ধারাবাহিক উপন্যাস
Published : 21 Oct 2025, 10:39 AM
বেন ওকরি সমকালীন আফ্রিকান সাহিত্যের অন্যতম কণ্ঠস্বর। জন্ম ১৫ মার্চ ১৯৫৯, মিননা, নাইজেরিয়াতে। ১৯৯১ সালে তিনি বুকার পুরস্কার পান। তার লেখা সবসময় বাস্তব ও কল্পনার সীমানা অতিক্রম করে মানবিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সত্যের দিকে আমাদের চোখ ফেরায়। ‘এভরি লিফ অ্যা হ্যালেলুইয়া’ (২০২১) উপন্যাসটিও এর ব্যতিক্রম নয়।
যদিও বইটির কাঠামো শিশু-কিশোর উপযোগী কাহিনির আঙ্গিকে নির্মিত, তবু এর অন্তর্নিহিত দর্শন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক ও পরিবেশগত সংকট সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে। বিশ্বায়নের যুগে দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে প্রকৃতি আজ ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে প্রকৃতিবান্ধব জীবনদর্শন উপস্থাপন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
দিন কেটে গেল। কিন্তু মাঙ্গোশি আর শিশুদের কারণে গাছকাটা লোকেরা কাজ করতে পারল না। শেষে তারা হাল ছেড়ে সরে গেল। ম্যানেজার হুমকি দিয়ে গেল, কাল আমি বড় বড় প্রহরী কুকুর নিয়ে আসব। তখন মাঙ্গোশির পক্ষে এখানে থাকা ভালো হবে না।
সন্ধ্যা নেমে এলো। শিশুরা একে একে ঘরে ফিরে গেল। অধিকাংশ লোকও চলে গেল। কেবল মাঙ্গোশি রইল গাছের পাশে, একা। অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। তুমি ভীষণ সাহসী কাজ করছো, জানো? বাওবাব বললো।
তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
তুমি আমার বন্ধু। আমরা তো বন্ধুদের সাহায্য করতেই হয়, বললো মাঙ্গোশি।
কিন্তু জানো, তুমি-ই একমাত্র যে আমাদের জন্য সত্যি সত্যি কিছু করছো। আমরা একা কিছু করতে পারি না। আমরা মানুষের সঙ্গে কথা বলি, কিন্তু তারা আমাদের শোনে না।
তোমরা কী বলতে চাও আমাদের?
যদি আমাদের কেটে ফেলে, তবে ভয়ানক রোগ আসবে। মানুষের জীবন আমাদের ওপর নির্ভর করে। কেবল মানুষই আমাদের রক্ষা করতে পারে। তাই আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
মাঙ্গোশি বসে বসে রাত নামতে দেখল। সে চিন্তা করছিল তার মায়ের কথা, গ্রামের কথা, আর বনভূমির গাছেদের কথা। রাতে সে শুনল গাছেরা ফিসফিস করছে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। তারা জানে, ভোর হলে তাদের কেটে ফেলা হবে।
বিদায়, বললো এক তালগাছ অন্যদের। তোমাদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা আমি খুব ভালোবেসেছি।
বিদায়, বললো এক ইরোকো। আমি সূর্যের দিকে আমার ডাল তুলে ধরতে আর পারব না। তোমাদের সঙ্গে কথা বলাও মিস করব।
তারপর গাছেরা কান্না শুরু করল। এমন শব্দ যেন এক বিশাল গির্জাভর্তি মানুষ একসঙ্গে কাঁদছে, আর থামতে পারছে না। মাঙ্গোশির চোখ ভিজে গেল, সে-ও তাদের সঙ্গে কাঁদতে লাগল। আমাদের এত ভাই-বোন, এত বন্ধু চলে গেছে, বললো বাওবাব।
তাই আমরা এত দুঃখী। কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়ল মাঙ্গোশি। আর স্বপ্নে দেখল, পৃথিবীর সব গাছ নেই। পৃথিবী শূন্য, ফাঁকা। তারপর একে একে মানুষও অদৃশ্য হয়ে গেল।
