Published : 24 Jul 2026, 04:16 PM
নোয়াখালীতে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলছে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা। গত ছয় মাসে জেলায় পানিতে ডুবে মারা গেছে ৬৫ শিশু। বর্ষা মৌসুমে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটায় স্বজনদের মনে বাড়ছে আতঙ্ক।
অথচ পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা সিভিল সার্জন অফিস ও ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালীতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পানিতে ডুবে ৬৫ জন শিশু মারা গেছে। এরমধ্যে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় মারা গেছে সবচেয়ে বেশি, ৩৬ জন শিশু। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়।
এছাড়া ছয় মাসে পানিতে পড়া ২১৫ জন শিশুকে সদর হাসপাতালে এবং উপজেলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “নোয়াখালী জেলার এবং সারা বাংলাদেশের চিত্রটা একই। প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখজনক এবং পানিতে ডুবে মরার প্রত্যেকটি ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। ”
উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীতে জালের মতো ছড়িয়ে আছে খাল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা। বর্ষা মৌসুমে এসব জলাশয়গুলো পানিতে টইটম্বুর হয়ে থাকে। এ সময় পরিবারের অগোচরে বা অসাবধানতার সুযোগে সেসব জলাশয়ে পড়ে যায় শিশুরা। অনেক সময় খেলাচ্ছলে পুকুর-দিঘিতে নেমেও দুর্ঘটনার শিকার হয় শিশুরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যথাযথ সময়ে সাঁতার শিখা থাকলে এমন অকাল মৃত্যুর বেশির ভাগই রোধ করা যেত। শিশুরা সাঁতার শিখতে আগ্রহী হলেও কোথাও সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই বড় হচ্ছে তারা।
নোয়াখালী পৌরসভার শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা জহির উদ্দীন (৫৯)। শৈশবে তিনি দুইবার বাড়ির পাশে পুকুরে পড়েও প্রতিবেশী-পথচারীদের বেঁচে যান। তার ছোট বোনও একবার পানিতে পড়ে বেঁচে যান। তবে, বাঁচানো যায়নি তাদের বড় ভাই জসিম উদ্দীনের দেড় বছর বয়সী শিশু পুত্রকে। পরিবারের সবার অগোচরে ঘরের পাশে পুকুরে পড়ে তার অকাল মৃত্যু হয়।
এলাকায় আরো অনেক পরিবারে এমন ঘটনা রয়েছে উল্লেখ করে জহির উদ্দীন বলেন, “এ অঞ্চলের প্রত্যেক বাড়িতে একটা দুইটা করে পুকুর আছে। তো শিশুরা পানিতে পড়ে মারা যায়, এজন্যতো পুকুরগুলো ভরাট করে ফেলা যাবে না।
“এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এ বিষয়ে পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও দায় রয়েছে। শিশুরা কিভাবে সহজে সাঁতার শিখতে পারে, এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
তিনি বলেন, “সাঁতার বিষয়ে আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্যে পাঁচ-ছয় বছর বয়সি যে শিশুরা সাঁতার জানে তাদেরকে সরকারিভাবে একটা কার্ড দেওয়া দরকার।
“এরপর কার্ডধারী শিশুদের সাঁতার লটারির মাধ্যমে প্রতি বছর পুরস্কৃত করলে তারা সাঁতারের বিষয়ে অভিভাবক ও শিশুরা আগ্রহী হয়ে উঠবে। এছাড়া প্রাথমিক এবং হাই স্কুলে নিয়মিত সাঁতার প্রতিযোগিতা আয়োজন করলে শিশুরা সাঁতার শিখতে উদ্বুদ্ধ হবে।”
নোয়াখালী সদর উপজেলার মহব্বতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজল রাণী রায় বলেন, “আমাদের নোয়াখালী একটা উপকূলীয় জেলা হওয়ার কারণে এখানে খাল-বিল, নদী-নালার সংখ্যা বেশি। এখানে প্রত্যেক বছর জলাবদ্ধতার কারণে অনেক বাচ্চা পানিতে ডুবে মারা যায়।
“আমি অভিভাকদেরকে অনুরোধ করি তারা যেন ছোটবেলা থেকে শিশুদের সাঁতার শিক্ষা দেন। একটা বাচ্চা যখন সাঁতার শিখে, সে তার জীবনকেই রক্ষা করে না, পাশাপাশি সে তার শারীরিক শিক্ষার ব্যাপারেও অনেকখানি উন্নত থাকে।
শিশুর জীবন রক্ষার পাশাপাশি শারীরিক গঠনে সাঁতারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “সাঁতার একটা বাচ্চার জীবনের একটা অনবদ্য শিক্ষা। সে যদি তার প্রাথমিক বয়স থেকে সাঁতার শিখতে পারে তাহলে সে তার জীবনে অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনা থেকে রক্ষা পায়।
“এছাড়া সাঁতার এক ধরনের ব্যায়াম, যার ফলে শিশুর শরীরের কাঠামোটা সুদৃঢ হয়। সাঁতার জানা থাকলে জলাবদ্ধতা, বন্যা, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও শিশুরা নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।”

এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম কালার মতে, “প্রত্যেক জেলায় ক্রীড়া সংস্থার মাধ্যমে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে এভাবে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধ করা যেতো।
তিনি বলেন, “আমাদের নোয়াখালী জেলা ক্রীড়া সংস্থায় এমন কোনো ব্যবস্থা নেই যে শিশুদের সাঁতার শেখানো যায়, এ রকম কোনো ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো। যদি প্রত্যেকটা ক্রীড়ায় সংস্থায় সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতো, সুইমিং পুল থাকতো, তাহলে শিশুরা সহজে সাঁতার শিখতে পারতো।”
মূলত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই পানিতে পড়ে বেশি মারা যাচ্ছে। এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, “সাধারণত পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ৭৫ ভাগ ঘটনা বাড়ির পাশে পুকুর-জলাশয়ে ঘটে থাকে। এক্ষেত্রে ১-৫ বছরের শিশুরা হচ্ছে মোস্ট ভালনারেবল।”
তিনি আরো বলেন, “সাধারণত দেখা যায় যে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩টা এই সময়টাতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটে। এই সময়টাতে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাড়ির বাইরে থাকেন, নারীরা রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকেন, বড় ছেলে মেয়ে থাকলে তারা স্কুল-কলেজে চলে যায়। এই সময়টাতে ছোট বাচ্চাগুলি খেলার ছলে বা আকর্ষণের কারণে বাড়ির আশপাশে পানিতে ডুবে মারা যায়।
এজন্য পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের দিনের বেলা দেখাশোনার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সকলের সমন্বিত উদ্যোগে শিশু যত্নকেন্দ্র স্থাপন এবং বাড়ির পাশে পুকুরে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া এবং শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।