Published : 16 Jul 2026, 02:30 PM
ডালাসের সংবাদ সম্মেলন কক্ষটি তখন গণমাধ্যমকর্মীদের ব্যস্ততায় মুখর। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি সবে তার বক্তব্য শেষ করেছেন। জর্ডানের বিপক্ষে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচটির আগে নানা কৌশল আর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছিলেন তিনি। কিন্তু সম্মেলন শেষে যখন তিনি চলে যাবেন, ঠিক তখনই ঘটল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ডাগআউটের কোচ স্কালোনি হুট করেই থামলেন। একজন প্রবীণ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে পোজ দিলেন ক্যামেরার সামনে।
যার জন্য বিশ্বজয়ী কোচ স্কালোনি এভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন, তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন। তিনি এনরিকে মাকায়া মার্কেজ। ফুটবল দুনিয়া যাকে একডাকে চেনে ‘মাকায়া’ নামে। ৯১ বছর বয়সি এই আর্জেন্টাইন সাংবাদিক ফুটবল ইতিহাসের যেন এক জীবন্ত লাইব্রেরি। এবার তিনি কভার করছেন তার ক্যারিয়ারের রেকর্ডসংখ্যক ১৮তম বিশ্বকাপ! ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে আজ ২০২৬ সাল, মাঝের এই দীর্ঘ সাতটি দশকে পুরুষদের একটি বিশ্বকাপও মিস করেননি এই কিংবদন্তি। তার এই অনন্য ও মহাকাব্যিক পথচলা কেবল দীর্ঘ নয়, ফুটবল ইতিহাসের বিবর্তনেরও দলিল।
আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগের কথা। ১৯৫৮ সাল। সুইডেন বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে আর্জেন্টিনা থেকে পাঠানো হয়েছিল মাত্র ২৪ বছরের এক তরুণ সাংবাদিককে। তিনিই আজকের প্রবীণ মাকায়া। সেবার ফুটবল বিশ্ব প্রথম পরিচিত হয়েছিল ১৭ বছরের এক বিস্ময় বালকের সঙ্গে, যার নাম ছিল পেলে। মাকায়ার অন্যতম প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেলের ব্রাজিলের ম্যাচটি মাঠে বসে দেখা।
তবে সুইডেন বিশ্বকাপের কথা মনে করলেই আজ এত বছর পরও তার চোখে ভেসে ওঠে এক চরম বেদনার স্মৃতি। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে যা ‘ডিজাস্টার অফ সুইডেন’ নামে পরিচিত। চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে সেবার ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। সেই স্মৃতি হাতড়ে মাকায়া বলেন, “স্মৃতির পাতায় সেই ম্যাচটি আজও আর্জেন্টিনার ফুটবলের জন্য একটা ভয়াবহ চপেটাঘাত হিসেবে খোদাই করা আছে। আমরা তখন চেকোস্লোভাকিয়া সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতাম না। আমাদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না, কোনো ডেটা ছিল না। ওরা মাঠে এসে আমাদের স্রেফ স্তব্ধ করে দিয়েছিল।”
আজকের গুগল আর ইন্টারনেটের যুগে যেখানে প্রতিপক্ষের নাড়িনক্ষত্র আঙুলের ডগায় থাকে, সেই যুগে দাঁড়িয়ে মাকায়ার এই স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় ফুটবল কতটা আদিম আর রোমাঞ্চকর ছিল। গত সাতটি দশকে মাকায়া কেবল বয়স বাড়তেই দেখেননি, দেখেছেন ফুটবল ও গণমাধ্যমের খোলনলচে বদলে যাওয়া। তিনি চোখের সামনে খেলতে দেখেছেন পেলে, ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির মতো ইতিহাসের সেরা ফুটবলারদের। তার চোখের সামনে সাদা-কালো টেলিভিশন রঙিন হয়েছে, অ্যানালগ প্রযুক্তি পরিণত হয়েছে ডিজিটালে, ফুটবল পরিসংখ্যান এখন কাগজের পাতা থেকে উঠে এসে চোখের পলকে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। বিশ্বকাপ এখন আর স্রেফ একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, এটি এখন বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক মহাযজ্ঞ।
এত পরিবর্তনের মধ্যেও মাকায়ার একটি জিনিস আজো অপরিবর্তিত রয়েছে- তিনি কখনোই কোনো বিষয়ে তাড়াহুড়ো করে রায় দিয়ে দেন না। এই ধীরস্থির এবং দর্শনই তাকে আজ সাংবাদিকতা জগতে শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে লিওনেল স্কালোনির অপ্রত্যাশিত নিয়োগ। সে সময় স্কালোনিকে নিয়ে চারদিকে যখন তুমুল সমালোচনা, তখনো মাকায়া চুপ ছিলেন। ডি-স্পোর্টস রেডিওর এই জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার বলেন, “সত্যি বলতে, স্কালোনিকে নিয়ে আমার খুব বেশি আশা ছিল না। কারণ, আমি তাকে ওভাবে চিনতামই না।”

