Published : 01 Oct 2025, 02:19 AM
এর কয়েকদিন পর এক বৃদ্ধা এলেন সারির দরবারে। জটবাঁধা চুল তার, গালে আঁচড়ানোর দাগ। চোখ ব্যথার পানিতে ছলছল।
সারির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “মুসলমানদের হে অভিভাবক, একটা ছেলে ছিল আমার—তরতাজা, সুন্দর আর তরুণ। একদিন সে আপনার বয়ানে এসেছিল হাসতে হাসতে, ফুরফুরে মেজাজে। আর ফিরে গেল কাঁদতে কাঁদতে; বুক চাপড়াতে চাপড়াতে। তারপর কেটে গেল এতগুলো দিন। সে ফিরল না আর। কোথায় গেল সে, কিচ্ছু জানি না আমরা। বুক ভাঙা কষ্ট নিয়ে দিন কাটাচ্ছি আমি। তার বিচ্ছেদে পুড়ে মরছি মনের আগুনে। কিছু একটা করুন আপনি আমার জন্য, হুজুর।”
বৃদ্ধার এই হৃদয় বিদীর্ণ আর্তি ভীষণ স্পর্শ করল সারির অন্তর। নরম কণ্ঠে তিনি বললেন, “কেঁদো না তুমি। এতে যে কল্যাণই নিহিত, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। যখন সে ফিরে আসবে, আমি নিজে থেকেই তোমাকে জানাবো সেটা। সে দুনিয়াকে ছেড়ে দিয়েছে; মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে পার্থিব মানুষদের থেকে। এখন সে সত্যিকারের ক্ষমাপ্রার্থীদের একজন।”
এর কয়েকদিন পর, এক গভীর রাতে ফিরে এল আহমাদ। সারি তার খাদেমকে বললেন, “যাও, সেই বৃদ্ধাকে গিয়ে বলো, তার ছেলে ফিরে এসেছে।” তারপর তার দৃষ্টি পড়ল আহমাদের দিকে। গাল তার বিবর্ণ, শীর্ণ শরীর। একদিন যে শরীর ছিল সাইপ্রেস গাছের মতো, তা এখন যেন বাঁকা হয়ে গেছে যন্ত্রণায়। কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল আহমাদ, “দয়াল, যে শান্তির পথ আপনি আমাকে দেখিয়েছেন, অন্ধকার থেকে এনে দাঁড় করিয়েছেন আলোয়। আপনার এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। আল্লাহ যেন শান্তি দান করেন আপনাকে, আর আনন্দে রাখেন উভয় জগতে।”
তাদের এই আলোচনা যখন চলছিল, এর মধ্যে সেখানে হাজির আহমাদের মা ও তার স্ত্রী। সঙ্গে তাদের ছোট্ট ছেলে। আহমাদের উপর তার মায়ের চোখ পড়তেই ছেলের রুগ্ন, ভগ্ন, অপরিচিত রূপ দেখে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। আহাজারি করতে করতে স্ত্রী এসে দাঁড়ালেন এক পাশে। আর ছোট্ট ছেলেটি কাঁদতে লাগলো অন্য পাশে দাঁড়িয়ে। চারদিক থেকে একসঙ্গে উঠে এলো কান্নার শব্দ, যেন তা মর্মভেদী কোনো সঙ্গীত।
নিজেকে আর সংবরণ করতে পারলেন না সারি। মুহূর্তে তার চোখ ভিজে উঠে অশ্রুতে। শিশুটি ছুটে এসে লুটিয়ে পড়ল বাবার পায়ে। কিন্তু এত কান্না আর অনুনয়েও মন গলল না আহমাদের। সে আর ঘরে ফিরল না। “মুসলমানদের হে ইমাম,” মিনতির কণ্ঠে বললেন আহমদ, “কেন তাদেরকে সব বলে দিলেন আপনি? ওরাই তো আমার সর্বনাশ ডেকে আনবে।”