ভোরে সূর্যের আলোয় তার ঘুম ভাঙল। সে দেখল, গাছকাটা লোকেরা এসে গেছে। তারা অনেকগুলো যন্ত্র আর নতুন সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে। মাঙ্গোশির বুক ধক করে উঠল।
সাহসী হও, বললো সবচেয়ে প্রবীণ গাছ। অটল থেকো, কখনো ভয় দেখিও না। তুমি ছোট, কিন্তু তোমার এই নবীন চিন্তাই শক্তিশালী। আমরা সবাই তোমার পেছনে আছি, তোমাকে শক্তি দিতে।
মাঙ্গোশি পেছনে তাকাল। তার মনে হলো গাছগুলো আরও কাছে এসে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা যেন এক ঘন দেওয়াল হয়ে গেছে। প্রথমবার তার মনে হলো, গাছেরাও রাগ করতে পারে। বনের গাছেরা সত্যিই রেগে গেছে, আর সেটা অদ্ভুত একভাবে বোঝা যাচ্ছিল। ম্যানেজার লোকদের কাজ শুরু করতে বললো। কিন্তু তারা যখন বনের কাছে পৌঁছাল, কিছু একটা তাদের থামিয়ে দিল।
বন যেন আগের চেয়ে আরও ঘন আর অন্ধকার হয়ে উঠল। এখন শুধু মাঙ্গোশি দাঁড়িয়ে আছে গাছ আর মানুষদের মাঝে। তোমরা এই বনের একটিও গাছ কাটতে পারবে না! বললো মাঙ্গোশি, ছোট্ট মেয়ের দৃঢ় কণ্ঠে।
আর যদি কাটি, তবে তুমি কী করবে? ম্যানেজার হেসে জিজ্ঞেস করল।
মাঙ্গোশি জানত না কী করবে। কিন্তু সে দ্রুত ভাবল। আমি এ কথা সারা দুনিয়াকে বলে দেব, সে বললো।
দুনিয়া পরোয়া করে না, ম্যানেজার হেসে বললো। তারা তো নিজেদের বনও কেটে ফেলেছে। ভেবেছ কোথায় পাঠানো হয় এই গাছের কাঠ?
মাঙ্গোশির মুখে আর কোনো কথা এলো না। কিন্তু মনে মনে বললো, আমি হার মানব না। কোনোভাবেই হার মানব না।
তারপর ম্যানেজার আর লোকেরা বনের ভেতরে ঢুকতে শুরু করল। তারা মাঙ্গোশিকে সরিয়ে দিল, সে মাটিতে পড়ে গেল। ঠিক তখনই হাজির হলো সেই সাংবাদিক, যে আগের দিনও এসেছিল। তার পেছনে একটা বড় দল। তারা দেখতে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।
তোমরা কারা? চোখে জল নিয়ে জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।
আমরা তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি, বললো সাংবাদিক।
তোমার সংগ্রামের খবর সব পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। মানুষ বন নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।
গাছকাটা দলের ম্যানেজার এগিয়ে এল ভিড় দেখে। দলের সঙ্গে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ নারী তার সঙ্গে কথা বললেন। আমি এই প্রদেশের গভর্নর। আমরা চাই, তুমি বনে কাজ বন্ধ করো।
কিন্তু আপনিই তো আমাদের এই কাজের নির্দেশ দিয়েছিলেন, বললো ম্যানেজার।
এখন আমরা চাই কাজ বন্ধ হোক, গভর্নর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন।
মানুষ বন রক্ষার জন্য প্রতিবাদ করছে। আপাতত সব কাজ বন্ধ করো।
এভাবে ঘটনাটা ঘুরে গেল, ম্যানেজার ভীষণ অবাক হলো। তবুও তাকে আর তার লোকদের কাজ থামাতে হলো। তারা চলে গেলে সাংবাদিক ছবি তুলল, মেয়েটির সঙ্গে গভর্নরের, আর মেয়েটির সঙ্গে তার বন্ধু বাওবাব গাছের। তারপর গভর্নর ও সাংবাদিক বিদায় নিলেন।