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্কালোনি আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং ঐতিহাসিক ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় জুয়াকে স্কালোনি রূপ দিয়েছেন ফুটবলের সর্বকালের সেরা রূপকথায়। আর এই সাফল্য মাকায়ার আজীবনের লালিত বিশ্বাসকেই যেন নতুন করে সত্য প্রমাণ করেছে। মাকায়া বিশ্বাস করেন, “কাউকে পুরোপুরি না চিনে, তার ভেতরের সত্তাটাকে গভীরভাবে না বুঝে স্রেফ হুট করে কোনো রায় বা সিদ্ধান্ত দিয়ে দেওয়া যায় না। গভীর উপলব্ধি ছাড়া বিচার করা অনুচিত।”
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গেছে আর্জেন্টিনা। মাকায়া কি মনে করেন আর্জেন্টিনা এবারও ২০২২ সালের সেই সোনালি সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে? ৯১ বছরের প্রবীণ মাকায়ার উত্তর আত্মবিশ্বাসী, “অবশ্যই তারা পারে। আমরা যদি সম্ভাবনা আর ভবিষ্যতের কথা বলি, তবে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি আর্জেন্টিনার আবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সব রকমের যোগ্যতা আছে।”
এত দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তার সবচেয়ে প্রিয় আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় কে? এই প্রশ্নের উত্তরে কোনো দ্বিধা নেই মাকায়ার। সরাসরি জানিয়ে দিলেন, “খুব স্পষ্টভাবেই, সে হলো লিওনেল মেসি।” কিন্তু এর পরেই যখন সেই অমোঘ প্রশ্নটি ধেয়ে আসে, সর্বকালের সেরা ফুটবলার বা ‘গোট’ আসলে কে? তখন মাকায়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে অভিজ্ঞতার চওড়া হাসি। তিনি রসিকতা করে বলেন, “এই প্রশ্নটা শুনলে কেবল একটা মিষ্টি হাসি দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ফুটবল ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের পরিমাপ করার কোনো নির্দিষ্ট স্কেল বা ফিতা নেই।”
তার মতে, যুগ বদলেছে, প্রতিপক্ষ বদলেছে, ফুটবলের ধরন বদলেছে। প্রতিটি খেলোয়াড়ই নিজ নিজ জায়গায় অনন্য। তিনি বলেন, “আমি বলতে পারি ব্যক্তিগতভাবে আমার কাকে বেশি পছন্দ, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি তাকেই ইতিহাসের সেরা বলে রায় দিয়ে দেব।” ম্যারাডোনা ও মেসির মধ্যকার তুলনার প্রসঙ্গেও মাকায়ার বিশ্লেষণ সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মত, “তাদের মধ্যে কোনো নিরেট বা গাণিতিক তুলনা করা অসম্ভব। তাদের প্রতিপক্ষ আলাদা ছিল, দলের চাহিদা আলাদা ছিল এবং সতীর্থদের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনও ছিল ভিন্ন। প্রত্যেকের নিজস্ব জীবন এবং নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে।”
এমনকি ১৯৭০ সালের পেলের ব্রাজিল দলের সঙ্গে ১৯৮৬ সালের ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার তুলনা করাকেও অর্থহীন মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, “ওদের তুলনা করার কোনো সুযোগই নেই। খেলার ধরনটাই ছিল একদম আলাদা।” অনেকেই শুধু জয় আর ট্রফি জয়ের গল্প মনে রাখতে চান। কিন্তু মাকায়া মনে করেন, ফুটবলে পরাজয়ের বেদনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। “স্মৃতিতে গেঁথে থাকার মতো অনেক ম্যাচ আছে। কেবল জয় নয়, নেতিবাচক ফলাফল বা পরাজয়গুলোও সেই স্মৃতিরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ,” বলেন মাকায়া।
তবে একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে বিশ্বকাপ জয় তার হৃদয়ে আলাদা আবেগের জায়গা জুড়ে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই অবিস্মরণীয় বিশ্বকাপ জয়ের মুহূর্তটি। মাকায়া আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “বিশ্বকাপ জয় আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি। ম্যারাডোনার ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছিল, ওই সোনালি ট্রফিটি অবশেষে তাকে সেই উত্তরটি এনে দিয়েছিল যা সে সারা জীবন পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছে- বিশ্বের সেরা হওয়া, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া।”
দীর্ঘ ৭০ বছরের এই রোমাঞ্চকর পথচলার কি তবে শেষ হতে চলেছে? অবসরের কথা জিজ্ঞেস করতেই হেসে ফেলেন এই অশীতিপর বৃদ্ধ। রসিকতার সুরে বলেন, “আমি তো কোনো না কোনো সময় অবসর নেবোই... আচ্ছা, আমি বরং এখনই বিদায় নিচ্ছি, আজকের মতো ফোনটা রাখি, বাকি কথা অন্য কোনো দিন হবে!” বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস যিনি নিজের চোখে রচনা হতে দেখেছেন, তার বিদায়বেলাটা এমন নির্ভার আর রসাত্মক হওয়াই তো স্বাভাবিক।
সূত্র: বিবিসি স্পোর্ট, স্প্যানিশ ফুটবল রিপোর্টার এলিজাবেথ কনওয়ের প্রতিবেদন থেকে, ১৫ জুলাই ২০২৬।