সারি বললেন, “তোমার মা বিনীত অনুরোধ করছিলেন বারবার। শেষমেষ, তার আকুতিতেই জানাতে বাধ্য হলাম আমি।” তারপর আবার মরুভূমির পথ ধরতে প্রস্তুত হলেন আহমদ। কান্নায় ভেঙে পড়লেন তার স্ত্রী, “বেঁচে থেকেও আমাকে বিধবা করলে তুমি। আর তোমার ছেলেকে করছো অনাথ। যখন সে তোমার খোঁজ করবে, কী বলব আমি তাকে? আর কোনো পথ নেই, তোমার সঙ্গেই তাকে নিতে হবে।” “ঠিক আছে, তাই হোক তবে,” শান্ত কণ্ঠে বললেন আহমদ।
তারপর শিশুটির রেশমি পোশাক খুলে নিয়ে, তার গায়ে পরিয়ে দিলেন বকরির পশমে বোনা কাপড়ের একটি টুকরো। হাতে দিলেন একটি ঝুলি। আর বললেন, “এখন তুমি যাও, পথ ধরো নিজের।” ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখে আর্তনাদ করে উঠলেন আহমদের স্ত্রী। “আমি এটা সহ্য করতে পারছি না,” এই বলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন নিজের বুকে। আহমদ তখন বললেন, “আমি আমার নিজের দায়িত্বও তোমার হাতে তুলে দিলাম। যদি তুমি চাও, তবে আমাকে মুক্ত করে দাও।” তারপর আহমদ ফিরে গেলেন মরুর নির্জন বুকে।
বহু বছর কেটে গেল। এক রাতে, এশার নামাজের সময়, এক আগন্তুক এসে দাঁড়ালেন সারির খানকায়। “আহমদ আমাকে পাঠিয়েছেন,” বলে ঢুকল সে। “তিনি বলছেন, ‘আমার অবস্থা চূড়ান্ত সংকটে। আপনি আমাকে সাহায্য করুন।” এটা শুনে সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে এলেন সারি। গিয়ে দেখলেন, একটি কবরের পাশে, ধুলায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন আহমদ; প্রায় মৃত্যুর মুহূর্ত তার। কিন্তু জিহ্বা তখনও নড়ছে। সারি কান পেতে শুনলেন। আহমদ বলছিলেন, “এরই জন্য তো সাধকের সাধনা।”
মাটি থেকে তার মাথাটা তুলে নিজের বুকে টেনে আনলেন সারি। মুছে দিলেন মুখমণ্ডল। চোখ খুললেন আহমদ, শায়েখকে দেখে বললেন, “মালিক, সময়মতো এসেছেন আপনি। আমার অবস্থা সংকটময়।” এই কথা বলেই তার নিশ্বাস থেমে গেল। চোখের পানি মুছতে মুছতে নগরের পথে রওনা হলেন সারি, আহমদের দাফনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। পথে দেখলেন, শহর থেকে নেমে আসছে জনতার ঢল। তিনি জানতে চাইলেন, “কোথায় যাচ্ছো তোমরা?” তারা বলল, “আপনি জানেন না? গতরাত্রে আওয়াজ এসেছে আকাশ থেকে, যারা আল্লাহর এক প্রিয় বন্ধুর জানাজায় অংশ নিতে চায়, সে যেন কাল শোনিজিয়া কবরস্থানে চলে যায়।”
এই কাহিনিটি বর্ণনা করেছেন জুনায়েদ। একদিন আমি সারির কাছে যাই। গিয়ে দেখি, তিনি কাঁদছেন। “কী হয়েছে আপনার?”, জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, “হঠাৎ একটা চিন্তা এলো মাথায়। আজ রাতে পানি ঠান্ডা করার জন্য একটা কলসি ঝুলিয়ে রাখব বাইরে। সেই রাতে এক হুরিকে স্বপ্নে দেখলাম আমি। জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কার?” সে বলল, “আমি সেই পুরুষের, পানিকে ঠান্ডা করতে যার কলসিতে ঝুলিয়ে রাখতে হয় না।”