তখন দুপুর গড়িয়ে এসেছে। দিনের সবচেয়ে গরম সময়। এমন সময় বন ঘুমিয়ে থাকে নিজস্ব ছায়ার শান্তিতে। এবার গাছেরা খুশিতে ঘুমিয়ে পড়ল, কারণ তাদের আর কেটে ফেলা হবে না। মাঙ্গোশি বুঝল, এবার তার ঘরে ফেরার সময় হয়েছে। কিন্তু যাওয়ার আগে সে বিদায় জানাল তার বন্ধু, সেই বৃদ্ধ বাওবাব গাছকে। বাওবাব তখন হাসছিল।
তুমি হাসছো কেন? জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি।
কারণ, যদি তারা আমাকে কেটে ফেলত, তুমি এটা কখনো দেখতে পেতে না, বললো বুড়ো গাছটি। তার শিকড়ের কাছে ফুটে ছিল সেই বিশেষ ফুল। যে ফুল তার মা আর পুরো গ্রামকে বাঁচাতে পারবে।
তাহলে এটা তো তোমার কাছেই ছিল এতদিন? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি। বাওবাব হেসে উঠল খুশিতে। এই ফুল তখনই জন্মায়, বললো সে, যখন কেউ দেখায় সত্যিকারের সাহস।
মাঙ্গোশি ঝুঁকে পড়ল। ওহে বিশেষ ফুল, সে বললো, আশা করি তুমি রাগ করবে না যদি আমি তোমাকে তুলে নিই। কিন্তু আমার মায়ের খুব প্রয়োজন তোমার, যাতে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
আমি কিছু মনে করি না, উত্তর দিল ফুলটি। তখন মাঙ্গোশি ফুলটি তুলে নিল আর ঘরে ফেরার পথে রওনা হলো। ফিরতি পথে তার খুব ক্ষুধা লাগল। সে মনে করল তার পকেটে থাকা সাতটি বীজের কথা। সে ভেবেছিল সেগুলো জাদুবীজ, ক্ষুধা পেলে খাওয়ার জন্য।
কিন্তু যখন সে পড়ে থাকা গাছেদের পাশ দিয়ে হাঁটছিল, তখন বুঝল, এই বীজগুলো আসলে খাওয়ার জন্য নয়, এগুলো রোপণের জন্য, নতুন বন জন্ম দেওয়ার জন্য। তাই সে বীজগুলো সাতটি জায়গায় পুঁতে দিল। তারপর খুব যত্ন করে ফুলটি নিয়ে গেল গ্রামে। তার মা-বাবা তাকে দেখে ভীষণ আনন্দে ভরে উঠলেন। আরও অবাক হলেন, কারণ মাঙ্গোশি ফিরিয়ে এনেছে সেই বিশেষ ফুল, যা বহুদিন কেউ আনতে পারেনি।
ফুলটির জাদুতে তার মা সুস্থ হয়ে উঠলেন, আর গ্রামও রক্ষা পেল ভয়ানক অসুখ থেকে। এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় গ্রামের প্রবীণদের সামনে মাঙ্গোশি বললো, গাছেরা আসলে রক্ষক। বন ধ্বংস হওয়ার কারণেই এই সব দুঃখ আর বিপদ আমাদের জীবনে আসছে।
সেই দিন থেকে গ্রাম বন রক্ষার লড়াই শুরু করল, আর সঙ্গে রক্ষা করল সেই জাদুকরী আরোগ্যের ফুলগুলোকে, যারা লুকিয়ে ছিল বনের অন্তরে। এক রাতে ঘুমের মধ্যে মাঙ্গোশি নিজেকে খুঁজে পেল এক অদ্ভুত জায়গায়। যেখানে পাখিরা খুশিতে গান গায়, নদীগুলো একেবারে স্বচ্ছ আর নির্মল। এ কোন জায়গা? সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
এটা হলো গাছেদের স্বর্গ, বললো বৃদ্ধ বাওবাব গাছ। এখানে কিছুই মরে না। সবকিছু বাঁচে সহজ আনন্দে।
তুমি আমাকে এখানে কেন এনেছো?
একটুখানি শান্তির জন্য, যা পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যায় না। এবার সময় হয়েছে তোমার শৈশবে ফিরে যাওয়ার।
তারপর থেকে মাঙ্গোশি প্রায়ই বনে ফিরে আসত। একদিন সে তার বন্ধু, বৃদ্ধ বাওবাব গাছকে বললো, এবার আমি তোমাদের গোপন রহস্য জেনে গেছি।
কোন রহস্য? জিজ্ঞেস করল বাওবাব।
মাঙ্গোশি বললো, সব গাছই ভালোবাসা ছড়িয়ে দেয়, আর প্রতিটি পাতাই ঈশ্বরের গান গায়।