায়- ঈশ্বরকে খুঁজতে হলে মন্দির-মসজিদে নয়, নিজের অন্তরেই খুঁজতে হয়। আর সেই অনুসন্ধানের শ্রেষ্ঠ পথ হলো প্রেম।