“তারপর সেই হুরি আমার কলসিটা মাটিতে ফেলে খানখান করে দিল। ওই যে দেখ।” তাকিয়ে দেখলাম কলসির ভাঙা কয়েকটি টুকরো। অনেকদিন সেগুলো ওইভাবেই পড়ে ছিল। এটাও জুনায়েদের থেকে বর্ণিত।
এক রাতে শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলাম আমি। আর যখন ঘুম ভাঙল, আমার গোপন আত্মা জোরাজুরি করল যে, আমাকে শোনিজিয়ার মসজিদে যেতে হবে। আমি সেখানে গেলাম, আর দেখলাম মসজিদের পাশে বীভৎস এক মুখ। ভয় পেয়ে গেলাম আমি। “জুনায়েদ, তুমি কি ভয় পাচ্ছো আমাকে?” সে জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম, “হ্যাঁ।” “যদি আল্লাহকে ঠিকভাবে চিনতে, তাহলে তাকে ছাড়া আর অন্য কাউকেই ভয় করতে না তুমি”, বললো সে। জিজ্ঞেস করলাম, “কে তুমি?” “ইবলিস”, তার উত্তর। “আমি তোমাকে দেখতে চেয়েছিলাম”, তাকে বললাম। “যে মুহূর্তে তুমি আমার কথা ভাবলে, ঠিক তখনই আল্লাহকে ভুলে গেলে, আর তুমি এটা জানলেও না।”
“তো, আমাকে দেখতে চাওয়ার কারণ কী?”, সে বললো। “আমি জানতে চেয়েছিলাম, দরিদ্রদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতা আছে কিনা”, তাকে বললাম আমি। সে বলল, “না, নেই।” আমি বললাম, “কেন?” “যখন আমি তাদের পার্থিব জিনিসের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করি, তখন তারা আখেরাতে পালিয়ে যায়। আর যখন আমি তাদেরকে আখেরাতের ফাঁদে ফেলতে চাই, তখন তারা সোজা তাদের রবের কাছে ফিরে যায়, সেখানে আমি আর পৌঁছাতে পারি না,” বলল সে।
“যখন তুমি তাদের শিকার করতে পারো না, তখনও কি ওদের দেখতে পাও?” জানতে চাইলাম। সে বলল, “হ্যাঁ, দেখতে পাই। যখন তারা বিশৃঙ্খল গানের অনুষ্ঠান আর আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানো অবস্থায় থাকে, তখন আমি তাদের হাহাকারের উৎস দেখতে পাই।” এই বলে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। তারপর আমি মসজিদের ভেতরে ঢুকলাম। দেখি, সেখানে হাঁটু মুড়ে বসে আছেন সারি। “মিথ্যে বলেছে সে, আল্লাহর সেই শত্রু”, মাথা তুলে বললেন সারি, “আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তার কাছে এতটাই দামি, তিনি তাদের ইবলিসের নজরে পড়তেই দেন না।”
একটা বোন ছিল সারির। সে সারির ঘর মোছার জন্য অনুমতি চাইলো। কিন্তু সারি প্রত্যাখান করলেন। “আমার জীবন এসবের যোগ্য নয়”, তিনি বললেন তাকে। একদিন সে সারির ঘরে ঢুকলো আর দেখতে পেল এক বৃদ্ধা নারী তার ঘর ধোয়ামোছা করছে। “ভাই, তুমি তো আমাকে তোমার ঘর ঝাড়ু দেওয়ার অনুমতি দিলে না। এখন দেখি এমন একজনকে এনেছ যে তোমার আত্মীয় নয়। “বোন, অস্থির করো না তোমার অন্তরকে”, জবাব দিল সারি। “এটা নিচের জগৎ। সে আমার প্রেমে পড়েছিল, আর আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর সে আল্লাহর কাছে অনুমতি চেয়েছে, আমার জীবনের একটা অংশ হতে। তাকে আমার কক্ষ ঝাড়ু দেওয়ার কাজ দেওয়া হয়েছে।”